দুর্ঘটনা

কিশোর কবিতা সংকলন

১। দুর্ঘটনা

গোলগাল চেহারা 
এলো উড়ে বেহারা
	চার চার আটটা;
কাঁধে নিয়ে পালকি 
চলে, তার চাল কী!
	পার হলো মাঠটা।
এর পর নদীতে 
যেই গেল পা দিতে 
	অমনি রে হুড়মুড়
পড়ে গেল গর্তে
ধরতে না ধরতে 
	পালকিটা চুরচুর।
আরোহীর ভুঁড়িটা
যেন দশ কুড়িটা
	গোলাকার মুটকি, 
ফেটে গেলো দুদ্দাড়
বের হলো এন্তার 
	পরোটার শুঁটকি।
চিৎপাত বেচারা 
আট উড়ে বেহারা
	টেনে তারে তুললো,
হাত পায়ে বেঁধে বাঁশ
নিয়ে যেন মরা লাশ 
	ধুঁকে ধুঁকে চললো।

২। শিক্ষা

তিল তিল করে যদি হয় তাল,
চিল চিল করে তবে হলে চাল।
এই ভেবে ও পাড়ার উদ্দিন
চিল চিল করে শুধু রাদ্দিন।

দেখে তার পাগলামি কান্ড
দানা মিয়া এনে দিলো ভান্ড;
বলে তারে,‘এটা তোর হাতে রাখ,
দ্বারে দ্বারে দাও বলে দিবি হাঁক!’

উদ্দিন বলে,‘এযে ভিক্ষা!’
দানা বলে,‘এই হলো শিক্ষা।’

৩। নেড়ি

সায়েব পাড়ার কুকুর
খাচ্ছে চুকুর চুকুর
দুধের ছানা ক্ষীরের পায়েস
সকাল বিকাল দুপুর।

তাইনা দেখে সেদিন
বললে সে এক বেদীন,
‘কুকুর কেন হলাম না হায়, 
পয়দা হলাম যেদিন!’

হাসলে শুনে কুকুর,
বললে তুলে ঢেঁকুর,
‘তুইও নেড়ি আমার মতো,
নেইরে শুধু লেজুড় !’

শুনতে পেয়ে তাহা
বললে সায়েব,‘বাহা,
কুত্তা মেরা বহুত লায়েক 
বাততো ঠিকই কাহা !’

৪। পালোয়ান

লিকলিকে পালোয়ান
	নাম তার সটকা,
রোজ ভোরে চাই তার 
	ছোলা এক মটকা।
ঝোলাগুড় আধমন
	তাতে কবি মন্থণ,
মেরে দেয়, তবু তার
	দেহ রোগা পটকা;
রাতদিন হাঁই তোলে
	চোখে থাকে চটকা।

৫। রোশনাই

টক করে টিপ মেরে 
	হয়ে গেলো রোশনাই,
দেখে শুনে হাবুলের 
	একেবারে হুঁশ নাই।
মামী এসে কেঁদে কন
	‘আহা মোর বাছাধন,’
তনু হেসে বলে,‘উহুঁ,
	কাবুলের দোষ নাই।’

৬। বায়না

খুকুমনি বায়না ধরেছে, 
আয়না ধরে দেখবে কেমন গয়না পরেছে।
কোথায় পাব আয়না?
খুকুমনির বায়না!

নোলক নাকে ঝুমকো কানে
মাথায় সিঁথিপাট, 
হাতে কাঁকন গলাতে হার 
পায়ে মলের ঠাট;
মায়ের কাপড় পড়ে আবার
একটুখানি ঘোমটা করেছে।

তাইতো খুকু বায়না ধরেছে,
আয়না ধরে দেখবে কেমন ঘোমটা করেছে।
কোথায় পাব আয়না?
খুকুমনির বায়না!

৭। খাঁচা

তোতা পাখী খাঁচাতে 
ছিলো লেজ নাচাতে 
খোকা এসে হেসে তারে বললে,
‘ইত্কুলে দাবে কি?
বলো হলে খাবে কি?
এখন না লেখাপড়া কললে?’

