মানুষ

একজন গ্রীক দার্শনিক নাকি দিনের বেলা বাতি জ্বালিয়ে কোনো কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। এক পথচারী তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলো, ‘মান্যবর, আপনি দিনের বেলায় এমন করে কি খুঁজছেন?’

উত্তরে দার্শনিক বলেছিলেন, ‘মানুষ!’

দার্শনিক প্রবরের খুঁজে বেড়ানোর ধারা আর উত্তরের মধ্যে বেশ অভিনবত্ব আছে, একথা আমাদের মানতেই হবে। কারণ মানুষ যেখানে চারপাশেই ভীড় করে আছে সেখানে তাকে খুঁজে বেড়াতে হয় না। আবার দিনের বেলায় বাতি জ্বালিয়ে খোঁজা সেত এক দেখার মতো ব্যাপার। কাজেই সমস্ত ব্যাপারটার মধ্যে যদি অন্য কোনো তাৎপর্য না থাকে, তাহলে এটাকে পাগলামি বলা ছাড়া গত্যন্তর নেই।

বিচক্ষণ ব্যাক্তি মাত্রেই বলবেন, না, ব্যাপারটা পাগলামি নয় এর মধ্যে তাৎপর্যতো আছেই, তদপুরি আছে একটি শাশ্বত তথ্য। অর্থাৎ এমনি দিনের বেলা বাতি জ্বালিয়ে মানুষ খোঁজার ব্যাপারটি দার্শনিকের সাথেই শেষ হয়ে যায়নি। প্রতি যুগেই এমনি মানুষ খোঁজার একটা প্রচেষ্টা আমরা লক্ষ্য করে থাকি। অতীতেও তা ছিলো, আর এখনো আছে।

এবার কিন্তু ব্যাপারটার মধ্যে বেশ একটা গভীর তত্ত্বের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, মানুষ তাহলে মানুষ নয় আর দিনের আলোও আলো নয়। চারিদিকে অজ্ঞানতার অন্ধকারে ছেয়ে আছে, এর সামনে দিনের আলো আর রাতের কালো সবই এক সমান। আর সেই অন্ধকারে মানুষের চেহারা নিয়ে যারা ঘুরে বেড়াচ্ছে, তারা সবাই মানুষ নয়, ভিন্নতর কোনো জীব। দার্শনিক জ্ঞানের মশাল নিয়ে তাই মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। কিন্ত মানুষের দেখাতো খুব সহজে পাওয়া যায়না; দার্শনিকও পেয়েছিলেন কিনা, সে খবর অবশ্য জানা যায়নি।

তবু আমরা ধরে নিতে পারিযে, মানুষ ছিলো এবং এখনো মানুষ আছে। কারণ যে বস্তুর অস্তিত্ব নেই, তাকে খুঁজে বেড়ানো যায়না, আবার যুগে যুগে তাকে খুঁজে বেড়ানোর মতো একটা শাশ্বত পাগলামি কিছুতেই সম্ভব নয়। অতএব মানুষ আছে, তবে তার সংখ্যা খুবই কম। এর উপর মানুষ নামধারি মানুষ তার অস্তিত্বকে আরো বিভ্রান্তিকর করে তুলেছে। সে জন্যই খুঁজে পেতে তার দর্শন পাওয়া খুবই আয়াস সাধ্য ব্যাপার।

সে না হয় মেনে নিলাম যে, ব্যাপারটা খুবই আয়াস সাধ্য; একজন দার্শনিকের সেজন্য প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু আমাদের ন্যায় সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাসা সে পরিশ্রম নিয়ে নয়, স্বয়ং মানুষ নিয়ে। মানুষের সংজ্ঞাটা যদি জানা যেত, তা হলে আমরাও না হয় খুঁজে পেতে দেখতাম! কিন্তু সংজ্ঞা পাওয়াও বোধ হয় খুব সহজ ব্যাপার নয়!

