একটি স্বপ্নের নাম শেখ মুজিব

১০ই জানুয়ারী, ১৯৭২।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত বাংলাদেশে ফিরে আসছেন তিনি। বিমান বন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য। বাঙালীর আবেগ আপ্লুত চেতনার উপর দিয়ে রেসকোর্সের বিরাট চত্বরে তিনি এসে প্রবেশ করলেন। এই্ সেই রেসকোর্স, যেখানে দাঁড়িয়ে একাত্তুরের ৭ই মার্চ তিনি উচ্চারণ করেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। রক্তাক্ত সংগ্রামের মাধ্যমে সেই স্বাধীনতা আজ অর্জিত হয়েছে। যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলো, তাদের চিহ্ন মাত্রও কোথাও নেই। ৭ই মার্চের সেই আবেগ এক অবারণ সাফল্যের মাধ্যমে আজ এই ১০ই জানুয়ারীর আবেগের জন্ম দিয়েছে। সেদিন যা ছিলো আশংকা কাতর, আজ তাই বিজয়ের আনন্দে সোচ্চার। তারই স্পর্শে বুঝি শেখ মুজিবের আবেগ মথিত কন্ঠে উচ্চারিত হলো, “কবি গুরু, তুমি দেখে যাও, তোমার বাঙালীরা আজ মানুষ হয়ে উঠেছে”।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর একটি কবিতায় বলেছিলেন, “চার কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালী করে মানুষ করনি।” শেখ মুজিব কবিগুরুর সেই খেদোক্তির উত্তর দিচ্ছেন, সান্ত্বনা দিচ্ছেন। বারবার উচ্চারণ করছেন তিনি। আনন্দ অশ্রুতে ভেজা তাঁর সেই আবেগ মথিত কন্ঠস্বর। যারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তারা যেমন এই কথাগুলি শুনেছেন; তেমনি যারা দূরদূরান্তে থেকে ধারাবিবরনী শুনছিলেন, তারাও শুনেছেন। আমি তো এখনো শুনতে পাই শেখ মুজিবের সেই আবেগ জড়ানো কন্ঠের উচ্চারণ। “কবিগুরু, তুমি দেখে যাও, তোমার বাঙালীরা আজ মানুষ হয়ে উঠেছে।”

জানিনা, কবিগুরু কেন তাঁর কবিতায় এই খেদোক্তি করেছিলেন। কেন তাঁর দৃষ্টিতে বাঙালীরা তখনো মানুষ হয়ে উঠতে পারেনি। আর শেখ মুজিবই বা কী দেখে, কী বুঝে এমন গর্বিত উচ্চারণ করলেন, তাও তো সর্বাংশে আমাদের বোধগম্য নয়। কারণ তাঁর কথা যদি সত্য বলে মেনে নেই, তা হলে বলতে হবে, বাঙালীরা মানুষ হয়ে গেছে। তা হলে স্বাধীনতার অপর নামই বুঝি মনুষত্য? মানুষ স্বাধীন হলেই তার মানুষ নামের সার্থকতা লাভ ঘটে? তাই যদি হয়, তা হলেও তো প্রশ্নের অবসান ঘটবে না। আপনারা প্রশ্ন তুলবেন, বাঙালীরা কি যথার্থই স্বাধীনতা লাভ করেছে? এ প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে যাবোনা! কারণ এর উত্তর আপনারা ভালোই জানেন। আমি শুধু আপনাদের কাছে সবিনয়ে এই একটি কথাই বলবো, আবহমান কাল ধরে বাঙালীর মাঝে মানুষ হবার যে স্বপ্ন বিরাজ করছে, সেই স্বপ্নের নামই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব!

আমি জানি, আপনারা আমার এই উচ্চারণকেও আবেগের ফসল বলে মনে করছেন। আপনারা ভাবছেন, এই উচ্চারণের মধ্যেও তো প্রতারণা আছে, যুক্তিহীন সরল আবেগের উচ্ছ্বাস আছে, প্রশ্নের অবকাশ আছে। আপনাদের এই ভাবনায় আমিও তো শরীক না হয়ে পারি না। কারণ তা হলে তো বলতে হয়, শেখ মুজিব নিহত হয়েছেন, তাই বাঙালীর মানুষ হবার স্বপ্নেরও সেই সঙ্গে ইতি হয়েছে। কিন্তু আপনারা এ কথা কিছুতেই মেনে নেবেন না। এ জন্যেই আমার এ উচ্চারণের ব্যাখ্যা, যে ভাবেই হোক, আপনাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। অবশ্যই আমি এও জানিযে, আপনারা সেই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হবেন না। কারণ আমার এই উচ্চারণের মধ্যে যে প্রতীকধর্মীতার আবহ আছে, তা থেকে আপনারা অনেক দূরে অবস্থান করছেন। আরো সহজ করে বললে বলতে হবে, আপনারা আর যাই কিছু হোন মানুষ হতে চান না। তাই মানুষ হবার স্বপ্ন লালন করার কোন প্রশ্নই উঠে না।

যদি সে ধরণের কোনো প্রশ্ন আপনাদের মনে থাকতো, তা হলে শেখ মুজিব এমন নিষ্ঠুরভাবে সপরিবারে নিহত হতেন না। কিন্তু আমি কি আপনাদেরকে এ প্রশ্ন করতে পারি, কী দোষ করেছিলেন শেখ মুজিব? দয়া করে মনকে চোখ ঠারবেন না। খুব সহজভাবে বিবেকের কাছে এ প্রশ্নটি তুলে ধরুণ। তুলে ধরুণ তাদের কাছে, যারা শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু বানিয়ে ছিলেন। তুলে ধরুণ সেই সব সাধারণ মানুষের কাছে, যারা বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা মেনে নিয়ে সত্তুরের নির্বাচনে তাঁকে শতকরা ছিয়ানব্বইটি ভোট দিয়েছিলো। আমি জানি এ প্রশ্নের উত্তর খুব সুবিধেজনক হবে না; এমন কোনো কারণই আপনারা বের করতে পারবেন না, যদ্দরুন এমন একজন জননেতা অমানুষিক নির্মমতার সাথে সপরিবারে নিহত হতে পারেন।

কিন্তু আমার এই জানা আর সিদ্ধান্ত প্রকাশ করায় আমার কোনো আনন্দ নেই। না, আমি কখনোই একথা স্বীকার করে নিতে চাই না যে, বাঙালীরা এমনি অমানুষ, অবিবেচক যে, অহেতুক তারা তাদের নেতৃবৃন্দকে হত্যা করে থাকে। কাজেই অবশ্যই দোষ ছিলো, আর আজ যদি সেই দোষ বিবেচনা করার পথ উন্মুক্ত করা হয়, যদি তার নিহত হবার এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটির বিচার করা হয়; তা হলে সে দোষ সর্বসমক্ষে অবশ্যই বেরিয়ে আসবে। আপনারা অবাক বিস্ময়ে দেখতে পাবেন, যে দোষের জন্য তিনি নিহত হয়েছেন, সেটি অন্য কিছু নয়, তাঁর সরল বিশ্বাস। তিনি অকপটে এই জাতিকে, এই বাঙালীদেরকে বিশ্বাস করেছিলেন। আমরা তাঁর সেই সরল অকপট বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে পারিনি। কিন্তু কেন তিনি এমন বিশ্বাস করেছিলেন। এর কারণ তাঁর পাবার কিছু ছিলো না, বরং ছিলো এই জাতিকে এই দেশকে অনেক কিছু দেবার। এই জাতির কাছ থেকে তাঁর যা পাবার, তা তিনি বঙ্গবন্ধু হয়ে সত্তুর ও তিয়াত্তুরের নির্বাচনে পেয়ে গিয়েছিলেন। এখন ছিলো তাঁর দেবার পালা। ভৌগলিক স্বাধীনতাকে তিনি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিয়ে পরিপূর্ণ করে তুলতে পারতেন। আর এর মধ্যে দিয়েই বাঙালী যথার্থ মানুষ হয়ে উঠতে পারতো। এমন একটি স্বপ্ন তাঁর মনে ছিলো বলেই তিনি বাঙালীকে বিশ্বাস করেছিলেন।

তাই তিনি ভেবেছিলেন, তাঁর এই স্বপ্নই বাঙালীর আবহমান কালের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে তাঁরা কখনো বুলেট দিয়ে ঝাঁঝরা করে দিতে পারেনা। কিন্তু আমরা তাই করেছি; আমরা ব্যালট দিয়ে যে স্বপ্ন তৈরী করেছিলাম, বুলেট দিয়ে তাকেই হত্যা করেছি। বাঙালীর স্বাধীকার আন্দোলনের মধ্যে যে শেখ মুজিবের জন্ম, তাঁকে লালন করেছে উনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তুরের নির্বাচন, একাত্তুরের মুক্তি সংগ্রাম এবং তিয়াত্তুরের নির্বাচন। তাঁর নেতৃত্বকে নতুন মাত্রাই বিন্যস্ত করার অধিকার বাঙালীরাই তাঁকে দিয়েছিলো। সুতরাং এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, বাঙালীরাই তাদের প্রয়োজনে শেখ মুজিবকে সৃষ্টি করেছিলো, তাঁর নেতৃত্বকে অবিসংবাদিত করে তুলেছিলো; আবার তাদের প্রয়োজনেই তাকে হত্যা করেছে। কিন্তু কী সেই প্রয়োজন? গণতন্ত্রকে মুক্তি দেয়া, উৎপাদন ব্যবস্থাকে রাহুমুক্ত করা কিংবা পাকিস্তানকে পুনরুদ্ধার করা? যাই হোক না কেন শেখ মুজিবকে হত্যা ছাড়া কোনোটাই সম্ভব ছিলো না।

হতে পারে। তাই যদি হয়, তা হলে আসুন না কিছুক্ষণের জন্য শেখ মুজিবকে আজ আসামীর কাঠগড়ায় এনে দাঁড় করাই। যাকে ভালোবাসা প্রয়োজন, তাকে বিচার করার প্রয়োজন সবচাইতে বেশী। যাকে বঙ্গবন্ধু বলছি তাকে বাঙালীর বন্ধু বানাতে গেলে কিছুটা খতিয়ে দেখতে হবে বৈকি! শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ তিনি বাকশাল করে গণতন্ত্র হত্যা করেছিলেন। সুতরাং তাঁকে হত্যা করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে। আপনারা কি এই অভিযোগ সত্য বলে গ্রহণ করবেন? তাহলে কি বহুদল ছাড়া গণতন্ত্র চর্চা সম্ভব হয়না? গণতন্ত্রের সংজ্ঞা তো শুনেছি, জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে জনগণের জন্য শাসন প্রতিষ্ঠা করা। সেটি করতে কি বহুদল একান্তই অপরিহার্য? বাস্তবেতো দেখি সংখ্যাগরিষ্ঠ একদলই সে কাজটি করে থাকে। এমনকি সংখ্যালঘিষ্ঠ বহুদলকেও একত্র হয়ে সেই একক দলের ভূমিকা পালন করতে হয়। মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা বহুদলের ভিত্তিতে যেমন আছে, তেমনি একদলের ভিত্তিতে তা করা যায়। কারণ এখানে স্বাধীনতা আর নীতি নির্ধারণের প্রশ্নটি দলের জন্য নয়, দেশের জন্যই বিবেচিত হয়ে থাকে। আর দেশের প্রয়োজন কখনো বিভিন্ন হতে পারেনা। তা যদি এক ও অভিন্ন হয়, তা হলে সেই উদ্দেশ্য সাধন করতে গিয়ে ঐক্যের বদলে অনৈক্যের সাধন করতে হবে কেন?

