যখন একাকী

আকুয়া, ১লা জৈষ্ঠ্য ১৩৮০

আমার জীবনে অবসর মুহূর্ত খুবই বিরল। তবুও কখনও সেই দুর্লভ মুহূর্তটি এলে, যখন আমি নিজের মুখোমুখি হই, তখর এক অদ্ভুত অনুভূতি আমার সমগ্র চেতনায় ছড়িয়ে পড়ে, মনে হয় আমি যেন এই পৃথিবীর জড় পদার্থের সাথে একান্ত হয়ে আমার পাশে দাড়ানো বাশের খুঁটি বা চেয়ারটির মতই নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছি। ওরা যেমন আমাকে নীরবে নিভৃতে এক বিশাল একাগ্রতা নিয়ে দেখছে, ঠিক তেমনই আমিও আমাকে দেখছি। আমার সমগ্র চৈতন্যে, মগজের কোষে কোষে, হৃদয়ের পরতে পরতে আমার দৃষ্টি আমাকে খুঁজে ফিরছে। আমার সমস্ত কর্মকান্ডের ভূমিকা, আমার সমস্ত বাকবিতন্ডার অহমিকা থেকে আমাকে দূরে সরিয়ে এনে একান্ত নির্নিমেষে আমাকে দেখছে।

বাঁশের খুঁটি বা চেয়ার আমাকে দেখে, কিন্তু কোন কথা বলেনা। অথচ আমার এই নিভৃত দৃষ্টি আমাকে শুধু দেখেনা, মাঝে মাঝে কথাও বলে উঠে। কখনও ইঙ্গিতে, কখনও আভাসে, কখনও ঈষৎ হাসির রেখা টেনে, কখনও বিকৃত মুখভঙ্গির ছায়া ফেলে সে অন্তরতম সত্তাকে নাড়া দিয়ে যায়। আমি শিউরে উঠি। কেবলি মনে হয়, আমি ধরা পড়ে গেছি। আমি যেভাবে নিজকে প্রকাশ করি, যেভাবে কথা বলি, যেভাবে অপরের সাথে ব্যবহার করি, যেভাবে পথ চলি – সবকিছুর মধ্যেই যেন একটা প্রতারণা মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করি – আমার মাঝে দুটি স্বত্বা বিরাজ করছে। এর একটি সংসারের কর্ম কোলাহলের মাঝে নিজেকে ছড়িয়ে দেয় আর অপরটি এই নিভৃত মুহূর্তে নিজেকে প্রকাশ করে আমার সমস্ত কর্মচাঞ্চল্যকে বিচার করতে বসে। অনেক সময় তার বিচার আমার বিপক্ষে যায়, আমি ক্ষণকালের জন্য এক অপরাধবোধে পীড়িত হয়ে থাকি। আবার কখনও সে আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলে সাবাশ! আমি উৎফুল্ল হয়ে উঠি।

আমি ভাল করে জানিনা বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্রে সত্তার এই দ্বিধাবিভক্তিকে কীভাবে বিশ্লেষন করা হয়েছে; কিম্বা ভাববাদী ও বস্তুবাদী দর্শনে এর স্বীকৃতি ও অস্বীকৃতি নিয়ে কী ধরনের সূক্ষ্ম বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। কারন আমাদের চিন্তার – ঐতিহ্যে তার অস্তিত্ব ও অবস্থান যে ভাবেই থাক না কেন, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। যা আমার অনুভূতির জগতে সত্য, তাকে কোন তর্কজালের খাতিরে যেমন আমি অস্বীকার করতে পারিনা, তেমনি তার স্বীকৃতিতেও আমার লজ্জা পাবার কোন হেতু নেই। বরং আমি মনে করি, এই বিভক্তি মূলতঃ একই চেতনার স্তর পরস্পরা মাত্র। যে চেতনা সংসারে কর্ম কোলাহলে ষড়ঋতুর তাড়নায় উদ্ভ্রান্ত, সেই চেতনাই নিভৃত নির্জনে বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ, তাকেই আমরা বলি বিবেকের দংশন। কিন্তু বিবেকতো শুধু দংশন করেনা, সে আমার অনুঃপ্রেরণারও উৎস।

