বিজয় দিবসের স্মৃতি

বিজয় দিবস এলেই কিছুকথা মনে পড়ে। সে সব কথার সাথে সারাদেশের কথার হয়তো মিল নেই। কারণ সে সব একান্তই আমার কথা, আমার উপলব্ধির কথা, আমার চেতনার কথা, আমার বিশ্বাসের কথা। তবু সে সব কথাতো ব্যক্তিগত পর্যায়ে থাকতে চায় না, সমাজের সাথে মিশতে চায়, দেশের সাথে একাত্ম হতে চায়। আসলে এখানেই ব্যক্তি চিন্তার সার্থকতা। তা না হলে সে চিন্তা আকাশ কুসুম কল্পনা মাত্র।

বিজয় দিবসকে ঘিরে আমার যে উপলব্ধি, তার বিস্তৃতি অনেক ব্যাপক। এ শুধু নয় মাসের আতংকগ্রস্থ দিন রাত্রির কথা নয়, এর পরিধি এ দেশের ইতিহাসকে বেষ্টন করে আছে। সুতরাং সে উপলব্ধির ব্যাপকতা বর্ণনা করতে গেলে অনেক কথাই বলতে হয়। কিন্তু তা কি এই স্বল্প পরিসরে সম্ভব। কাজেই বিজয় দিবসের কথাই বলি।

১৯৭১ সনের ১৬ই ডিসেম্বর এসেছিল সেই বিজয় দিবস। এর আবির্ভাব ঘটেছিল ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে। কিন্তু দেশের এই প্রত্যন্ত অঞ্চল ময়মনসিংহের আকুয়ায় তার দেখা পেয়েছিলাম ১১ই ডিসেম্বর। সেই দিন ছিল শুক্রবার। কিন্তু তার আগের দিনগত রাত্রির ভয়াবহতা বর্ণনা না করলে এই দিবসের আবির্ভাবের স্মৃতি স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়বে না। কি আতংকের মধ্যেই না কেটেছিল সেই রাত্রি।

১০ই ডিসেম্বর ভোর বেলায় দুটি ট্রাক বোঝাই পাক বাহিনীর সৈন্য এসে উপস্থিত হলো আকুয়া প্রাইমারি স্কুল মাঠে। এলাকার লোকজনের মধ্যে নতুন এক সারা জাগিয়ে দিলো তারা। এরপর রুটি সেকার জন্য তারা যখন স্কুলের টেবিল বেঞ্চ ভাঙ্গতে আরম্ভ করলো, তখনই নতুন এক আতংক ছড়িয়ে পড়তে লাগল সবখানে। একটা কানাকানি, কি হয়, কি হবে – একটা ভাব সবার মধ্যে দেখা দিলো।

এই ভাবটা অপরিচিত কিছু নয়। পঁচিশে মার্চের পরেও এমনি একটা ভাব দেখেছিলাম সবার মধ্যে। তখন বিহারী আগমনের ভয়ে সবাই তটস্থ হয়ে উঠেছিল। এর দুই দিনের মধ্যেই সমস্ত এলাকা খালি হয়ে গিয়েছিল। কেবল যাইনি আমি। সপরিবারে এই দীর্ঘ নয় মাস এখানে কাটিয়েছি।

এরপর এই এলাকার মানুষ ফিরে এসেছে এবং বসবাসও করেছে। কিন্তু সবাই ছিলো মহা আতংকগ্রস্থ। সেই আতংকই পাক সৈন্যরা নতুন করে জাগিয়ে তুললো। আমার বাড়ির সবগুলি ঘর শরণার্থীতে ভরে গেলো। আবার বুঝি সবার পালিয়ে যাবার পালা এসেছে। কিন্তু আমি যাবো কোথায়। এতগুলি শরণার্থী মানুষ, এতসব গচ্ছিত সম্পদ রেখে আমি যাই কী করে। আমাকেই যদি পালাতে হয় তাহলে এঁরা এসে আশ্রয় নিয়েছে কোন ভরসায়। অবস্থা যাই হোক, পালাবার উপায় নেই।

কিন্তু সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পর আতংক যেন মূর্তিমান হয়ে উঠলো। অনেকেই বললেন আমার বাড়িতে আক্রমণ হতে পারে, লুটপাট হতে পারে, প্রয়োজন হলে গুলাগুলিও চলতে পারে। হয়তো আমার বাড়িতে রাখা মানুষের কিছু গচ্ছিত আসবাবপত্র দেখেই তারা একথা ভেবেছিলো। সুতরাং অবস্থা তখন একান্তই ভয়াবহ। কিন্তু আমি কী করতে পারি। যদি আক্রান্ত হই মরতে হবে, তবু বাড়িতে শরণার্থী রেখে আমি পালাতে পারি না।