আসলে মুখে আমরা যাই বলিনা কেন, বহুদলীয় গণতন্ত্র উদ্ধারের নামে আমরা শেখ মুজিবকে হত্যা করে আমাদের শ্রেণী স্বার্থই উদ্ধার করেছি। এর প্রকৃষ্ট প্রমান আমরা মুজিব হত্যার বিচারকে নিষিদ্ধ করেছি, কিন্তু যে কালাকানুন দিয়ে মুজিব বহুদলীয় গণতন্ত্র হত্যা করেছিলেন, তাকে নিষিদ্ধ করিনি। কারণ সেটি আমাদের শ্রেণী স্বার্থ উদ্ধারের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। বস্তুতঃ শেখ মুজিব যে নীতিমালা দিয়ে শোষকশ্রেণীর অমিতাচারকে ঠেকাতে চেয়েছিলেন, তাঁর হত্যা কান্ডের মধ্য দিয়ে সেটিই উল্টে গেছে; আজ সেই নীতিমালাই শোষিতশ্রেণীকে ঠেকানোর কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। শেখ মুজিবের দোষ, তিনি ছিলেন শোষিতের পক্ষে। কিন্তু তিনি যদি শোষকের পক্ষে এমনি এক দল গঠন করতেন, তা হলে বহুদলের জন্য তাঁর নিহত হবার পরিস্থিতিই দেখা দিতোনা; তিনিই সর্বেসর্বা হয়ে থাকতেন।

সুতরাং শেখ মুজিব গণতন্ত্র হত্যা করেছিলেন, এ অভিযোগ নিতান্তই অন্তঃসারশূণ্য বাজে অভিযোগ মাত্র। বরং শেখ মুজিব যা করেছিলেন, তার মধ্যে একটি গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অনুসরণ ছিলো। বুকে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে তিনি তা করেননি। যারা বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখল করেছেন, গণতন্ত্রের আসল হত্যাকারীতো তারা। তারা যে কারণে গণতন্ত্রকে এভাবে বারেবারে হত্যা করেছেন, সেটি হলো রাষ্ট্রীয় খাতকে ধ্বংস করে ব্যক্তিমালিকানার খাতকে সম্প্রসারিত করা, আসলে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে এটিই ছিলো মূল অভিযোগ। পশ্চিম পাকিস্তানী একচেটিয়া ব্যক্তিমালিকানার বিরুদ্ধে ছয় দফার আন্দোলন ব্যক্তিমালিকানা ধ্বংসের আন্দোলন ছিলো না। বরং সেই মালিকানাকে বাঙালীদের কাছে হস্তান্তরের দাবীই ছিলো প্রবল। স্বাধীনতার পর সেই মালিকানা লাভের পথে যখন কোনো বাধাই ছিলো না, তখনি সকলের বাড়া ভাতে ছাই দিয়ে শেখ মুজিব সেখানে রাষ্ট্রীয় খাত এনে দাঁড় করালেন এবং সেই খাতকে পাকাপোক্ত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করলেন। এর ফলে শেখ মুজিবকে হত্যা ছাড়া সেই মালিকানা ফিরে পাবার আর কোন পথ রইলো না।

আপনাদের মধ্যে যারা আমার এই বক্তব্যকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে করতে চান, তারা অবলীলাক্রমে তা করকে পারেন, আমি তাদের কে বাধা দেবো না। কারণ তারা শেখ মুজিবের, তাঁর দল বলের, এমনি তাঁর নীতিমালার এমন কিছু দোষ ত্রুটি খুঁজে বের করতে পারবেন, যা অস্বীকার করা সম্ভব নয়। আমি নিজেও তা অকপটে স্বীকার করি। সেই সঙ্গে আমি একথাও স্বীকার করি যে, শেখ মুজিব যত বড় জননেতাই হোন না কেন, তিনি দোষে গুণে একজন মানুষই ছিলেন। তাঁর আশে পাশে তাঁর সহায়ক শক্তি হিসাবে যারা বিরাজ করতো, তারাও মানুষই ছিলো। তাদের কথাবার্তা, আচার আচরণ, গৃহীত নীতিমালা এবং তার বাস্তবায়ন কোনো কিছুই একান্ত নিখুঁত ছিলো না। এমনকি শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের বাকশাল গঠন পর্যন্ত একটি হঠকারী উদ্যোগে পর্যবসিত হতে পারত এবং শেখ মুজিব গণধিকৃত হয়ে আমাদের প্রত্যাশার মঞ্চ থেকে বিদায় নিতে পারতেন। এ সব কিছুই সম্ভব ছিলো; কিন্তু তাঁর হত্যাকান্ড এই সকল সম্ভাবনার পথ রুদ্ধ করে তাঁকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। তিনি ব্যর্থতার পঙ্কিল পথ থেকে সফলতার সম্ভবনাময় পথে পা রেখেছেন। একান্ত অবিশ্বাসীর মনেও প্রশ্ন জেগে উঠেছে, শেখ মুজিব কি তা হলে সঠিক পথেই অগ্রসর হচ্ছিলেন? তা না হলে তাঁকে হত্যা করা হলো কেন?

বলুন, কী উত্তর দেবেন আপনার এই প্রশ্নের? মনের কোণে সংশয়ের আবছা আঁধার যদি কিছু থাকে, তাকে ক্ষণিকের জন্য উদারতার আলো জ্বেলে দূর করুন। তারপর কোনো দল নয়, গোষ্ঠি নয়; একান্ত ভাবে দেশ ও দেশের জনগণের প্রয়োজনের নিরিখে বিচার করে দেখুন তো, শেখ মুজিব যা করতে চেয়েছিলেন, তার উদ্দেশ্য কী হতে পারে। সেই উদ্দেশ্যকে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে রেখে দেখুন, তা হলেই বুঝতে পারবেন শেখ মুজিবের হত্যাকান্ড কোন্ সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের ফসল! সেই চক্রান্তই কি এদেশে তাঁর রক্তে ভেজা সিঁড়ি দিয়ে ক্রমশঃ উপরে উঠে আসেনি? এরফলে যারা স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় শত্রু শিবিরে অবস্থান করছিলো, তারাই আজ বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু হয়ে উঠেছে।

বুঝতে পারছি, আপনি বিরক্ত হয়ে উঠেছেন। মনে মনে বলছেন, তা না হয় হলো, কিন্তু এসব তত্ত্ব কথা আলোচনা করে লাভ কী! গত পনের বছরে এসব তত্ত্ব আর তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণতো কম শুনিনি। দেশ গোল্লায় যাচ্ছে, দেশের জনগণ দূর্নীতির বন্যায় ভাসছে আর আমাদের বুদ্ধিজীবিরা আছেন তত্ত্ব কথার কচকচানি নিয়ে। যত্ত সব! হ্যাঁ ভাই, যত্ত সব হাঁদারামের দেশই এই বাংলাদেশ। এই দেশের ভাগ্য কখন কী ভাবে কী কারণে বদলায়, এই দেশের অধিকাংশ লোকই তার খবর রাখেনা। এর কারণ এরা পুরোপুরি মানুষ নয়। মানুষ হয়ে উঠার কোনো সুযোগই এদের নেই। সেই কবে মোঘল আমলে এরা প্রার্থণা জানিয়েছিলো, “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে!” এরপর ব্রিটিশ আমল গেছে, পাকিস্তানী আমল গেছে এবং এখন এই স্বদেশী আমল চলছে, কিন্তু তাদের সেই প্রার্থণা পূরণ হয়নি। আজো তারা দেবদেবীর কাছে ধর্ণা দেয়, শবেবরাতের রাতে আল্লার দরবারে ফরিয়াদ জানায় কিন্তু কোথাও কোনো সুরাহা হয় না। দুধভাত তো দূরের কথা দুবেলা ডাল ভাতও তাদের জুটেনা। কারণ এরা শুধু দরিদ্র নয়, এরা নিরক্ষর; শুধু নিরক্ষর নয় এরা বাস্তুহারা। এরা এই দেশের পশুপাখির মতোই নিতান্ত অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে লিপ্ত। বংশ পরম্পরায় সে সংগ্রামের শেষ নেই।

এদেরই একটি অংশ কায়ক্লেশে কোথাও সুযোগ সুবিধা লাভ করে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তের স্তরে উঠে এসেছে। এরা অনেকে লেখাপড়া করে শিক্ষিতও হয়েছে। কিন্তু বিত্তহীনের সেই স্বভাব ত্যাগ করতে পারেনি। বিত্তবান হয়েও এরা তাই বিত্তের জন্য লালায়িত। এদের মধ্যে চিত্তের প্রসার ঘটেনি। এদের চোখের সামনেই দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে, এরা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে। মনে হয়, এরা বিদেশ থেকে চুক্তিবদ্ধ হয়ে এসেছে। এদের জন্য নির্ধারিত বেতন আর পদোন্নতি যদি এরা পায়, তাহলে এদেশের এই শিক্ষিত সন্তানদের বলার কিছু নেই। দেশ গোল্লায় যাক, দেশের জনগণ দূর্নীতির বন্যায় ভাসুক, তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। আরো মজার ব্যাপার, তারা চায় দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটুক, কিন্তু সেটি বুকের রক্ত দিয়ে দেহের ঘাম দিয়ে ঘটাবে অন্যরা, তারা শুধু ফল ভোগ করবে।

না, আর বেশি কিছূ বলবো না। এখন শুধু প্রশ্ন করবো, আপনি নিজে কোথায় অবস্থান করছেন? এই যে দেশ গোল্লায় যাচ্ছে, তাকি আপনার চোখের সামনে দিয়ে যাচ্ছে না? এই যে দেশের জনগণ দূর্নীতির বন্যায় ভাসছে, তাকি আপনার চেতনার সামনে ভাসছেনা। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে একটি কথাও কি আপনি বলেছেন? এর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গিয়ে কোনো প্রকার ত্যাগ কি আপনি স্বীকার করেছেন? আপনি প্রতিক্রিয়াশীল, রাজাকার আর মৌলবাদীদেরকে বৃথাই দোষারোপ করেন। তারা সবাই তাদের স্বার্থের জন্য লড়ছে। একমাত্র আপনিই নিষ্ক্রিয় ভাববিলাসিতার দেশ প্রেমে আবদ্ধ হয়ে আছেন। সেখানে এদেশের শতকরা আশি জনের জন্য দুঃখবোধ আছে। তাদের আহার্য, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যাতায়াতের জন্য আহাজারি আছে! কিন্তু তার যথাযোগ্য বহিঃপ্রকাশ কই?

না, ভাই, আমি কারো সমালোচনা করতে চাই না। যারা জনগণের জন্য কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন করে নিজেদের স্বার্থের থলি বোঝাই করছেন, তাদেরকে কিছু বলতে আমি নারাজ। আমি বরং আত্ম সমালোচনার পক্ষপাতি। যদি করতে চান, তা হলে আসুন আমরা আত্ম সমালোচনা করি। আমাদের চারপাশে দুর্দৈব আমাদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলছে, তার সৃষ্টিতে আমাদের কি কোনো অবদান আছে? আমরা কি তাতে অংশগ্রহণ করছি, কিংবা তাকে প্রতিরোধ করার কোন চেষ্টা করছি? যারা দেশের জন্য, সৈরাচারের অবসানের জন্য নুর হোসেনদের মতো সেচ্ছায় বুকের রক্ত বিলিয়ে দেয়, আমরা তাদের আত্মদানের জন্য খুবই গর্ব অনুভব করি। কিন্তু আমরা কি তাদের এই মহান চেতনাকে আমাদের স্বার্থপর চিত্তের দেয়ালে রক্তের আঁখরে লিখে নিতে পেরেছি?

না, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কথা আমি বলতে চাই না। হঠাৎ ঘুম ভেঙে সিঁড়ির দোরগোড়ায় দাড়ানো তাঁর দেহটা বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে নেমে আসছে, সেই দৃশ্য আমি আপনাদের সম্মুখে তুলে ধরতে চাই না। আমি শুধু দশ বছরের নিষ্পাপ শিশু রাসেলের কথা বলতে চাই। এ কোন ধরনের নিষ্ঠুরতা! যারা এই শিশুটিকে হত্যা করেছে, তারা কি এই দেশেরই মানুষ? আমার বিশ্বাস হতে চায় না। কারণ বিশ্বাস করতে গেলে এদেশের, আমার এই প্রিয় জন্মভুমির সীমানা ছেড়ে দৌড়ে পালাতে হবে, যাকে মা বলে ডেকেছি, তাকে মনে হবে রাক্ষুসী। না, আমি আমার জননী জন্মভুমিকে সেভাবে দেখতে চাইনা। শুধু বলবো, হে স্বদেশ, তোমার এই নিষ্ঠুরতাকে ঘৃণা করার যথার্থ ভাষা আমার জানা নেই। কী অপরিসীম এর নির্মম আঘাত। শুধু বলবো, হে বাঙালী, এ রক্ত আর বেদনার কোনো বিনিময় নেই। এই রক্ত এই দেশের শোষিত নির্যাতিত জনগণের উত্তরাধিকার। সাবধান, কেউ এই রক্তের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করতে যেয়ো না, তা হলে স্ববংশে ধ্বংস হয়ে যাবে।

আমিতো জানি, আপনারা আমার এই সাবধান বাণী উচ্চারণেও আবেগের আতিশয্য দেখবেন। তা দেখুন; কিন্তু আমি বলবো, মহৎ কোনো কিছুই আবেগ ছাড়া সৃষ্টি হয়না। সেই আবেগ নিয়েই ৭ই মার্চ শেখ মুজিব উচ্চারণ করেছিলেন, “আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাইনা, আমি এদেশের মানুষের মুক্তি চাই।” এরপর তিনি এদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন, এমনকি প্রধানমন্ত্রীও হয়েছেন; কিন্তু এদেশের সাধারণ শোষিত মানুষের মুক্তি আসেনি। মুক্তি খুব সহজে আসেও না। এর প্রধানমন্ত্রীত্ব অর্জন শুধু নয়, যথার্থ পদ্ধতি প্রক্রিয়ার অনুসরন করতে হয়। শেখ মুজিব তাঁর সাধ্যমতো সেই মহান আবেগকেই যুক্তির মাধ্যমে বাস্তবায়িত করতে অগ্রসর হয়েছিলেন। সুতরাং এই আবেগের লালন অবশ্যই করতে হবে। আবেগতো হলো আগুন, যুক্তির আধারে তাকে ন্যাস্ত করতে পারলেই সেটি মুক্তির প্রদীপ হয়ে উঠে।

শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে মহান আবেগ শেখ মুজিবের মধ্যে বিরাজ করছিলো, যুক্তির আধারে আবেগের শিখা জ্বালিয়ে আজ তাঁকেই খুঁজে বেড়াতে হবে। কারণ সেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া শোষিত নির্যাতিত গণমানুষের মুক্তির অন্য কোনো পথ নাই। আসুন, আমরা সেই পথে অগ্রসর হই। আর সে পথে অগ্রসর হলেই আমরা, ‘বাঙালীর মানুষ হবার যে স্বপ্নের নাম শেখ মুজিব’, তাকে আমাদের সহচর রূপে পেয়ে যাবো।

