কয়েকদিন আগে একটা ওয়াজের মফিলে গল্পটা শুনেছিল করমালী। মৌলবী সাহেব খুব ইনিয়ে বিনিয়ে বলছিলেন, কী করে শাদ্দাদ খোদার না ফরমানী করলো, কী করে খোদার তৈরী বেহেশতকে টেক্কা দিতে একটা বিরাট বেহেশত গড়ে তুললো। আজ দীদার আলীর বাড়ীর সামনে দাঁড়িয়ে সেই গল্পটাই মনে পড়লো তার। কিন্তু কেনো মনে পড়লো? কী সম্পর্ক আছে সেই গল্পের সাথে এই বিরাট বাড়ীটার? দীদার, তার দূর সম্পর্কের ভাই দীদার। যে একদিন দশটাকা ধার নিয়েছিলো, তারপর দশবৎসরেও ফেরত দিতে পারেনি; সেই দীদার এমন বাড়ী বানিয়েছে!
বাড়ীটার সামনে একটা চায়ের দোকানে বসে এসব কথাই ভাবছিলো করমালী। অনেক কষ্টে এক বুক জল ভেঙ্গে সে শহরে এসেছে দীদার আলীর সাথে দেখা করতে। ভাতিজীর নিকট থেকে যে নতুন জমিটা কিনে রেখেছে, সেটার কিছু অংশ তার ছোট ভাই রহমালী বেদখল করেছে। অনেকদিন ধরে এই নিয়ে মামলাও হয়েছে, আদালতে ডিগ্রীও পেয়েছে সে। কিন্তু কিছুতেই দখল করতে পারেনি। এবার এসেছে, এম.পি সাহেব কে বলে কয়ে মিলিটারী দিয়ে যদি ব্যাপারটা একটা ফয়সালা করা যায়। টাকা খরচ করতে সে রাজী। দৌলতপুরের কেচু তালুকদারের মত টাকা দিতে না পারলেও, সে অন্ততঃ হাজার দুই খরচ করতে পারবে। ওরাতো পাঁচ হাজার দিয়ে বিলের নয় আড়া জমি দখল নিয়েছে। যে জমি নিয়ে দু’দুটা খুন হল, সেই জমি এখন নির্বিবাদে তাদের দখলে চলে এসেছে। কয়েকজন মিলিটারী শুধু বিলের পাড়ে গিয়ে দাড়িয়েছিল, ব্যস, সব ঠিক হয়ে গেছে। এম.পি সাহেব বললে তার কাজটাও অনায়াসে হয়ে যেতে পারে। তখন রহমালীর লাফ ঝাপ সব শেষ হয়ে যাবে। মনে মনে তার ছোট ভাইয়ের কাঁচুমাচু মুখটা কল্পণা করে কেমন একটা তৃপ্তি পায় করমালী।
কিন্তু সাহেবের আসতে এতো দেরী হচ্ছে কেনো! কোথায় যেন রিলিফের কাজে গেছেন। সাথে কিছূ লোকও গেছে। সকালে গেছেন। নইলে বাসায় তার সাক্ষাত নিশ্চয় পেতো করমালী। সে এর আগেও বহুবার এসেছে। সাহেব হলেও কথাবার্তা প্রায় আগের মতই বলে। আবশ্য একদিনও সাহেবের বাসায় খেতে পারেনি সে। আজও প্রায় আটটার সময়েই এসেছে। এখন একটা বাজে। এই দোকানেই নামতা করে কয়েক কাপ চা খেয়েছে করমালী। আবার এক কাপ চায়ের অর্ডার দিলো সে।
দীদার সাহেবের বাড়ীটা একতলা। সামনে একটা বাগান। সেখানে দুই একটা বাহারে ফুল ফুটে আছে। ছাদের উপরে একটা দামী শাড়ী উড়ছে। দুয়েকটা ছেলে মেয়েকে তার পাশে ঘোরা ফেরা করতে দেখা গেছে। একটা চাকর কয়েকবার দরজা খুলেছে। আরও কয়েকজন দেখা করতে এসেছিল, তাদের কে কি যেন বলে বিদায় দিয়েছে। তারা করমালীর সম্মুখ দিয়েই ফিরে গেছে। আজ রোববার। হয়তো শহরেরই কেউ আলাপ করতে এসেছিল। তাদের তেমন দরকার নেই। কিন্তু করমালীতো তেমন আলাপ করতে আসেনি। কাজেই তাকে শেষ পর্যন্ত দেখ যেতে হবে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে নিজের মধ্যে নতুন করে ধৈর্যের একটা প্রেরণা সঞ্চার করে করমালী।
কিন্তু তার ধৈর্য থাকলেও দোকানী এবার অধৈর্য হয়ে পড়ে, বলে, ‘আপনার কি ব্যাপার বলেনতো? এতোক্ষন ধরে বসে এম.পি সাহেবের বাড়ীর দিকে চেয়ে আছেন?’