কাকে মানুষ বলবো? মানুষের কুলে জন্ম গ্রহণ করলেও যদি মানুষ না হয়, তা হলে মনুষ্যত্বের একটা পৃথক সংজ্ঞা নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু সেটা কী? এক্ষেত্রে আমাদের মনে হয়, মানুষের একটা আদর্শ রূপ কোথাও আছে। সেটি যুগে যুগে মানুষই গড়ে তুলেছে। আর সে আদর্শের সাথে মিলিয়েই সে মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু এ ব্যাপারটাই বা কেমন, মানুষ মানুষের জন্য যে আদর্শ রূপের প্রতিষ্ঠা করলো, সেটি এখন অলভ্য হয়ে উঠছে কোনো। তাহলে মানুষ কি দেখে কী শিখে এমন একটি আর্দশ গড়ে তুলেছিলো! সে কি বাস্তবতাহীন একান্তই কোনো খেয়ালী স্বপ্ন?

প্রশ্নটি বিদঘুটে, তবু এ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে মানুষ খোঁজার এই তাৎপর্যের রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব নয়। আমরা দার্শনিক নই, সাধারণ মানুষ হিসাবে এ প্রশ্নের মুখোমুখি আমাদেরকে হতেই হবে। কারণ আমরা মানুষ কুলে জন্ম গ্রহণ করেছি, মানুষের নাম ধারণ করেছি; তবু যদি আমরা মানুষ না হই, তাহলে মানুষ হবার সেই খেয়ালি আদর্শ আমাকে খুঁজে দেখতেই হবে। যদি তার মাঝে কোনো সারবত্তা থাকে, তবে অবশ্যই তা আমাকে মানতে হবে, আর যদি না থাকে, তাহলে কেনো খামোকা আমার উপর এমনি অমানুষ হবার দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হলো।

কিন্তু মুশকিল হয়েছে এই যে মানুষের সেই আদর্শ সম্পর্কে সংজ্ঞা খোজার জন্য আমাদেরকে যাদের কাছে হাত পাততে হবে, সেই ধার্মিক – দার্শনিকদের সংখ্যাওতো অল্প নয়। তাদের অনেকের নাম আমরা জানি আবার অনেকের নাম জানিনা এবং তাদের বক্তব্যও একই ধরনের নয়। তবু তার নির্গলিতার্থ যা আমরা সহজে পেতে পারি, তাহলো, মানুষ সৃষ্টির সেরা – ‘আশরাফুল মখলুকাত’, অম্রতস্য পুত্রা। অবশ্য এই সহজে পাওয়া বিষয়টি কিন্তু আদৌ কোনো সংজ্ঞা নয়, একটি বিশেষণ মাত্র এবং এটি মানুষ নিজেই নিজের জন্য তৈরি করেছে কারণ মানুষের বাস্তব অবস্থা এ কথারই সাক্ষ্য বহন করছে। সে যদি সেরা না হতো, তাহলে এভাবে পৃথিবীর সব কিছু কুক্ষিগত করে নেয়া কিছুতেই তার পক্ষে সম্ভব হতো না। তবে এর মধ্যে দ্বিতীয় বিশেষণটিতে এমন কিছু একটার ইংগিত আছে, যা সৃষ্টির সহজ নিয়মের বাইরে অর্থাৎ মানুষ এই পৃথিবীর হয়েও যেনো পৃথিবীর নয়। এই মরণশীলতার উর্ধ্বে কোনো অমৃত জগৎ থেকে বুঝি তার আগমন ঘটেছে। এধরনের একটি মনোভাব প্রথম বিশেষণের সাথেও জড়িয়ে আছে। সুতরাং উভয়টিকে একত্র করলে যে কথাটি আমরা সহজে পেতে পারি, তা হলো, মানুষ এই পৃথিবীর হয়েও পৃথিবীর নয়; সৃষ্টির সাথে তার আত্মীয়তা থাকলেও সে এ সবের চাইতে অধিক এক বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী।

কিন্তু আমরা আগেই বলেছি, এ ব্যাপারটি কোনো প্রকার সংজ্ঞা নয়; মানুষের বাস্তব অবস্থার সাক্ষ্য বহন কারী একটি বিশেষণ মাত্র। আর এ বিশেষণ তৈরি করতে গিয়ে মানুষ তার অতীত ইতিহাসকে বিচারের মধ্যে আনেনি। কারন তখন সে ইতিহাস তার জানা ছিলো না। এ কারনেই সে নিজের অবস্থা ব্যবস্থাকে পৃথিবীর সাথে মিলিয়ে নিতে পারেনি। নিজের ক্ষমতাকে সে নিজের পরিচর্যার ফসল বলে মনে করতে পারেনি। বরং সমগ্র সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে তাকে এতো উর্ধ্বে মনে হয়েছে যে, সে এই সৃষ্টির বাইরের কিছু একটার ধারনা করা ছাড়া অন্য কোনো পথ খুঁজে পায়নি।

