গোবদা সাধুর কোর্তা

কিশোর কবিতা সংকলন

গোবদা সাধুর কোর্তা

গোবদা সাধুর কোর্তাটি দেখতে বেশ জবরজং 
খুজঁলে পরে মিলবে তায় রংধনুকের সাতটি রং
আসলে কোন রং তো নয় সাত কাপড়ের সাতটি তালি 
বাড়ছে যতো ভুড়ির বেড়, বাড়ছে ততো তালির ঢং। 

সাধুর মতো নয় মোটেই দেখতে গেলে তার ভুঁড়ি 
রোজ দুবেলা ঢালছে সে তায় পরোটা এক কুড়ি।
বললে তারে, ‘বুঝলে ভাই পেটটা তোমার নয় সাধু!’ 
বলবে, ‘দেখো কোর্তাটা, হয় কি কোথাও এর জুড়ি?’

বললে তারে, ‘পাললে পেট, কামাই করে খাও, দাদা!’
বলবে, ‘পেলে পরেরটা কামায় নিজে কোন্ গাধা;
তোমরা আমায় কও সাধু, যোগাও সবে অন্ন মোর,
তাই দিয়েতো পেট ভরি, উপরি আরো পাই ছাঁদা। 

এর  লাগিয়া দিনকে দিন বাড়ছে নিপট ভুঁড়ির ব্যাস;
ভয় কী জানো? ওর মাঝে মেদ শুধু নয় জমছে গ্যাস। 
ঢেঁকুর তুলে বাই ছেড়ে সবটা কি আর  হয় খালি,
ভাবনা কখন যায় ফেটে লাগলে নিরেট কিছুর ঠ্যাস।

তাইতো আমি কোর্তাটায় তালির পরে দেই তালি,	
রাখছি ঢেকে ভুঁড়ির বেড়, দেখলে লোকে দেয় গালি।’
বললে তারে, ‘এই বুঝি তোমার সাধু গিরির ভেখ?’
বলবে, ‘লোকে দেয়না তাই আমার মুখে চুন কালি।’


