১০ই জানুয়ারী, ১৯৭২।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত বাংলাদেশে ফিরে আসছেন তিনি। বিমান বন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য। বাঙালীর আবেগ আপ্লুত চেতনার উপর দিয়ে রেসকোর্সের বিরাট চত্বরে তিনি এসে প্রবেশ করলেন। এই্ সেই রেসকোর্স, যেখানে দাঁড়িয়ে একাত্তুরের ৭ই মার্চ তিনি উচ্চারণ করেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। রক্তাক্ত সংগ্রামের মাধ্যমে সেই স্বাধীনতা আজ অর্জিত হয়েছে। যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলো, তাদের চিহ্ন মাত্রও কোথাও নেই। ৭ই মার্চের সেই আবেগ এক অবারণ সাফল্যের মাধ্যমে আজ এই ১০ই জানুয়ারীর আবেগের জন্ম দিয়েছে। সেদিন যা ছিলো আশংকা কাতর, আজ তাই বিজয়ের আনন্দে সোচ্চার। তারই স্পর্শে বুঝি শেখ মুজিবের আবেগ মথিত কন্ঠে উচ্চারিত হলো, “কবি গুরু, তুমি দেখে যাও, তোমার বাঙালীরা আজ মানুষ হয়ে উঠেছে”।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর একটি কবিতায় বলেছিলেন, “চার কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালী করে মানুষ করনি।” শেখ মুজিব কবিগুরুর সেই খেদোক্তির উত্তর দিচ্ছেন, সান্ত্বনা দিচ্ছেন। বারবার উচ্চারণ করছেন তিনি। আনন্দ অশ্রুতে ভেজা তাঁর সেই আবেগ মথিত কন্ঠস্বর। যারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তারা যেমন এই কথাগুলি শুনেছেন; তেমনি যারা দূরদূরান্তে থেকে ধারাবিবরনী শুনছিলেন, তারাও শুনেছেন। আমি তো এখনো শুনতে পাই শেখ মুজিবের সেই আবেগ জড়ানো কন্ঠের উচ্চারণ। “কবিগুরু, তুমি দেখে যাও, তোমার বাঙালীরা আজ মানুষ হয়ে উঠেছে।”
জানিনা, কবিগুরু কেন তাঁর কবিতায় এই খেদোক্তি করেছিলেন। কেন তাঁর দৃষ্টিতে বাঙালীরা তখনো মানুষ হয়ে উঠতে পারেনি। আর শেখ মুজিবই বা কী দেখে, কী বুঝে এমন গর্বিত উচ্চারণ করলেন, তাও তো সর্বাংশে আমাদের বোধগম্য নয়। কারণ তাঁর কথা যদি সত্য বলে মেনে নেই, তা হলে বলতে হবে, বাঙালীরা মানুষ হয়ে গেছে। তা হলে স্বাধীনতার অপর নামই বুঝি মনুষত্য? মানুষ স্বাধীন হলেই তার মানুষ নামের সার্থকতা লাভ ঘটে? তাই যদি হয়, তা হলেও তো প্রশ্নের অবসান ঘটবে না। আপনারা প্রশ্ন তুলবেন, বাঙালীরা কি যথার্থই স্বাধীনতা লাভ করেছে? এ প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে যাবোনা! কারণ এর উত্তর আপনারা ভালোই জানেন। আমি শুধু আপনাদের কাছে সবিনয়ে এই একটি কথাই বলবো, আবহমান কাল ধরে বাঙালীর মাঝে মানুষ হবার যে স্বপ্ন বিরাজ করছে, সেই স্বপ্নের নামই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব!