এ জন্যই পৃথিবীর যে কয়টি পুরাণ মানুষের সৃষ্টি সম্পর্কে কথা বলেছে, তারা কেউই তাকে পৃথিবীর নিয়মের মধ্যে রাখতে পারেনি। সেমেটিক পুরাণে আমরা দেখতে পাই, পৃথিবীর প্রথম মানুষের নাম “আদম” এবং তাকে “আল্লাহ্” আপন আকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। আদমের বাম পাজরের একটি হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে পৃথিবীর প্রথম নারী “হাওয়া” কে। পৃথিবীর সমস্ত মানুষ এই আদম ও হাওয়ার বংশধর। ভারতীয় পুরাণেও মানুষের সৃষ্টি কাহিনী প্রায় অনুরূপ। ব্রহ্মা প্রথম সৃষ্টি করলেন “মনু” কে। মনু হলেন প্রজাপতি সম্রাট; তিনি তার প্রজা হিসেবে মানুষকে সৃষ্টি করলেন। মানুষ শব্দটির উৎপত্তিইতো এই “মনু” থেকে। গ্রীক পুরাণেও একই ব্যপার – দেবাদিদের জিউস সৃষ্টি করলেন অতিমানব টাইটান দেবকে আর এই মানুষ হলো সেই টাইটানদের সৃষ্টি। দুর্বল মানুষের জন্য স্বর্গ থেকে আগুন নিয়ে যাবার ফলে প্রমিথিউসের শাস্তিও কাহিনী সবারই জানা।

এ ব্যাপারে আরো অনেক পুরাণের কাহিনীই আলোচনা করা যায়, কিন্তু সর্বত্রই সেই একই প্রচেষ্টা – যেভাবেই হোক মানুষের সৃষ্টি ভিন্নতর কোনো উৎস থেকে চিহ্নিত করার পরিকল্পনা। কারন আকৃতি প্রকৃতিতে সমস্ত জীব জগত থেকে তার পার্থক্যকে সে অন্য কোনো কার্যকারন দিয়ে বিশ্লেষণ করতে পারেনি। এর কারনও আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি – মানুষের ইতিহাস তখনো তার আয়ত্তে আসেনি। এর ফলে মানুষের পক্ষে যা করা সম্ভব তাই তারা করেছে। এর মধ্যে মানুষের মননশীলতার পরিচয় যেমন আছে। তেমনি আছে সেই মননশীলতার উৎস জানার কৌতুহলের। কারন মানুষ নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্নকাতর না হলে এমন কাহিনী তৈরি এবং বিশ্বাস কোনোটাই করতে পারতো না।

কিন্তু আমাদের মুশকিল হয়েছে এই যে, এ সকল কাহিনীর উৎস আর অর্থ যাই হোক না কেন আমাদের উদ্দিষ্ট সেই সংজ্ঞা কিন্তু এর মধ্যে নেই। যে আদর্শ মানুষকে দার্শনিক প্রবর খুঁজে বেড়াছিলেন, তার সেই আদর্শের সংজ্ঞা কোথায় পাবো? কি করে বুঝতে পারবো যে, মানুষ বলতে এমন বিশেষ কিছুকে বোঝায়, যা মানুষ নামধারী এই জন সমাজে সহজ লভ্য নয়?

হ্যাঁ, উপরে বলা পুরাণের কাহিনী গুলিকে না হয় ধর্মের আওতায় ফেলে দিলাম। কিন্তু দর্শন আদর্শ মানুষের সংজ্ঞা সর্ম্পকে এমন কীই বা বলেছে। তার বক্তব্যওতো সেই অম্রতস্য পুত্রার মতো বিশেষণ ধর্মী, যা পুরাণের কাহিনীর সাথেই সাযুজ্যপূর্ন, এক্ষেত্রে ‘সুপারম্যান’ ও ‘মর্দেমুমেনের’ ধারনা দুটিকে বিশ্লেষন করলেও সেই একই ব্যাপার বেরিয়ে আসবে। সুতরাং ধর্ম দর্শন হাতড়ে বেড়ালে আমরা যা পাবো, তার সাথে দিনের বেলা বাতি জ্বালিয়ে মানুষ খোঁজার রহস্যেও মতোই একটা রহস্য জড়িয়ে আছে, যা খুঁজে বেড়ানো যায় কিন্তু পাওয়া খুব সহজ নয়। কাজেই শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে বিজ্ঞানের কাছে হাত পাতা ছাড়া অন্য কোন উপায় থাকে না। কারন এই বিজ্ঞানই দিনের বেলা বাতি জ্বালিয়ে নয় বরং যথার্থ ঐতিহাসিক জ্ঞানের আলো ফেলে আমাদেরকে আদর্শ মানুষের সন্ধান দিতে পারে এবং ধর্মদর্শনের সৃষ্ট সেই রহস্যের সে দ্বারোৎঘাটন করতে পারে।

