কানিজ গোফরানী কোরায়শী

জীবনান্দের অদ্ভুত আঁধারে আজ পৃথিবী, নিমজ্জিত বাংলাদেশ। অন্ধ, হৃদয়হীন মানুষদের দখলে আজ সবকিছু। তাদের সুপরামর্শ ছাড়া পৃথিবী অচল। আর যাদের গভীর আস্থা মানুষের প্রতি তারা হচ্ছে ঘাতকের হত্যার শিকার। শেয়াল ও শকুনের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়। চারদিকে যখন এমনি ঘোর অন্ধকার, গভীর সংকট, দুঃসময় তখন যে মানুষটির কথা বেশি মনে পড়ে, যার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় তিনি হলেন আমার বাবা। যিনি ছিলেন আলোর বাতি ঘর। হতাশাকে লাথি মেরে, ভয়কে জয় করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার, সংকট মোকাবেলার উপায় যিনি বলে দিতে পারতেন এবং শুধু বলা নয় কাজে ঝাঁপিয়েও পরতেন, তিনি গোলাম সামদানী কোরায়শী। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে, সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আজীবন লড়ে গেছেন তিনি। অর্থ আর প্রচারের কাছে কখনই বিক্রি করেননি নিজের বিবেককে। আজন্ম সংগ্রামী, সমাজের বাতিঘর এই মানুষটি ১৯৯১ সালের ১১ অক্টোবর ভোরের আলো ফোটার প্রাক্কালে মহাখালীর বক্ষ ব্যধি হাসপাতালে নীরবে নিঃশব্দে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আসছে ১১অক্টোবর তার ১৭তম মৃত্যুবাষিকী।

আমার বাবার সঙ্গে আমাদের সাত ভাই বোনের একটা অলিখিত দূরত্ব ছিল। আমরা খুব সহজে কোন কথা ঊনার কাছে বলতে পারতাম না। তখন ১৯৮২/৮৩ সালের দিকে আমাদের বাসায় টেলিভিশন ছিল না। কিন্ত টেলিভিশন কেনার কথাটা আমরা বাবাকে বলব এই সহসটা ছিল না। তাই আমরা বাসায় দরজা জানালায় টিভি চাই, শ্লোগান লিখে ভরে ফেলি। পরে আমাদের মায়ের মধ্যস্থতায় টেলিভিশন পেয়েছিলাম। আমরা খুব ছোট বেলায় আব্বাকে দেখতাম সারাক্ষণ লেখালেখি করছেন। একটা আলাদা ঘরে থাকতেন একা। বিছানার চারপাশে সাজানো ছিল মোটা মোটা বই। তখন তিনি আল মোকাদ্দিমার অনুবাদ করছিলেন। তবে আমাদের প্রতি তাঁর অবাধ স্নেহ ও ভালবাসা আমরা দূর থেকে ঠিকই উপলব্ধি করতাম। আমাদের ভাইবোনদের কারো অসুখ হলে তিনি তার বিছানায় নিজের পাশে রাখতেন অসুখ ভাল না হওয়া পর্যন্ত। তাঁর ছায়া দিয়ে সব সময় ঘিরে রাখতেন আমাদের। পারিবারিক জীবন থেকে বিচ্ছিন হয়ে নানার আশ্রয়ে বড় হওয়ার পর যখন তিনি সংসারের হাল ধরেন, তখন একক প্রচেষ্টায় বিচ্ছিন হয়ে যাওয়া আত্মীয় পরিজনের মাঝে পুনরায় বন্ধন তৈরি করেন। বাবার মৃত্যুর পর সেই বাঁধনও হালকা হয়ে গেছে। আমরা ভাইবোনেরা আজ স্বজন হারা, বন্ধনহারা ছায়াহীন, কঠোর বাস্তবতার সঙ্গে সংগ্রাম রত।