তোতা শুনে হাসলো,
খুকখুক কাশলো ,
বলে,‘খোকা ঠিক কথা শিখছো;
শুধু বড়ো খাঁচাটা
তার মাঝে বাঁচাটা
জেনে নেবে যতোদিন টিকছো।’

৮। তুড়ি

তুড়ি তুড়ি তুড়ি,
তুড়ি মেরে দিলেম ফেঁড়ে
দলু মিয়ার ভুড়ি।
বোঁচা বলে,‘একী!’
আরে তাইতো দেখি,
ভুড়ির থেকে বেরিয়ে এলো
ইয়া বড়ো এক ঘুড়ি!
নেইকো তাতে সুতো
আকাশে খায় গুঁতো,
তাইতো দেখে পালিয়ে গেলো
দখিন পাড়ার বুড়ি।
ছেলেরা তার এসে
মরেই গেল হেসে 
ওদের মাথায় পড়লো ঝরে
পরোটা এক কুড়ি।

৯। খোকার বাড়ী

এলাম গেলাম খেলাম না
খোকার দেখা পেলাম না।

খোকার বাড়ী অনেক দূর
মাঝখানে এক সমুদ্দুর।

সমুদ্দুরে নেই যে না
আসতে যেতে ভিজলো গা,
ভিজলো কাপড় মাথার চুল-
ঝাড়তে গিয়ে পেলাম ফুল।

ফুল ফুটেছে কোন দেশে?
খোকার বাড়ী যেই দেশে।

১০। লাল রং

দীঘির জলে শাপলা ফুল
দুলছে ঢেউয়ে দোদুল দোল।
বললে তারে একটা হাঁস,
‘লাল রং তুই কোথায় পাস?
ঘাঁটছি নিতুই দীঘির ধার
ডুবছি জলে হাজার বার
দেখছি খুঁজে কাদার তাল
ঠোঁট তবুতো হয়না লাল!’

বললে শুনে শাপলা ফুল,
‘করলি এমনি ভুল, 
ঠোঁট দিয়ে কি খুঁজলে পাঁক
অমনি জানা যায় বেবাক?
ভাসছি জলে রাত্তিদিন
শিকড় দিয়ে তল গহীন
খুঁজছি, তবু পাইনি খোঁজ 
তোর সমানই মুঁই অবুঝ।

১১। ময়না

ময়না পাখী রয়না খাঁচায়,
	করবো বলো কি?

গয়না দিলে সয় না, চেঁচায়,
	করবো বলো কি?

ভয় না পেলে কয় না কথাই, 
	করবো বলো কি?

ময়না পোষা হয় না যে তাই,
	করবো বলো কি?

১২। টিয়ে

আয়রে টিয়ে আয়
গয়না দেবো গায়,
থাকতে দেবো বাড়ী
পরতে দেব শাড়ী,
খাবার দেবো ছোলা
বসার দেবো দোলা।
দুলবি মনের সুখে
দেখবে চেয়ে লোকে,
বলবে,‘বারে টিয়ে, 
হলো কি তোর বিয়ে?
গয়না দেখি গায়, 
শিকলি কেন পায়?’

বলিস তখন তুই,
‘কনে হলাম মুঁই 
গয়না শাড়ী পরে 
এলাম পরের ঘরে
শিকলি ওটা মিছে
আছে পায়ের নীচে
লাগলে ভালো বর
করবো তবে ঘর;
নইলে শিকল কেটে
মুখে কুলুপ এঁটে
উড়াল দিয়ে যাবো
বনের ফলই খাবো।

১৩। যা-পাস-গিল

ভুঁড়ির নাম যা-পাস-গিল
গিলছে তাল গিলছে তিল,
বাড়ছে তাই হাত ছাফাই
ডোবার খাই হচ্ছে বিল।

সাতটা দেশ এক গরাস
চাঁদ সুরুজ খায় তরাস,
চায় কতো পায় যতো 
চোখ ততো ফসফরাস।

ঘুরছে দুই চাকতি গোল
জিভটা তাই হচ্ছে লোল,
ভাবটা এই পায় যাকেই
খায় তাকেই কোপ্তা ঝোল।

সবদেশের সবটি গাঁয়
যায় ভুঁড়ি আলতো পায়
দেয়না হাঁক দেয়না পাক
খায় বেবাক একটা হাঁয়।

১৪। কানাকানি

সকাল বেলা সূয্যি কেন উঠে?
ফুলের গাছে ফুল যে কেনো ফুটে?
গানের পাখি কেনোই এসে জুটে?
ঝিরঝিরিয়ে বাতাস কেনো ছুটে?
কেউ কি জান তা?
সূয্যি উঠে ছড়ায় আলোর রাশি,
ফুলের শোভা ফোটায় মুখে হাসি,
পাখীর গানে বাজায় মনে বাঁশী
ঝিরঝিরে যায় যে ভালো বাসি, 
কেউ কি মানো তা?

আমরা সবাই জানি 
আমরা সবাই মানি,
সূয্যি, বাতাস, ফুল আর পাখি
করলো কানাকানি।

১৫। খোকা

খোকা, আমার খোকা,
খোকা তো নয় ফোটা ফুলের থোকা।
গোলাপ বেলি যুঁই চামেলী
সব মিলিয়ে হয়না এমন শোভা,
এমন মনোলোভা!