ফালতু সায়েব শ্যাওড়া তলার ফালতু সায়েব, হলেন জমিদারের নায়েব, গোফজোড়া তার ইয়া মোটা মোটা; খাজনা পাতি করেন গায়েব, কেউ যদি তার ধরলো আয়েব অমনি ছুটেন নিয়ে লাঠি সোঁটা। বলেন, ‘বেটা হারামজাদা, না হলে তোর বাপ আর দাদা এমন ছিলো নাতো কোন কালে; নাকের পরে ঘষলে রাঁদা, করতো না রা, এমনি সাদা বলতো ‘হুজুর’ কথার তালে তালে। তুই হয়ে তার ছেলের ছেলে, এমন শিক্ষা কোথায় পেলে, মানীর গায়ে মারিস কাদা ছুড়ে; একাই আমি সবটা খেলে, কখন চলে যেতাম জেলে মানতো কি কেউ আমায় রাজ্যি জুড়ে!’ সবাই শুনে বললে, ‘আহা, আরে না, না, হয় কি তাহা, ফালতু সায়েব এমন ভালো লোক; বউ মরেছে, শুনছি যাহা, আসলে তা নয়, মিথ্যে ডাহা, নইলে কি আর করেন বৌয়ের শোক। সদাই টুপি রাখেন মাথে, হাজার দানা তসবি হাতে, হজ্ব করেছেন খরচ করে টাকা; খোদার ভয়ে কাঁদেন রাতে, বাগড়া কে আর দেবে তাতে ঘর খানা তার রইলো আজো ফাঁকা।’ ছোকড়া গুলা বেজায় পাজি, বললে, ‘হলো তাই তো হাজি, বউ মারা পাপ হজেই হবে মাপ; দখিন পাড়ার গপসা কাজি, বারুই পাড়ার চিমঠে মাঝি সবাই জানে যায়না ঢাকা পাপ। ছেলেটা তার মরলো কিসে, কেউ পেয়েছে কি তার দিশে? বললে মোরা করবে সবাই রোষ; তাই যদি কই পাপের বিষে কিপটে যাঁতায় ফেলেছে পিষে অমনি হবে ছোকড়াগুলার দোষ। বউটা ছিল জবর ভালো, দেখতে কিছু হোকনা কালো দেয়া থোয়ায় হাতটা ছিলো খাসা; ফালতু সেতো কিপটে মালো, দেয়না রাতে ঘরেই আলো, এমন বৌয়ের বুঝবে কী সে চাষা। তাইতো সেবার ছেলের শোগে, ধরলো তারে বিষম রোগে বিছনা ছেড়ে উঠাই হলো দায়; অশুধ তার ছিলোনা ভোগে, করবে ভালো তাবিজ যোগে ফালতু গিয়ে ধরলো ওঝার পায়। শুনতে পেয়ে আমরা সবে, তার কাছেতে গেলাম যবে বললে, ‘তোরা বুঝিস কী বা ছাই; অশুধ খেলেই ভালো হবে, তাইলে কি আর মরতো ভবে, অশুধ কেনার পয়সা কোথায় পাই!’ সবার কথা ফেললে জলে, এর পরে কি বাক্যি চলে, আমরা ফিরে এলাম বিরস মুখে বৌ ছেলে তার মাটির তলে গেলো কিপটেপনার ফলে ফালতু সায়েব তাইতো আছে সুখে। কমলো খরচ বাঁচলো টাকা, তাতে গড়বে দেনার চাকা, মাটির তলে যাবেইযে তা নিয়ে; ঘরখানা তার থাকবে ফাঁকা, যতোই ভুরু করুক বাঁকা দেখবো মোরা দেয় কে তারে বিয়ে!
গবেষণা [সমালোচনা] অতবড়ো জন্তুটা নাম তার এইটুক, শুনে তাই খুকু সোনা হেসে উঠে খুকখুক। বলে, ‘বাবা, বলি হারি বুদ্ধিটা বুড়ো দের, কী দেখে যে নাম রাখে, দিশে নেই মুরোদের। নইলে যে হাত নেই সে কথাতো জানতো, শুঁড় আছে নাম দিয়ে তাই টেনে আনতো। মোটা মোটা পাও আর দাঁত দুটি মুলা যার, বড়ো সড়ো দেহ আর কান দুটি কুলা যার; তার নাম খেলা নয়, বুঝে হবে রাখতে, শব্দের ঠেকা কি অভিধান থাকতে। [প্রস্তাব] শুঁড় দেখে নাম তার রাখা যায় শুন্ডুল;* ছোটো হোক হস্তীর মতো নয় ভন্ডুল। পাও দেখে নাম তার রাখা যায় স্তম্ভ; (বুদ্ধিটা খেলে ভালো, করি নেকো দম্ভ।) কান দেখে শূর্প ও দাঁত দেখে কন্দ, দেহ দেখে পর্বত তবে মিলে ছন্দ। তারপর করে সব এক সাথে সৃষ্ট দরকার হলে করো শিলনোড়া পিষ্ট। মিলে মিশে হবে নাম জন্তুর যুক্ত ‘মদ-শূর-ভন্ডুল-পরব্ত-শুক্ত’। [*পাদটিকা ] শুন্ডের সাথে যোগ করে উল প্রত্যয় শুন্ডল হবে নাকি ব্যাকরণ ব্যত্যয়; এই মতো অভিমত করেছেন ব্যক্ত নিধিরাম পন্ডিত। হয়ে যাই ত্যক্ত, তাই হলে যেতে হয় ব্যাকরণ শিখতে তারপর যেতে হয় গবেষণা লিখতে! এই করে গোল্লায় গেলো পুরো দেশটা, গবেষণা করবার নেই কারো চেষ্টা। কেউ যদি করে তাকে করে দিতে পন্ড এক পায়ে ছুটে সবে উঁচু করি দন্ড।
করুণা বেচারাম দেউড়ি, ভোরে হয়ে খেউড়ি একটিন মুড়ি দেন ছড়ায়ে; শালিক আর কাকরা পায় তাতে বখরা। নিজে এক ঘটি জল গড়ায়ে পাখিদের তুষ্টি হলে দুই মুষ্টি মুড়ি খান খুব করে চিবিয়ে; তারপর ঢকঢক ঘটি করে ভকভক জল ঢেলে দেন ক্ষুধা নিবিয়ে। চান করে নদীতে চলে যান গদীতে পথে তার দেরী হয় কিছুটা, মাছ কিনে ছাড়াতে পিপড়ে না মাড়াতে বারবার দেখে পার নীচুটা। মানুষ কী নষ্ট দেয় জীবে কষ্ট ভেবে তার মনে হয় দুঃখ; তাই দেখে নিকারী ঘুঘু বক শিকারী মেজাজটা হয়ে যায় রুক্ষ। ঠেস দিয়ে তাকিয়ে বসে যান জাঁকিয়ে নিয়ে রোকড়ের খাতাপত্র; মনে তার আছে ভাব এই বার হলে লাভ খুলবেন এক দান সত্র। দেশে অনাবৃষ্টি জ্বলে গেলো সৃষ্টি, খাদ্যের দাম তাই বাড়ছে; দিনকাল মন্দা রোজ ভোর সন্ধ্যা ভিক্ষুক দ্বারে হাঁক ছাড়ছে। বেচারাম গুদামে রেখেছেন সু দামে ধান চাল কিনে লাখ বস্তা; দেখা যায় শুভচিন যাক আরো কিছুদিন দরদাম এখনো তো সস্তা। এরপর বন্যা কেঁদে মেঘ কন্যা দেশটারে করে দিলো গর্ত; চারদিকে হাহাকার ভেসে গেলো ঘর দ্বার এক হলো আকাশ আর মর্ত্য। এক মুঠি খাদ্য পায় কার সাধ্য নাহি দিলে এক মুঠি তংকা; সব ঘরে তাও নাই আছে শুধু খাই খাই রাত দিন মরণের শংকা। পায় যদি অন্ন হয়ে মতিছন্ন গাঁও ছেড়ে লোক যায় শহরে; ‘দাও দুষ্টি ফেনভাত’ কাতরায় দিনরাত মেটে নাকো ক্ষুধা আট পহরে। লঙ্গড় খানাতে দুটি ক্ষুদ দানাতে কয়জন পাবে আর রক্ষা; কিছুপানি চাল ডাল তার চেয়ে লাথি গাল বেশী খায়, শেষে পায় অক্কা। দেশ যবে মর মর বেচারাম পেয়ে দর রাতে রাতে করে দেন বিক্রি; ধান চাল কোথা যায় তাতে তার নাহি দায় যথা লাভ তথা তার ডিক্রি। নেই কোনো শংকা লাভে মূলে তংকা কতো হলো, গোনা তার কর্ম; জীবে দয়া করলে গতি হবে হবে মরলে জীবে দয়া তাই তার ধর্ম। এই ঘোরে আকালে আজো তাই সকালে চাল মুড়ি দেন তিনি ছড়ায়ে; ঘুরে দেখে পাড়াটা মাছ কিনে ছাড়াটা হয় নাকো, বেলা যায় গড়ায়ে বসে থেকে বাড়ীতে; কভু যান গাড়ীতে পথে ঘাটে চোখ করি অন্ধ। চার দিকে হাহাকার নেই কাজ কারবার রেখেছেন গদী তাই বন্ধ।
অতুলন ঘরের দাওয়ায় একটা পোষা বাজ পাখী থাকতো বসে, আপন মনে খুঁটতো গা; মোরগ বুড়া দেখতো তারে দূর থাকি, বললো সে দিন, ‘শুনছো ওগো বাজের ছা, তোমার মতো নবাব কোথাও নেই নাকি, মান যাবে কি আমার সাথে করলে রা?’ তাইনা শুনে উঠলো রেগে বাজের পো, বললে, ‘ওরে নিমক হারাম, বলিস কি? তোর সাথে মুই বলবো কথা, ওয়াক থু, মুখের দিকে যায়না চাওয়া বালাই ছি!’ বললে মোরগ, ‘মেজাজ কারে দেখাস তু, মোরগ কারো ধার ধারে না শুনিস নি? মুচকি হেসে বাজ তারে কয়, ‘হায় কপাল, পরের ঘরে থাকিস তবু বলিস এই!’ মোরগ বলে, ‘মিছাই ঝারিস মুখের ঝাল তুইও থাকিস পারের ঘরে, সন্দে নেই।’ বাজ বলে, ‘দুর, বলছি ভালো বুঝলি গাল।’ মোরগ বলে, ‘বৃথাই হারাস কথার খেই।’ এই না শুনে বললে রেগে বাজের পুত, ‘বলছি যা মুই একটি কথাও মিথ্যে নয়; মালিক এতো খাওয়ায় তবু পায়না জুত, ধরতে গেলেই দৌড়ে পালাস, কিসের ভয়? পরের খেয়ে হামবড়া তোর জাতের খুঁত, বলবি তবু মিছাই বাজে নিন্দে কয়।’ ‘দেখতো আমায় ছিলাম কোথায় জঙ্গলে মালিক এনে আদর করে পাললে, তাই ডাকলে পরে উড়াল দিয়ে যাই চলে, হাতের কাছে দিই ধরা, তায় নেই কামাই।’ মোরগ বলে, ‘হয়তো তা ঠিক, তাই বলে জানিস কী তুই, কিসের তরে মুই পালাই?’ ‘জীবন ভরে দেখলি নেতো কোথাও বাজ, তোদের কারো গোশ্ত দিয়ে রাঁধতে ঝোল; দেখলে পারে ধরতিরে তুই মোদের সাজ, ডাকলে তোরেও পালাতি, তায় নেই যে ভুল। তুই আর মালিক শিকার করা তোদের কাজ, শিকার যে হয়, তার সাথে নেই তোদের তুল।’