গোলাম সামদানী কোরায়শী, আমার বাবা, শুধু আমদের পরিবারের জন্যই ছায়াময় বটবৃক্ষ ছিলেন না। তার সুশীতল ছায়া বিস্তৃত ছিল সমাজে, নানা দিকে, নানা মানুষের উপর। সমাজের বিত্তবান মানুষ থেকে শুরু করে একেবারে নিঃস্ব অসহায় মানুষটিও আশ্রয় পেত তার কাছে। পারিবারিক দাম্পত্য কলহ থেকে শুরু করে জমি নিয়ে ঝগড়া বা সামাজিক যে কোন সমস্যা সমাধানে আমার বাবা ছিলেন শেষ আশ্রয়। ছোট বেলা থেকে দেখেএসেছি গভীর রাতে আমাদের বাসার বৈঠক খানায় সালিশ হচ্ছে অথবা তিনি গভীর রাতে বাসায় ফিরেছেন বিচার কাজ শেষ করে। এ ছিল নিত্য দিনের ঘটনা। যারা বুদ্বির চর্চা করেন নানা কারনেই তাঁদের সাথে সাধারণ মানুষের একটা দুরত্ব থাকে। তাঁরা অনেকটা দুর থেকেই মানুষের দুঃখ-কষ্ট গুলো অনুভব করেন। এক্ষেত্রে আমার বাবা ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি মানুষের দুঃখ-যন্ত্রনার অংশীদার হতেন। আমার মনে হয় ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত আমার বাবা মানুষের ভালবাসাকেই বেশি মূল্যবান মনে করতেন। তাই ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লার মৃত্যুর পর বাংলা একাডেমির চাকুরী ছেড়ে চলে যান ময়মনসিংহে। আকুয়ার নিভৃত পল্লীতে থেকে লেখা লেখি করবেন এই ইচ্ছায়। কিন্তু লেখালেখির চেয়ে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দেখে জড়িয়ে পড়েন তাদের জীবনের সাথে।

প্রচন্ড রাগ ছিল উনার। রেগে গেলে রাগের প্রচন্ডতায় কাঁপতে থাকতেন। আমাদের উপর কোন কারনে রাগলে একটি কথাই বলতেন, তোরা মানুষ হলিনা। এই মানুষ না হওয়াটাই ছিল তাঁর কাছে খুব পরিতাপের বিষয়। তাই মানুষকে মানুষ বানানোর চেষ্টাই করে গেছেন আজীবন। বাংলা একাডেমির চাকুরী ছেড়ে তিনি যোগদান করেন ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে। সেখানকার ছাত্রদের নকল করা থেকে ফেরাতে একাই প্রতিবাদ করেছেন। ছাত্রশিক্ষকদের কল্যানে কুদরত-ই-খোদা শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন সহ প্রগতিশীল শিক্ষা ব্যাবস্থা চালু করা ইত্যাদির জন্য আব্বা জড়িত হন ‘বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি’র সাথে প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে মৃত্যুর কয়েক মাস আগ পর্যন্ত সাধারন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। হঠাৎই কি এক অভিমানে এই পদ থেকে অব্যাহতি নেন। মানুষের জন্য যাঁরা লড়াই করেন, সেই মানুষেরা তাঁদের কষ্ট দেয় বেশি। আমার বাবার ক্ষেত্রের এই সত্যটির ব্যতিক্রম হয়নি। যে মানুষের যন্ত্রনায় তিনি এগিয়ে গেছেন, যাঁদের ভালবেসেছেন তারাই তাকে আঘাত দিয়েছে। মৃত্যুও আগে রোগে ভোগার যন্ত্রণা যতটানা পেয়েছেন তার চেয়ে হয়তো এই যন্ত্রণা তাঁকে বেশি পীড়িত করেছে।

সহজ, সরল, সাদামাটা, অথচ সত্যবাদী, সাহসী মানুষের আজ বড় অভাব আমাদের সমাজে। সাধারণ কাপড়ের পাজামা পাঞ্জাবী পরিহিত, শ্মশ্রুমন্ডিত মুখমন্ডলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টির আমার বাবাকে আজ বড় প্রয়োজন। বাবা তুমি দূর থেকে কি দেখছো আমাদের? আমরা এখনও মানুষ হতে পারিনি। আমাদের চারপাশ থেকে মানুষ ক্রমশঃ হারিয়ে যাচ্ছে। তোমার শূণ্যতায় ময়মনসিংহ শহরের সকল প্রগতিশীল সংগঠনে সাংস্কৃতিক স্থবিরতা এসেছে। সভা গুলো নিষ্প্রভ। আকুয়ার মানুষেরা অভিভাবকহীন। আমরা কোথায় পাব তোমার মতো আরেকটি মানুষ? তোমার যে অসমাপ্ত কাজের দায়িত্ব রেখে গেছ আমাদের ঊপর, তা এখনও শুরুই করতে পারিনি। তোমার অপ্রকাশিত লেখা গুলো প্রকাশের ব্যবস্থা করা, মুদ্রিত লেখা গুলো পুনঃমুদ্রনের ব্যবস্থা কবে – কিভাবে করব, করতে পারব কি না জানি না?