ভোরের আলো হয়না এমন মিঠি,
এমন করে জুড়ায় নাতো দিঠি।
পুন্নিমা চাঁদ হোক না যতই ভালো,
এমন করে ছড়ায় নাতো আলো।
দখিন হাওয়া দেয়না এমন দোলা, 
এমন আপনভোলা।

খোকা, আমার খোকা,
খোকার তরে হলাম যে তাই বোকা।

১৬। বেদীন

এই দেশেরই শহর কিবা গাঁয়ে
	কোথাও আছে বিদ্কুটে এক পাগল।
বলতে কিছু চায়না ডানে বাঁয়ে;
	সবাই বলে,‘ওর মুখে নেই আগল।’
সামনে যা পায় তা তুলে দেয় হাঁয়ে ;
	সবাই বলে,‘আস্ত একটা ছাগল।’

সেই পাগলে গোল বাধালে সেদিন
	যেই তারে কেউ বললো যে, সে বেদীন।

১৭। চাঁদের বুড়ী

খুকিঃ	চাঁদের বুড়ী, চাঁদের বুড়ী!
	বয়েস তোমার কয়শ’ কুড়ি?
	কয়টি ছেলে, কয়টি মেয়ে
	কয়টি নাতি-নাতনি পেয়ে
	কাটছো সুতো মনের সুখে?
বুড়িঃ	সুখেতো নয় মনের দুখে
	চরকা চালাই সারাটা রাত
	তাইতো জুটে দুবেলা ভাত।
খুকিঃ	ছেলেরা সব মরেছে বুঝি?
বুড়ীঃ	মরেনিতো, পায়নি খুঁজি!

১৮। দত্যি

একটুকু মিছে নয়, বিলকুল সত্যি
আকাশের মাঝখানে আছে এক দত্যি।
বড়ো বড়ো হাত পাও খুব বড়ো মাথাটা, 
আকাশটা আসলে তার বড়ো ছাতাটা।
সুরুজটা যায় যবে সেই ছাতা পেরিয়ে, 
দত্যিটা চোখ বুজে থাকে মুখ ফিরিয়ে।
কখনো সে রাগ করে ডেকে উঠে ঘরঘর, 
গাছপালা নদীনালা কেঁপে উঠে থরথর।
চোখ দুটি তার সাতে উঠে ঝিলমিলিয়ে,
বিজলীর রেখা তাই উঠে কিলবিলিয়ে।
শরীরের ঘাম তার ঝড়ে পড়ে ঝরঝর, 
খালবিল নদীনালা জলে হয় ভরভর।
আমরাতো জানিনেতা তাই বলি বৃষ্টি, 
বলতো কি আজগুবী, অদ্ভুত সৃষ্টি!   

১৯। তেলচোরা

এই দেশে এক সায়েব আছেন
	নাম হলো তাঁর আরশোলা, 
রাতের বেলা বেরুন তিনি
	খুঁজেন ভাঁড়ার আর গোলা।
যা পান চাটেন বুদ্ধি আঁটেন
	চাটায় তিনি একচেটে,
চেটেচেটেই করেন সাবাড়
	সবকিছু তার যায় পেটে।
পাখনা দুটি চকচকে তাই
	উড়েন, ভাবেন হই পাখি, 
চামচিকা আর বাদুড় যেমন
	তেমনি বাঁধি ভাই-রাখী।
হায়রে ফুরুৎ! একটু খানি
	তার পরেতে যেইকে সেই-
চাটার জোরে যায়কি উড়া!
	এইটুকুতে হারান খেই।
তবু চাটেন কেবল কেবল চাটেন
	ওতেই মজা আনকোরা,
তাইতো তিনি নাম কিনেছেন
	সবাই ডাকে তেলচোরা।

২০। দরজা

দাদুর হয়েছে জিহ্বা দোষ, সকলি বলেন উলটা, 
রেগে মেগে হন আগুনের মত শুধরাতে গেলে ভুলটা।
আম খেতে হলে বলেন, ‘মোয়া দে’, কাঁঠালে বলেন লটকা;
তিনি যদি কন, ‘কাষ্ট এনে দে’, আমরা যোগাই সটকা।
আমরা সবাই বুঝি তার ভাষা, বাড়ীর চাকর ডান্ডা, 
সেও জানে যদি ‘ডানা’ চান তিনি, এনে দিতে হবে আন্ডা।
সময় দাদুর ভালয় কাটছে খেয়ে পান চুন র্জদা;
এরি মাঝে গিয়ে পুরানো চাকর নতুন এসেছে র্গদা।
বেচারা বুঝতে পারে না মোটেও দাদুর ভাষার শব্দ
আমরাই তাকে এটা ওটা বলি, সবটাতে হয় জব্দ।
সেদিন বাড়ীর সবে একসাথে বেড়াতে গেলাম বাড্ডা,
সারাদিন মান ইতি উতি ঘুরে চুটিয়ে দিলাম আড্ডা।
রাত্রে বাড়ীতে ফিরে দেখি দাদু করেছেন মুখ গোমড়া, 
নতুন চাকর র্গদার কান ফুলে হয়ে গেছে কুমড়া।
অনেক বুঝিয়ে র্গদার শিরে ঢেলে পানি কয় ভান্ড,
আমরা সবাই হেসে মরে যাই শুনে সে দারুণ কান্ড।
র্জদা ফুরায়ে গিয়েছে দাদুর র্গদারে কন আনতে,
র্জদা কি করে ‘দরজা’ হলো তা বেচারা পারেনি জানতে।
অনেক কষ্টে পাশের বাড়িতে বিশ টাকা করি র্কজা
দোকান থেকে এনেছে কাঠের ইয়া বড় এক র্দজা।