আমি জানি, আপনারা আমার এই উচ্চারণকেও আবেগের ফসল বলে মনে করছেন। আপনারা ভাবছেন, এই উচ্চারণের মধ্যেও তো প্রতারণা আছে, যুক্তিহীন সরল আবেগের উচ্ছ্বাস আছে, প্রশ্নের অবকাশ আছে। আপনাদের এই ভাবনায় আমিও তো শরীক না হয়ে পারি না। কারণ তা হলে তো বলতে হয়, শেখ মুজিব নিহত হয়েছেন, তাই বাঙালীর মানুষ হবার স্বপ্নেরও সেই সঙ্গে ইতি হয়েছে। কিন্তু আপনারা এ কথা কিছুতেই মেনে নেবেন না। এ জন্যেই আমার এ উচ্চারণের ব্যাখ্যা, যে ভাবেই হোক, আপনাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। অবশ্যই আমি এও জানিযে, আপনারা সেই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হবেন না। কারণ আমার এই উচ্চারণের মধ্যে যে প্রতীকধর্মীতার আবহ আছে, তা থেকে আপনারা অনেক দূরে অবস্থান করছেন। আরো সহজ করে বললে বলতে হবে, আপনারা আর যাই কিছু হোন মানুষ হতে চান না। তাই মানুষ হবার স্বপ্ন লালন করার কোন প্রশ্নই উঠে না।
যদি সে ধরণের কোনো প্রশ্ন আপনাদের মনে থাকতো, তা হলে শেখ মুজিব এমন নিষ্ঠুরভাবে সপরিবারে নিহত হতেন না। কিন্তু আমি কি আপনাদেরকে এ প্রশ্ন করতে পারি, কী দোষ করেছিলেন শেখ মুজিব? দয়া করে মনকে চোখ ঠারবেন না। খুব সহজভাবে বিবেকের কাছে এ প্রশ্নটি তুলে ধরুণ। তুলে ধরুণ তাদের কাছে, যারা শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু বানিয়ে ছিলেন। তুলে ধরুণ সেই সব সাধারণ মানুষের কাছে, যারা বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা মেনে নিয়ে সত্তুরের নির্বাচনে তাঁকে শতকরা ছিয়ানব্বইটি ভোট দিয়েছিলো। আমি জানি এ প্রশ্নের উত্তর খুব সুবিধেজনক হবে না; এমন কোনো কারণই আপনারা বের করতে পারবেন না, যদ্দরুন এমন একজন জননেতা অমানুষিক নির্মমতার সাথে সপরিবারে নিহত হতে পারেন।
কিন্তু আমার এই জানা আর সিদ্ধান্ত প্রকাশ করায় আমার কোনো আনন্দ নেই। না, আমি কখনোই একথা স্বীকার করে নিতে চাই না যে, বাঙালীরা এমনি অমানুষ, অবিবেচক যে, অহেতুক তারা তাদের নেতৃবৃন্দকে হত্যা করে থাকে। কাজেই অবশ্যই দোষ ছিলো, আর আজ যদি সেই দোষ বিবেচনা করার পথ উন্মুক্ত করা হয়, যদি তার নিহত হবার এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটির বিচার করা হয়; তা হলে সে দোষ সর্বসমক্ষে অবশ্যই বেরিয়ে আসবে। আপনারা অবাক বিস্ময়ে দেখতে পাবেন, যে দোষের জন্য তিনি নিহত হয়েছেন, সেটি অন্য কিছু নয়, তাঁর সরল বিশ্বাস। তিনি অকপটে এই জাতিকে, এই বাঙালীদেরকে বিশ্বাস করেছিলেন। আমরা তাঁর সেই সরল অকপট বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে পারিনি। কিন্তু কেন তিনি এমন বিশ্বাস করেছিলেন। এর কারণ তাঁর পাবার কিছু ছিলো না, বরং ছিলো এই জাতিকে এই দেশকে অনেক কিছু দেবার। এই জাতির কাছ থেকে তাঁর যা পাবার, তা তিনি বঙ্গবন্ধু হয়ে সত্তুর ও তিয়াত্তুরের নির্বাচনে পেয়ে গিয়েছিলেন। এখন ছিলো তাঁর দেবার পালা। ভৌগলিক স্বাধীনতাকে তিনি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিয়ে পরিপূর্ণ করে তুলতে পারতেন। আর এর মধ্যে দিয়েই বাঙালী যথার্থ মানুষ হয়ে উঠতে পারতো। এমন একটি স্বপ্ন তাঁর মনে ছিলো বলেই তিনি বাঙালীকে বিশ্বাস করেছিলেন।