ধন্যবাদ।

বুদ্বিজীবী নিধনের চালচিত্র

বুদ্ধিজীবী নিধনের ব্যাপারটি আদৌ অস্বাভাবিক কিছু নয় এটি সারা বিশ্ব জুড়ে সর্বদাই ঘটে আসছে এবং এখনো এর বিরাম নেই আমাদের এ দেশের যে একাত্তুরের চৌদ্দই ডিসেম্বর এক বার মাত্র এ কান্ডটি ঘটেছিলো, তা নয়; বরং এর আগেও ঘটেছে এবং এখনো এর ধারা পুরোমাত্রায় বজায় রয়েছে। অবশ্যি এ কথা ঠিক যে, একাত্তুরের পরে এমন মর্মবিদারক কোন ঘটনার সংবাদ আমরা জানতে পারিনি। কিন্ত নিধন বলতে তো শুধু হাতে মারাই বুঝায় না, ভাতে মারা এরি মধ্যে পড়ে। এর সাথে আমরা জাতে মারার ব্যপারটিও অনায়াসে যোগ করে নিতে পারি। তার মানে দৈহিক ভাবে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন না করে দারূন অভাব অনটনের মধ্যে ফেলে কিংম্বা প্রলোভনের ফাঁদে জড়িয়েও যথা নিয়মে তাদেরকে পঙ্গু করে দেওয়া যায়। এতেও ফল দাড়াবে সেই একই অর্থাৎ তারা বেচে থাকবে বটে, কিন্তু তাদের অবস্থাটা হবে এই যে, এর চাইতে তাদের একেবারে মরে যাওয়াই ছিল ভালো। কারন মরার চাইতে টসকে মরার ভোগান্তিটাই বেশি। বর্তমানে যদ্দুর মনে হয়, এমন এক দূরবস্থা বুদ্বিজীবীদের উপর বেশ জোরে শোরেই চেপে বসেছে।

সে যাই হোক, যে কথাটা দিয়ে আমরা বক্তব্য আরম্ভ করেছিলাম, তাছিল এই যে. এ ব্যাপারটি আদৌ অস্বাভাবিক কিছু নয়। এর কারন জীবনের অপর নামই সংগ্রাম। আর এইসংগ্রাম তথা হানাহানি মারামারি মধ্য দিয়েই মানুষের সভ্যতা সংস্কৃতির ইতিহাস গড়ে ঊঠেছে। মানুষ যে শুধু প্রকৃতির বিরূদ্বে লড়াই করেছে, তা নয়; বরং তার চাইতেও বেশি করে মানুষের বিরূদ্বে তাকে অনবরত লড়তে হচ্ছে। এর ফলে যারা শক্তিশামান ও কুশলি, তারাই টিকে রয়েছে পৃথিবীর বুকে। আর যারা দুর্বল ও ভিরূ, তারা অপরের হাতে মার খেয়ে খেয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। যোগ্যতমের উদ্বর্তন. বলে যে কথাটা আমাদের সামাজিক ইতিহাসে চালু হয়ে গেছে, তার ও অর্থ বোধ হয় এই যে, শক্তিমানেরই জয়জয়াকার সর্বত্র। সুতারাং যারা দুর্বল, তারা প্রাকৃতিক নিয়মেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে বাধ্য। এদিক থেকে দেখতে গেলে অবশ্যই বলতে হয় যে, বুদ্বিজীবীরা নিশ্চয়ই দুর্বল প্রাণী. কাজেই তাদের নিহত হওয়া বা পঙ্গু হয়ে যাওয়াটা আদৌ অস্বাভাবিক কিছু নয়।

হাঁ, তাতো বটেই। দুর্বলতা সে যেখানেই থাক, যে ভাবেই থাক, তা যে জীবন ধারনের উপযোগী গুন নয়, সে কথা আমরা সকলেই স্বীকার করতে বাধ্য। কাজেই যে সকল বুদ্বিজীবী অভাবের তাডনায় আত্মবিস্মৃত হয় কিংবা প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদেরকে বিকিয়ে দেয়, তারা যে নেহাতই দুর্বল, সে সম্পর্কে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। কিন্তু মুশকিল হয়েছে এই যে. চৌদ্দই ডিসেম্বরের, ঘটনাটি এর উল্টো সাক্ষ্যই বহন করে। এটি বরং এ কথাই প্রমান করে যে, এ সকল নিহত বুদ্বিজীবী আদৌ দুর্বল ছিলেন না, তারা অভাবের তাড়নায় কিংবা প্রলোভনের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে আত্মবিক্রয় করেননি। করলে তাদেরকে এমন মর্মান্তিক মৃত্যু বরণ করতে হতো না বরং আমাদের সমাজে বিচরণকারী অজস্র বুদ্ধিজীবীর ন্যায় তারাও বেঁচে থাকতে পারতেন। তারা অসতর্কতার শিকার হয়েছেন বটে; কিন্তু তাদের মৃত্যুই প্রমান করেছিলো যে, তাঁরা যর্থাথই জীবনের অধিকারী ছিলেন। এ যেনো সেই কাদম্বিনীর ব্যাপার; সে মরে প্রমাণ করেছিলো যে সে মরেনি। কিন্তু ভাবছি, উপমাটা বোধ হয়, জুত সই হলো না। কারন কাদম্বিনী তার জীবনের প্রমাণ দিতে গিয়ে আত্মহত্যা করেছিল; কিন্তু শহীদ বুদ্ধিজীবীরা তা করেননি! বরং তাঁদেরকে জোর করের ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছিল বর্বর ধর্মাজ্জরা। সে হত্যা কান্ডও কী জঘন্য, কী নিষ্ঠুর! দড়ি দিয়ে হাত বেঁধে, কাপড় দিয়ে চোখ বেধে রাতের অন্ধকারে গুলি করেছে বুক বরাবর। ফায়ারিং স্কোয়াডের অপরাধীদেরকে ও এমন বর্বরতার সাথে হত্যা করা হয় না। তা হলে কি ওরা তাঁদেরকে তার চাইতে ও বেশী অপরাধী বলে ভেবেছিলো? কী এমন জঘন্য অপরাধ করেছিলেন তাঁরা? তারা কি চুরি ডাকাতি হাইজ্যাক করেছিলেন? বাড়ীঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়ে ছিলেন? কিংবা যুবকদের বুকে যথেচ্ছা গুলি মেরে যুবতীদেরকে ধরে ধরে ধর্ষণ করেছিলেন? কী সেই অপরাধ যার জন্য তারা এমন একটি বর্বর হত্যাকান্ডের শিকার হলেন? আজকে তাদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সর্বাগ্রে তাদের সেই অপরাধটিকেই আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। কারন সেটি না করতে পারলে, একদিকে যেমন তাদের স্মৃতিচারণের মূল্য আমরা বুঝবনা, অন্য দিকে তেমনি ত্রিশ লক্ষ শহীদের তালিকা থেকে তাদের নামগুলি পৃথক করে উচ্চারণ করার যৌক্তিকতা ও আমরা তুলে ধরতে পারবোনা।

তা যাহোক, আসলে সেই অপরাধটা কী? আমাদের মনে হয়, সেটা আমাদের বর্বর বন্ধুরাই ভালো বলতে পারতেন, যারা এই নির্মম হত্যা কান্ড ঘটিয়েছিল। কিন্ত মুশকিল হয়েছে এই যে, তারা এই ব্যাপারে কখনো মুখ খুলেননা। কারন এই ব্যাপারটি তাদের ঘিলু থেকে বেরোয়নি। তাদের ঘিলু এতটা উর্বর হলে এ বর্বরতার পরিনাম ফলটাও তারা অনায়াসে ভাবতে পারতেন জোর গলায় বলতে পারতেন, আমরা যা করেছি দেশের মঙ্গলের জন্যই করেছি। একারনেই আমাদের কেবলই সন্দেহ হয়, আমরা হয়তো শহীদ বুদ্ধিজীবীদের যথার্থ অপরাধটা খুঁজে বের করতে পারবোনা। কারন আমরা যদ্দুর জানি, তারা এ দেশের গণমানুষের স্বাধিকারের জন্যই নিজেদের বিচিত্র শক্তি নিয়োজিত করেছিলেন। সেই ভাষা আন্দোলনের পটভুমি থেকেই এর প্রকাশ্য যাত্রা শুরূ। তারই ধারা ধরে উনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থান এমন এক শক্তির পটভুমি গড়ে তুলে, যার অনিবার্য পরিণতি ছিলো সত্তুরের নির্বাচন ও একাত্তুরের স্বাধীনতা সংগ্রাম। এর জন্যই বর্বর যখন দেখলেন যে, তাদের সকল ষড়যন্ত্র ভেদ করে সেই শক্তির জয়ই অনিবার্য হয়ে উঠেছে, তখন তারা এই শক্তি ব্যুহের স্থপতিদেরকে নির্বিচারে হত্যা করার পরিকল্পনায় মেতে উঠলো।

বিরাট ও ব্যাপক তাদের সে পরিকল্পনা। অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা তাদের এই কুখ্যাত পরিকল্পনাকে বুদ্বিজীবী নিধনের নীল নকশা বলে অভীহিতকরে থাকেন। সমস্ত বাংলাদেশই ছিলো এ পরিকল্পনার আওতাভুক্ত। আর এরই ধারা অনুসরন করে তারা শুধু ঢাকায় নয়, ব্রাহ্মণবাডিয়াতেও এমনি হত্যাকান্ড চালিয়েছিল। শুনেছি এই ময়মনসিংহ শহরেও ডিসম্বেরের তিন তারিখে তারা ছোবল হানার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন। কিন্তু সে দিন নাকি নিয়াজি এসে পড়ায় তাদের সে পরিকল্পনা সফল হয়নি। এমনি ভাবে নানা ধরনের বাধা বিপত্তি এসে তাদের আরদ্ধ কাজ শেষ করার পথে অনন্তরায় হয়ে দাড়ায়। কিন্তু তাই বলে কি তাদের সেই পবিত্র নীল নকশা বাতিল হয়ে গেছে? মনেতো হয়না। হাতে না মারতে পারলেও ভাতে আর জাতে মারার কাজতো পুরো দমেই চলছে। এমন কি কিছু দিন এক বন্ধু বললেন, একটি নতুন নীল নকশাও নাকি ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে।

তা নীল নকশাই বলুন আর লাল নকশাই বলুন, বন্ধুদেরকে বলবো, এ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কি খুব লাভ আছে? কারণ যে জন্মে তাকে মরতে হবে; আল্লা মিয়া তার সাদা নকশাতেই এ কাজ সাবাড় করে রেখেছেন। সুতারাং যে গুলিকরে, সেও মরে যে গুলি খায় সেও মরে, বাকি থাকে শুধু কে কি কাজ করলো, সেটুক। কাজেই ভয় নেই, এ দেশের গণমানুষের স্বাধীকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করাটা যদি অপরাধ হয়, তা হলে সে অপরাধ করেই মরা ভালো। তাতে জীবন না হোক, অন্তত মৃত্যুটাতো সার্থক হবে।

কারণ আমাদের ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে যতটুকু বুঝতে পারি, তাতে মনে হয় এমনি এক অপরাধের জন্যই বুদ্ধিজীবীদেরকে হত্যা করা হয়েছে এবং হচ্ছে। যদি তা না হয়, তা হলে জোড় হাতে বন্ধুদের কাছে এই অনুরোধ জানাবো, তারা যেন দয়া করে এ সকল বুদ্ধিজীবীর যথার্থ অপরাধটি সকলের সম্মুখে খুলে বলেন যদি তারা ন্যায়সঙ্গত যুক্তিপ্রমাণ দিয়ে এই নির্মম হত্যা কান্ডের সরবতা প্রতিপন্ন করতে পারেন, তাহলে কথা দিচ্ছি, আমরা তা নির্দ্বিধায় মেনে নেবো। আর যদি তা না পারেন, তা হলে বলুন, কেন কিসের জন্য আপনারা এমন কিছু প্রাণের বিনাশ সাধন করেছেন, যাঁদের বুদ্বিমত্তা আর মননশীলতা জাতীয় অগ্রগতির জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় ব্যাপার ছিল? কিন্তু প্রশ্ন করে কোন লাভ আছে? কারণ এ কথা ভালো করেই জানি যে, আপনারা এর উত্তর দিতে পারবেন না। আসলে এ এক ধরনের বিভ্রান্তি এক ধরনের অন্ধ উন্মাদনা। মানুষের সভ্যতা সংস্কৃতির ইতিহাসে এর ভুরি ভুরি উদাহরণ বিদ্যামান। এভাবেই এক দল অপযুক্তির পুজারি সমাজ প্রগতির ধারাকে বার বার রূদ্ধ করে দিতে চেয়েছে। কখনো নিজেদের কায়েমি স্বার্থের জন্য, আবার কখনো ভিন্নতর কোন প্রলোভনের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে প্রগতির বার্তা বাহক সমাজ শিল্পীদেরকে নীরব করে দিতে এগিয়ে এসেছে। আপাত দৃষ্টিতে সাময়িক ভাবে তাদের এ প্রচেষ্টা সফল হলেও পরিণামে জয় হয়েছে প্রগতির। আর এমনি ভাবেই রক্তাক্ত ঘর্মাক্ত পিচ্ছিল পথে পা ফেলে ফেলে ক্রমাগত এগিয়ে এসেছে মানুষের সভ্যতা সংস্কৃতির ইতিহাস।

