ক্রমান্বয়ে সংযুক্ত করা হবে…
Tag: গোলাম সামদানী কোরায়শী স্মরণে
আলোকময় নাহা
গোলাম সামদানী কোরায়শী তেইশ বছর আগে ময়মনসিংহে আসেন নাসিরাবাদ কলেজে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে। ময়মনসিংহে এলেন এবং জয় করলেন। সে সময় থেকে আমৃত্যু তিনি ময়মনসিংহের সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতিতে নিজেকে একাত্ম করে রেখেছেন। এ সময়টা তাঁকে ছাড়া এলাকায় কোন সাহিত্য বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কথা চিন্তা করতে পারি না আমরা। ১৯৩০ সালে জন্মেছেন, মৃত্যু গত ১১ই অক্টোবর। বাল্যে পিতৃহারা হয়ে কঠোর সংগ্রাম করতে হয়েছে তাঁকে। অসাধারণ মেধাবী ছাত্র ছিলেন বলেই সেই দুঃসহ দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম তিনি টিকতে পেরেছেন – এগুতে পেরেছেন।
আরবী ফারসী উর্দূতে তাঁর পান্ডিত্য ছিল অগাধ। মমতাজুল মোহাদ্দেসীন পরীক্ষায় ঢাকা আলীয়া মাদ্রাসা থেকে তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। এর পরে তিনি আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তিনি অনার্স ও এম.এ ডিগ্রী প্রাপ্ত হন। বাংলা একাডেমীতে তিনি সুদীর্ঘ ৮ বছর ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র অধীনে আঞ্চলিক ভাষা অভিধান প্রকল্পে চাকুরী করেন। তাঁর আরবী ও ফার্সী থেকে অনুদিত লেখা কিছু বইয়ের মাঝে ইবনে খালদুন রচিত আরবী গ্রন্থ ‘আল মুকাদ্দিমা’, ‘কালিলা ও দিমনা’, ‘হেজাজের সওগাত’, ‘তারিখ-ই-ফিরোজশাহী’, ‘তোহ্ফা’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্যে। আরবী সাহিত্যের ইতিহাস, সাহিত্য ও ঐতিহ্য, ইসলাম ও আমেরিকা ও স্বরচিত অন্যান্য গ্রন্থে গোলাম সামদানীর জ্ঞানের গভীরতা, যুক্তিবাদী চিন্তাচেতনা, দৃষ্টিভঙ্গীর উদারতা, বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও মানবতাবোধ, মুক্তবুদ্ধি-দীপ্ত সাধারণ পাঠকের মনকে ও আলোড়িত করতে সক্ষম হয়।
১৯৬৮ সনে ময়মনসিংহে চাকুরী সূত্রে আসার পর ময়মনসিংহ শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সারাদেশ ব্যাপী রাজনৈতিক আবহাওয়া তখন উত্তপ্ত – শুরু হলো স্বাধিকার আন্দোলনের সংগ্রামী দিনগুলি। ময়মনসিংহে বুদ্ধিজীবিরা বুদ্ধিজীবী সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ শহর, শহরতলী এবং আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে সভাসমিতি করে জনগণকে আন্দোলনের পক্ষে উদ্বুদ্ধ করেন। এ আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে গোলাম সামদানীর ভূমিকা সবাইকে উদ্বুদ্ধ করেছিলো। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষিকে প্রাধান্য দিয়ে একটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় করার জন্য সে সময় দেশজুড়ে যে শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে উঠেছিলো তার অন্যতম রূপকার ছিলেন জনাব সামদানী। এ ব্যাপারে আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে যে গুরুতর ফৌজদারী অভিযোগ এনে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারী হয়েছিলো তাতেও তাঁর নাম যুক্ত হয়েছিলো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বক্ষণে বুদ্ধিজীবী হত্যার যে তালিকা তৈরী হয়েছিলো ময়মনসিংহের সে তালিকায় তাঁর নাম ছিল প্রথমে – ময়মনসিংহ মুক্ত হতে একদিন দেরী হলে হয়তো সামদানীসহ অনেক বন্ধুকেই আমরা সে সময় হারাতাম।