তাই তিনি ভেবেছিলেন, তাঁর এই স্বপ্নই বাঙালীর আবহমান কালের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে তাঁরা কখনো বুলেট দিয়ে ঝাঁঝরা করে দিতে পারেনা। কিন্তু আমরা তাই করেছি; আমরা ব্যালট দিয়ে যে স্বপ্ন তৈরী করেছিলাম, বুলেট দিয়ে তাকেই হত্যা করেছি। বাঙালীর স্বাধীকার আন্দোলনের মধ্যে যে শেখ মুজিবের জন্ম, তাঁকে লালন করেছে উনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তুরের নির্বাচন, একাত্তুরের মুক্তি সংগ্রাম এবং তিয়াত্তুরের নির্বাচন। তাঁর নেতৃত্বকে নতুন মাত্রাই বিন্যস্ত করার অধিকার বাঙালীরাই তাঁকে দিয়েছিলো। সুতরাং এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, বাঙালীরাই তাদের প্রয়োজনে শেখ মুজিবকে সৃষ্টি করেছিলো, তাঁর নেতৃত্বকে অবিসংবাদিত করে তুলেছিলো; আবার তাদের প্রয়োজনেই তাকে হত্যা করেছে। কিন্তু কী সেই প্রয়োজন? গণতন্ত্রকে মুক্তি দেয়া, উৎপাদন ব্যবস্থাকে রাহুমুক্ত করা কিংবা পাকিস্তানকে পুনরুদ্ধার করা? যাই হোক না কেন শেখ মুজিবকে হত্যা ছাড়া কোনোটাই সম্ভব ছিলো না।
হতে পারে। তাই যদি হয়, তা হলে আসুন না কিছুক্ষণের জন্য শেখ মুজিবকে আজ আসামীর কাঠগড়ায় এনে দাঁড় করাই। যাকে ভালোবাসা প্রয়োজন, তাকে বিচার করার প্রয়োজন সবচাইতে বেশী। যাকে বঙ্গবন্ধু বলছি তাকে বাঙালীর বন্ধু বানাতে গেলে কিছুটা খতিয়ে দেখতে হবে বৈকি! শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ তিনি বাকশাল করে গণতন্ত্র হত্যা করেছিলেন। সুতরাং তাঁকে হত্যা করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে। আপনারা কি এই অভিযোগ সত্য বলে গ্রহণ করবেন? তাহলে কি বহুদল ছাড়া গণতন্ত্র চর্চা সম্ভব হয়না? গণতন্ত্রের সংজ্ঞা তো শুনেছি, জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে জনগণের জন্য শাসন প্রতিষ্ঠা করা। সেটি করতে কি বহুদল একান্তই অপরিহার্য? বাস্তবেতো দেখি সংখ্যাগরিষ্ঠ একদলই সে কাজটি করে থাকে। এমনকি সংখ্যালঘিষ্ঠ বহুদলকেও একত্র হয়ে সেই একক দলের ভূমিকা পালন করতে হয়। মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা বহুদলের ভিত্তিতে যেমন আছে, তেমনি একদলের ভিত্তিতে তা করা যায়। কারণ এখানে স্বাধীনতা আর নীতি নির্ধারণের প্রশ্নটি দলের জন্য নয়, দেশের জন্যই বিবেচিত হয়ে থাকে। আর দেশের প্রয়োজন কখনো বিভিন্ন হতে পারেনা। তা যদি এক ও অভিন্ন হয়, তা হলে সেই উদ্দেশ্য সাধন করতে গিয়ে ঐক্যের বদলে অনৈক্যের সাধন করতে হবে কেন?