তাহলে অপরাধ। কিসের অপরাধ? কি অপরাধ করেছিলেন সক্রেটিস; যার জন্য তাকে হেমলকের পিয়ালা মুখে তুলে আত্মবিসর্জন দিতে হলো? কি অপরাধ করেছিলেন হযরত ঈসা যার জন্য তাকে ক্রুশে চড়ে প্রায়শ্চিত্ত করতে হলো? কি অপরাধ করেছিলেন হযরত মুহম্মদ; যার জন্য তাকে প্রাণের ভয়ে স্বদেশ ত্যাগ করতে হলো? কি অপরাধ করেছিলেন গ্যালিলিও; যার জন্য তাকে নির্মম অত্যাচারের শিকার হতে হলো? অজস্র উদাহরণ; অজস্র নির্মম নিস্করুন দৃষ্টান্ত। একেবারে আমাদের একাল পর্যন্ত তাকে টেনে আনা যায়। কিন্তু কি লাভ হবে তাতে? আমাদের অন্ধ বন্ধুদের দৃষ্টি কি তাতে বিস্ফারিত হবে? মোটেও না; বরং ইতিমধ্যেই তারা মনে মনে আৎকে উঠেছেন। এ বলে কিরে এ সব, বুদ্বিজীবী হত্যালীলা বুঝাতে গিয়ে কিনা যতো সব পুণ্যাত্মা ধর্মবেত্তা আর জ্ঞানী গুনীদের নাম টেনে এনেছে। এর কারণ বন্ধুদের ধারনা, বুদ্বিজীবী মানেই নাস্তিক, নাস্তিক মানে ধর্মবিরোধী আর ধর্ম বিরোধী মানেই দেশদ্রোহী; সুতারাং এদেরকে নির্বিচারে হত্যা করা শুধু জায়েজ নয়, ফরজ। কাজেই ঝুঝতেই পারছেন, এমন বন্ধুদেরকে বুঝাতে যাওয়া পন্ডশ্রম।

না না, তারা যে নির্বোধ, এ কথা মনে করার কোন কারন নেই; বরং তারা যথেষ্ট বুদ্বিমান; সে দিন তিনি কি সুন্দর করে বললেন, লোকে আমাকে অনেক বিশেষণই দিয়েছেন, কিন্তু কেউ আমাকে গন্ডমুর্খ বলেনি। বাস্তবিক তিনি যে গন্ডর্মূখ নন, ইরানে থাকা কালে তার একটি মন্তব্যে তা ধরা পড়েছে। একবার তিনি সাংবাদিকদের নিকট বলেছিলেন, আমার দেশের জন্য কমিউনিষ্টদের চাইতেও ক্ষতিকর হলো বুদ্বিজীবীরা, বলুন, বুদ্বিমান ছাড়া কি এমন কথা অন্য কেউ বলতে পারে? কারন তিনি দেখতে পেয়েছিলেন যে, দীর্ঘদিন চেষ্টা চালিয়েও তার সেবক বাহিনী এই বুদ্বিজীবীদেরকে নির্মূল করতে পারেনি অবশেষে তারাই খোমেনীকে ডেকে এনেছে। আপনারা, আর শুধু আপনারা কেনো সারা বিশ্ববাসীই এখন খোমেনীর খেলা দেখছেন; কিছু দিনের মধ্যে মাদারীর খেলাও জমে উঠলো বলে। এসবের পিছনে কি ইরানের বুদ্বিজীবীরা নেই? তা হলে কি একথা বলতে হবে যে, তারা সবাই নাস্তিক?

এজন্যই বলছিলাম, আমাদের বন্ধুরা মোটেও নির্বোধ নন; বরং তারাও বুদ্বিজীবী। তফাৎ শুধু এই যে, তারা একটা গন্ডির মধ্যে আবদ্ব থেকে সব কিছু দেখতে আর শুনতে ভালোবাসেন। এজন্যই তারা যখন প্রগতির কথা বলেন, তা আবলীলায় পশ্চাৎ গতি হয়ে দাঁড়ায়। শুনেছি ভূতের পা নাকি পিছন দিকে কাজেই সে যখন এগিয়ে যায়, তখন পিছন দিকেই অগ্রসর হয় আমাদের বন্ধুদের অবস্থাও হয়েছে তাই এর কারণ তারা বিশ্বের দিকে তাকিয়ে দেখেন না; সবকিছু ইতিহাসের সামগ্রিক পটভূমিতে বিচার করতে অগ্রসর হন না। যদি তা করতে পারতেন, তা হলে তাদের দৃষ্টি অবশ্যই সত্যকে দর্শন করতো তারা ও দেখতে পেতেন যে, এই পৃথিবীর বস্তুপুঞ্জকে বিশ্লেষণ করলে যেমন তার মূলে অনু পাওয়া যায়, তেমনি এর সভ্যতা ও সংস্কৃতির তাবৎ ঐতিহ্যকে বিশ্লেষন করলেও তার মূলে পাওয়া যায় শ্রম। আর অনু যেমন ঋনাত্বক ও ধনাত্বক দুটি বিদ্যুৎ কণার চাঞ্চল্য নিয়ে গঠিত, তেমনি এই শ্রমও শক্তি ও বুদ্ধির ঐশ্বর্যে মহিমান্বিত। অনুর ধনাত্বক বিদ্যুৎ কণার মতো শ্রমের মধ্যকার এই বুদ্ধিও ধনাত্বক। সে প্রয়োজনের তাড়নায় একটি সত্যকে আবিষ্কার করে আর শক্তি সেই সত্যকে বাস্তবে রূপ দিয়ে ঋনাত্বক বিদ্যুৎ কণার ভূমিকা পালন করে। এমনি ভাবে কায়িক ও মানসিক শ্রমের সম্মিলিত সমাহারে সভ্যতা-সংস্কৃতির ইতিহাস গড়ে উঠে।

এক্ষেত্রে, বন্ধুরা, আমরা সকলেই স্বীকার করতে বাধ্য যে, তুলনামূলক বিচারে কায়িক শ্রমের চাইতে মানসিক শ্রমের মূল্য অবশ্যই বেশী। কারন এই মানসিক শ্রম তথা বুদ্ধি-চিন্তা-মননশীলতাই দিক নির্দেশের কাজ করে থাকে। এর ফলেই সমাজ প্রগতি উদ্দেশ্যে অনুসারী হয়ে গন্তব্যে পৌছাতে সক্ষম হয়। উপরে যাদের পুণ্য নাম উল্লেখ করে ছিলাম, তাঁরাও তো এই মানসিক শ্রমের অধিকারী। তাঁরা প্রতিভাবান, তাই তাঁরা যুগান্তর সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করলে চলবে না যে, তাঁদের এ প্রকার আলোড়ন সৃষ্টিকারী আর্বির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন লক্ষ লক্ষ বুদ্ধিজীবী। এমন কি তাদের তিরোভাবের পরও এ সকল বুদ্ধিজীবীই তাদের উপলব্ধীতে সত্যকে ধারণ করেছেন এবং বাস্তবে রূপ দিতে সচেষ্ট হয়েছেন। সুতরাং বুদ্ধিজীবীদের প্রতি প্রদর্শিত নির্মমতার উদাহরণ দিতে গিয়ে এ সকল পুণ্যাত্মা জ্ঞানী গুণীদের নাম উচ্চারন করলে আৎকে উঠার কোনো অবকাশ নেই; বরং এর মধ্যে ইতিহাসের সত্যকে অনুধাবন করাই সমুচিত।

সমুচিততো বটেই। কিন্তু তারা কোথায়, যাদের জন্য এতো গলাবাজি করছি। সেই বুদ্বিজীবীরা? আমাদের এ দেশে তদের অস্তিত্বের কোন লক্ষণতো দেখতে পাচ্ছিনা। তারা কি ভাতে মারা আর জাতে মারার কবলে পড়ে এমনি নির্জীব হয়ে পড়েছেন যে, তাদেরকে আর চেনাই যাচ্ছেনা। ‘হুজ্জুতে বাঙ্গাল’ একটা কথা ছিল, আজ দেখছি সেটা বদলে গিয়ে ‘হুজোগে বাঙ্গাল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের ছেলেরা খরো হয়ে জন্মায় আর ঢ়োড়া হয়ে মরে এ কি শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করতে হবে। চারদিকের অবস্থা দেখে শেষ পর্যন্ত সেই বর্বর বন্ধুদেরকেই ধন্যবাদ জানাতে ইচ্ছা হচ্ছে। সত্যি তারা চৌদ্দই ডিসেম্বরের হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে অন্তত; কিছু সংখ্যক বুদ্বিজীবীকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। তা না হলে অন্য আরো অনেকের মতো তাদেরও আরো করুণ অপমৃত্যু ঘটতো। এজন্য রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতাটির ছন্দ নকল করে বলতে ইচ্ছা হয়:

বুদ্বিজীবী হত্যা করে করেছো একি বন্ধুরা,
অমর করে দিয়েছো তাদের বাঁচিয়ে।

মানুষ

একজন গ্রীক দার্শনিক নাকি দিনের বেলা বাতি জ্বালিয়ে কোনো কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। এক পথচারী তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলো, ‘মান্যবর, আপনি দিনের বেলায় এমন করে কি খুঁজছেন?’

উত্তরে দার্শনিক বলেছিলেন, ‘মানুষ!’

দার্শনিক প্রবরের খুঁজে বেড়ানোর ধারা আর উত্তরের মধ্যে বেশ অভিনবত্ব আছে, একথা আমাদের মানতেই হবে। কারণ মানুষ যেখানে চারপাশেই ভীড় করে আছে সেখানে তাকে খুঁজে বেড়াতে হয় না। আবার দিনের বেলায় বাতি জ্বালিয়ে খোঁজা সেত এক দেখার মতো ব্যাপার। কাজেই সমস্ত ব্যাপারটার মধ্যে যদি অন্য কোনো তাৎপর্য না থাকে, তাহলে এটাকে পাগলামি বলা ছাড়া গত্যন্তর নেই।

বিচক্ষণ ব্যাক্তি মাত্রেই বলবেন, না, ব্যাপারটা পাগলামি নয় এর মধ্যে তাৎপর্যতো আছেই, তদপুরি আছে একটি শাশ্বত তথ্য। অর্থাৎ এমনি দিনের বেলা বাতি জ্বালিয়ে মানুষ খোঁজার ব্যাপারটি দার্শনিকের সাথেই শেষ হয়ে যায়নি। প্রতি যুগেই এমনি মানুষ খোঁজার একটা প্রচেষ্টা আমরা লক্ষ্য করে থাকি। অতীতেও তা ছিলো, আর এখনো আছে।

এবার কিন্তু ব্যাপারটার মধ্যে বেশ একটা গভীর তত্ত্বের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, মানুষ তাহলে মানুষ নয় আর দিনের আলোও আলো নয়। চারিদিকে অজ্ঞানতার অন্ধকারে ছেয়ে আছে, এর সামনে দিনের আলো আর রাতের কালো সবই এক সমান। আর সেই অন্ধকারে মানুষের চেহারা নিয়ে যারা ঘুরে বেড়াচ্ছে, তারা সবাই মানুষ নয়, ভিন্নতর কোনো জীব। দার্শনিক জ্ঞানের মশাল নিয়ে তাই মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। কিন্ত মানুষের দেখাতো খুব সহজে পাওয়া যায়না; দার্শনিকও পেয়েছিলেন কিনা, সে খবর অবশ্য জানা যায়নি।

তবু আমরা ধরে নিতে পারিযে, মানুষ ছিলো এবং এখনো মানুষ আছে। কারণ যে বস্তুর অস্তিত্ব নেই, তাকে খুঁজে বেড়ানো যায়না, আবার যুগে যুগে তাকে খুঁজে বেড়ানোর মতো একটা শাশ্বত পাগলামি কিছুতেই সম্ভব নয়। অতএব মানুষ আছে, তবে তার সংখ্যা খুবই কম। এর উপর মানুষ নামধারি মানুষ তার অস্তিত্বকে আরো বিভ্রান্তিকর করে তুলেছে। সে জন্যই খুঁজে পেতে তার দর্শন পাওয়া খুবই আয়াস সাধ্য ব্যাপার।

সে না হয় মেনে নিলাম যে, ব্যাপারটা খুবই আয়াস সাধ্য; একজন দার্শনিকের সেজন্য প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু আমাদের ন্যায় সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাসা সে পরিশ্রম নিয়ে নয়, স্বয়ং মানুষ নিয়ে। মানুষের সংজ্ঞাটা যদি জানা যেত, তা হলে আমরাও না হয় খুঁজে পেতে দেখতাম! কিন্তু সংজ্ঞা পাওয়াও বোধ হয় খুব সহজ ব্যাপার নয়!

কাকে মানুষ বলবো? মানুষের কুলে জন্ম গ্রহণ করলেও যদি মানুষ না হয়, তা হলে মনুষ্যত্বের একটা পৃথক সংজ্ঞা নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু সেটা কী? এক্ষেত্রে আমাদের মনে হয়, মানুষের একটা আদর্শ রূপ কোথাও আছে। সেটি যুগে যুগে মানুষই গড়ে তুলেছে। আর সে আদর্শের সাথে মিলিয়েই সে মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু এ ব্যাপারটাই বা কেমন, মানুষ মানুষের জন্য যে আদর্শ রূপের প্রতিষ্ঠা করলো, সেটি এখন অলভ্য হয়ে উঠছে কোনো। তাহলে মানুষ কি দেখে কী শিখে এমন একটি আর্দশ গড়ে তুলেছিলো! সে কি বাস্তবতাহীন একান্তই কোনো খেয়ালী স্বপ্ন?