হুক্কাহুয়া দুপুর বেলা সবার চোখে লাগছে যখন ঘুমের ছোঁয়া, ঠিক তখনি শিয়াল বুড়ো উঠল ডেকে হুক্কা হুয়া। বললে সবাই, ‘ব্যাপার কিহে, ডাকছো ডেকে এই অবেলা? ঘরের বুড়ী মারলো কি ভাই কনুই দিয়ে বিষম ঠেলা?’ বললে শিয়াল, ‘ঠাট্টা রাখো, ডাকছি কি আর অমনি সাধে, দুদিন ধরে পাইনি কিছু বাচ্চা বুড়ী ক্ষিধেয় কাঁদে। মোড়ল বাড়ীর কুকুর গুলা এমনি পাজি, বলবো কি আর, ওদের হাঁকে ওই পাড়াতে যাওয়াই হলো ভীষন ব্যাপার। মোড়গ গুলাও সুযোগ বুঝে ঠ্যাং দেখিয়ে করছে খাতির, শিয়াল খেলে জাত যাবে, তাই লোকমা হবে মানুষ জাতির। ছোকড়াগুলাও দেদার চেঁচায়, ‘ওইযে শেয়াল, ওইযে শোয়াল!’ তোরাতো খাস রাজ্যি গিলে শিয়াল কি তা করছে খেয়াল? একটি মোরগ, ছাগল ছানা এইতো মোরা করছি দাবী, নাই দিলি তা, চেঁচাস কেনো, না হয় তোরা নিজেই খাবি! খোদার দেয়া এই দুনিয়া খুব চুটিয়ে করলি রে ভোগ তোদের সাথে জাত গোলাম ঐ কুকুর গুলাও দিচ্ছে যে যোগ; তাই দেখে তো কলেজ ফাটে, এমনি হলো পশুর পতন! সব খেকো ঐ মানুষ গুলার এমন করে করছে যতন। এইনা শুনে বললে কেহ, ‘নাই বা গেলে ওই পাড়াতে, বিদ্ঘুটে ঐ মানুষ পালা মোরগ গুলার দাও মারাতে। বিলের ধারে মাছ আছে আর কাঁকড়া শামুক দেদার মিলে, তাই দিয়ে পেট না হয় তুমি এই কটা দিন ভরেই নিলে। তারপারে তো মড়ক আছে মরবে মোরগ, মরবে গরু; কুকুর শকুন খেলেও তাতে পালতে পাবে বাচ্চা জরু।’ বললে শুনে শিয়াল বুড়ো, তুইতো দেখি আস্ত হাঁদা! বুঝবি কিসে ভোজের বাড়ীর পাত চাটা তোর নিত্যি সাধা। বিলের ধারে মানুষ গুলা বাঁধ দিয়েছে মাছের লাগি, আলোও জ্বেলে বাঁধের পারে সমস্ত রাত থাকছে জাগি। তাই তো সেদিন চুপটি করে ছিলেম বসে বাধেঁর পাশে, মিলতে পারে একটি মাছও নিদেন কাঁকড়া, তারই আশে। হায়রে কোথা মাছ পাবো আর কাঁকড়া খাবো, তার বদলে একসেরী এক ঢেলার চোটে ঝাঁপ দিলেম ঐ বিলের জলে। অনেক করে সাঁতরে শেষে জানটা নিয়ে এলাম ফিওে; আর কিওে যাই বাঁধের কাছে বৌ দিয়েছে মাথার কিরে। মরবে কবে মোরগ গরু, সেই আশতে বাঁধবো পাথর, এই করে কি দিন চলে আর দুদিন ধরে ক্ষিধেয় কাতর! বাচ্চা বুড়ী মরবে, শেষে মরবো নিজেও পেটের জ্বালায়, এর লাগিতো শুনছি এখন বাচ্চা রেখে শিয়াল পালায়। বাপ দাদারা ভালোই গেছে, মিলতো তখন অল্প বেশী, দুদিন ধরে অমন করে খিঁচতো নাতো পেটের পেশী। তখন এমন হন্যে হয়ে সব খেতো না মানুষ গুলো, খুব সহজেই দেওয়া যেতো কুকুর গুলোর চক্ষে ধূলো। ক্রমেই যতো যাচ্ছে রে দিন বাড়ছে ক্ষিধে, ছল-চাতুরি, লুটছে সবাই ইচ্ছামতো চুরির পরে করছে চুরি। তাই হলো আজ শিয়াল বোকা দেখছে চোখে সকল ভুয়া, দিন দুপুরে ডাকছে রে তাই হুক্কা হুয়া, হুক্কা হুয়া।
গাধা ঘোড়ার নাতি একটা হাতি বললে যখন এক গাধাকে ‘তোমার দেহ দেখলে কেহ করবে স্মরণ মোর দাদা কে। বললে গাধা, ‘তোমার দাদা এমন করে বলতো যদি, তাইলে কি আর থাকতো গো তার পিঠের পারে জিনের গদি। তোমরা ছেলে নতুন কেলে মানছো না তাই দাদার প্রথা; আমার কানে কিসের টানে বলছো রে ভাই এমন কথা? এ মুখ পোড়া বিশ্ব জোড়া নাম কিনেছে তার লোভে কি? তাইলে মোরে দাদার জোরে যেই চিনেছে, তার শোভে কি?’ বললে হাতি ঘোড়ার নাতি, আর কিছু নয়, কান দুটি তার তোমার মতো ভাবছি যতো মোর মনে হয় এমনি আকার। হাসলে গাধা, বললে,‘হাঁদা, কান দিয়ে কি বিচার চলে! বিরাট কায়া করলে ভায়া তাই গিয়ে কি হাতির দলে?’
মাছরাঙা নদীটার পাড় যেথা ভাঙা পুকুরে ধারে যেথা ডাঙা, সেই খানে ঝোপে ঝাড়ে বসে থাকে চুপি সারে তোমরা দেখেছো তারে নাম? তাও জানো ঃ মাছরাঙা। দেখে তারে মনে মনে ভাবলে, জ্যান্ত কি মরা, নেই সাড়া তো? একটু দাঁড়াও দুরে আগলে, চুপ কওে, নেই কোন তাড়াতো? দেখছো কি? বসে আছে চুপচাপ মাখছেনা গায়ে কোন রোদ তাপ; চোখ দুটি একঠাঁয় পানি যেথা বয়ে যায়, কি জানি কিসের দায় আচমকা টুপ করে দিলো ঝাঁপ। ঝুপ করে হলো একশব্দ দেখতে না দেখতেই এলো ফের, ঠোটে তার মাছ; তুমি স্তব্ধ দেখে তার খেলা এক পলকের। খেলা নয়, দেখলে যা আজ তার ঝোপ বুঝে কোপ মারা কাজ তার; খেয়ে দেয়ে আছে সুখে গায় পাখা ঠোঁট মুখে মাছের স্বপন চোখে আহা মরি শিকারীর সাজ তার! মাছ খেয়ে বেড়ে গেছে চেকনাই পাখা আর ঠোঁট হলো রাঙা, সবে মিলে নাম বুঝি দিলো তাই মাছ খেকো নয়, মাছরাঙা!
অযাচিত অনেক দূরে এক দেশে এক জঙ্গলে সেবার এলো শীত, পড়লো ঝরে গাছের পাতা গাছ তলে থামলো পাখীর গীত। সেথায় ছিলো বাঁদর ছিলো না তার চাদর, কোথায় পাবে ঘরের কোনে লেপের তলার আদর! এমনি খালি হাতে ঘুরছিলো সে রাতে। বইছে তখন হিমেল হাওয়া কনকনে কাঁপছে চারিধার ভাবছে বনের পশু পাখী নিজমনে উপায় নাহি আর। শীতের চোটে কাতর ঠক্ঠকে সেই বাঁদর দেখতে পেলো পথের ধারে চকচকে এক পাথর। আগুন ভেবে তাতে করলো জড়ো হাতে গাছের ঝরা শুকনো পাতা কয় মুঠো, লাগালো তায় ফুঁক, ফুঁয়ের চোটে হয় বুঝি তার পেট ফুটো যায় বা ফেটে মুখ। মোরগ ছিলো দূরে ঝোপের অন্তঃপুরে বাঁদর ভায়ার ব্যাপার দেখে মুন্ডু গেলো ঘুরে। ভাবলে বোকা, হায় চকচকে যা পায় তারেই ভাবে আগুন, আহা এর তরে করতে কিছু হয় - এইনা ভেবে বললে, ‘মিছাই, শোন ওরে করিস দেহ ক্ষয়। পাথর পাতায় জুড়ে দিলেই কি আর পুড়ে? হবার যা নয় তার লাগি তুই মরিস মাথা খুঁড়ে!’ বাঁদর শুনেও তায় মাখলে নাকো গায়। ভাবলে মোরগ শুনতে পেলে করতো রা, পায়নি বুঝি তাই পুণ্য কাজে কষ্ট কী আর তুলতে গা আমি নিজেই যাই। মোরগ ভেবে এই কাছে গেলো যেই, বললে বাঁদর, ‘কিসের তরে নাচিস রে ধেই ধেই?’ মোরগ বলে, ‘হায় বোঝান তরে দায়! বাঁদর বলে, ‘আহারে মোর বুদ্ধিমান বোঝানো তোর রাখ।’ এই না বলে জাপটে ধরে মুন্ডু খান করেই দিলো ফাঁক।
