সম্পাদকীয়
সম্প্রতি ময়মনসিংহ শহর ও শহরতলী গুলিতে ওয়াজ মহফিলের হিড়িক পড়ে গেছে। এতে একদিকে মানুষের মধ্যে ধর্মবোধ জাগ্রত হবার জন্য যেমন আনন্দিত হবার অবকাশ আছে, তেমনি অন্যদিকে এক ধরণের সুপ্ত সাম্প্রদায়িক চেতনাকে জাগ্রত করার তৎপরতায় শংকিত হবারও কারণ আছে। শুনেছি স্বাস্থ্য নাকি সংক্রমিত হয়না, ব্যাধিই সংক্রমিত হয়। এজন্যই আমাদের এই আশংকাকে অমূলক বলে উড়িয়ে দেয়া যায়না।
এ ধরণের দুয়েকটি সভায় শ্রোতা হবার সৌভাগ্য আমাদের হয়েছে। এ সব সভার হলেন এমন এজন ব্যক্তি, যিনি ধর্মান্তরিত হয়েছেন। ইসলাম ধর্মের সৌন্দর্য দর্শনে তিনি তাঁর পূর্ব ধর্ম ত্যাগ করেছেন, এ অবশ্যি গৌরবের ব্যাপার। কিন্তু এর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে পরধর্মের প্রতি বল্গাহীন উক্তি কিছুতেই সমর্থনযোগ্য নয়। কারণ এ ধরণের ধর্মান্তরিত ব্যক্তিদের কালাপাহাড়ী মনোভাব সামাজিক সম্প্রীতির ক্ষেত্রে খুবই বিপদজ্জনক। যেখানে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গসহ স্বয়ং রাষ্ট্রপতি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা অনবরত বলে বেড়াচ্ছেন, সেখানে এক শ্রেণীর ধর্মীয় বক্তা এর উল্টো কাজ করছেন। যে ইসলাম ধর্মে দোহাই দিয়ে তারা এমনি গর্হিত কাজে লিপ্ত, সেখানেও এর জন্য কোনো সমর্থন নেই।
আসলে এরা এক ধরণের ওয়াজ ব্যবসায়ী। অতীতেও এদের আবির্ভাব দেখা গেছে। আমরা এক সময়ে ইসমাইল ব্যানার্জী, আব্দুল্লাহ মুখার্জীদের তুখড় ওয়াজ নসিহত শুনেছি। এঁরা পয়সার বিনিময়ে এমনি ওয়াজ ফেরি করে বেড়াতেন। ময়মনসিংহের এখানে সেখানে যিনি ওয়াজ করছেন, তিনিও সেই শ্রেণীরই একজন ধর্মীয় বক্তা। এর কথার মধ্যে সেই একই ধরণ এবং প্রায় একই বিষয়বস্তু। সেদিন শুনলাম ভদ্রলোক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকের একটি ছড়ার উদাহরণ তুলে ধরে এইসব পাঠ্য বিষয়ের অসারতা নিয়ে কথা বলছেন। হঠাৎ শুনলে সাধারণ শ্রোতাদের মনে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই এই সমালোচনার অন্তর্নিহিত সুরটি বোঝা যায়। অর্থাৎ এসব আবোল তাবোলের চেয়ে ধর্মীয় শিক্ষা অনেক ভালো। না, এ কথায় কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু সেই যে কথায় বলে, ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখে ডরায়, আমাদেরও হয়েছে সেই অবস্থা। কারণ এমনি সমালোচনার যথার্থতা স্বীকার করে নিলে আমাদের সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির প্রায় সবকিছুই ধর্ম বিরোধী হয়ে দাড়াবে। এ আমরা অবশ্যি চাইব না।
জানিনা সরকারী পর্যায়ে বিঘোষিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সরকারী বিদ্যালয়ে প্রবর্তিত পাঠ্যসূচীর বিরুদ্ধে এমনি বিষোদ্গার করার সাহস এ সকল ধর্মব্যবসায়ীরা কী করে পায়! সরকারী প্রশাসন যন্ত্রের নাকের ডগায় বসে তারা অবলীলাক্রমে তাদের জঘন্য মনোবৃত্তি তুলে ধরছে। কোথাও কোনো প্রতিবাদ প্রতিরোধের ব্যবস্থা দেখতে পাচ্ছিনা। সব দেখে শুনে আমাদের কেবল একটি কথাই মনে হচ্ছে, সব ব্যাপারে আমরা যথার্থই স্বাধীন অর্থাৎ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণহীন।
এমনি ধর্মের নামে যা মুখে আসে তাই বলার একটি ওয়াজ সেদিন এক আসরে শুনতে পেলাম। সেই ধর্মান্তরিত ব্যক্তিটিই সমবেত শ্রোতাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন, আপনারা কুত্তার খাসলত গ্রহণ করুণ। কুকুর যেমন প্রভুভক্ত, সদা সতর্ক, প্রবল ঘ্রাণ শক্তির অধিকারী, আপনারাও সেই চরিত্রে চরিত্রবান হোন। আমরা বুঝতে পারিনা, ধর্ম সম্পর্কে এমন মূর্খতা প্রদর্শণের সাহস তার হলো কী করে। যেখানে আল্লার নবী (সঃ) বলছেন, ‘তাখাল্লাকু বে আখলাকিল্লা’ অর্থাৎ তোমরা আল্লার খাসলত গ্রহণ করো, সেখানে সেই ধর্মব্যবসায়ী বলছে, তোমরা কুত্তার খাসলত গ্রহণ করো!
এমনি বল্গাহীন উক্তি, মনগড়া ধর্মের কথা এদের মুখ দিয়ে বেড়িয়ে আসছে। আমরা মনে করি, এর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ হওয়া দরকার। ধর্ম ভালো, কিন্তু ধর্মের নামে বাঁদরামি কখনো ভালো নয়। এতে মানুষের মূর্খতাই বৃদ্ধি পায়। আমরা উর্ধতন কতৃপক্ষসহ সকল চিন্তাশীল নাগরিকের কাছে এর প্রতিরোধে এগিয়ে আসার জন্য সবিনয় আবেদন জানাচ্ছি।