যে কথা না বলাই ভালো

এমন অনেক কথা আছে, যা সহজে কেউ বলতে চান না। কারণ এসকল কথা একদিকে যেমন বক্তার যথার্থ পরিচয় তুলে ধরে, অন্যদিকে ঠিক তেমনি পরিবেশের মধ্যে একটা প্রতিক্রিয়ারও সৃষ্টি করে। এজন্যই বৈষয়িক মানুষ, হিসেবী মানুষ নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। খুব একটা দায়ে না ঠেকলে কোনো কথা বলতে চান না।

এ অভ্যাসের একটা ভালো দিক অবশ্যি আছে। অন্ততঃ এতে বাড়তি ঝামেলা এড়িয়ে যাবার সুযোগ পাওয়া যায়। কিন্তু এভাবে হিসেব করে ঝামেলা এড়িয়ে নিজের ব্যক্তিত্বের যে অবস্থানটি চিহ্নিত হয়, তা অনেকাংশেই সংকীর্ণ হতে বাধ্য। এর ফলে শুধু ব্যক্তি নয়, সমাজও তাঁর ব্যক্তিত্বের সৌরভ থেকে বঞ্চিত হয়। যে উপলব্ধি, যে অভিজ্ঞতা সমাজের মধ্যে নতুন চেতনার সঞ্চার করতে পারতো, তা ব্যাক্তির মনের গহনে অবরুদ্ধ থেকে এক সময়ে হারিয়ে যায়। এ যেন বনের গহনে ফুল ফুটে ঝরে যাওয়ার মতো। তার শোভা কেউ দেখলোনা, তার সুবাস কেউ শুঁকলো না, তার পরিচয় কেউ জানলোনা।

এ তুলনার মধ্যে অবশ্যি একটা সীমাবদ্ধতা আছে। কারণ প্রকৃতির মাঝে ফুল ফোটার একটা নিজস্ব স্বার্থকতা আছে। কেউ না দেখলে না শুঁকলেও সে তার সার্থকতা থেকে বঞ্চিত হয়না। কিন্তু মানুষের চিন্তাচেতনা তো তেমনভাবে ঝরে যাবার জন্য জন্মায়না। যে সমাজ পরিবেশ থেকে উপলব্ধি আর অভিজ্ঞতার নির্যাস নিয়ে তার জন্ম, সেই পরিবেশকে সমৃদ্ধ করার মধ্যেই তার সার্থকতা। এ ভাবেই মানুষের চিন্তার জগৎ গড়ে উঠেছে। স্বার্থের প্রলোভন এড়িয়ে, নির্যাতনের ভয়কে জয় করে মানুষ সত্য উচ্চারণ করেছে। এর মধ্য দিয়ে নিজের পরিচয় যেমন সে তুলে ধরেছে, তেমনি সমাজও এর দ্বারা উপকৃত হয়েছে।

চঞ্চলা

[রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিরচিত ‘চঞ্চলা’ কবিতার প্যারডি]

        হে বিরাট গদি,
সুদৃশ্য সশব্দে তব লোভ
	অবিচ্ছিন্ন তারি ক্ষোভ
		আছে নিরবধি।
স্পন্দনে শিহরে দেশ তব রুদ্র কায়াময় বেগে,
বস্তুহীন আদর্শের প্রচন্ড আঘাত লেগে
	পুঞ্জ পুঞ্জ শব্দ ফেনা উঠে জেগে,
লালসার তীব্রচ্ছটা বিচ্ছুরিয়া উঠে ঘর্মস্রোতে
ধাবমান অন্ধকার হতে,
	ঘূর্ণাচক্রে ঘুরে ঘুরে মরে
		স্তরে স্তরে
	জনসাধারণ যত
		বুদবুদের মত।

	হে স্বৈরিণী, ওগো বৈরাগিনী,
চলেছে সে কোন্ দেশ, সেই চলা তোমার রাগিনী -
		ক্রন্দনের সুর।
		ছন্দহীন দূর
	তোমারে কি নিরন্তর দেয় সাড়া?
সর্বনাশা প্রেমে তার নিত্য তাই তুমি ঘরছাড়া।
		উন্মত্ত সে অভিসারে
		তব বক্ষোহারে
	ঘন ঘন লাগে দোলা, ছড়ায় অমনি
		মন্ত্রীত্বের মনি।

আস্ফালিয়া ওড়ে শূণ্যে ঝোড়ো এলো চুল;
		দুলে উঠে নির্দেশের দুল;
			পরান আকুল
		ছড়ায় নিশীথ দিনে
	চঞ্চল বান্ধববৃন্দে মুখ চিনে চিনে;
		বারম্বার ঝরে ঝরে পড়ে ভুল -
			দাও চাপা দূর্ভোগের মূল
				পথে পথে
			বিড়াল বেরোয় থলি হতে।