কাঁথা অনেক বছর আগে পৌষে কিবা মাঘে ঠিক মনে নেই- শীতের চোটে করলে চুরি কাঁথা একটা বুড়ো বাঘে। গায় দিয়ে সে কাঁথা করলে দেহ তাতা, তারপরে সে আরাম করে ফিরলে গুহার দিকে দোলদুলিয়ে মাথা। বাঘের বুড়ী দেখে ভাবছে ওমা, একে? দেখতে যেন বাঘের মতো গায়ে আবার কীযে রং এসেছে মেখে। দুলছে মাথা কোনো ভালুই হবে যেনো; পালাই তবে দেখলে পারে করবে বিষম তাড়া নাইতো মাতাল হেনো। বাঘ দেখে তার বুড়ী পালায় গুড়িগুড়ি; বললে ডেকে, ‘ও বুড়ী তুই যাস পালিয়ে কোথা আঁধার করে পুরী?’ শুনলে বুড়ী তাহা, বললে ফিরে, ‘আহা, ঢং দেখে আর বাঁচিনে গো, শেষ কালে তুই বুড়ো ভয় দেখালি ডাহা! গায় দিলি কী ওটা, দেখতে তো বেশ মোটা! বাষ বলে, তা বলছি পরে আগুন ধরাবি তো শুকনো পাতা জোটা। বসলে আলাও কওে হুঁকায় তামুক ভরে, বললে, ‘বুড়ী! শীতের দিনে এই গায়ে না দিলে মানুষ যেতো মরে। বললে বুড়ী হেসে খুকখুকিয়ে কেশে, ‘বাঘও বুঝি মরতো এবার যদিই না সে চুরি করতো তাহা শেষে!’ এই না শুনে বাঘে উঠলো কেঁপে রাগে, বললে, ‘বলিস এমন কথা দিলেম তবে ফেঁকে দেখি কী শীত লাগে! এই না বলে কাঁথা ফেললো করে যাতা, আগুন রেগে পুড়লো, তাতে বাঘবুড়া ও বুড়ীর গা হলো খুব তাতা।
দুষ্টুমি মায়ের কাছে এক যে আছে দুষ্টু খোকা নয় সে বোকা, দুষ্টুমিটা এমনি মিঠা বলবো কী আর! গল্পটি তার শুনলে তুমি মুখটি চুমি বলবে খেঁচে থাকসে বেঁচে দুষ্টুমিতে সবার চিতে। রাতের শেষে ঘুমের দেশে সূয্যি যখন দেখছে স্বপন তখন খোকা সে এক রোখা উঠবে জেগে বলবে রেগে, খুলবে না দোর, হয়নি কি ভোর? তখন তারে সবাই হারে বললে কিছু ডাকলে পিছু শুনবে সে, বসবে পাশে বলবে, মাগো তোমরা জাগো, সবাই কেনো আলসে হেনো! এই দেখোনা যাচ্ছে শোনা কাকের কাকা লাগছে ফাঁকা আঁধারটা যে, কয়টা বাজে? দেখবে ঘড়ি আনবে ছড়ি খুলতে যাবে এমনি ভাবে দরজাটাকে - বলবো কাকে, দেখতে খাসা যায়না হাসা; হাসলে কেঁদে মাথায় বেঁধে তুলবে টেনে, সেটুক জেনে থাকছি শুয়ে। সে একগুঁয়ে করছে তখন অনেক যতন ছড়ির আগায় খুলতে সে চায় ছিটকিনি টা, এমনি চিটা যায় না খোলা খাচ্ছে দোলা হাত দুটি তার মজার ব্যাপার! দেখছি, শেষে ফেলছি হেসে এমনি খোকা সে এক রোখা উঠলো রেগে ছুটলো বেগে আনলো ধরে আনেক করে চেয়ার টাকে দ্বারের ফাঁকে। তারপরে সে মুচকি হেসে দরজা বেয়ে উঠলো যেয়ে চেয়ার টাতে ধরলো হাতে ছিটকিনিটা, দুষ্টুমিটা বলবো কী তার, খুললো সে দ্বার। তাইতো খোকা ফুলের থোকা উঠলো হেসে, এক নিমেষে তার সে হাসি আলোর রাশি পুব আকাশে, ছড়ায় ঘাসে। ঘরের মাঝে আর কি সাজে আমায় শোয়া, লাগছে ছোঁয়া দুই চোখে মোর - রাত হলো ভোর।
ব্যাঙের সর্দি আষাঢ়ে মেঘের নতুন পানিতে কসরত করে ঠ্যাঙের সর্দি লেগেছে ব্যাঙের। চুপ করে বসে কাটায়েছে পুরা শীতকাল বাইরে যায়নি, বুঝেনি দেশের হালচাল। ফাগুন চৈতে আগুনে হাওয়ার হলকা, বৈশাখে জেঠে মাটিরে করেছে বলকা। কখনো ছুটেছে মাতাল ধুলির ঝরনা, এলো মেলো করে দিয়ে গেছে ঘর-করনা। তবুতো টলেনি নিঁদালু ব্যাঙের ঘাপটি, দুটি চোখ বুজে রয়েছে সে মাটি সাপটি। তার পরে যেই আষাঢ়ে মেঘের গুরগুর আকাশ বাতাশ কাঁপায়ে তুলেছে ভীমসুর। হাটে ঘাটে মাঠে নুপূর বেজেছে রিমঝিম, তরল পরশে ধরনী হয়েছে হিমহিম। অমনি টুটেছে ব্যাঙের দুচোখে চটকা, খুশিতে দু’গাল ফুলায়ে হয়েছে মটকা। নতুন পানির আসরে জমেছে গাওনা, এমন সময় সর্দি কি ছিলো পাওনা! সর্দি লেগেছে ব্যাঙের বারবার তাই তাল কেটে যায় রাগিনী গ্যাঙর গ্যাঙের। তবলার বোল তাধিন তাধিন ধিনতা, ব্যাঙোনীর গালে ফুটেনা, হয়েছে চিন্তা। কেমনে সর্দি দূর করা যায় তাইতো, ডাক্তার ছাড়া আর কোনো পথ নাইতো। শেষে লেজ নেড়ে এলো এক চ্যাঙ ডাক্তার, বললে, ‘পয়লা উঁচু করে দাও নাক তার। চ্যাপ্টা নাকের সর্দিতো বের হয় না গলায় চেপেছে, সুর তাই কথা কয়না।’ কচুর ডাঁটায় লাগিয়ে বিষম ঠেকনা, উঁচু হলো নাক। ঔষধ, তাও এক না। মাথায় দিয়েছে সবুজ শ্যাওলা পট্টি, গলায় দড়িতে পড়া গেরো একষট্টি। বুকেতে মালিশ ফেনা আর খাবে নোনতা, তা হলে বুঝবে অশুধের কীযে গুণ, তা। এর পওে যদি উবু হয়ে থাকো দেড় দিন, তাইলে রবেনা দেহে সর্দির কোনো চিন। উঁচু করে নাক উবু হয়ে থেকে ঔষধ খেয়ে চ্যাঙের সর্দি সেরেছে ব্যাঙের।
জোনাকী রাতের বেলা আকাশটাতে অনেক গুলি তারা কী যেনো কী খুঁজে বেড়ায় হয়ে পাগল পারা। মিটমিটিয়ে পিটপিটিয়ে রগড়ে নিয়ে চোখ, যতোই খুঁজে ততোই বাড়ে খোঁজে দেখার রোখ। এটুক লিখে ভাবছি যখন, হঠাৎ খোকন এসে, আমার ক’লাইন পদ্য পড়ে উঠলো বেজায় হেসে। বললো, বাবা, এই লিখেছো, তাও জানো নাকি? আসলে ওরা তারাতো নয়,ওরাও জোনাকী। অনেক দূরে আকাশ টাতে বিরাট গহীন বন, গাছের পরে গাছ সেখানে নেইকো মানুষ জন। পশুও নেই পাখীও নেই, দেও পরীদের বাস, বড়োই সুখে সেথায় তারা কাটায় বারোমাস। কইনু হেসে, গল্প তোমার কোথাও শোনা কি? নইলে কোথায় দেও পরী আর কোথায় জোনাকী! বললে রেগে, ‘শোনেই না ছাই, বলবে আবার কে, তোমাদের ঐ গল্পতো সব ‘গাঙ শালিকের বে’।’ তারপরে সেই গহীন বনে নেই কো দিবস রাত, চাঁদ সুরুজও করে নাকো সেথায় আলোক পাত। ঘুটঘুটে সেই আঁধার মাঝে জোনাকীদের মেলা, তার আলোতে দেও পরীরা খেলে মজার খেলা। খাওয়া পরার ভাবনা তো নেই, নেই কো ঘুমের টান, সবাই সেথায় নেচে বেড়ায় সবাই গাহে গান। চাঁদের চেয়ে আগে সেথায় তাইতো যাওয়া চাই, সেথায় যাবার গড়বো রকেট পয়সা যদি পাই।
মোমবাতি বাদশা দিলেন হাজার টাকা খাজারে, কী সব নাকি আনতে যাবে বাজারে। লোকটা ছিলো বেজায় চটা ফেললো ছিঁড়ে শূণ্য ক’টা, বললো রেগে, ‘খেয়েছে কী গাঁজারে! নইরে কি দ্যায় এক টাকা এক হাজারে। এক টাকা তে কিনলো সে মোমবাতি, ভাবলো, এতে চলবে গোটা দিনরাতি। আলোর চেয়ে আর কী ভালো, এইনা হলে সবতো কালো। তাই ভেবে সে খুব ফুলিয়ে নিজে ছাতি, বাজার থেকে র্ফিরলো চড়ে শ্বেত হাতি। বাদশা বলেন, ‘ব্যাপার কি হে সওদা কই? দেখছিনেতো কিছুই হাতির হওদা বই।’ বললে খাজা, ‘এই তো হাতে, আর কী পাবো এক টাকাতে; কিনেছি এই মোমবাতি। মুই আর যা হই, সবার মতো নিসটে বোকা মোটেও নেই। বাদশা বলেন, ‘দিলেন টাকা এক হাজার একটাকাতে করবি কেনো এই বাজার! নয়শ নিরানব্বই বাকী অমনি হবে মিথ্যে ফাঁকি, করলি কী তা, দম দিয়েছিস কোন গাঁজার? এই না বলে সাপটে ধরেন ঘাড় খাজার। চেঁচায় খাজা, ‘দোহাই হুজুর, মিথ্যে নয়; মটকে আবে ঘাড়টা বেজায় করছি ভয়। ডাকুন দেখি মুনশীজিকে আঁকটা দিলো সেই তো লিখে এক ছাড়া আর শূণ্য সবই, তাইতো হয়; শূণ্য গুলির নেই যে মূল্য সবাই কয়। বাদশা বলেন, ‘এহ বুঝি তোর আঁক শেখা, শূণ্য কবে পৃথক করে হয় লেখা? একের পিঠে শূণ্য দিলে তবেই তোরে হিসাব মিলে। শূণ্য কোনো সংখ্যাতো নয়, এক রেখা। মগজ তোর গোবর কতো যাক দেখা।’ এই না বলে বাদশা দিলেন এক ধমক, দূর হলো তায় খাজার যতো জাঁক জমক। মাথায় পোড়া গোবর নিয়ে আন্ধা গোরে ঢুকলো গিয়ে, বাদশা গেলেন শুনতে খেয়াল সুর গমক, অমনি মাথায় একটা কথা দেয় চমক। বলেন ডেকে খাজাঞ্চীকে, ‘ঠিক কি তাই, চায়নি খাজা হাজার টাকা তোমার ঠাঁই? খাজাঞ্চী কয়, ‘হায়রে কপাল, কোথায় পাবো খাজার নাগাল, কর্জ নিলে একটাকা, তায় দেখাই নাই হাজারতো দূর আর তারে দিই একটা পাই। বাদশা বলেন, ‘এই সেরেছে, হায় বোকা দিয়েছিলাম হাজার টাকার এক রোকা দেয়নি সে তা তোমার কাছে তাইলে সে তার সাথেই আছে, তাই তো এক আর শূণ্য নিয়ে এক রোখা গোল পাকালে, আমায় দিলে এই ধোকা।’ বাদশা বসে খাজার গোরের পাশটাতে দিলেন জ্বেলে মোমবাতিটা নিজ হাতে, বলেন, ছিলো লোকটা ভালো তার গোরেতে জ্বলুক আলো।’ দিলেন রেখে হাজার টাকা এই খাতে মোমবাতি তাই জ্বলছে গোরে দিনরাতে।