প্রশ্নটি বিদঘুটে, তবু এ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে মানুষ খোঁজার এই তাৎপর্যের রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব নয়। আমরা দার্শনিক নই, সাধারণ মানুষ হিসাবে এ প্রশ্নের মুখোমুখি আমাদেরকে হতেই হবে। কারণ আমরা মানুষ কুলে জন্ম গ্রহণ করেছি, মানুষের নাম ধারণ করেছি; তবু যদি আমরা মানুষ না হই, তাহলে মানুষ হবার সেই খেয়ালি আদর্শ আমাকে খুঁজে দেখতেই হবে। যদি তার মাঝে কোনো সারবত্তা থাকে, তবে অবশ্যই তা আমাকে মানতে হবে, আর যদি না থাকে, তাহলে কেনো খামোকা আমার উপর এমনি অমানুষ হবার দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হলো।

কিন্তু মুশকিল হয়েছে এই যে মানুষের সেই আদর্শ সম্পর্কে সংজ্ঞা খোজার জন্য আমাদেরকে যাদের কাছে হাত পাততে হবে, সেই ধার্মিক – দার্শনিকদের সংখ্যাওতো অল্প নয়। তাদের অনেকের নাম আমরা জানি আবার অনেকের নাম জানিনা এবং তাদের বক্তব্যও একই ধরনের নয়। তবু তার নির্গলিতার্থ যা আমরা সহজে পেতে পারি, তাহলো, মানুষ সৃষ্টির সেরা – ‘আশরাফুল মখলুকাত’, অম্রতস্য পুত্রা। অবশ্য এই সহজে পাওয়া বিষয়টি কিন্তু আদৌ কোনো সংজ্ঞা নয়, একটি বিশেষণ মাত্র এবং এটি মানুষ নিজেই নিজের জন্য তৈরি করেছে কারণ মানুষের বাস্তব অবস্থা এ কথারই সাক্ষ্য বহন করছে। সে যদি সেরা না হতো, তাহলে এভাবে পৃথিবীর সব কিছু কুক্ষিগত করে নেয়া কিছুতেই তার পক্ষে সম্ভব হতো না। তবে এর মধ্যে দ্বিতীয় বিশেষণটিতে এমন কিছু একটার ইংগিত আছে, যা সৃষ্টির সহজ নিয়মের বাইরে অর্থাৎ মানুষ এই পৃথিবীর হয়েও যেনো পৃথিবীর নয়। এই মরণশীলতার উর্ধ্বে কোনো অমৃত জগৎ থেকে বুঝি তার আগমন ঘটেছে। এধরনের একটি মনোভাব প্রথম বিশেষণের সাথেও জড়িয়ে আছে। সুতরাং উভয়টিকে একত্র করলে যে কথাটি আমরা সহজে পেতে পারি, তা হলো, মানুষ এই পৃথিবীর হয়েও পৃথিবীর নয়; সৃষ্টির সাথে তার আত্মীয়তা থাকলেও সে এ সবের চাইতে অধিক এক বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী।

কিন্তু আমরা আগেই বলেছি, এ ব্যাপারটি কোনো প্রকার সংজ্ঞা নয়; মানুষের বাস্তব অবস্থার সাক্ষ্য বহন কারী একটি বিশেষণ মাত্র। আর এ বিশেষণ তৈরি করতে গিয়ে মানুষ তার অতীত ইতিহাসকে বিচারের মধ্যে আনেনি। কারন তখন সে ইতিহাস তার জানা ছিলো না। এ কারনেই সে নিজের অবস্থা ব্যবস্থাকে পৃথিবীর সাথে মিলিয়ে নিতে পারেনি। নিজের ক্ষমতাকে সে নিজের পরিচর্যার ফসল বলে মনে করতে পারেনি। বরং সমগ্র সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে তাকে এতো উর্ধ্বে মনে হয়েছে যে, সে এই সৃষ্টির বাইরের কিছু একটার ধারনা করা ছাড়া অন্য কোনো পথ খুঁজে পায়নি।

এ জন্যই পৃথিবীর যে কয়টি পুরাণ মানুষের সৃষ্টি সম্পর্কে কথা বলেছে, তারা কেউই তাকে পৃথিবীর নিয়মের মধ্যে রাখতে পারেনি। সেমেটিক পুরাণে আমরা দেখতে পাই, পৃথিবীর প্রথম মানুষের নাম “আদম” এবং তাকে “আল্লাহ্” আপন আকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। আদমের বাম পাজরের একটি হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে পৃথিবীর প্রথম নারী “হাওয়া” কে। পৃথিবীর সমস্ত মানুষ এই আদম ও হাওয়ার বংশধর। ভারতীয় পুরাণেও মানুষের সৃষ্টি কাহিনী প্রায় অনুরূপ। ব্রহ্মা প্রথম সৃষ্টি করলেন “মনু” কে। মনু হলেন প্রজাপতি সম্রাট; তিনি তার প্রজা হিসেবে মানুষকে সৃষ্টি করলেন। মানুষ শব্দটির উৎপত্তিইতো এই “মনু” থেকে। গ্রীক পুরাণেও একই ব্যপার – দেবাদিদের জিউস সৃষ্টি করলেন অতিমানব টাইটান দেবকে আর এই মানুষ হলো সেই টাইটানদের সৃষ্টি। দুর্বল মানুষের জন্য স্বর্গ থেকে আগুন নিয়ে যাবার ফলে প্রমিথিউসের শাস্তিও কাহিনী সবারই জানা।

এ ব্যাপারে আরো অনেক পুরাণের কাহিনীই আলোচনা করা যায়, কিন্তু সর্বত্রই সেই একই প্রচেষ্টা – যেভাবেই হোক মানুষের সৃষ্টি ভিন্নতর কোনো উৎস থেকে চিহ্নিত করার পরিকল্পনা। কারন আকৃতি প্রকৃতিতে সমস্ত জীব জগত থেকে তার পার্থক্যকে সে অন্য কোনো কার্যকারন দিয়ে বিশ্লেষণ করতে পারেনি। এর কারনও আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি – মানুষের ইতিহাস তখনো তার আয়ত্তে আসেনি। এর ফলে মানুষের পক্ষে যা করা সম্ভব তাই তারা করেছে। এর মধ্যে মানুষের মননশীলতার পরিচয় যেমন আছে। তেমনি আছে সেই মননশীলতার উৎস জানার কৌতুহলের। কারন মানুষ নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্নকাতর না হলে এমন কাহিনী তৈরি এবং বিশ্বাস কোনোটাই করতে পারতো না।

কিন্তু আমাদের মুশকিল হয়েছে এই যে, এ সকল কাহিনীর উৎস আর অর্থ যাই হোক না কেন আমাদের উদ্দিষ্ট সেই সংজ্ঞা কিন্তু এর মধ্যে নেই। যে আদর্শ মানুষকে দার্শনিক প্রবর খুঁজে বেড়াছিলেন, তার সেই আদর্শের সংজ্ঞা কোথায় পাবো? কি করে বুঝতে পারবো যে, মানুষ বলতে এমন বিশেষ কিছুকে বোঝায়, যা মানুষ নামধারী এই জন সমাজে সহজ লভ্য নয়?

হ্যাঁ, উপরে বলা পুরাণের কাহিনী গুলিকে না হয় ধর্মের আওতায় ফেলে দিলাম। কিন্তু দর্শন আদর্শ মানুষের সংজ্ঞা সর্ম্পকে এমন কীই বা বলেছে। তার বক্তব্যওতো সেই অম্রতস্য পুত্রার মতো বিশেষণ ধর্মী, যা পুরাণের কাহিনীর সাথেই সাযুজ্যপূর্ন, এক্ষেত্রে ‘সুপারম্যান’ ও ‘মর্দেমুমেনের’ ধারনা দুটিকে বিশ্লেষন করলেও সেই একই ব্যাপার বেরিয়ে আসবে। সুতরাং ধর্ম দর্শন হাতড়ে বেড়ালে আমরা যা পাবো, তার সাথে দিনের বেলা বাতি জ্বালিয়ে মানুষ খোঁজার রহস্যেও মতোই একটা রহস্য জড়িয়ে আছে, যা খুঁজে বেড়ানো যায় কিন্তু পাওয়া খুব সহজ নয়। কাজেই শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে বিজ্ঞানের কাছে হাত পাতা ছাড়া অন্য কোন উপায় থাকে না। কারন এই বিজ্ঞানই দিনের বেলা বাতি জ্বালিয়ে নয় বরং যথার্থ ঐতিহাসিক জ্ঞানের আলো ফেলে আমাদেরকে আদর্শ মানুষের সন্ধান দিতে পারে এবং ধর্মদর্শনের সৃষ্ট সেই রহস্যের সে দ্বারোৎঘাটন করতে পারে।

তবে মুশকিল হয়েছে এই যে, বিজ্ঞানের কথা শুনলেই আমাদের গা শিউরে উঠে, আমাদের হাত পা যেনো পেটের মেধ্য সেধিঁয়ে আসতে থাকে কারণ বিজ্ঞানকে আমরা সব সময় বিদেশী আক্রমনের মতো ভয়াবহ কিছু বলে মনে করি। মনে হয়, আমাদের ধর্ম দর্শনের সর্বনাশ করা ছাড়া এই বিজ্ঞানের অন্য কোনো কাজ নেই। কিন্ত আসলে ব্যাপারটি কি তাই? বিজ্ঞান কি সত্যেই বিদেশী? ধর্ম দর্শনের সর্বনাশ করতেই কি বিজ্ঞানের উদ্ভব?

এ সব প্রশ্নের উত্তরে অনেক কথাই বলা যায়। কিন্তু আসল ব্যাপার যা ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্যের সৃষ্টি করেছে, সেটি হলো একটির জন্য পৃথিবীর সাধারণ নিয়মের বাইরের অলৌকিক কিছু একটার ভিত্তি আছে আর অন্যটির ভিত্তি হলো এই পৃথিবী ও তার নিয়মাবলী। কাজেই বিজ্ঞানের কথা মানতে হলে আমাদেরকে সেই অলৌকিক ভিত্তিটাকে ত্যাগ করতে হয়। কারণ ওটা বিজ্ঞানের বিচার বিশ্লেষনের ধোপে টেকেনা। সুতরাং আমরা যেহেতু অলৌকিকে অতিমাত্রায় ভক্ত, কাজেই আমাদের জন্য বিজ্ঞানের দিকে চোখ বুজে থাকা ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। কারণ চোখ খুললেই সকল রহস্য কর্পূরের মতো উবে যেতে থাকে।

কিন্তু এভবে চোখ বুঁজে কি আমরা বাঁচতে পারবো। এই বিজ্ঞানের যুগে আমরা বিজ্ঞানের সকল অবদানই অম্লান বদনে ভোগ করছি। কেবল ধ্যান ধারনার ক্ষেত্রেই আমাদের বিজ্ঞান বিমুখতা যেনো অদ্ভুত ভাবে অনড় হয়ে আছে। এর ফল হয়েছে এই যে, আমাদের পাঠ্যসূচিতে বিজ্ঞান স্থান না করলেও আমাদের জীবন সূচিতে অপাংক্তেয় হয়ে আছে। আমরা বিজ্ঞানের বিচার বিশ্লেষন লিখছি শিখছি, কিন্ত জীবনের বাস্তব সমস্যায় আমরা তাকে দুরে সরিয়ে রাখছি। এজন্যই বলছিলাম যে, মানুষের ব্যাপারে বিজ্ঞানের বিচার বিশ্লেষনকে আমাদের যেমন গ্রহণ করা অতীব প্রয়োজন, তেমনি একে সাদরে বরণ করে নেয়া বেশ মুশকিলের ব্যাপার।

তবু এই অচলায়তন আমাদেরকে ভাঙতেই হবে। কারণ এ ছাড়া মানুষকে খুঁজে পাওয়ার অন্য কোনো পথ নেই। কারণ বিজ্ঞানের বিচার বিশ্লেষনের দ্বারস্থ হয়েই আমরা বুঝতে পারি মানুষ এই জীব জগতের অন্তর্গত এক প্রকার জীব মাত্র। সমগ্র সৃষ্টি জগতের ইতিহাসের সাথে তার ইতিহাস ওতপ্রোতো ভাবে জড়িয়ে আছে। তবু এরই মধ্যে মানুষ সকলকে অতিক্রম করে প্রাধান্য বিস্তার করছে। এর মূলে যে বিষয়টি সর্বদা সক্রিয় রয়েছে, তার নাম হলো ‘শ্রম’।

কিন্ত বড়ো বিচিত্র মানুষের অগ্রগতির ইতিহাস। বনচারী বৃক্ষশালা বিহারী মানুষ অনিবার্য – প্রয়োজনে সমতলে নেমে এসেছিলো। এর পর জীবনের তাড়নায় সে তার হাত দুটিকে পায়ের কাজ থেকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে। আর এই মুক্তিই তাকে জীব জগতের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিয়েছে। হাতের শ্রম তার মস্তিষ্ক বৃদ্ধির সহায়ক হয়েছে এবং তার চোয়ালের আড়ষ্টতা দূর করে ভাষা সৃষ্টির পথ সুগম করে দিয়েছে। এর পর এসেছে সমাজ বদ্ধ জীবনের অমোঘ ফলাফল।

গুহাবাসী পশুজীবী মানুষ আগুন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে সভ্যতার উন্মেষ ঘটিয়েছিলো। এর ফলে তার জীবনে এসেছে অদ্ভুত সব পরিবর্তন। শুধু পৃথিবীর সাথে সংগ্রামের হাতিয়ার সৃষ্টিতে সম্বৃদ্ধি লাভ নয় তার চিন্তা চেতনাও সেই আনুসারে নতুন পর্যায় লাভ করেছে। এর পর কৃষির আবির্ভাব আর গোষ্টি বদ্ধ মানুষের এক কেন্দ্রীয় শাসনের অধীন হবার ঘটনা। ধর্ম দর্শনও এরই সাথে সংগতি রেখে অগ্রসর হয়েছে। বিজ্ঞানও নানা ভাবে মানুষের চেতনাকে নাড়া দিয়েছে।