শুধু খাও, শুধু খাও, শুধু রেগে খাও
	কোরমা পোলাও -
		ফিরে নাহি চাও,
জনগণ কী যে চায়, কী যে বলে, বোঝ নাকো তাও।
	শুধায়ে লও না কিছু, করনা সঞ্চয়
		নাই শোক, নাই ভয় -
পদের আনন্দে বেগে অবাধে অর্থেরে কর ক্ষয়।

	যে মুহূর্তে শান্ত তুমি সে মুহূর্তে কিছু তব নাই,
				তুমি তাই
			সঙ্কিত সদাই।
	তোমার নির্দেশ লভি দ্রব্যগুলি
		মূল্যমান যায় ভুলি।
পলকে পলকে -
	মূল্যমান নেমে যায় ঝলকে ঝলকে।
		যদি তুমি অখ্যাতির তরে
			ক্রোধ ভরে
				দাঁড়াও থমকি
					অমনি চমকি
		উল্লাসি উঠিবে দেশ পুঞ্জ পুঞ্জ পুঁজির পর্বতে;
				পঙ্গু মূক কবন্ধ বধির আঁধা
					স্থুলতনু ভয়ঙ্করী বাধা
		সবারে ঠেকায়ে দিয়ে দাঁড়াইবে পথে।
স্বল্পতম পুঁজিবাদ আপনার ভাড়ে
সঞ্চয়ের সচল বিকারে
বিধ্য হবে জনতার মর্মমূলে
	শোশনের বেদনার শূলে।

ওগো গদি, চঞ্চল অপ্সরি,
	লোলুপ সুন্দরী,
	তব আশা মন্দাকিনী নৃত্য ঝরি ঝরি
			তুলিতেছে ক্ষিপ্ত করি
		মৃত্যুন্নানে দেশের জীবন।
সহিংস বিদ্রোহ বিষে বিষাইছে নিখিল গগন।

ওরে কবি, তোরে আজ করেছে উতলা
            শোষন কাতরা এই ভুবন মেঘলা
        দুর্বিনীত চরণের আকরণ অবারণ চলা।
            নাড়ীতে নাড়ীতে তোর অশান্তির শুনি পদধ্বনি,
                বক্ষ তোর উঠে রণরনি।
                নাহি জানে কেউ -
            রক্তে তোর নাচে আজি বিপ্লবের ঢেউ,
            কাঁপে আজি জনতার ব্যাকুলতা;
                মনে আজি পড়ে সেই কথা -
                    যুগে যুগে এনেছি ছলিয়া
                        স্খলিয়া স্খলিয়া
                            চুপে চুপে
                        রূপ হতে রূপে
                            স্থান স্থান হতে স্থানে;
                        নিশীথে প্রভাতে
                    যা - কিছু গিয়েছি সাথে
                    এসেছি করিয়া ক্ষয় মাঠে-ময়দানে
                        স্লোগানে স্লোগানে।

            ওরে দেখ্, জনস্রোত হয়েছে মুখর,
                তরণী কাঁপিছে থরথর।
                নীড়ের সঞ্চয় তোর পড়ে থাক তীরে -
                    তাকাস নে ফিরে।
                        বিপ্লবের বাণী
                    নিক তোরে টানি
                        জনস্রোতে
                পশ্চাতের প্রতিক্রিয়া হতে
                    প্রগতির পথে - উজ্জ্বল আলোতে।

ওয়াজ মহফিল

সম্পাদকীয়

সম্প্রতি ময়মনসিংহ শহর ও শহরতলী গুলিতে ওয়াজ মহফিলের হিড়িক পড়ে গেছে। এতে একদিকে মানুষের মধ্যে ধর্মবোধ জাগ্রত হবার জন্য যেমন আনন্দিত হবার অবকাশ আছে, তেমনি অন্যদিকে এক ধরণের সুপ্ত সাম্প্রদায়িক চেতনাকে জাগ্রত করার তৎপরতায় শংকিত হবারও কারণ আছে। শুনেছি স্বাস্থ্য নাকি সংক্রমিত হয়না, ব্যাধিই সংক্রমিত হয়। এজন্যই আমাদের এই আশংকাকে অমূলক বলে উড়িয়ে দেয়া যায়না।