খোকার আব্দার আমায় রেখোনা, মাগো, বন্ধ করে এ ঘরের মাঝে, আমিতো হয়েছি বড়ো, আমার কি আর থাকা সাজে ঘরের কোনেতে শুধু! তোমার আঁচল ধরে ধরে কেবল খেলানো এই এতোটুকু উঠোনের পরে। আমায় দাওনা যেতে ওই দূরে মাঠের সবুজে, সেখানে বলদ গুলো হাল টানে চোখ বুজে বুজে। বাবাতো পাজন হাতে পিছু থেকে ওদেরে শাসায়, তবুও ছুটেনা ওরা; বলোনা মা, কিসের আশায় ছুটবে! ওদের মুখে বাধাঁ আছে মোটা মোটা দড়ি, ঘাসতো পায় না খেতে পিঠে পড়ে গুতো আর ছড়ি। বাবারে বলোনা মাগো, ওদের জোয়াল খুলে দিক্, সবুজ ধানের ক্ষেতে ওরাও কিছুটা খেয়ে নিক। না হয় খোরাকী কিছু কম হবে, তাতে কীবা দোষ, না হয় দুয়েক দিন আমারও করবো উপোস! বাবাতো আমার কথা শুনে না মা, শুধু ধমকায় তোমাকেও ধরে মারে, বুঝিনাতো বাবা কীযে চায়! ধরোনা, আমায় যদি কেউ নিয়ে জোয়ালেতে জুতে, মুখে দড়ি বেঁধে রাখে, কেবলি শাসায় খেতে শুতে। তাহলেও বাবা বুঝি মুখ বুজে সয়ে যাবে সব; তুমিও কাঁদবে শুধু, বলবে এ খোদার গজব? তা যদি না হয়, মাগো, দাও না আমায় যেতে আজ, হাতে দাও হাতিয়ার, গায়েতে পরাও বীরসাজ। জোয়ালের যতো দড়ি, কেটে দেবো সব গুলি তার, গরুগুলি ছাড়া পাবে খুশি মনে ঘুরে বেড়াবার। বাবা যদি রাগ করে, লাঠি নিয়ে আসে খুব তেড়ে, তুমি মা দিওনা বাধা দূর থেকে হাত নেড়ে নেড়ে। আমিও গরুর সাথে দেবো ছুট সারা মাঠভর, বাবা কি পারবে ছুঁতে নিয়ে তার বাতের কোমর! ছুটে ছুটে শেষটায় বেড়ে যাবে বুকের হাঁপানি, বলবে তোমায় এসে, ‘দাও দিকি এক গ্লাস পানি।’
ভূতের ছা দুপুর বেলা ভুতের ঢেলা পড়লো গায়ে আচমকা, অমনি সটান ঘাবড়ে গিয়ে দৌড়ে পালান আদম খাঁ। বললে সবাই, ‘ও খাঁ সায়েব! পালান কোথা, ব্যাপার কি?’ বলেন, ‘ওরে ভুতের ঢেলা, পালাও রেখে ইয়ারকি!’ সবাই পালায়, ঠিক দুপুরে ভূতের ঢেলা বাপরে বাপ! ভয়ের চোটে হোতকা মোটার উঠলো বেড়ে রক্তচাপ। পটকা পিলের হালকা দেহে বাড়লো জোরে হাঁপির টান। ছুটলো সবাই সেই দিকেতে, যেথায় গেলেন আদম খান। পালায় বুড়া পালায় বুড়ী জোয়ান ছুঁড়ী মায় ছারে, ভূতের ভয়ে কাতর হয়ে রইলোনা কেউ দেশ গাঁয়ে। মা বাপ হারা কয়টি ছেলে ঘাঁটতে ছিলো আস্তাকুঁড়, ওরাই শুধু জানলো না এই ভূতের ভয়ের ঘটার তোড়। আস্তা কুঁড়ের আস্ত পচা খাবার খেয়ে পেট ভরে ফিরছে যখন পথের পাশে চাটায় ঘেরা নিজ ঘরে দেখলো পথে আগের মতো ছুটছে নাতো আর গাড়ী, করছে খাঁ খাঁ দিন দুপুরে দালান কোঠা সব বাড়ী। ঋাবলে ওরা, ভর দুপুরে কোথায় গেলো লোক গুলা, হয়তো কোথাও দাওয়াত আছে, সন্দেহ নেই এক তোলা। এই না ভেবে পাড়ায় পাড়ায় ওরাই শুধু বাড়ায় পা, জানিনে ভাই, মানুষ ওরা কিংবা ওরাই ভূতের ছা।
হাড়গিলা সায়ের সেজে হাড় গিলা গায় লাগিয়ে সুট ঢিলা টাই উড়িয়ে হাওয়াতে জুটলো এসে দাওয়াতে। রাঁধতে বসে শিয়ালনী ফেলছে পুড়ে বিরিয়ানী ছুটছে বিকট গন্ধ তার, চার দিকেতে অন্ধকার। চশমা এঁটে নাক দুটোয় আগুন জ্বেলে কাঠ কুটোয় শিয়াল দেখে সব ফাঁকা, বৃথাই গেলো ত্রিশ টাকা! শুনতে পেয়ে হায়জারি হাড় গিলা কয় ডাক ছাড়ি, ও ভাই শিয়াল চিন্তা কি; একাই যাবো মান রাখি। খেলাম কতো হাড় গিলে বিরিয়ানী তো খুব ঢিলে, সুরুৎ সুরুৎ টান মেরে এই তো দিলাম সব সেরে। সবটা একা সাবড়িয়ে হাড়গিলা যায় ঘাবড়িয়ে, পেট ফুলে তার আস্ত ঢোল বাধলো বিষম গন্ড গোল।
পুতুলের বিয়ে গোলগাল পুতুলের তুলতুলে গাল, কেনো জানি হয়ে গেছে টুকটুকে লাল। ভাবনায় শান্তির চোখে নেই ঘুম, বারবার দেখে আর গালে খায় চুম। শ্যামলের ছেলেটার বিয়ে গেলো কাল, সেখানে পুতুল গিয়ে খেয়েছে কি কাল? সারাদিন হৈ চৈ গেছে ধুম ধাম, মনে কারো পড়ে নাই পুতুলের নাম। কাজলের মেয়েটার মূখে বড়ো ঝাল, সেই কি দিয়েছে তবে পুতুলের গাল? তাই শুনে মাথা বুঝি করে ঝিম ঝিম, হাত পাও হয়ে গেছে এতো হিম হিম! পুতুলের পাশে বসে পুষি খায় চাল, শান্তি যে রাঁধে নাই আজ চাল ডাল। সব শুনে পুষি তাই হাসে ফিক ফিক, বলে এর কোনোটাই নয় বুঝি ঠিক! আসলে যে পুতুলের বিয়ে হবে কাল, লজ্জায় গাল তাই হয়ে গেছে লাল। তাই শুনে শান্তিও কুঁচকিয়ে নাক বলে, ‘আমি বুঝেছিরে, বলিস নে, থাক। শুনে তাই ডালুটাও দেয় তিন ফাল, আহলাদে পড়ে তার জিভ দিয়ে নাল। পুষিটাও জিভ দিয়ে করে চুক চুক, সব কিছু বুঝে ওরা, নয় উজবুক।
দেখলে খুঁজে অনেক কিছু মিলে! সকাল বেল সূয্যি যখন উঠে বইতে থাকে মন্দ মধুর হাওয়া, মুচকি হেসে ফুল কলিরা ফুটে অমনি জুড়ে পাখীরা গান গাওয়া। ঠিক তখনি দেখলে চেয়ে দূরে কী যেনো হয় মনের অন্তঃপুরে! মেঘেরা সব ঘুমিয়ে যখন থাকে দূরের আকাশটাতে হেলান দিয়ে, গাছেরা সব গায়েতে রোদ মাখে, খেলায় বায়ু পাতার আঁচল নিয়ে! ঠিক তকনি আকাশের ঐ নীলে দেখলে খুঁজে অনেক কিছু মিলে! আবার যখন মেঘেরা সব জেগে করতে থাকে বেজায় হুড়ো হুড়ি, ঝিলিক দেয়া গরজে উঠে রেগে পড়তে থাকে বৃষ্টি গুড়ি গুড়ি। ঠিক তখনি মেঘের ফাঁকে ফাঁকে অনেক কিছু লুকিয়ে বুঝি থাকে। সাঁজের বেলা সূয্যি যখন ডুবে টিপের মতো উঠে সন্ধ্যা তারা, কালির মতো কালো ঘনায় পুবে পশ্চিমেতে মিলায় আলোর ধারা। ঠিক তখনি দেখলে আকাশটাতে কিসের ছোঁয়া লাগে নয়ন পাতে। রাতে য়খন ছড়ায় চাঁদের হাসি লতায় পাতায় মধুর মায়া ঝলে, দূরে কোথাও বাজতে থাকে বাঁশি কারা যেনো বেড়ায় হাওয়ার ছলে। ঠিক তখনি দেখলে বসে একা অনেক কিছু যায় বুঝিবা দেখা! আঁধার রাতে যখন তারার আলো ঝিকমিকিয়ে জ্বলতে থাকে দূরে, ঘুমায় ধরা চাদর মুড়ে কালো ঝিল্লি পোকার ঘুম পাড়ানী সুরে। ঠিক তখনি দেখলে দুচোখ মেলে মনের মাঝে অনেক কিছু খেলে ।
কৈফিয়ত কৈফিয়তে বলার কিছু নেই, বলবো শুধু এই - যাদের তরে লিখছি, যদি তারা বুঝতে পারে, তবেই হলো সারা আমার সকল কাজ। নইলে কথার ভাঁজ বাড়বে যতো ততোই হবে ভুল, যার কিছু নেই মূল।