আজ সেই বিজ্ঞানের জয়জয়কার সর্বত্র। এই বিজ্ঞান যদি মানুষের মননশীলতার দান হয়ে থাকে! তা হলে ধর্ম দর্শনও মানুষের চিন্তা চেতনারই আবদান। তাই আজ মানুষ সম্পূর্ন নির্মোহ দৃষ্টি দিয়ে তার অতীতকে বিশ্লেষন করছে। ধর্ম দর্শনে তার মননশীলতার যে বিরাট ঐশ্বর্য লুকিয়ে আছে, তার স্বরূপ উদঘাটন করছে। এর ফলে মানুষ আজ সর্ম্পূন দ্বিধাহীন কন্ঠে উচ্চারণ করতে পারছে যে, সে এই জীবজগতেরই অন্তর্গত ছিলো পৃথিবীর সকল জড় ও জীবের সাথেই রয়েছে তার আত্মীয়তা। এদের মধ্যেই বিধৃত রয়েছে তার জীবন ও জীবিকার সকল উপকরণ। তাই তার মনুষ্যত্বের সংজ্ঞা কোনো অলৌকিক আদর্শের বাহন নয়; বরং তার শ্রমেরই সফল নিদর্শন।

তাই এই শ্রমের ব্যাপারটিকে একটু তলিয়ে দেখতে হবে। কারণ এর মাধ্যমেই আমরা যথার্থ মনুষ্যত্বের সন্ধান পাবো। শ্রম বলতে আমরা মানুষের সক্রিয়তাকে বুঝি। এক দিক থেকে সমগ্র জড় ও জীব জগতেও এই সক্রিয়তা বিদ্যমান। কিন্তু মানুষের মতো তা মননশীলতা সমৃদ্ধ নয়। বস্তুত এই মননশীলতা মানুষের শ্রেষ্ঠত্বেরও পরিচয় বহন করে। নতুবা মাকড়শা, পিপীলিকা, মৌমাছি, ইত্যাদির চাইতে সে শ্রেষ্টতর জীব হিসাবে পরিগনিত হতো না। কিন্ত তাই বলে শুধু মনন চিন্তন তাকে এই পর্যায়ে আনতে পারতো না। যদি না সে তদনুসারে পরিশ্রমী হতো। সুতরাং এই মনন সমৃদ্ধ শ্রমই মানুষকে মানুষ করে তুলেছে এবং এর মধ্যেই তার পরিচয় বিদ্যমান।

অথচ আমাদের সাধারণ ধারনা এ ব্যাপারে কিছুটা ভিন্ন ধরনের। আমরাও সাধারণ ভাবে মননশীল শ্রমকেই মানুষের আদর্শ বলে বিবেচনা করি। তবে সে শ্রম ধর্মীয় উপাসনা মাত্র। এজন্যই আমাদের কাছে আশ্রম বা আস্তানাবাসী মহাপুরুষরাই আদর্শ মানুষ। তাঁরা অবিরত মননশীল শ্রমের দ্বারা তাদের আত্মিক উন্নতি সাধন করছেন। আমরা সংসারের কীট হয়ে তাদের সেই পবিত্রতা অবলম্বন করতে পারছিনা বলে আমাদের আক্ষেপের আর অন্ত নেই।

কিন্তু আমরা উপরে যে শ্রমের কথা বলেছি, সে শ্রম উপাসনা নয়। অবশ্য উপাসনা এক ধরনের শ্রম হতে পারে; আর এই মাত্র বলা যায় যে, এ ধরনের শ্রম দিয়ে সভ্যতার ইতিহাস সৃষ্টি হয়নি। সুতরাং যিনি আশ্রম বা আস্তানায় বসে নিজের আত্মিক উন্নতি সাধন করছেন, তিনি কখনো আদর্শ মানুষ হতে পারেন না। যে পোশাক তৈরি করার পর শুধু বাক্সের মাঝেই অবস্থান করলো, তাকে পোশাক না বলাই ভালো। আর তার পবিত্রতা নিয়ে গর্ব করার কীই বা আছে। কারণ গায়ে না চড়ালে তাতে ধূলি বালি লাগবে কোনো? আবার এর উলটো দিকও আছে – যে মানুষ শুধু শঠতা ও প্রতারনা দিয়ে কার্যোদ্ধার করতে চায়, তাকেও তো আদর্শ হিসাবে ধরা যায়না। সে তো সেই পোশাক, যাতে ময়লা লেগে লেগে একদম বির্বন হয়ে গেছে, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। সুতরাং যে পোশাক বাক্সে বন্দী থাকে আর যে পোশাক ময়লায় কুৎসিত হয়ে দুর্গন্ধ ছড়ায়, এদের কোনোটিই আদর্শ পোশাক নয় বরং আদর্শ পোশাক বলবো সেই পোশাককে, যা গায়ে চড়ানো হয় এবং ময়লা লাগলে ধুয়ে পরিষ্কার করে আবার পরা হয়। এমনি ভাবে মানুষের মধ্যেও যিনি সংসারে জড়িত হয়ে এর উন্নতির জন্য দিবা রাত্রি পরিশ্রম করছেন, তাকেই আমরা আদর্শ মানুষ বলে ভাববো।

তবে সেই যে কথায় বলে, সব কাজই যেমন কাজ নয়, তেমনি সব পরিশ্রমই শ্রম নয়। আমরা আগেই বলেছি, মানুষের সভ্যতা সংস্কৃতির নির্মাতা শ্রম অবশ্যই মনন সমৃদ্ধ প্রগতি শীল। কারণ একান্ত আত্মকেন্দ্রিক শ্রমের দ্বারাও সংসারে উন্নতি সম্ভব। কিন্তু এর ফলে সভ্যতা সংস্কৃতির গতি ব্যহতও হতে পারে। এজন্যই যুগে যুগে মানুষ এই আত্মকেন্দ্রিকতার লালসাকে অতিক্রম করে এগিয়ে এসেছে। সে সেই শ্রমকেই প্রাধান্য দিয়েছে, যা শুধু ব্যক্তিকে নয়, তার সাথে পরিবার কে – সমাজকেও সমৃদ্ধ করেছে। যে মানুষ তার অস্তিত্বের জন্য কারো কাছে স্বীকার করতে চায় না, তাকে অন্যান্য পশুর সাথে অবলীলায় তুলনা করা যায়। সে মানুষ রূপে অবস্থান করলেও তার মনুষ্যত্ব বিকশীত হয়নি। যদি হতো তাহলে সে পিতা মাতা পরিবার, সমাজ এমন কি পৃথিবীর সকলের কাছে তার অস্তিত্বের জন্য কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে পরান্মুখ হতো না এবং তার কার্য ধারার মধ্য দিয়ে যতোদুর সম্ভব সেই ঋণ পরিশোধ করতে চেষ্টা করতো।

সুতরাং শ্রম বলতে শুধু গাধার মতো জীবনের বোঝা বওয়াকে বুঝায়না; বরং সেই জীবনের উৎপত্তি, তার বিকাশ ও পরিনতি সম্যক রূপে উপলব্ধি করে এক মহান উত্তরাধীকারের দায়িত্ব নিয়ে তার কর্তব্য পালন করাকে বুঝায়। কারণ আমার অস্তিত্বেও বহু পূর্বে মানুষের এই সমাজ গঠিত হয়েছে। যে পরিবেশে আমরা জন্ম নিয়েছি, যতো সামান্যই হোক, তাও গড়ে উঠতে কোটি কোটি মানুষের উদ্দেশ্য পূর্ণ মননশীল শ্রমের প্রয়োজন হয়েছে। কতো রক্ত কতো ঘামের পরিবর্তে মানুষ এমনি এক পরিবেশের সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছে, তা যদি আমাদের উপলব্ধিতে না থাকে, তাহলে কখনোই আমরা মনুষত্ব নামক এই উত্তরাধিকারের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে বহন করতে পারবো না। সুতরাং আমাদেরকে বুঝে শুনে পরিশ্রম করতে হবে। তবেই আমাদের পরিশ্রম সমাজ প্রগতির বাহক হয়ে আমাদের মনুষ্য জন্মকে ধন্য করবে।

কাজেই এমনি এক শ্রমের মাপকাঠি দিয়েই আমরা আদর্শ মানুষের অনুসন্ধান করতে পারি। যিনি যে পরিমানে এই যথার্থ শ্রমের শ্রমিক, তিনিই ততো খানি আদর্শ মনুষ্য পদবাচ্য। যারা সমাজ প্রগতির ধারাবাহী এই শ্রমকে এড়িয়ে উপাসনা বা প্রতারণার দ্বারা মনুষ্যত্বের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চান, তারা শুধু সমাজকে প্রতারিত করেন না, বরং নিজেরাও প্রতারিত হন। অপরের শ্রমের ফসল ভোগ করে তারা যে কোনো পদবীই গ্রহন করুন না কেনো, জীবন যাপনে তারা যতো ঐশ্বর্যের অধিকারীই হোন না কেনো, মানুষ হিসাবে তারা অবশ্যই নিকৃষ্ট। তাদের চাইতে সেই একজন শ্রমিক শ্রেষ্ঠতর – মনুষ্যত্বের অধিকারী, যে তার ক্ষমতা ও চেতনা অনুসারে জীবনের দায়িত্ব পালন করছে। হয়তো তার দেহে স্বাস্থ্যে চাকচিক্য নেই, হয়তো পরনে পোশাকের জৌলুস নেই, কিন্তু মানুষ হিসেবে সে শ্রেষ্ঠ।

একথা যদি আমরা মেনে নিতে পারি, তা হলে সেই দার্শনিক প্রবরের ন্যায় দিনের বেলায় বাতি জ্বালিয়ে আর মানুষ খোঁজার প্রয়োজন হয় না। একটু তলিয়ে দেখলেই দেখতে পাবো, এমন মানুষ আমাদের চার পাশে অজস্র বিচরণ করছে; এমনকি আমাদেরকেও সেই পর্যায়ে উন্নীত করে আমরা আমাদের মনুষ্য জন্মের সার্থকতা বিধান করতে পারবো। তখন আর মানবিক ত্রুটি বিচ্যুতির জন্য এমন নিষ্করুন লজ্জা পেতে হবে না এবং মানুষের কীর্তিমালা নিয়ে গর্ব অনুভব করতেও কুন্ঠা জাগবে না।

মানুষ, সেতো দোষে গুনেই মানুষ। সে ফেরেশতা বা শয়তান নয়, দেবতা বা অসুর নয়; সে এই বিরাট ও বিচিত্র জীব জগতেরই অংশ। মননশীল শ্রম দিয়েই সে সকলের মধ্যে শ্রেষ্টত্বের অধিকারী হয়েছে। কিন্ত সকল বাধা প্রতিবন্ধক সে এখনো অতিক্রম করতে সমর্থ হয়নি। তাই তার সাধনা এখনো অব্যাহত। একদিন সে স্বশিক্ষিত স্বশাসিত হয়ে মনুষ্যত্বের আদর্শ পূর্ণ করবে।

ধর্ম

ধর্ম নিয়ে বেশ বিপদে পড়েছি। অবশ্য বন্ধুদের কথামত চললে এ বিপদে পড়তাম না। হয় নির্বিবাদে ব্যাপারটাকে মেনে নিতে পাড়তাম, না হয় নির্বিবাদে ছেড়ে দিতে পাড়তাম; ও নিয়ে মাথা ঘামাতে হতো না। কিন্তু আমি এর কোনোটাই করতে পারছিনা। তাই আমার হয়েছে বিপদ।

অন্যের কথা জানিনে, আমি আমার ধর্মমত পেয়েছি উত্তারাধিকার সূত্রে। আমার পূর্বপুরুষ এই ধর্মে বিশ্বাস করতেন। আমি তাদের সন্তান হিসাবে যেমন তাঁদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির উত্তারাধিকার পেয়েছি, তেমনি এই ধর্মমতেরও উত্তারাধিকার আমার উপর বর্তেছে। পারিবারিক ঐতিহ্য হিসাবে আমি এই শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠেছি। এরপর উত্তারাধিকারে প্রাপ্ত অন্যান্য সম্পদের ন্যায় এটিকে বিচার বিশ্লেষণ করতে গিয়েই পরেছি বিপদে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, যা পেয়েছো, তা নির্বিবাদে মেনে নিলেই পারো, বিচার করে দেখার দরকার কি? সে কথাতো আমি আগেই বলেছি, তা যদি পারতাম, তা হলে আর এমনি বিপদে পড়তে হতো না। কারণ অন্যান্য উত্তারাধিকারের বেলায় বিচার বিবেচনা করতে গেলে কেউই এ প্রশ্র তুলেননা; বরং যতোদূর সম্ভব খুঁটিয়ে তার উপযোগিতা বিচার করতে বলেন। সুতরাং ধর্মের ব্যাপারে সেটি করতে গেলে তারা উল্টো সুরে কথা বলবেন কেন! ধরুন আমার পিতা আমার জন্য একটি ঘর রেখে গেছেন। শিশু কালে আমি তাতেই লালিত পালিত হয়েছি। বয়স কালে যখন আমার উপর এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ত পড়বে, তখন অবশ্যই সেই ঘরটিকে নিয়ে আমাকে ভাবতে হবে। সেটি আমার বসবাসের উপযোগী কিনা, তা বিচার করে তাতে প্রয়োজনীয় রদবদল করলে কেউই আমাকে গালমন্দ করবেন না। কারন একটি ঘর শুধু মাথা গোজার ঠাঁই মাত্র নয়, এর সাথে আমার সাস্থ্য সাচ্ছন্দ্য, আমার ব্যক্তিগত রুচির পরিচয়ও জড়িয়ে আছে। সব কিছু মিলিয়েই আমাকে আমার সার্মথানুসারে তাকে সাজিয়ে তুলতে হবে।