তবে মুশকিল হয়েছে এই যে, বিজ্ঞানের কথা শুনলেই আমাদের গা শিউরে উঠে, আমাদের হাত পা যেনো পেটের মেধ্য সেধিঁয়ে আসতে থাকে কারণ বিজ্ঞানকে আমরা সব সময় বিদেশী আক্রমনের মতো ভয়াবহ কিছু বলে মনে করি। মনে হয়, আমাদের ধর্ম দর্শনের সর্বনাশ করা ছাড়া এই বিজ্ঞানের অন্য কোনো কাজ নেই। কিন্ত আসলে ব্যাপারটি কি তাই? বিজ্ঞান কি সত্যেই বিদেশী? ধর্ম দর্শনের সর্বনাশ করতেই কি বিজ্ঞানের উদ্ভব?

এ সব প্রশ্নের উত্তরে অনেক কথাই বলা যায়। কিন্তু আসল ব্যাপার যা ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্যের সৃষ্টি করেছে, সেটি হলো একটির জন্য পৃথিবীর সাধারণ নিয়মের বাইরের অলৌকিক কিছু একটার ভিত্তি আছে আর অন্যটির ভিত্তি হলো এই পৃথিবী ও তার নিয়মাবলী। কাজেই বিজ্ঞানের কথা মানতে হলে আমাদেরকে সেই অলৌকিক ভিত্তিটাকে ত্যাগ করতে হয়। কারণ ওটা বিজ্ঞানের বিচার বিশ্লেষনের ধোপে টেকেনা। সুতরাং আমরা যেহেতু অলৌকিকে অতিমাত্রায় ভক্ত, কাজেই আমাদের জন্য বিজ্ঞানের দিকে চোখ বুজে থাকা ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। কারণ চোখ খুললেই সকল রহস্য কর্পূরের মতো উবে যেতে থাকে।

কিন্তু এভবে চোখ বুঁজে কি আমরা বাঁচতে পারবো। এই বিজ্ঞানের যুগে আমরা বিজ্ঞানের সকল অবদানই অম্লান বদনে ভোগ করছি। কেবল ধ্যান ধারনার ক্ষেত্রেই আমাদের বিজ্ঞান বিমুখতা যেনো অদ্ভুত ভাবে অনড় হয়ে আছে। এর ফল হয়েছে এই যে, আমাদের পাঠ্যসূচিতে বিজ্ঞান স্থান না করলেও আমাদের জীবন সূচিতে অপাংক্তেয় হয়ে আছে। আমরা বিজ্ঞানের বিচার বিশ্লেষন লিখছি শিখছি, কিন্ত জীবনের বাস্তব সমস্যায় আমরা তাকে দুরে সরিয়ে রাখছি। এজন্যই বলছিলাম যে, মানুষের ব্যাপারে বিজ্ঞানের বিচার বিশ্লেষনকে আমাদের যেমন গ্রহণ করা অতীব প্রয়োজন, তেমনি একে সাদরে বরণ করে নেয়া বেশ মুশকিলের ব্যাপার।

তবু এই অচলায়তন আমাদেরকে ভাঙতেই হবে। কারণ এ ছাড়া মানুষকে খুঁজে পাওয়ার অন্য কোনো পথ নেই। কারণ বিজ্ঞানের বিচার বিশ্লেষনের দ্বারস্থ হয়েই আমরা বুঝতে পারি মানুষ এই জীব জগতের অন্তর্গত এক প্রকার জীব মাত্র। সমগ্র সৃষ্টি জগতের ইতিহাসের সাথে তার ইতিহাস ওতপ্রোতো ভাবে জড়িয়ে আছে। তবু এরই মধ্যে মানুষ সকলকে অতিক্রম করে প্রাধান্য বিস্তার করছে। এর মূলে যে বিষয়টি সর্বদা সক্রিয় রয়েছে, তার নাম হলো ‘শ্রম’।