চিরন্তনী

তোমার আকাশে আজ, হে শ্রাবণ, পূর্নিমার চাঁদ;
মেঘের কুয়াসা শুভ্র আবরণ ভেদি তার আলো
আমার মুখের পওে নেমে এলো, যেন সুলোচনা
ষোড়শীর শান্তদৃষ্টি। আপরূপ বেদনা বিলাস
হৃদয় গহনে জাগে, উদাসী দুচোখে স্বপ্ন সাধ
সোনালী দিনের আর রূপালী রাতের অন্যমনা
আধোআলো আধোছায়া ঘেরা এ জীবন লাগে ভালো
শিহরিত গানে গানে চিরন্তন অতনু উল্লাস।

এই শুভক্ষণে আজ প্রাণ পেলো অর্থ খুঁজে তার
শান্ত সে দৃষ্টির মাঝে; জীবনের নিত্য নব ঘাটে
‘এক হাটে লয়ে বোঝা শূন্য কবি দেয়া অন্য হাটে’
কোন আকর্ষণে আর কেবা সেই নিয়তি দুর্বার।

নিত্য নব পরিচয় জীবনের সাথে হলো জানা।
প্রদীপ্ত বাসনা তাই মৃত্যু দুর্গে নিত্য দেয় হানা।

গল্পিকা

উটকোর জিভ

[গোড়া]

	কোত্থেকে এলো এক উটকো;
হাত পাও প্যাকাটি,	পেট যেন চাপাটি,
	গাল দুটো একদম শুঁটকো।

	কদ্দিন খায়নি সে অন্ন,
ছেঁড়া তার বেশবাস,	উসখুসে কেশপাশ
	দেখে মনে হয় মতিচ্ছন্ন।

	দেখে তার করুণার মূর্তি
ও পাড়ার খয়রাত	খেতে দিলো ডালভাত,
	এনে দিলো নয়া এক কুর্তি।

	খেয়ে দেয়ে গায়ে হলো শক্তি,
নাচে গায় ধেই ধেই	পড়ে থাকে সেখানেই
	খয়রারে করে খুব ভক্তি।

	খয়রার বউ করে রান্না
উটকো সেগন্ধে	মনের আনন্দে
	হাউ মাউ জুড়ে দেয় কান্না।

	বউ বলে, ‘খাক্ দুটি পান্তা,’
খেতে খেতে গরমও	নেই কোনো শরমও
	বকে যেন সেই সবজান্তা।

	এই করে কিছুদিন চললো,
একদিন আপোষে	‘বলো কারে কে পুষে !’
	খয়রাত উটকোরে বললো।

	উটকো তা শুনে হলো ধন্ধ, 
চোখ করে চকচক	জিভ করে লকলক -
	খাওয়া তার কেন হবে বন্ধ?

	‘কে বলেরে নেই মোর ধান্দা 
বেঁচে আছি এই ঢের	করবো কি বলো ফের,
	আমিওতো আল্লার বান্দা!’  

	এই বলে মারে জোরে লম্ফ,
যেনো এক দন্তু	বিদঘুটে জন্তু
	দেখে তারে গায়ে লাগে কম্প।

	ওপাড়াতে ছিলো যুবসঙ্ঘ,
দেখে সেই দলবল	চোখ করি ছলছল
	শেষটায় রণে দিল ভঙ্গ।

	খয়রাত হাফ ছেড়ে বাঁচলো
লোকটাকি সাক্ষাত	হারে হারে বজ্জাত
	এ কদিন কাঁধে চড়ে নাচলো!

[মাঝা]

উটকোরে তাড়িয়ে	দিলে গাঁও ছাড়িয়ে
	খয়রাত ভাবে হলো মুক্ত;
বৌ তার খুশিতে	তার মন তুষিতে
	রেঁধে ফেলে ডালনা ও শুক্ত।
দিন গিয়ে হয় রাত	খেতে বসে খয়রাত
	সারাদিন ছিল সে অভুক্ত।

চারদিক চুপচাপ, 	অমনিরে ধুপধাপ
	কোত্থেকে হয় ঢিলা বিষ্টি;
খাওয়া হলো আধখান	দিলে চোচা পিঠটান -
	বউ বলে, একি অনাশিষ্টি!
ঝোপটার ওপাশে 	খুকখুক কে হাসে ,
	এইটুকু দেখো না গো তিষ্টি।’

খয়রাত বলে,‘ভূত	দেখ্ যদি পাও জুত
	চট করে দেবে ঘাড় মটকে;
বৌ বলে,‘আ মলো,	মিনসের কি হলো
	ঘর ছেড়ে যায় কোথা সটকে!
ভূত নয় নির্ঘাৎ	এটা কোন বজ্জাত
	হবে বলে মনে হয় খটকে।’