ধর্মও তো এমনি একটি ঘরের মতোই। হোক সে মানসিক ঘর, তবু এর মধ্যেই সুখে দুঃখে আমাকে আশ্রয় নিতে হয়। সুতরাং সেটির উপযোগিতাও তো বিচার করে দেখার ব্যাপার। সেক্ষেত্রে উল্টো সুরে যারা কথা বলেন, তারা কি ধর্মকে জীবনের আশ্রই বলে মনে করেন না? যদি ধর্মকে জীবনের আশ্রই বলে তারা মনে করেন, তবে জীবনের জন্য তার উপযোগিতা বিচার করে দেখাকে তারা মন্দ বলবেন কেনো? জীবনকে সুন্দর করাইতো ধর্মের লক্ষ্য। পারলৌকিক পুরষ্কার আর শান্তি তো এই লক্ষ্য সাধনেই নিয়োজিত। কাজেই আমার জীবনের সৌর্ন্দয বিধান করতে গিয়ে অবশ্যই ধর্মের মুল্যমান আমাকে খতিয়ে দেখতে হবে।

জানি মুরব্বীরা এক্ষেত্রে চোখ রাঙিয়ে বসবেন, ও তোমাকে খতিয়ে দেখতে হবে না, যা পেয়েছো তা মেনে নিলেই তোমার জীবন সুন্দর হয়ে উঠবে। কিন্তু মুশকিল হয়েছে এই যে, পৃথিবীতে যদি একটি মাত্র ধর্মমত থাকতো, তাহলে নির্বিবাদে মুরব্বীদের কথা মেনে নেয়া যেতো। যখন মানুষ গুহায় বাস করতো, তখন গুহার দৈর্ঘ্যে প্রস্থ নিয়ে সে বাছ বিচার করতে যায় নি; প্রকৃতির দান যা পেয়েছে, তাতেই মাথাগুঁজে আত্মরক্ষা করেছে। কিন্তু সে পর্যায় পেরিয়ে এসে আজকে মানুষ নির্মাণ কৌশলে সমৃদ্ধ বলেই বাছ বিচারের আর অন্ত নেই। বিচিত্র রুচি আর সাচ্ছন্দ্যবোধ তাকে কেবলই তাড়া করে ফিরছে। তেমনি ধর্মমতও আজ আর একটি নয়, অজস্র। সংখ্যায় তার হিসাব নিতে গেলে হাজার দুহাজার ছাড়িয়ে যাবে। আর সব ধর্মের মুরব্বীরাই একই সুরে সেই একটি কথাই বলেন, যা পেয়েছো, তাকেই আঁকড়ে ধরে থাকো। সাবধান, আর যা কিছু সবই ভুয়া, সবই ফাঁকি।

আমার বিপদ হয়েছে এখানেই; উত্তরাধিকার সূত্রে আমি যা পেয়েছি, তাকেই যদি একমাত্র সত্য বলে মনে করি, তাহলে আর সবাইকে মিথ্যা বলতে হয়। আর তা করতে গেলে পৃথিবীর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে কেবল নিজের মধ্যেই গুটিয়ে আসা ছাড়া গতান্তর থাকে না। কিন্তু মানুষের পক্ষে কি এ ভাবে গুটিয়ে থাকা সম্ভব? তাহলে মানুষ আর অন্য প্রানীর মধ্যে পার্থক্য থাকে কি করে? আর কি করেই বা মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব বলে আখ্যায়িত হয়? অন্য সকল প্রানীই তো কেবল নিজকে নিয়ে ব্যপৃত; অন্য করো দিকে ফিরে তাকাবার তার ফুরসত নেই। কিন্তু মানুষ সবার প্রতি দৃষ্টি দিয়েছে বলেই আজ পৃথিবীর সেরা।

সুতরাং মানুষের সৃষ্টি বিজ্ঞান যদি উদারতার বানী শুনায়, দর্শন যদি সকলের প্রতি দৃষ্টি দিতে বলে, তাহলে ধর্ম এমন সংকীর্নতার কথা বলবে কেনো? সত্য কি শুধু ধর্মের মধ্যেই আছে, দর্শনে বিজ্ঞানে কোনো সত্য নেই? পৃথিবিতে মানুষের যে ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে, যে ঐতিহ্য সম্ভার গড়ে উঠেছে, তা কি শুধু ধর্মেরই অবদান? আমার পূর্বপূরুষের নিকট থেকে আমি কি শুধু ধর্মের উত্তরাধিকারই লাভ করেছি; দর্শন বিজ্ঞানের কোনো উত্তরাধিকার কি তারা রেখে যাননি? তাছাড়া আমার পূর্বপূরুষ বলতে কি শুধু আমার বংশ পরম্পরায় প্রাপ্ত কিছু সংখ্যক লোকের কথাই ভাববো; এর বাইরে কি মানুষের সৃষ্টি এই ঐতিহ্য সম্ভারে আমার উত্তরাধিকার নেই?

আমি জানি, এর উত্তর দিতে গিয়ে মুরব্বীরা নাক কুঁচকে, মুখ বাঁকিয়ে চোখ মিটমিট করে বলবেন, ও বুঝেছি, ছেলেটা বয়ে গেছে। আর এ কথা শুধু তারা এ যুগে নয়, সব যুগেই বলে এসেছেন। তাই মুরব্বীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলতে হয়, আপনাদের সধর্ম নিষ্ঠার মুখে ফুল চন্দন পড়ুক। কিন্তু ও দিয়েতো আমার বয়ে যাওয়া আপনারা ফিরাতে পারেননি! আমি কি চাইনা আপনাদের মতো অখন্ড বিশ্বাসের শান্তি দিয়ে আমার মানষিক যন্ত্রনাকে দূরে ঠেলে দিতে, অবশ্যই চাই! কিন্তু পারছি কৈ? আপনাদের অখন্ড শান্তিকে মনে হয় এক নির্বিকল্প সমার্ধি, যা কবর শ্বশানের সাথেই যুক্ত, জীবনের সাথে নয়। কারন জীবনতো বিচিত্র ব্যাপক বিরাট! দেশে দেশে দিশে দিশে তার বিস্তার। তার সাথে যুক্ত হলে এমন নির্বিকল্প সমাধির কথা কল্পনাও করা যায়না। আমি জীবনকে চাই বলেই বিপদে পড়েছি, তানা হলে আপনাদের মতো নির্বিকল্প সমাধি লাভ করা এমন কোনো কঠিন কাজ ছিলোনা। কিন্তু একান্ত বাধ্য হয়েই আপনাদের পূণ্য পদাংক অনুসরন করা থেকে দূরে সরে আসতে হয়েছে। অবশ্য তাতেও বিপদের অন্ত হয়নি।

কারন আপনাদেরকে অনুসরন করতে না পারি, কিন্তু তাই বলে আপনাদেরকে সর্ম্পুন ছেড়ে দেওয়াতো সম্ভব নয়। অন্তত:আমি সেটা করতে পারছিনা। আপনারা আমার পূর্বপুরুষ, আপনারা আমার স্বজন বান্ধব; আপনাদের বিশ্বাস ও আচার আচরনকে এক ফ্ৎুকারে উড়িয়ে দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। পিতার মূর্খতার জন্য পিতাকে অস্বীকার করায় বিপদ আছে। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিয়ে এসে প্রাইমারি স্কুলের অস্তিত্ব অস্বীকার করা শুধু বিপদজনক নয়, চরম বোকামি। সুতরাং আপনাদের বিশ্বাস ও আচরণের মূল্যমান অস্বীকার আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারন আপনাদের এই বিশ্বাস আর আচরণ মানুষের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্দ্য অংশ। একে বাদ দিয়ে ইতিহাসের বিশ্লেষন সম্ভব হতে পারে না। অন্য দিকে এ ছাড়া আমার পক্ষের আপনাদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের অন্য কোনো পথ নেই।

সুতরাং একান্ত সবিনয়ে আপনাদের সম্মুখে সেই ঐতিহাসিক বিশ্লেষনের কথা তুলে ধরতে হয়। জানি, আপনারা চোখ বুঝে কানে তুলো দিয়ে চীৎকার করে বলবেন, ওসব কথা শুনতে নেই, শোনা ভয়ানক পাপ। তবু আমাকে বলতেই হবে। কারন বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত আধুনিক যন্ত্রপাতি ও কলাকৌশল যদি আপনাদের নিকট গ্রাহ্য হয়ে থাকে, তা হলে এই বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষনকে আপনারা এমনভাবে অগ্রাহ্য অন্যায্য বলবেন কেনো? গাছের ফল খেতে পারি কিন্তু গাছের নাম শুনলেই কানে আংগুল দিই – এ কেমন ব্যবহার। যদি ছাড়তে হয় সবই ছেড়ে দিন, তাতে কারো কিছু বলার থাকে না। বিজ্ঞানের ফসল খাবেন আর বিজ্ঞানের নাম শুনলেই আৎকে উঠবেন, এতে সুবুদ্ধির কোনো পরিচয় নেই। আমি সেটা পারছিনা বলেই আপনাদের অসুবিধা হবে জেনেও সেই বিশ্লেষনের কথা আমাকে বলতে হচ্ছে। দয়া করে আমাকে ক্ষমা ঘেন্না করবেন।

জীবন ও জগতের ইতিহাস আজ আর রহস্যময় কিছু নয়। সূর্য থেকে বেরিয়ে আসা এ পৃথিবীর বয়স প্রায় সাড়ে চারশ কোটি বৎসর। জ্বলন্ত অগ্নি পিন্ডরুপী এই পৃথিবী ঠান্ডা হতে বেশ সময় নিয়েছে। তারপর জলীয় বাষ্পের আর্বিভাব ঘটে সাগরের সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে প্রাণের আর্বিভাব ঘটেছে প্রায় দু’শো কোটি বৎসর আগে। বিশেষ প্রজাতি হিসেবে মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে কমপক্ষে দশ লক্ষ বৎসর পূর্বে।

তখন থেকে শুরু হয়েছে মানুষের অগ্রযাত্রা। গাছের ফলের উপর র্নিভরশীল মানুষ এক সময়ে এর অভাবে নেমে এসেছে সমতল ভূমিতে। জীবিকার তীব্র প্রয়োজনে মাংসাশী হতে গিয়ে তার দেহের পরিবর্তন ঘটেছে অনেকখানি। হাত দুটিকে পায়ের কাছ থেকে মুক্তি দিয়ে সে যেমন সোজা হয়ে দাড়াতে শিখেছে, তেমনি পশু শিকারের জন্য সে উদ্ভাবন করেছে হাতিয়ার। এ সময়ে সাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তাবোধও পূর্বাপেক্ষা অধিক মাত্রায় তার মধ্যে দেখা দিয়েছে। তাই সে হয়েছে গুহাবাসী।

জীবনের এ পর্যায়ে আমরা মানুষের মধ্যে মননশীলতার সুষ্পষ্ট আবির্ভাব লক্ষ্য করি। প্রকৃতির উপর তার ইচ্ছাশক্তির প্রভাব সম্পর্কে সে তখন অতি মাত্রায় সচেতন। এর ফলে সে এমন কিছু ধ্যান ধারনা ও আচার অনুষ্ঠান পোষন করতে আরম্ভ করে, যা তার দলবদ্ধ শক্তির বদান্যতা ও অস্ত্র উদ্ভাবনের পারদর্শিতাকে অতিক্রম করে এক অতীন্দ্রিয় চেতনার পরিচয় বহন করছে। এই চেতনাই তার প্রাথমিক ধর্মবোধ, যার পরিচয় সে রেখে গেছে গুহাচিত্রের মাঝে এবং যার রেশ এখনো দেখতে পাই যাদু টোনা ও বিচিত্র ব্রতানুষ্ঠানে। বৃষ্টির জন্য ব্যাং বিয়ে দেয়ার যে অনুষ্ঠান সর্বত্র দেখা যায়, এর সেই প্রাথমিক ধর্মবোধেরই পরিচয় বহন করছে। অনুকরণের মাধ্যমে নিজের ইচ্ছাশক্তিকে অন্যের উপর প্রভাবশীল করে তোলার প্রচেষ্টা ছাড়া এর মধ্যে অন্য কোনো অলৌকিকত্ব নেই।