আসলে মুখে আমরা যাই বলিনা কেন, বহুদলীয় গণতন্ত্র উদ্ধারের নামে আমরা শেখ মুজিবকে হত্যা করে আমাদের শ্রেণী স্বার্থই উদ্ধার করেছি। এর প্রকৃষ্ট প্রমান আমরা মুজিব হত্যার বিচারকে নিষিদ্ধ করেছি, কিন্তু যে কালাকানুন দিয়ে মুজিব বহুদলীয় গণতন্ত্র হত্যা করেছিলেন, তাকে নিষিদ্ধ করিনি। কারণ সেটি আমাদের শ্রেণী স্বার্থ উদ্ধারের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। বস্তুতঃ শেখ মুজিব যে নীতিমালা দিয়ে শোষকশ্রেণীর অমিতাচারকে ঠেকাতে চেয়েছিলেন, তাঁর হত্যা কান্ডের মধ্য দিয়ে সেটিই উল্টে গেছে; আজ সেই নীতিমালাই শোষিতশ্রেণীকে ঠেকানোর কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। শেখ মুজিবের দোষ, তিনি ছিলেন শোষিতের পক্ষে। কিন্তু তিনি যদি শোষকের পক্ষে এমনি এক দল গঠন করতেন, তা হলে বহুদলের জন্য তাঁর নিহত হবার পরিস্থিতিই দেখা দিতোনা; তিনিই সর্বেসর্বা হয়ে থাকতেন।
সুতরাং শেখ মুজিব গণতন্ত্র হত্যা করেছিলেন, এ অভিযোগ নিতান্তই অন্তঃসারশূণ্য বাজে অভিযোগ মাত্র। বরং শেখ মুজিব যা করেছিলেন, তার মধ্যে একটি গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অনুসরণ ছিলো। বুকে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে তিনি তা করেননি। যারা বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখল করেছেন, গণতন্ত্রের আসল হত্যাকারীতো তারা। তারা যে কারণে গণতন্ত্রকে এভাবে বারেবারে হত্যা করেছেন, সেটি হলো রাষ্ট্রীয় খাতকে ধ্বংস করে ব্যক্তিমালিকানার খাতকে সম্প্রসারিত করা, আসলে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে এটিই ছিলো মূল অভিযোগ। পশ্চিম পাকিস্তানী একচেটিয়া ব্যক্তিমালিকানার বিরুদ্ধে ছয় দফার আন্দোলন ব্যক্তিমালিকানা ধ্বংসের আন্দোলন ছিলো না। বরং সেই মালিকানাকে বাঙালীদের কাছে হস্তান্তরের দাবীই ছিলো প্রবল। স্বাধীনতার পর সেই মালিকানা লাভের পথে যখন কোনো বাধাই ছিলো না, তখনি সকলের বাড়া ভাতে ছাই দিয়ে শেখ মুজিব সেখানে রাষ্ট্রীয় খাত এনে দাঁড় করালেন এবং সেই খাতকে পাকাপোক্ত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করলেন। এর ফলে শেখ মুজিবকে হত্যা ছাড়া সেই মালিকানা ফিরে পাবার আর কোন পথ রইলো না।
আপনাদের মধ্যে যারা আমার এই বক্তব্যকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে করতে চান, তারা অবলীলাক্রমে তা করকে পারেন, আমি তাদের কে বাধা দেবো না। কারণ তারা শেখ মুজিবের, তাঁর দল বলের, এমনি তাঁর নীতিমালার এমন কিছু দোষ ত্রুটি খুঁজে বের করতে পারবেন, যা অস্বীকার করা সম্ভব নয়। আমি নিজেও তা অকপটে স্বীকার করি। সেই সঙ্গে আমি একথাও স্বীকার করি যে, শেখ মুজিব যত বড় জননেতাই হোন না কেন, তিনি দোষে গুণে একজন মানুষই ছিলেন। তাঁর আশে পাশে তাঁর সহায়ক শক্তি হিসাবে যারা বিরাজ করতো, তারাও মানুষই ছিলো। তাদের কথাবার্তা, আচার