আমি সাহেবের সাথে দেখা করতে এসেছি।
তাহলে তার বাসায় গিয়ে বসলেই পারতেন।
না, এখানে বসে নাস্তা করলাম কিনা, তাই এখানে বসেই অপেক্ষা করছিলাম।
কেনো, তিনি কি বাসায় নেই?
না, কোথায় নাকি রিলিফের কাজে বেড়িয়ে গেছেন।
আপনিও যেমন, আজ রোববার আবার কোথায় যাবেন উনি, বাসাতেই আছেন। আপনি আবার খোঁজ করুন।
কেমন ধাক্কা খেলো করমালী। এও কি সম্ভব! বাসাতেই আছেন অথচও সে এখানে বসে অপেক্ষা করছে। যদি তাই হয়, তাহলে একটা দারুন লজ্জার কথা। উঠে পড়লো সে। বাসায় থাকুক আর না থাকুক আর এখানে বসা যায় না। এগিয়ে গেলো বাসার দিকেই। আবার সেই চাকরটা এসে দরজা খুলে দিলো। এবার করমালী নাছোড় বান্দা, বললো, ‘সায়েবের গায়ের লোক আমি, খুব জরুরী দরকার।’
চাকর তাকে দাঁড় করিয়ে বাসার ভেতরে গেল। ফিরে এলো অল্পক্ষণের মধ্যেই। বলল, ‘আইয়েন আমার সাথে।’
চাকরের পিছু পিছু ভেতরের রুমে ঢুকলো করমালী। অবাক কান্ড, সাহেব শুয়ে আছেন। ঘুম ভেঙ্গেছে, তবে এখনো বিছানা ছেড়ে উঠেননি। তাকে দেখেই উঠে বসলেন, আরে, করমালী ভাই যে!
খুব দরকারে এসেছি, দীদার ভাই। নইলে আপনার ঘুম ভাঙ্গিয়ে ঝামেলা করতাম না।
কিছু বললেন না দীদার সাহেব। আড় মোড়া ভাঙ্গলেন। তারপর গুছিয়ে চেয়ারে বসে বললেন, ‘বলো, তোমার কি দরকার!’
তুমি আমার জমি নিযে মামলার কথাতো জানো।
তাতো জানিই, তোমার দরকারটা বলো – বলতে বলতে সাহেব বিরাট একটা হাই তুললেন।
কিছুটা অবাক হল করমালী। কেমন যেন অধৈর্য হয়ে পড়েছে দীদার। তবুও তাকে বলতে হলো। এ সময় মেজাজ দেখালে চলবেনা। যদি কোনো প্রকারে বাগানো যায়। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলোনা। শুনেই সে না, না করে উঠলো, তুমি খেপেছো! দেশ ডুবে গেছে বন্যায় এসময় এসব করা যাবে না কি! অন্য কথা বলো।
অন্য আর কি বলবো! এ জন্যই এসেছিলাম।
আমাকে এবারের জন্য মাফ করো ভাই। উঠে দাড়ালেন দীদার সাহেব। এরপর বসে থাকা অর্থহীন, সেও বেড়িয়ে এলো। মনের ভেতর অদ্ভুব ধরনের একটা প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। ইলেকশনের সময় কি খাটুনিই না খেটেছে সে। আর আজ কি না, একটা ন্যায্য কাজে সেরেফ না বলে দিলো।
আবার ফিরে তাকালো করমালী বাড়ীটার দিকে। না, ঠিকই ভেবেছে সে, শাদ্দাদের বেহেশত। কি ছিলো আর কি হয়েছে। বেটা পাঁচ টাকার উকিল এখন দু’হাজারেও রা কড়ে না। কিন্তু গল্পটার শেষ দিকটাতো মেলে না। মৌলবী সাহেব বলছিলেন, শাদ্দাদের বেহেশত তৈরী হলো। একদিন ধুমধামের সাথে সেই বেহেশতে প্রবেশ করতে গেল শাদ্দাদ। আর তখনি এক বিকট মূর্তি এসে সামনে খাড়া। কে? কে তুমি? কী চাও?
আমি আজরাইল, তোমার জান কবচ করতে এসেছি।
কেঁপে উঠলো শাদ্দাদ। এমনটি সে আশা করেনি। কাকুতি মিনতি করে বললো, ‘দয়া করো, আমাকে শুধু বেহেশতটা দেখতে দাও। এক নজর দেখেই ফিরে আসব আমি।’
না, আমার সময় নেই!
সব কিছু পড়ে রইলো। মালাকুল মউত তার জান কবচ করে বাতাসে মিলিয়ে গেলো।
আর এখানে? এখানে শাদ্দাদ তার বেহেশতে দিব্বি সুখে বাস করছে। বলে কিনা, রিলিফের কাজে বেড়িয়ে গেছে। এভাবে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্নে রিলিফের কাজ করলে, মন্দ না! একটা ন্যায্য কাজ করতে বললেই বন্যার দোহাই!
রাগে গজগজ করতে করতে এগিয়ে চললো করমালী।