বিগত ৭/৮ বৎসর প্রয়াত সামদানী উচ্চ মাধ্যমিক বা ডিগ্রী পরীক্ষার কোন খাতা দেখেননি। পরীক্ষায় নকলের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন তিনি। প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন ও নকল করার প্রবণতা রোধ করতে তিনি নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। প্রচলিত পদ্ধতিতে পরীক্ষায় আসল ভাল ছাত্রের ও নকলবাজ ছাত্রের খাতা দেখে প্রভেদ নিরুপণ করা সম্ভব নয় বুঝে তিনি নীতিগতভাবে খাতা দেখা ছেড়েছেন। এ ব্যাপারে পত্রপত্রিকায় বহু লেখালেখি করেছেন । অর্থের কাছে তিনি ন্যায়নীতি বিসর্জন দেননি।
আমাদের সমাজে সর্বক্ষেত্রে অবক্ষয় যেখানে চরম আকার ধারণ করেছে, দুর্নীতি এবং দুর্বলকে সবলের শোষণ যেখানে স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে গোলাম সামদানী মেরুদণ্ড সোজা করে এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। সাথে এখন কাউকে না পেলে ‘একলা চলো’ নীতিতে আস্থা রেখেছেন। ধর্মীয় গোড়ামী, সাম্প্রদায়িকতা, সকল প্রকার কুসংস্কার থেকে মুক্ত থেকে তিনি মুক্তবুদ্ধির প্রচারে ও চর্চার যত্নবান থেকেছেন আমরণ। নীতিগতভাবে যার তাঁর এই নীতিরঘোর বিরোধী তাঁরাও কিন্তু সামদানীর চরিত্রের দৃঢ়তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।
বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক, ময়মনসিংহে বঙ্গবন্ধু পরিষদ, আপসো, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, প্রেস ক্লাব, ইত্যাদি বিভিন্ন সংগঠনে তিনি সংযুক্ত থেকে এ এলাকায় শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারে যত্নবান থেকেছেন। তিনি যে মাপের ব্যাক্তিত্ব ছিলেন, মফস্বল শহরে থাকার দরুণ সেটার দেশব্যাপী প্রতিফলন আজ অনুপস্থিত – এ ছাড়া ব্যক্তিগত ভাবে নিজেও ছিলেন প্রচার বিমুখ। জেলা পরিষদের মুদ্রণ বিভাগে তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করে তাঁর রচনাবলী প্রকাশে জেলা পরিষদ উদ্যোগ নেবে এটা কামনা করি।
মুক্তবাতায়ন পাঠচক্র নামের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ১৯৮৯ সনের ১৬ই আগস্ট স্থানীয় প্রেসক্লাবে অধ্যাপক সামদানী কোরায়শীর ষাট বৎসরে পদার্পণ উপলক্ষে এক মনোজ্ঞ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। গত ৬ই সেপ্টেম্বর উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, ময়মনসিংহ শাখা তাঁকে গুণীজন হিসেবে সম্মানীত করে। এ অনুষ্ঠানে তিনি তাঁর ভাষণে বলেছিলেন যে বোধ হয় সমাজকে তাঁর যেটুকু দেয়ার ছিল তা শেষ হয়েছে তাই গুণীজন হিসেবে তাকে সম্মান দেয়া হয়েছে। মাত্র একমাসের মধ্যে যে তিনি আমাদের ছেড়ে যাচ্ছেন সেটা অন্যে না বুঝলেও হয়তো তাঁর উপলব্ধিতে সেটা ছিল।
পরম শ্রদ্ধাভাজন সামদানী’র বিদেহী আত্মা
শান্তি পাক এটাই কামনা করি।