তাহলে এ কথা অবশ্যি সত্য যে, আমার সমগ্র চেতনা, চিন্তা, অভিজ্ঞতার যে সঞ্চয় সঞ্চারিত হয়ে আছে, তার মধ্য থেকেই এক পরিচালিকা শক্তির উদ্ভব হয়েছে, যা আমাকে বিপদ সংকুল সংসার পথের দিশা দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে আমার গ্রহণ বর্জন উত্থান পতনের জন্য আমিই দায়ী। আর এরই নাম ব্যক্তি স্বাতন্ত্র। এ স্বতন্ত্র ব্যক্তি সত্তা যেমন একান্ত আমার, তেমনি সে একটি পরিবারের, একটি সমাজের, একটি দেশের এবং একটি বিশ্বের প্রয়োজনীয় সম্পদ। এ সম্পদ তাই কোন মন্ত্র বা তন্ত্রের বাধ্য বাধকতায় নষ্ট হতে পারেনা। কারন এর নষ্ট হওয়া মানে একটি ব্যক্তির পরিচালিকা শক্তির ধংস হওয়া। সে ব্যক্তি কখনও একটি জীবন্মৃত সত্তা ছাড়া অন্যকিছু নয়। আর এমনি জীবন্মৃত ব্যক্তিসত্তা দিয়ে যে সমাজ গঠিত হবে, তার মধ্যে যান্ত্রিক সচলতা থাকতে পারে, কিন্তু প্রাণ থাকবে কিনা সন্দেহ। এ কারনেই যে সমাজে মন্ত্রের বাধ্যবাধকতা বা তন্ত্রের বিধি নিষেধ অতিমাত্রায় সক্রিয়, সেখানে চলমানতার চাইতে জড়তাই অধিকতর দেদীপ্যমান। ইতিহাস এর সাক্ষ্য প্রমানে পরিপূর্ণ।

কিন্তু এই ব্যক্তি স্বাতন্ত্র যখন একান্ত ভাবে আমার, তখন তার যে স্বরূপ, তাকে বহুলাংশে স্বপ্ন জগতের সাথে তুলনা করা যায়; সেখানে আমি নির্বাধ নিয়দ্বেগ। আমার মানব পরিক্রমায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, এমন শক্তি পৃথিবীতে কারো নেই। আমি ছেঁরা কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার আনন্দ উপভোগ করতে পারি; আবার লাখ টাকার উপর শুয়ে ছেঁড়া কাথার জন্য অশ্রু বিগলিত হতে পারি। কিন্তু বাস্তবে তার পরিধি সংকীর্ণ হতে বাধ্য। এখানে আমি নিজেকে ছেড়ে যতোই অগ্রসর হয়ে যাবো, ততোই আমার স্বাধীনতা খর্ব হতে থাকবে। আমার চিন্তা, আমার বাক্য, আমার আচরণ নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছা কে অতিক্রম করে কখনো পরিবারের মুখ চেয়ে, কখনো সমাজের বিধি নিষেধের তোয়াক্কা করে অগ্রসর হবে। অবশ্যই এ আমার অগ্রগতি, আমার এ ত্যাগ হবে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত। আর তা হলেই আমার ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের উপর আঘাত আসবেনা। গড্ডালিক প্রবাহ ও জনস্রোতের মধ্যে পার্থক্য দেখা দেবে। আমি সচেতনভাবে বিশ্বের এই বিরাট জনস্রোতে অংশগ্রহণ করতে চাই। মনুষ্যত্বের জন্যে, সার্বজনীন শান্তির ও সুখের জন্য আমি আমার শক্তি ও সম্পদ নিয়োগ করতে চাই। এই অনুভূতি যদি আমাকে সকলের সাথে একাত্ম করে, বৃহৎ ও মহৎ জীবন সংগ্রামে ব্রতী করে, তবেই আমার ব্যক্তি সত্তার মহান আবির্ভাবে আমি ধন্য হতে পারি। কিন্তু পৃথিবীতে ব্যক্তি সত্তার এই মহান আবির্ভাব কি এমনি সহজ ও সুলভ?

১১ চৈত্র ১৩৮০ পর্যন্ত লিখেছেন
বাকী দিনলিপি ক্রমান্বয়ে সংযুক্ত করা হবে…