এ ধরণের দুয়েকটি সভায় শ্রোতা হবার সৌভাগ্য আমাদের হয়েছে। এ সব সভার হলেন এমন এজন ব্যক্তি, যিনি ধর্মান্তরিত হয়েছেন। ইসলাম ধর্মের সৌন্দর্য দর্শনে তিনি তাঁর পূর্ব ধর্ম ত্যাগ করেছেন, এ অবশ্যি গৌরবের ব্যাপার। কিন্তু এর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে পরধর্মের প্রতি বল্গাহীন উক্তি কিছুতেই সমর্থনযোগ্য নয়। কারণ এ ধরণের ধর্মান্তরিত ব্যক্তিদের কালাপাহাড়ী মনোভাব সামাজিক সম্প্রীতির ক্ষেত্রে খুবই বিপদজ্জনক। যেখানে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গসহ স্বয়ং রাষ্ট্রপতি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা অনবরত বলে বেড়াচ্ছেন, সেখানে এক শ্রেণীর ধর্মীয় বক্তা এর উল্টো কাজ করছেন। যে ইসলাম ধর্মে দোহাই দিয়ে তারা এমনি গর্হিত কাজে লিপ্ত, সেখানেও এর জন্য কোনো সমর্থন নেই।

আসলে এরা এক ধরণের ওয়াজ ব্যবসায়ী। অতীতেও এদের আবির্ভাব দেখা গেছে। আমরা এক সময়ে ইসমাইল ব্যানার্জী, আব্দুল্লাহ মুখার্জীদের তুখড় ওয়াজ নসিহত শুনেছি। এঁরা পয়সার বিনিময়ে এমনি ওয়াজ ফেরি করে বেড়াতেন। ময়মনসিংহের এখানে সেখানে যিনি ওয়াজ করছেন, তিনিও সেই শ্রেণীরই একজন ধর্মীয় বক্তা। এর কথার মধ্যে সেই একই ধরণ এবং প্রায় একই বিষয়বস্তু। সেদিন শুনলাম ভদ্রলোক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকের একটি ছড়ার উদাহরণ তুলে ধরে এইসব পাঠ্য বিষয়ের অসারতা নিয়ে কথা বলছেন। হঠাৎ শুনলে সাধারণ শ্রোতাদের মনে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই এই সমালোচনার অন্তর্নিহিত সুরটি বোঝা যায়। অর্থাৎ এসব আবোল তাবোলের চেয়ে ধর্মীয় শিক্ষা অনেক ভালো। না, এ কথায় কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু সেই যে কথায় বলে, ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখে ডরায়, আমাদেরও হয়েছে সেই অবস্থা। কারণ এমনি সমালোচনার যথার্থতা স্বীকার করে নিলে আমাদের সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির প্রায় সবকিছুই ধর্ম বিরোধী হয়ে দাড়াবে। এ আমরা অবশ্যি চাইব না।

জানিনা সরকারী পর্যায়ে বিঘোষিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সরকারী বিদ্যালয়ে প্রবর্তিত পাঠ্যসূচীর বিরুদ্ধে এমনি বিষোদ্গার করার সাহস এ সকল ধর্মব্যবসায়ীরা কী করে পায়! সরকারী প্রশাসন যন্ত্রের নাকের ডগায় বসে তারা অবলীলাক্রমে তাদের জঘন্য মনোবৃত্তি তুলে ধরছে। কোথাও কোনো প্রতিবাদ প্রতিরোধের ব্যবস্থা দেখতে পাচ্ছিনা। সব দেখে শুনে আমাদের কেবল একটি কথাই মনে হচ্ছে, সব ব্যাপারে আমরা যথার্থই স্বাধীন অর্থাৎ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণহীন।

এমনি ধর্মের নামে যা মুখে আসে তাই বলার একটি ওয়াজ সেদিন এক আসরে শুনতে পেলাম। সেই ধর্মান্তরিত ব্যক্তিটিই সমবেত শ্রোতাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন, আপনারা কুত্তার খাসলত গ্রহণ করুণ। কুকুর যেমন প্রভুভক্ত, সদা সতর্ক, প্রবল ঘ্রাণ শক্তির অধিকারী, আপনারাও সেই চরিত্রে চরিত্রবান হোন। আমরা বুঝতে পারিনা, ধর্ম সম্পর্কে এমন মূর্খতা প্রদর্শণের সাহস তার হলো কী করে। যেখানে আল্লার নবী (সঃ) বলছেন, ‘তাখাল্লাকু বে আখলাকিল্লা’ অর্থাৎ তোমরা আল্লার খাসলত গ্রহণ করো, সেখানে সেই ধর্মব্যবসায়ী বলছে, তোমরা কুত্তার খাসলত গ্রহণ করো!

এমনি বল্গাহীন উক্তি, মনগড়া ধর্মের কথা এদের মুখ দিয়ে বেড়িয়ে আসছে। আমরা মনে করি, এর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ হওয়া দরকার। ধর্ম ভালো, কিন্তু ধর্মের নামে বাঁদরামি কখনো ভালো নয়। এতে মানুষের মূর্খতাই বৃদ্ধি পায়। আমরা উর্ধতন কতৃপক্ষসহ সকল চিন্তাশীল নাগরিকের কাছে এর প্রতিরোধে এগিয়ে আসার জন্য সবিনয় আবেদন জানাচ্ছি।