২১। আকাশ

খোকন শুধায় মাকে,
‘বলোতো মা, আকাশ বলে কাকে?’
মা হেসে কন ‘জানালার ঐ ফাঁকে’
অনেক দুরে যায়গো দেখা যাকে
আকাশ বলে তাকে।’

খোকন বলে ‘মা!
দেখছি তুমি কিচ্ছু জান না’
মা হেসে কন ‘তাইতো আমার খোকন জানে তা।
এর লাগি তো মেঘের মেয়ে কেঁদে ভাষায় গা,
মেঘ বুড়োটা দাপটে করে রা,
মেঘ বুড়ী দেয় আচল দিয়ে বা,
কখন জানি খোকন খুলে হাঁ!’

খোকন শুনে কয়,
‘মেঘ আর আকাশ এক কি করে হয়?
চোখ দিয়ে যা দেখছো তা ঠিক নয়।’
মা হেসে কন, ‘তাইতো করি ভয় 
দিনে দিনে সব কি পাবে লয়, 
চোখের দেখায় থাকবে না আর চোখের পরিচয়?’

খোকন বলে, ‘মা---’
মা হেসে কন, ‘ঘুমা, খোকন ঘুমা,
এইতো আকাশ দিচ্ছে তোরে চুমা।

২২। আসপে তাজী

ছুটছে ঘোড়া, ছুটছে ঘোড়া 
এক দুটি নয় অনেক জোড়া।
চলছে ছুটে ঝড়ের বেগে
ওদের পায়ের ঝাপটা লেগে
চারদিকেতে উড়ছে ধূলি
শোর তুলেছে মানুষ গুলি, 
জোরসে সাবাশ টাট্টু জোরে
পংখীরাজের মতোন উড়ে
ছুটছে সকল ঘোড়ার আগে
আর ওরে কেউ পায়কি বাগে, 
চলছে ছুটে জিতবে বাজি
নাম হলো ওর আসপে তাজী। 

আসপে তাজী ছুটছে কদম
সইস লাথি মারছে বেদম,
পিঠের পরে ঝাপটে বসে
আলতো হাতে লাগাম কষে- 
দেখছে আবার পিছন ফিরে
আর ঘোড়া কি আসলো ঘিরে, 
উঠছে হেঁকে ‘হেইও সাবাশ!’
টাট্টু জোরে ফেলছে নিশাস,
ঘামছে, মুখে উঠছে ফেনা
ধূলোয় ধূলোয় যায়না চেনা, 
বাড়ছে আগে জিতবে বাজি
সাবাশ ঘোড়া আসপে তাজী! 

২৩। দামা খাঁ

        ওপাড়ার দামা খাঁ
        হাটে ঘাটে খামাখা
যারে পায় তাকে দেয় গুঁতিয়ে।
	তাই দেখে ছেলেরা
	ভাবে এই-কেলেরা
একদিন দেবে তারে জুতিয়ে।
	হয়ে পাঁচ খানেতে
	গেলো তার কানেতে
ছেলেদের কথা এই জুতানি।
	শুনে চোখ পাকায়ে 
	দামা ওঠে লাফায়ে
বেড়ে যায় আরো তার গুঁতানি।
	তোলপাড় পাড়াটা
	বাড়ে শিং নাড়াটা
জুতা যদি দেখে কারো পায়েতে।
	জুতানির ভাবনা
	ছেড়ে দেয় জাবনা
নুন যেন পড়ে কাঁচা ঘায়েতে।
	সেইদিন গোয়ালে
	ডেকে তাই শুধালে,
‘কিহে দামা, ঘাস কেন খাওনা?
	দামা বলে,‘হায়রে,
	জাত বুঝি যায়রে-
মোর ভাগে ছিলো এই পাওনা!
	মুঁই জাতে দামড়া
	দিয়ে মোর চামড়া
কতো জুতা বানিয়েছে চামারে;
	রাখি কোথা লাজকে,
	তাই দিয়ে আজকে
পিটাবারে চায় ওরা আমারে।’