আলাপ আলোচনা আর পরামর্শে ঘনিয়ে এলো রাত। চারদিকে কেমন একটা থমথমে ভাব। একটা নিশ্ছিদ্র অন্ধকার সব কিছুকে ঢেকে দিয়ে একটা ভয়াবহ কিছুর জন্য যেন অপেক্ষা করছে। একাই বাড়ির আশে পাশে কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করলাম। তারপর ঘরের ভেতর এসে শুয়ে পড়া ছাড়া আর কি করনীয় হতে পারে।কিন্তু এমন সময় প্রচন্ড বিস্ফোরণে উত্তর-পশ্চিম দিক উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। সে কী প্রচন্ড শব্দের তান্ডব আর আলোর ঝলকানী। মানুষজন প্রথমটা বেড়িয়ে এলো বাইরে তারপর এক মহাআতংকে এলাকা ছেড়ে পোটলা পুটলি নিয়ে পালাতে আরম্ভ করল। বাইরে বেড়িয়ে আলোর ঝলকানির মধ্যে তাই দেখলাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। কিন্তু শব্দের যেমন শেষ নেই, তেমনি আলোর বিদ্যুচ্চমকেরও নেই সমাপ্তি। এমনি পরিস্থিতিতে ঘুমের চেষ্টা বৃথা।

কিন্তু কী হচ্ছে আসলে? মুক্তিবাহিনী ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে এসে পৌঁছেছে এবং ই. পি. আর কে লক্ষ্য করে মর্টারের গোলা ছুঁড়ছে? একটা কিছু ব্যাপার হচ্ছে সেখানে। কিন্তু ব্যাপার তা ছিল না। এই রাতেই পাক বাহিনী শহর ছেড়ে চলে যায়। যাবার সময় তারা ই. পি. আর ক্যাম্পের ম্যাগাজিনে আগুন দিয়ে গেছে আর সেখানে সংরক্ষিত গুলাগুলিই এমন প্রচন্ড শব্দে বিস্ফোরিত হচ্ছে। এরই দিয়ে তারা নিরাপদে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। রাত ৩টা পর্যন্ত চলল সেই বিস্ফোরণ।

এরপর একটু ঘুমাবার চেষ্টা করেছিলাম, হয়তো ঘুমিয়েও পড়েছিলাম। হঠাৎ হৈচৈ শুনে জেগে উঠলাম। দেখলাম শুধু ভোর হয়নি, বেলা উঠে গেছে। যারা হৈচৈ করছিলো তাদের মুখে শুনলাম প্রচুর রাইফেল আর গুলি পড়ে আছে রাস্তায়। দৌড়ে গিয়ে উপস্থিত হলাম ইউনিয়ন কাউন্সিল অফিসের পিছনের রাস্তার পাশের জলাভূমির ধারে। সেখানে লোকের ভীড়। তাদের মাঝখানে ১৪টি রাইফেলের একটি স্তুপ। কিন্তু গুলির স্তুপ সেই তুলনায় অনেক বেশি। বুঝা গেলো ইতিমধ্যেই কিছু রাইফেল চলে গেছে। কিন্তু কারা ফেলে গেছে এই রাইফেল আর গুলি? রাজাকাররা। পাক বাহিনী তাদের অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে পালিয়েছে। সুতরাং এইসব অস্ত্র ফেলে দিয়ে জনতার মধ্যে মিশে যাওয়া ছাড়া তাদের আর উপায় নেই।

১১ই ডিসেম্বর সেই ভোরে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত রাইফেল আর গুলির স্তুপ নিয়ে বিজয় দিবস এসেছিল আকুয়ায়। এরপর সেই রাইফেল আর গুলি গেছে মুক্তিবাহিনীর হাতে। কিন্তু যে মুক্তির জন্য এ বাহিনী গঠিত হয়েছিল সেই মুক্তি এখোনো আসেনি। তাই বিজয় দিবসের কাহিনী শেষ হবার নয়। পরিপূর্ণ বিজয় না আসা পর্যন্ত সেই স্মৃতিচারণ চলতেই থাকবে। কারণ সংগ্রামের যেমন শেষ নেই তেমনি বিজয়েরও শেষ নেই।