কিন্ত বড়ো বিচিত্র মানুষের অগ্রগতির ইতিহাস। বনচারী বৃক্ষশালা বিহারী মানুষ অনিবার্য – প্রয়োজনে সমতলে নেমে এসেছিলো। এর পর জীবনের তাড়নায় সে তার হাত দুটিকে পায়ের কাজ থেকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে। আর এই মুক্তিই তাকে জীব জগতের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিয়েছে। হাতের শ্রম তার মস্তিষ্ক বৃদ্ধির সহায়ক হয়েছে এবং তার চোয়ালের আড়ষ্টতা দূর করে ভাষা সৃষ্টির পথ সুগম করে দিয়েছে। এর পর এসেছে সমাজ বদ্ধ জীবনের অমোঘ ফলাফল।

গুহাবাসী পশুজীবী মানুষ আগুন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে সভ্যতার উন্মেষ ঘটিয়েছিলো। এর ফলে তার জীবনে এসেছে অদ্ভুত সব পরিবর্তন। শুধু পৃথিবীর সাথে সংগ্রামের হাতিয়ার সৃষ্টিতে সম্বৃদ্ধি লাভ নয় তার চিন্তা চেতনাও সেই আনুসারে নতুন পর্যায় লাভ করেছে। এর পর কৃষির আবির্ভাব আর গোষ্টি বদ্ধ মানুষের এক কেন্দ্রীয় শাসনের অধীন হবার ঘটনা। ধর্ম দর্শনও এরই সাথে সংগতি রেখে অগ্রসর হয়েছে। বিজ্ঞানও নানা ভাবে মানুষের চেতনাকে নাড়া দিয়েছে।

আজ সেই বিজ্ঞানের জয়জয়কার সর্বত্র। এই বিজ্ঞান যদি মানুষের মননশীলতার দান হয়ে থাকে! তা হলে ধর্ম দর্শনও মানুষের চিন্তা চেতনারই আবদান। তাই আজ মানুষ সম্পূর্ন নির্মোহ দৃষ্টি দিয়ে তার অতীতকে বিশ্লেষন করছে। ধর্ম দর্শনে তার মননশীলতার যে বিরাট ঐশ্বর্য লুকিয়ে আছে, তার স্বরূপ উদঘাটন করছে। এর ফলে মানুষ আজ সর্ম্পূন দ্বিধাহীন কন্ঠে উচ্চারণ করতে পারছে যে, সে এই জীবজগতেরই অন্তর্গত ছিলো পৃথিবীর সকল জড় ও জীবের সাথেই রয়েছে তার আত্মীয়তা। এদের মধ্যেই বিধৃত রয়েছে তার জীবন ও জীবিকার সকল উপকরণ। তাই তার মনুষ্যত্বের সংজ্ঞা কোনো অলৌকিক আদর্শের বাহন নয়; বরং তার শ্রমেরই সফল নিদর্শন।

তাই এই শ্রমের ব্যাপারটিকে একটু তলিয়ে দেখতে হবে। কারণ এর মাধ্যমেই আমরা যথার্থ মনুষ্যত্বের সন্ধান পাবো। শ্রম বলতে আমরা মানুষের সক্রিয়তাকে বুঝি। এক দিক থেকে সমগ্র জড় ও জীব জগতেও এই সক্রিয়তা বিদ্যমান। কিন্তু মানুষের মতো তা মননশীলতা সমৃদ্ধ নয়। বস্তুত এই মননশীলতা মানুষের শ্রেষ্ঠত্বেরও পরিচয় বহন করে। নতুবা মাকড়শা, পিপীলিকা, মৌমাছি, ইত্যাদির চাইতে সে শ্রেষ্টতর জীব হিসাবে পরিগনিত হতো না। কিন্ত তাই বলে শুধু মনন চিন্তন তাকে এই পর্যায়ে আনতে পারতো না। যদি না সে তদনুসারে পরিশ্রমী হতো। সুতরাং এই মনন সমৃদ্ধ শ্রমই মানুষকে মানুষ করে তুলেছে এবং এর মধ্যেই তার পরিচয় বিদ্যমান।