আচরণ, গৃহীত নীতিমালা এবং তার বাস্তবায়ন কোনো কিছুই একান্ত নিখুঁত ছিলো না। এমনকি শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের বাকশাল গঠন পর্যন্ত একটি হঠকারী উদ্যোগে পর্যবসিত হতে পারত এবং শেখ মুজিব গণধিকৃত হয়ে আমাদের প্রত্যাশার মঞ্চ থেকে বিদায় নিতে পারতেন। এ সব কিছুই সম্ভব ছিলো; কিন্তু তাঁর হত্যাকান্ড এই সকল সম্ভাবনার পথ রুদ্ধ করে তাঁকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। তিনি ব্যর্থতার পঙ্কিল পথ থেকে সফলতার সম্ভবনাময় পথে পা রেখেছেন। একান্ত অবিশ্বাসীর মনেও প্রশ্ন জেগে উঠেছে, শেখ মুজিব কি তা হলে সঠিক পথেই অগ্রসর হচ্ছিলেন? তা না হলে তাঁকে হত্যা করা হলো কেন?
বলুন, কী উত্তর দেবেন আপনার এই প্রশ্নের? মনের কোণে সংশয়ের আবছা আঁধার যদি কিছু থাকে, তাকে ক্ষণিকের জন্য উদারতার আলো জ্বেলে দূর করুন। তারপর কোনো দল নয়, গোষ্ঠি নয়; একান্ত ভাবে দেশ ও দেশের জনগণের প্রয়োজনের নিরিখে বিচার করে দেখুন তো, শেখ মুজিব যা করতে চেয়েছিলেন, তার উদ্দেশ্য কী হতে পারে। সেই উদ্দেশ্যকে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে রেখে দেখুন, তা হলেই বুঝতে পারবেন শেখ মুজিবের হত্যাকান্ড কোন্ সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের ফসল! সেই চক্রান্তই কি এদেশে তাঁর রক্তে ভেজা সিঁড়ি দিয়ে ক্রমশঃ উপরে উঠে আসেনি? এরফলে যারা স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় শত্রু শিবিরে অবস্থান করছিলো, তারাই আজ বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু হয়ে উঠেছে।
বুঝতে পারছি, আপনি বিরক্ত হয়ে উঠেছেন। মনে মনে বলছেন, তা না হয় হলো, কিন্তু এসব তত্ত্ব কথা আলোচনা করে লাভ কী! গত পনের বছরে এসব তত্ত্ব আর তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণতো কম শুনিনি। দেশ গোল্লায় যাচ্ছে, দেশের জনগণ দূর্নীতির বন্যায় ভাসছে আর আমাদের বুদ্ধিজীবিরা আছেন তত্ত্ব কথার কচকচানি নিয়ে। যত্ত সব! হ্যাঁ ভাই, যত্ত সব হাঁদারামের দেশই এই বাংলাদেশ। এই দেশের ভাগ্য কখন কী ভাবে কী কারণে বদলায়, এই দেশের অধিকাংশ লোকই তার খবর রাখেনা। এর কারণ এরা পুরোপুরি মানুষ নয়। মানুষ হয়ে উঠার কোনো সুযোগই এদের নেই। সেই কবে মোঘল আমলে এরা প্রার্থণা জানিয়েছিলো, “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে!” এরপর ব্রিটিশ আমল গেছে, পাকিস্তানী আমল গেছে এবং এখন এই স্বদেশী আমল চলছে, কিন্তু তাদের সেই প্রার্থণা পূরণ হয়নি। আজো তারা দেবদেবীর কাছে ধর্ণা দেয়, শবেবরাতের রাতে আল্লার দরবারে ফরিয়াদ জানায় কিন্তু কোথাও কোনো সুরাহা হয় না। দুধভাত তো দূরের কথা দুবেলা ডাল ভাতও তাদের জুটেনা। কারণ এরা শুধু দরিদ্র নয়, এরা নিরক্ষর; শুধু নিরক্ষর নয় এরা বাস্তুহারা। এরা এই দেশের পশুপাখির মতোই নিতান্ত অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে লিপ্ত। বংশ পরম্পরায় সে সংগ্রামের শেষ নেই।