নিয়ে আসে লোকজন	খুজে দেখে ঝোপবন
	কই কোথা নেই কিছু লুকিয়ে।
বৌ বলে,‘খেতে যাও হাত মুখ ধুয়ে নাও
	ভাত দুটি গেল বুঝি শুকিয়ে।’
ওমা! দেখে ভাত নেই	ভূত আর হোক যেই
	দিয়ে গেছে সেই পাট চুকিয়ে।

পর পর কয় রাত	হলো এই উৎপাত
	লোকজন হয়ে গেল ত্যক্ত,
শুধু ঢেলা দেখিয়ে	রাখে কতো ঠেকিয়ে
	নিজেরাও যদি কিছু দেখতো।
শেষে হয়ে নিরুপায়	ব্যাপারটা ভিন গাঁয় 
	গুনীদের কাছে করে ব্যক্ত।

শুনে কথা দেখে চিন	গুণী বলে,‘ওটা জিন,
	তাড়ানোটা হবে কিছু শক্ত;
পাঁচসের আলো চাল	কাঁচা মুগ তিন থাল
	দুটি কালো মুরগের রক্ত,
রেখে এক পাত্রে 	শনিবার রাত্রে
	ভোগ দিলে জিন হয় ভক্ত।’

করে সব উদ্যোগ 	খয়রাত দিলে ভোগ
	তবু জিন হয়নাকো শান্ত;
কোত্থেকে মারে ঢিল 	হাসে শুধু খিলখিল
	হররাত, তবু নয় ক্লান্ত।
বৌ বলে,‘জিন নয়,	করে দেখে নির্ণয়, 
	জীন হলে গুনীনকে মানতো।’

খররাত শেষটা 	করে বহু চেষ্টা
	সঙ্ঘের ছেলেদের ধরলে,
বলে,‘দাও বাবারা	করে এর কিনারা
	করবে কে তোমরা না করলে।
জিন হোক ভূত হোক	তোমরা কি পাবে সুখ
	আমি বুড়া ঢিল খেয়ে মরলে!

শুনে তার কান্না 	ডানপিটে মান্না
	দলবল নিয়ে গেল রাত্রে,
বেড় দিয়ে ঝোপবন বসে গেল দশজন
	কালিঝুলি মেখে মুখে গাত্রে।
হয়ে সব চুপচাপ	একসাথে দিলে ঝাঁপ
	কালোমতো কি, তা দেখা মাত্রে।

‘ওরে বাবা মেরো না	কাপড়টা ছেঁড়োনা,’
	বলে কালো জিন উঠে চেঁচিয়ে।
আরে এযে উটকো	মুখপোড়া শুঁটকো,
	সব মিলে বাঁধে তারে পেচিয়ে।
কুঁদে বলে মান্না,	‘রাখ নাকি কান্না
	ছেড়ে দেবো তোর খাল খেঁচিয়ে।’

মেরে কয় মুষ্ঠা	থেমে গেল রোষটা,
	দেখে ওর নেই সাড়া শব্দ।
সবে বলে হায়ওে	মারা যদি যায়রে
	সকলের হতে হবে জব্দ।
তাই করে ঘাড়েতে	দূরে নদী পাড়েতে
	রেখে এলো পাড়া হলে স্তব্ধ।

শেষ হলো উৎপাত 	মনে ভাবে খয়রাত
	এইবার হবে বুঝি শান্তি।
নাহি যেতে সাতদিন	বুড়া সলিমুদ্দিন
	ঢিল খেয়ে ঘোচালো ঘুচালো সে ভ্রান্তি।
তারপর দুর্যোগ	শুরু হলো ঢিলভোগ
	সকলের শিরে সংক্রান্তি!

রাতে তাই পাড়াতে	পথে পাও বাড়াতে
	ভয় হয়, মাথা বুঝি ফাটলো;
ছেলেদের দলটা	পেলো খুব ফলটা
	খুজে খুজে বহুরাত কাটলো।
হলো নাকো ব্যক্ত	শেষে হয়ে ত্যক্ত
	যার যার পথে সবে হাঁটলো।

[আগা]

ও পাড়াতে ছিলো সেই বুড়ো সলিমুদ্দি
ঢিল খেয়ে মগজেতে হলো তার বুদ্ধি।
একদিন সবাইকে ডেকে তাই বল্লে,
‘কোনো কাজ হবে না গো হৈচৈ কল্লে।
আমার তো মনে হয়, উটকোর কাজ এ
ভালো করে খুঁজে দেখো কোন খানে থাকে সে।
তারে নিয়ে এলে তবে পাবে সবে মুক্তাঁরে
এই বলে কানে কানে বলে দিলো যুক্তি।

একরাত কেটে গেলো তার কথা বুঝতে,
তার পরে সবে মিলে লেগে গেল খুঁজতে।
পেলো তারে ভিনগাঁয় এক পড়ো বাড়ীতে
চেনা দায় নাক মুখ ঢাকা চুল দাড়িতে।
কোত্থেকে বাগিয়ছে এক ছেঁড়া কম্বল,
গায়ে এক ছেঁড়া জামা - এই তার সম্বল।
ঝিম মেওে পড়ে আছে, দেখে তার এই বেশ
দূর থেকে মনে হবে পাকা এক দরবেশ।

গলিমুদ্দিন গিয়ে তাই বলে ডাকলো,
পয়লাই পাওধূলো গায়ে মুখে মাখলো।
বলে, ‘বাবা! দয়া কওে পারো তুমি বাঁচাবার
সারা গাঁও জিন ভূতে কওে দিলো ছারখার।
হররাত ঢিল পড়ে নিঁদ নাই চক্ষে,
তুমি যদি যাও সেথা পাবে সবে রক্ষে।’

একে একে দুয়ে দুয়ে হয়ে গেল মেলা ভীড়
সবে কেঁদে কেঁদে বলে, ‘দয়া হোক বাবাজীর!’
কথা শুনে উটকোর লেগে গেল ধান্দা,
যাই কেনো হোক সেতো আল্লার বান্দা।
সবে মিলে ধরে তারে তুলে গরু গাড়ীতে
নিয়ে এলো সেই বুড়ো সলিমের বাড়ীতে।

সারা গাঁও ছুটে এলো দেখে তার মূর্তি
জিন ভূত দূর হলো বলে করে স্ফূর্তি।
ডানপিটে ছেলেদের নেতা সেই মান্না
এক বড়ো খাসি এনে জুড়ে দিলো রান্না।
হৈচৈ হাঁক ডাকে উটকোর সন্দে
ঘুচে গেল, চোখ দুটি নাচে মহানন্দে।

বহুদিন পেটে তার পড়ে নাকো অন্ন,
রান্নার বাসে তাই হলো মতিচ্ছন্ন।
একটানে পাঁচ থালা মেরে দিয়ে শেষটা
দেখে আর নামে না যে, পেলো পানি তেষ্টা;
ঢকঢক করে দিলো এক ঘটি সাবড়ে,
তারপর কেনো জানি গেলো খুব ঘাবড়ে।
এনে হলো পেটে তার লেগে গেছে যুদ্ধ,
ঝিম ঝিম করে তার সারা দেহ শুদ্ধ।

চারদিক তবু বলে,‘বাবা আর চারটা
খেয়ে নাও জোর করে!’ কেবা শুনে কারটা,
উটকোর ততোখনে হয়ে গেছে কর্ম
গারা বপু দিয়ে তার ছুটে কাল ঘর্ম।
তারপর ঝপ করে হাত পাও ছড়ায়ে
চৌকির একপাশে পড়ে গেল গড়ায়ে।

সলিমুদ্দিন বলে,‘ওরে তোরা ধরে তোল,
এইখানে কিছু হলে হয়তো বা হবে গোল;
কিবা দায় রেখে আয় নদীটার পাড়েতে।’
জনকয় রেখে এলো তারে করে ঘাড়েতে।

শেষ রাতে পেট তার ফুলে জগঝম্প,
শুরু হলো ভেদ বমি জ্বর স্বেদ কম্প।
চোখ মেলে যতো চায় ততো পায় তেষ্টা
পানি দেখে আঁকুপাকুঁ করে খুব চেষ্টা।
উঠবার জোর নেই, শেষে হয়ে মরিয়ে
কিছু গেলো বুকে হেঁটে কিছু গেলা গড়িয়ে।
তবু পানি পেলো না সে, তেষ্টার জ্বালাতে
জিভ তার মুখ ছেড়ে চায় যেনো পালাতে।
বের হয়ে আধ হাত গেলো সেটা লটকে,
খাঁচা ছেড়ে প্রাণপাখী গেলো তার সটকে।