অথচ আমাদের সাধারণ ধারনা এ ব্যাপারে কিছুটা ভিন্ন ধরনের। আমরাও সাধারণ ভাবে মননশীল শ্রমকেই মানুষের আদর্শ বলে বিবেচনা করি। তবে সে শ্রম ধর্মীয় উপাসনা মাত্র। এজন্যই আমাদের কাছে আশ্রম বা আস্তানাবাসী মহাপুরুষরাই আদর্শ মানুষ। তাঁরা অবিরত মননশীল শ্রমের দ্বারা তাদের আত্মিক উন্নতি সাধন করছেন। আমরা সংসারের কীট হয়ে তাদের সেই পবিত্রতা অবলম্বন করতে পারছিনা বলে আমাদের আক্ষেপের আর অন্ত নেই।

কিন্তু আমরা উপরে যে শ্রমের কথা বলেছি, সে শ্রম উপাসনা নয়। অবশ্য উপাসনা এক ধরনের শ্রম হতে পারে; আর এই মাত্র বলা যায় যে, এ ধরনের শ্রম দিয়ে সভ্যতার ইতিহাস সৃষ্টি হয়নি। সুতরাং যিনি আশ্রম বা আস্তানায় বসে নিজের আত্মিক উন্নতি সাধন করছেন, তিনি কখনো আদর্শ মানুষ হতে পারেন না। যে পোশাক তৈরি করার পর শুধু বাক্সের মাঝেই অবস্থান করলো, তাকে পোশাক না বলাই ভালো। আর তার পবিত্রতা নিয়ে গর্ব করার কীই বা আছে। কারণ গায়ে না চড়ালে তাতে ধূলি বালি লাগবে কোনো? আবার এর উলটো দিকও আছে – যে মানুষ শুধু শঠতা ও প্রতারনা দিয়ে কার্যোদ্ধার করতে চায়, তাকেও তো আদর্শ হিসাবে ধরা যায়না। সে তো সেই পোশাক, যাতে ময়লা লেগে লেগে একদম বির্বন হয়ে গেছে, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। সুতরাং যে পোশাক বাক্সে বন্দী থাকে আর যে পোশাক ময়লায় কুৎসিত হয়ে দুর্গন্ধ ছড়ায়, এদের কোনোটিই আদর্শ পোশাক নয় বরং আদর্শ পোশাক বলবো সেই পোশাককে, যা গায়ে চড়ানো হয় এবং ময়লা লাগলে ধুয়ে পরিষ্কার করে আবার পরা হয়। এমনি ভাবে মানুষের মধ্যেও যিনি সংসারে জড়িত হয়ে এর উন্নতির জন্য দিবা রাত্রি পরিশ্রম করছেন, তাকেই আমরা আদর্শ মানুষ বলে ভাববো।

তবে সেই যে কথায় বলে, সব কাজই যেমন কাজ নয়, তেমনি সব পরিশ্রমই শ্রম নয়। আমরা আগেই বলেছি, মানুষের সভ্যতা সংস্কৃতির নির্মাতা শ্রম অবশ্যই মনন সমৃদ্ধ প্রগতি শীল। কারণ একান্ত আত্মকেন্দ্রিক শ্রমের দ্বারাও সংসারে উন্নতি সম্ভব। কিন্তু এর ফলে সভ্যতা সংস্কৃতির গতি ব্যহতও হতে পারে। এজন্যই যুগে যুগে মানুষ এই আত্মকেন্দ্রিকতার লালসাকে অতিক্রম করে এগিয়ে এসেছে। সে সেই শ্রমকেই প্রাধান্য দিয়েছে, যা শুধু ব্যক্তিকে নয়, তার সাথে পরিবার কে – সমাজকেও সমৃদ্ধ করেছে। যে মানুষ তার অস্তিত্বের জন্য কারো কাছে স্বীকার করতে চায় না, তাকে অন্যান্য পশুর সাথে অবলীলায় তুলনা করা যায়। সে মানুষ রূপে অবস্থান করলেও তার মনুষ্যত্ব বিকশীত হয়নি। যদি হতো তাহলে সে পিতা মাতা পরিবার, সমাজ এমন কি পৃথিবীর সকলের কাছে তার অস্তিত্বের জন্য কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে পরান্মুখ হতো না এবং তার কার্য ধারার মধ্য দিয়ে যতোদুর সম্ভব সেই ঋণ পরিশোধ করতে চেষ্টা করতো।