এদেরই একটি অংশ কায়ক্লেশে কোথাও সুযোগ সুবিধা লাভ করে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তের স্তরে উঠে এসেছে। এরা অনেকে লেখাপড়া করে শিক্ষিতও হয়েছে। কিন্তু বিত্তহীনের সেই স্বভাব ত্যাগ করতে পারেনি। বিত্তবান হয়েও এরা তাই বিত্তের জন্য লালায়িত। এদের মধ্যে চিত্তের প্রসার ঘটেনি। এদের চোখের সামনেই দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে, এরা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে। মনে হয়, এরা বিদেশ থেকে চুক্তিবদ্ধ হয়ে এসেছে। এদের জন্য নির্ধারিত বেতন আর পদোন্নতি যদি এরা পায়, তাহলে এদেশের এই শিক্ষিত সন্তানদের বলার কিছু নেই। দেশ গোল্লায় যাক, দেশের জনগণ দূর্নীতির বন্যায় ভাসুক, তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। আরো মজার ব্যাপার, তারা চায় দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটুক, কিন্তু সেটি বুকের রক্ত দিয়ে দেহের ঘাম দিয়ে ঘটাবে অন্যরা, তারা শুধু ফল ভোগ করবে।
না, আর বেশি কিছূ বলবো না। এখন শুধু প্রশ্ন করবো, আপনি নিজে কোথায় অবস্থান করছেন? এই যে দেশ গোল্লায় যাচ্ছে, তাকি আপনার চোখের সামনে দিয়ে যাচ্ছে না? এই যে দেশের জনগণ দূর্নীতির বন্যায় ভাসছে, তাকি আপনার চেতনার সামনে ভাসছেনা। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে একটি কথাও কি আপনি বলেছেন? এর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গিয়ে কোনো প্রকার ত্যাগ কি আপনি স্বীকার করেছেন? আপনি প্রতিক্রিয়াশীল, রাজাকার আর মৌলবাদীদেরকে বৃথাই দোষারোপ করেন। তারা সবাই তাদের স্বার্থের জন্য লড়ছে। একমাত্র আপনিই নিষ্ক্রিয় ভাববিলাসিতার দেশ প্রেমে আবদ্ধ হয়ে আছেন। সেখানে এদেশের শতকরা আশি জনের জন্য দুঃখবোধ আছে। তাদের আহার্য, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যাতায়াতের জন্য আহাজারি আছে! কিন্তু তার যথাযোগ্য বহিঃপ্রকাশ কই?
না, ভাই, আমি কারো সমালোচনা করতে চাই না। যারা জনগণের জন্য কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন করে নিজেদের স্বার্থের থলি বোঝাই করছেন, তাদেরকে কিছু বলতে আমি নারাজ। আমি বরং আত্ম সমালোচনার পক্ষপাতি। যদি করতে চান, তা হলে আসুন আমরা আত্ম সমালোচনা করি। আমাদের চারপাশে দুর্দৈব আমাদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলছে, তার সৃষ্টিতে আমাদের কি কোনো অবদান আছে? আমরা কি তাতে অংশগ্রহণ করছি, কিংবা তাকে প্রতিরোধ করার কোন চেষ্টা করছি? যারা দেশের জন্য, সৈরাচারের অবসানের জন্য নুর হোসেনদের মতো সেচ্ছায় বুকের রক্ত বিলিয়ে দেয়, আমরা তাদের আত্মদানের জন্য খুবই গর্ব অনুভব করি। কিন্তু আমরা কি তাদের এই মহান চেতনাকে আমাদের স্বার্থপর চিত্তের দেয়ালে রক্তের আঁখরে লিখে নিতে পেরেছি?
না, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কথা আমি বলতে চাই না। হঠাৎ ঘুম ভেঙে সিঁড়ির দোরগোড়ায় দাড়ানো তাঁর দেহটা বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে নেমে আসছে, সেই দৃশ্য আমি আপনাদের সম্মুখে তুলে ধরতে চাই না। আমি শুধু দশ বছরের নিষ্পাপ শিশু রাসেলের কথা বলতে চাই। এ কোন ধরনের নিষ্ঠুরতা! যারা এই শিশুটিকে হত্যা করেছে, তারা কি এই দেশেরই মানুষ? আমার বিশ্বাস হতে চায় না। কারণ বিশ্বাস করতে গেলে এদেশের, আমার এই প্রিয় জন্মভুমির সীমানা ছেড়ে দৌড়ে পালাতে হবে, যাকে মা বলে ডেকেছি, তাকে মনে হবে রাক্ষুসী। না, আমি আমার জননী জন্মভুমিকে সেভাবে দেখতে চাইনা। শুধু বলবো, হে স্বদেশ, তোমার এই নিষ্ঠুরতাকে ঘৃণা করার যথার্থ ভাষা আমার জানা নেই। কী অপরিসীম এর নির্মম আঘাত। শুধু বলবো, হে বাঙালী, এ রক্ত আর বেদনার কোনো বিনিময় নেই। এই রক্ত এই দেশের শোষিত নির্যাতিত জনগণের উত্তরাধিকার। সাবধান, কেউ এই রক্তের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করতে যেয়ো না, তা হলে স্ববংশে ধ্বংস হয়ে যাবে।
আমিতো জানি, আপনারা আমার এই সাবধান বাণী উচ্চারণেও আবেগের আতিশয্য দেখবেন। তা দেখুন; কিন্তু আমি বলবো, মহৎ কোনো কিছুই আবেগ ছাড়া সৃষ্টি হয়না। সেই আবেগ নিয়েই ৭ই মার্চ শেখ মুজিব উচ্চারণ করেছিলেন, “আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাইনা, আমি এদেশের মানুষের মুক্তি চাই।” এরপর তিনি এদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন, এমনকি প্রধানমন্ত্রীও হয়েছেন; কিন্তু এদেশের সাধারণ শোষিত মানুষের মুক্তি আসেনি। মুক্তি খুব সহজে আসেও না। এর প্রধানমন্ত্রীত্ব অর্জন শুধু নয়, যথার্থ পদ্ধতি প্রক্রিয়ার অনুসরন করতে হয়। শেখ মুজিব তাঁর সাধ্যমতো সেই মহান আবেগকেই যুক্তির মাধ্যমে বাস্তবায়িত করতে অগ্রসর হয়েছিলেন। সুতরাং এই আবেগের লালন অবশ্যই করতে হবে। আবেগতো হলো আগুন, যুক্তির আধারে তাকে ন্যাস্ত করতে পারলেই সেটি মুক্তির প্রদীপ হয়ে উঠে।
শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে মহান আবেগ শেখ মুজিবের মধ্যে বিরাজ করছিলো, যুক্তির আধারে আবেগের শিখা জ্বালিয়ে আজ তাঁকেই খুঁজে বেড়াতে হবে। কারণ সেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া শোষিত নির্যাতিত গণমানুষের মুক্তির অন্য কোনো পথ নাই। আসুন, আমরা সেই পথে অগ্রসর হই। আর সে পথে অগ্রসর হলেই আমরা, ‘বাঙালীর মানুষ হবার যে স্বপ্নের নাম শেখ মুজিব’, তাকে আমাদের সহচর রূপে পেয়ে যাবো।
ধন্যবাদ।