কিন্তু মানুষের এই অতীন্দ্রিয় চেতনা নিজের ইচ্ছাশক্তিকে কেন্দ্র করে অধিককাল স্থায়ী হয়নি। জনসংখ্যার বৃদ্ধি ও জীবিকা অর্জনের ক্রমবর্ধমান জটিলতার ফলে তার এই ইচ্ছাশক্তিকে সে অন্যের মধ্যেও সম্প্রসারিত করতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে পাহাড় নদী, বৃক্ষলতা ও পশুপাখী সবকিছুই তার মতো ইচ্ছাময় হয়ে উঠেছে। কারন জীবিকার অভাবের বাস্তব হেতু আবিষ্কারের মতো মননশীলতা তখনো তার আয়ত্তের বাইরে। তাই জীবিকা অর্জনে তার ইচ্ছাশক্তির ব্যর্থতা অন্য কোনো ইচ্ছাশক্তির প্রভাবের ফল বলে সে ধারনা করেছে। এর সাথে এসে যুক্ত হয়েছে গোত্র জীবনের অভিজ্ঞতা। গোত্রপতির শাসন ও ত্রাসন তাদের মধ্যে এই বোধেরই সৃষ্টি করেছে যে, সৃষ্টির অন্যত্রও এমনি গোত্রপতিসূলভ শক্তিমানের অস্তিত্ব বিদ্যমান। তার অধিস্থনদেরকে আয়ত্ব করতে হলে শক্তিমান দলপতিকে সন্তুষ্ট করতে হবে। এর ফলেই উদ্ভাবিত হয়েছে বিচিত্র পূজা অর্চনার পদ্ধতি। এ গুলিতে প্রশংসাবাণী আর বস্তু সামগ্রীর উপঢৌকন ছাড়া আর কিছু নেই।

কিন্তু প্রাকৃতিক শক্তির বৈচিত্র্যের মধ্যে ইচ্ছা অনিচ্ছার উপস্থিতির এই ধারনা এবং তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য উদ্ভাবিত নানাবিধ প্রক্রিয়া দু’দশ বৎসরের ফল নয়; এর জন্য বহুকাল ধরে মানুষের মননশীলতাকে কাজে লাগাতে হয়েছে। একারনেই প্রকৃতি পূজার এই কাল পরিধি যেমন দীর্ঘ, তেমনি বিচিত্র পর্যায়ে বিভক্ত।

এর প্রাথমিক পর্যায়ে বৃহৎ ও আয়ত্তি বহির্ভুত বস্তু, বৃক্ষ, প্রাণি ও ঘটনামাত্রেই মানুষের মনে ভয় ও বিষ্ময়ের সৃষ্টি করেছে। তাই তাকে সন্তুষ্ঠ করতে নানাবিধ সামগ্রি নিয়ে এগিয়ে গেছে মানুষ। পশু ও শস্যের উৎসর্গিকরণ এরই দীর্ঘকালিন ফলশ্রুতি। বিভিন্ন জলাশয়ে বৃক্ষের মূলে বা স্তুপের নীচে দুধ কলা বা অন্য সামগ্রীর উপাচার প্রদান, যা আজো আমাদের এ দেশে ও অন্যত্র দেখতে পাওয়া যায়, তা সেই প্রাচীন ধর্মবোধেরই বিচিত্র অনুসৃতি ছাড়া অন্য কিছু নয়।

অবশ্য এই পর্যায় অতিক্রম করতে গিয়ে মানুষ জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে আরো জটিলতার সম্মুখীন হয়েছে। এর ফলে তার উদ্ভাবন কৌশল যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি মনন ও মেধার ক্ষেত্রেও নতুনত্বের অভিসারী হতে হয়েছে তাকে। এরই কল্যাণে তার ইচ্ছাময়তার পেছনে ক্রিয়াশীল এক অনির্বচনীয় সত্তার উপলব্ধি তাকে এক নতুন জগতের সন্ধান দিয়েছে। সে জগৎ এই বস্তু জগতেরই সমান্তরালে অবস্থিত। এরপর নিজের দেহের মধ্যে উপলব্ধ এই আত্বশক্তিকে সে অন্যান্য বস্তু ও প্রাণির মধ্যেও ক্রিয়াশীল বলে মনে করেছে। এও সেই পূর্বের ইচ্ছা অনিচ্ছার উপস্থিতিরই অনিবার্য ফলশ্রুতি। কারন যেখানে ইচ্ছা অনিচ্ছা আছে, সেখানে তার পরিচালিকা শক্তির অবস্থান কল্পনা অযৌক্তিক কিছু নয়। সুতরাং শুধু নিজ গোত্র প্রতিক বা টোটেমকে উপাস্য হিসাবে বরণ করে নেয়ার মধ্যে নয়, বরং তারো চাইতে বেশী করে বৃহত্তর ও মহত্তর প্রাকৃতিক শক্তিগুলিকে সন্তুষ্ঠ করার ধর্মবোধে সে উদ্ভুদ্ধ হয়েছে। অগ্নি, বায়ু, জল, চন্দ্র, সূর্য, তারকা ইত্যাদিও তার উপাস্য হিসাবে স্থান লাভ করেছে।

অন্যদিকে এই আত্মশক্তিতে সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক বস্তুর উপাসনারই ফলশ্রুতি হিসাবে এসেছে আত্মার অবিনশ্বরতা। কারন প্রাকৃতিক শক্তিগুলির নিজের অস্তিত্বের মতোই তাদের আত্মশক্তি অবিনশ্বর। সুতরাং মানুষ নিজেও সে গুণে গুণাণ্বিত হবার যোগ্য। অবশ্য বস্তুর মতো তার দেহ চিরস্থায়ী হতে না পারে। কিন্তু তার আত্মশক্তি তাদের মতোই চিরস্থায়ী। আর এরই ফলে পূর্বপুরুষের উপাসনা তথা প্রেতোপাসনার মাধ্যমে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও মঙ্গল কামনার দায়িত্ব পালন করেছে। অনুরূপ ধারণা ও আচারের বৈচিত্র্য কবর পূজা ও প্রতীক তথা মূর্তি পূজার মধ্যে বিদ্যমান। এরই সঙ্গে এসে মিশেছে পরকাল তথা স্বর্গ নরকের অনন্ত জীবনের ধারণা। জন্মান্তরবাদ ও আত্মার এই অবিনশ্বর গুণগ্রামের সাথে যুক্ত আর এতে এই পরকাল সম্পর্কীয় ধারণায় অবস্থানগত পার্থক্য থাকলেও গুণগত কোনো পার্থক্য নেই। তদুপরি এ ধারণাও প্রাকৃতিক নিয়মে বৃক্ষলতা ও পশুপাখির বংশানুক্রমের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশের অভিজ্ঞতার উপর প্রতিষ্ঠিত। অবশ্য পরবর্তী পর্যায়ে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব পরিকল্পনার ফলে তাতে কিছুটা ব্যতিক্রমের সৃষ্টি হয়েছে।

এভাবে মানুষের দীর্ঘকাল ধরে প্রাকৃতিক শক্তির পশ্চাতে ক্রিয়াশীল এক ইচ্ছাময় সত্তার কল্পনায় ও তার বিধানে বিচিত্র তত্ত্ব ও তথ্যের জন্ম দিয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সেই প্রাথমিক পর্যায়ের অতীন্দ্রিয় চেতনার প্রভাব থেকে তার মুক্তি লাভ সম্ভব হয়নি। অনেক সময তার নিজের মননশীলতা, উদ্ভাবন শক্তি ও সঙ্গবদ্ধ প্রচেষ্টার প্রতি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে কার্যকারণ বিশ্লেষণের এই শ্রমসাপেক্ষ বক্তব্যকে উপলব্ধি করা সহজ হয়ে উঠে নি। কারণ এ করতে গেলে প্রচলিত সহজ পথে তার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। তদুপরি স্বার্থান্বেষী ক্ষমতাবানরা সর্বদাই এ ব্যাপারে প্রবল বাধার সৃষ্টি করেছে। তবু তাদের এ প্রকার বাধা সত্ত্বেও উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে এই বিচিত্র ধর্মবোধেও পরিবর্তন দেখা দিয়েছে।

মানুষের জীবনে কৃষি ব্যবস্থার সমৃদ্ধি. স্থায়ী বসবাসের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া এবং একক কেন্দ্রীয় শাসনের অনিবার্য ফলশ্রুতি ধর্মীয় বোধেও একেশ্বরের ধারণাকে অত্যাবশ্যকীয় করে তুলেছে। এ ধারণায় বৈচিত্র্য মতোই থাকুক, কেন্দ্রীয় শাসকরাই নিজ স্বার্থে একে লালন, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করেছে। এরপর শিল্প বিপ্লবোত্তর যুগেও ভাববাদের প্রসারের মধ্যেও সেই ধর্মবোধের অতিসুক্ষ লীলাবিলাস আমরা লক্ষ্য করে থাকি। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ যতোই প্রচলিত ধ্যান-ধারণাকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে, ততোই তা সুক্ষতর অতীবন্দ্রিয় মার্গে উত্থিত হচ্ছে।

অতিসংক্ষেপে মানুষের ধর্মবোধের এই ইতিহাস একটি সরলসূত্রে গ্রথিত। নিজের উদ্দেশ্যমূলক শ্রম শক্তিনিয়োগের পশ্চাতে ক্রিয়াশীল ইচ্ছা-অনিচ্ছার মধ্যে যথার্থ জ্ঞানের অভাবে যে অতীন্দ্রিয় স্বত্বার উপস্থিতি মানুষ এক সময়ে উপলব্ধি করে ছিলো, সেখানেই উপ্ত হয়েছিল ধর্মবোধের বীজ। উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে সেই বীজই এখন শাখা-প্রশাখায় বিস্তারিত বিরাট মহীরুহ।

একারণেই কোনো একটি বিশেষ ধর্মমতকে সত্য বলা বা শাশ্বত বলা এবং অন্যগুলিকে মিথ্যা বলা কিছুতেই সম্ভব নয়। আমার পক্ষে সেটি সম্ভব হয় নি বলেই আপনাদের সকলের প্রতিই আমি শ্রদ্ধাশীল। যদিও আমার উপরোক্ত বিশ্লেষণের ধারা পরিক্রমায় আপনারা বিশেষ কালে বিশেষ রূপে আর্বিভূত হয়েছেন মাত্র এবং এর ফলে মানুষের সভ্যতা সংস্কৃতির ইতিহাসে বিচিত্র ঘটনা ও দূর্ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে ঠিকই; কিন্তু সভ্যতা সংস্কৃতির বিনির্মাণে এর প্রভাব কখনো তেমন সুফল প্রসব করেনি। কারণ এক সময়ে জীবনের জন্য ধর্মের আর্বিভাব ঘটলেও কালক্রমে তা জীবনবিমুখী চেতনায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে এবং যে সমাজের বুকে সে লালিত পালিত হয়েছে, সেই সমাজকে পাশ কাটিয়ে আজ সে আত্মকেন্দ্রিক মোক্ষ সাধনায় নিয়োজিত। তবু আপনাদের সবার প্রতিই আমি শ্রদ্ধাশীল। কারণ যে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের দ্বারস্থ হয়ে আপনাদের প্রতি এই শ্রদ্ধার ভাব পোষণ করছি, তা ইতিপূর্বে অনিবার্য কারণেই সম্ভব ছিলোনা। আপনারা যে পরিবেশে যে ভাবে এই ধর্মবোধকে পোষণ করেছেন, তা নানা কারণে আপনাদের জন্য স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে হয়। এমন কি একই পর্যায়ের বোধ ও মেধার অর্ন্তগত হয়েও পরস্পরের প্রতি আপনাদের এই উধ্যত মুষ্টি ভাবও সঙ্গত কারণেই দেখা দিয়েছিলো। কিন্তু আজ বিজ্ঞানের প্রখর আলোতে এসেও যদি আপনারা চোখ মুছে পরস্পরকে মিথ্যাবাদী প্রতারক বলে গালাগালি করতে থাকেন, তাহলে এক সময়ে আপনারা সবাই একই অবস্থায় পরিগণিত হবেন। তখন আপনাদের দ্বারা পরস্পরের প্রতি প্রদত্ত মিথ্যা ও প্রতারণার বিশ্লেষণ সামগ্রিক ভাবে আপনাদের জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াবে।

এই অশুভ পরিণতি থেকে মুক্তি লাভের একমাত্র পথ সেই ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ কে মেনে নেয়া, যার মধ্যে পর্যায়ক্রমিক মর্যাদায় আপনারা সকলেই অবস্থান করতে পারেন এবং পরস্পরকে শ্রদ্ধা করার ঐতিহাসিক শ্রদ্ধা লাভ করতে পারেন। কিন্তু এ না করে উল্টো পথে চললে বিজ্ঞানের মারকে কিছুতেই ঠেকতে পারবেন না। যা অনিবার্য, তাকে নিবারণ করে কার সাধ্য। সে অনবরত আপনাদের নিষ্ঠার মূলে জ্ঞানের কুঠার দিয়ে আঘাত হানছে। একদিন আপনাদের ধর্মের এই বোধি বৃক্ষ সমূলে উৎপাঠিত হবে। এর থেকে নিষ্কৃতি পাবার পথ নেই।

জানি এরপরও বিপদের শেষ হবে না। কারণ মানুষতো সবকিছূ জানে না। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আদি অন্ত নিয়ে তার জিজ্ঞাসার এখনো অন্ত হয়নি। এই জিজ্ঞাসার পথধরেই তাকে এগিয়ে যেতে হবে। কোনো বাক্যে এই অন্তহীন সমস্যার সমাধান করে দেখা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং বিপদ তার চিরসঙ্গী। আমিও মানুষ, তাই আমার বিপদেরও শেষ নেই। মানুষকে মানুষ ভাবই বলেই এই বিপদ, তার সৃষ্ট ঐতিহ্য সভ্যতাকে নিজের মনে করি বলেই এই বিপদ এবং সকলের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করে প্রত্যেককে তার ন্যায্য প্রাপ্য দিতে চাই বলেই এই বিপদ।

আপনি কি আমার এই বিপদের কথা বুঝতে পারছেন?