সুতরাং শ্রম বলতে শুধু গাধার মতো জীবনের বোঝা বওয়াকে বুঝায়না; বরং সেই জীবনের উৎপত্তি, তার বিকাশ ও পরিনতি সম্যক রূপে উপলব্ধি করে এক মহান উত্তরাধীকারের দায়িত্ব নিয়ে তার কর্তব্য পালন করাকে বুঝায়। কারণ আমার অস্তিত্বেও বহু পূর্বে মানুষের এই সমাজ গঠিত হয়েছে। যে পরিবেশে আমরা জন্ম নিয়েছি, যতো সামান্যই হোক, তাও গড়ে উঠতে কোটি কোটি মানুষের উদ্দেশ্য পূর্ণ মননশীল শ্রমের প্রয়োজন হয়েছে। কতো রক্ত কতো ঘামের পরিবর্তে মানুষ এমনি এক পরিবেশের সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছে, তা যদি আমাদের উপলব্ধিতে না থাকে, তাহলে কখনোই আমরা মনুষত্ব নামক এই উত্তরাধিকারের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে বহন করতে পারবো না। সুতরাং আমাদেরকে বুঝে শুনে পরিশ্রম করতে হবে। তবেই আমাদের পরিশ্রম সমাজ প্রগতির বাহক হয়ে আমাদের মনুষ্য জন্মকে ধন্য করবে।

কাজেই এমনি এক শ্রমের মাপকাঠি দিয়েই আমরা আদর্শ মানুষের অনুসন্ধান করতে পারি। যিনি যে পরিমানে এই যথার্থ শ্রমের শ্রমিক, তিনিই ততো খানি আদর্শ মনুষ্য পদবাচ্য। যারা সমাজ প্রগতির ধারাবাহী এই শ্রমকে এড়িয়ে উপাসনা বা প্রতারণার দ্বারা মনুষ্যত্বের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চান, তারা শুধু সমাজকে প্রতারিত করেন না, বরং নিজেরাও প্রতারিত হন। অপরের শ্রমের ফসল ভোগ করে তারা যে কোনো পদবীই গ্রহন করুন না কেনো, জীবন যাপনে তারা যতো ঐশ্বর্যের অধিকারীই হোন না কেনো, মানুষ হিসাবে তারা অবশ্যই নিকৃষ্ট। তাদের চাইতে সেই একজন শ্রমিক শ্রেষ্ঠতর – মনুষ্যত্বের অধিকারী, যে তার ক্ষমতা ও চেতনা অনুসারে জীবনের দায়িত্ব পালন করছে। হয়তো তার দেহে স্বাস্থ্যে চাকচিক্য নেই, হয়তো পরনে পোশাকের জৌলুস নেই, কিন্তু মানুষ হিসেবে সে শ্রেষ্ঠ।

একথা যদি আমরা মেনে নিতে পারি, তা হলে সেই দার্শনিক প্রবরের ন্যায় দিনের বেলায় বাতি জ্বালিয়ে আর মানুষ খোঁজার প্রয়োজন হয় না। একটু তলিয়ে দেখলেই দেখতে পাবো, এমন মানুষ আমাদের চার পাশে অজস্র বিচরণ করছে; এমনকি আমাদেরকেও সেই পর্যায়ে উন্নীত করে আমরা আমাদের মনুষ্য জন্মের সার্থকতা বিধান করতে পারবো। তখন আর মানবিক ত্রুটি বিচ্যুতির জন্য এমন নিষ্করুন লজ্জা পেতে হবে না এবং মানুষের কীর্তিমালা নিয়ে গর্ব অনুভব করতেও কুন্ঠা জাগবে না।

মানুষ, সেতো দোষে গুনেই মানুষ। সে ফেরেশতা বা শয়তান নয়, দেবতা বা অসুর নয়; সে এই বিরাট ও বিচিত্র জীব জগতেরই অংশ। মননশীল শ্রম দিয়েই সে সকলের মধ্যে শ্রেষ্টত্বের অধিকারী হয়েছে। কিন্ত সকল বাধা প্রতিবন্ধক সে এখনো অতিক্রম করতে সমর্থ হয়নি। তাই তার সাধনা এখনো অব্যাহত। একদিন সে স্বশিক্ষিত স্বশাসিত হয়ে মনুষ্যত্বের আদর্শ পূর্ণ করবে।