বাদশাজাদা

নাক খাঁদা আর বেজায় হাঁদা
এক যে ছিলো বাদশা জাদা
তার কাহিনী বলবো এবার
	গোল করোনা কোন
	চুপটি করে শোনো।

এই দেশেতে কোথাও হবে,
ঠিক মনে নেই কখন কবে
বাদশা ছিল বেজায় রাগী
সব লোকেরে ভাবতো দাগী।
বলতো, ‘সবাই করছে চুরি
দেশটা হলো পাপের পুরী;
তাইতো আমারে হয়না ছেলে
হয়না রহম খোদার দেলে।’

শুনতে পেয়ে বেগম তাহা,
বললে,‘এযে মিথ্যে ডাহা।
পাপীর ছেলে হচ্ছে কতো
আঁটকুড়ে নয় মোদের মতো।’

রাগলে শুনে বাদশা সাধু
বললে,‘ওরা করছে যাদু,
লুটছে সবাই আমার টাকা
মরলে বেবাক করবে ফাঁকা।
কিন্তু আমি মরার আগে
করবো যা হয় আমার ভাগে,
দেখবো খোদা কোথায় থাকে
কাটবো পরে লোক গুলাকে।’

বাদশা সাধু এই না বলে
নামলো গিয়ে নদীর জলে,
ডুব দিয়ে সে দেখলো ভেসে
পৌছে গেছে নতুন দেশে।
নেইকো সেথা মানুষ-গরু
রাস্তা গুলি বেজায় সরু।
তার দু’ধারে অনেক ছাতা
সবার নীচে আসন পাতা;
আর সেগুলি এমনি কষা
বসতে গেলে যায়না বসা;
হাঁটতে গেলে মাথায় ঠেকে-
বাদশা অবাক এসব দেখে।

এমন সময় গরু-গ্-গরু
হঠাৎ হলো বৃষ্টি শুরু।
অমনি দেখে হাজার হাজার
জমলো সেথা ব্যাঙের বাজার,
বসলো সবাই ছাতার নীচে
বাদশা শুধু রইলো পিছে,
ভিজছে কাপড় কাঁপছে দেহ
ছাতায় জায়গা দেয় না কেহ।
বাদশা রেগে মারলে লাথি
ভাঙলো তাতে তিনটে ছাতি।
ব্যাঙরা তখন ধরলো তারে
লাফ দিয়ে সব উঠলো ঘাড়ে;
বললে ডেকে কানের কাছে,
‘করলে এমন বুঝবে পাছে
আমরা নাকে কামড়ে দেবো
তিনটে ছাতার শোধটা নেবো।’

বাদশা শুনে ছুড়লে পা হাত
ব্যাঙরা তবু হয়না তফাত;
উলটো ওরা সবাই মিলে
নাকের ডগায় কামরে দিলে,
পড়লো কাটা নাকটা বেবাক
রক্ত দেখে বাদশা অবাক।

অমনি গেলো ঝলসে আঁখি
কোত্থেকে এক হুতুম পাখি
আসলো উড়ে, বলরো, ‘কে রে,
এমন করে ফেললো মেরে?
লোকটা কেবা, কোথায় থাকে
যাচ্ছে কোথা, চাইছে কাকে -
নেই জানা তার মুন্ডু মাথা।’
ব্যাঙরা বলে, ‘ভাঙলো ছাতা,
এর লাগিতো কামড়ে দিয়ে
দিলেম ছেড়ে শোধটা নিয়ে।’
বললে হুতুম ধমকে উঠে,
‘বুদ্ধি তোদের নেই কি মোটে?
তোদের খোদা হলাম আমি
পালছি সবায় দিবস যামি।’

বাদশা শুনে উঠলো কেঁপে
হাত দিয়ে তার নাকটা চেপে
বললে,‘খোদা তোমার তরে
এলাম হেথা কষ্ট করে।
কিন্তু তোমার ফেরেশতারা
করলে আমায় কামড়ে সারা।’

বললে হুতুম, ‘বিশ্রী ব্যাপার,
বলতে পারো কী চাই তোমার,
কিসের লাগি আসলে হেথা
ঘুচবে কিসে তোমার ব্যাথা।’

বাদশা সাধু বললে শুনে,
‘তোমার দেখা কপাল গুনে
পেলাম যদি, আমায় বলো
রাজ্যি কেনো এমন হলো?
সবাই মিলে লুটছে টাকা
আমার মহল নিসটে ফাঁকা,.
একটা ছেলে না হয় যদি
লুটবে ওরা আমার গদি।’

এই না শুনে হুতুম বলে,
‘তোমার আশা উঠছে ফলে,
যাও নিয়ে এই তিনটে ছাতি
একটা ছেলে একটা নাতি
একটা তোমার নাতির ছেলে -
লাথির চোটে ভাঙা পেলে,
নাকটা হবে হয়তো খাঁদা
হোক না, তবু বাদশাজাদা।’

বাদশা শুনে উঠলো কেঁদে।
বললে বেগম,‘শুনছো, হেঁদে,
ঘুমের মাঝে এমন করে
উঠলে কেঁদে কিসের তরে?’
বাদশা বলে,‘নাকটা আমার 
কামড়ে দিয়ে করলে সাবাড়-’
বেগম বলে,‘বকছো বাজে,
কামড়ে দেবো কিসের কাকে!’
বাদশা তখন উঠলো রেগে
ঘুমের থেকে উঠলো জেগে।

বললে সবি বেগমকে সে
বেগম শুনে উঠলো হেসে।
বাদশা বলে,‘হাসলে কেনো
স্বপ্ন শুধুই নয় এ যেনো,
খোঁজ পেয়েছি ঠিক অশুধের
আঁটকুড়ে নাম ঘুচবে মোদের।’	

এই না বলে বদলে কাপড়
আনলে ডেকে দশটা চাকর,
বললে,‘তোরা আনবি বুঝে
ব্যাঙের ছাতা তিনটে খুঁজে।’

দৌড়ে গেল চাকর গুলি
ব্যাঙের ছাতা আনলো তুলি,
খুব করে তা পিষলো শিলে
বেগম পরে ফেললো গিলে।

এর পরেতে কাটলো ক মাস,
বেগম বলে,‘পাচ্ছি আভাস
এবার ছেলে হতেও পারে
মেয়ে হলেও পালবো তারে।’
বাদশা বলে,‘হোক্ তো আগে
তাই হবে যা মোদের ভাগে।’

কাটলো ক্রমে তিনশ রাতি
আঁধার ঘরে জ্বললো বাতি।
বেগম কোলে ধরলে ছেলে
অন্য সবাই মিষ্টি খেলে।
কিন্তু ছেলের নাকটা বোঁচা
হাজার টিপেও হয়না উঁচা।
মনের দুখে বাদশা বলে,
‘এমন করেও স্বপ্ন ফলে!
এর চেয়েতো আঁটকুড়ে নাম
তাতেই ছিলো অনেক সুনাম।’

বেগম বলে, ‘নাকটা খাঁদা,
হোকনা, তবুও বাদশাজাদা।
সবাই তারে করবে খাতির
খোদার শোকর, বংশে বাতির
যাহোক তবুও হিল্লে হবে
নামটা বেঁচে থাকবে ভবে।’

নাক খাঁদা আর হোকনা হাঁদা
বাড়লো তবু বাদশাজাদা।
হাসতো সবাই, বলতো দেখে
‘বাদশা কি কেউ মানবে একে!’

বাদশা শুনে রাগলে ভারী
করলে দেশে হুকুম জারী,
‘নাক উঁচা যার তাকেই ধরে
পুরবি এনে কয়েদ ঘরে,
তারপরে সব মারবি রাঁদা
নাক যেনো হয় সবার খাঁদা।’

হুকুম শুনে সৈন্যরা সব
বললে, ‘একী, খোদার গজব!
মারবে রাঁদা সবার নাকে
এই করে কি রাজ্যি থাকে!’

সবাই মিলে উঠলো কেঁপে
বাদশা কে তাই ধরলে চেপে,
বললে গিয়ে, ‘আলমপনা,
দেশটা হবে কয়েদ খানা;
সব লোকেরে করতে খাঁদা
লাগবে কয়েক হাজার রাঁদা,
ঘষতে যাবে কয়েক বছর -
এর চেয়ে কি হয়না জবর
পালের গোদা সব কটাকে
আনলে ধরে একটা পাকে।’

বাদশা বলে, ‘যা হয় করো
সব কটাকে সাপটে ধরো।
নাক যেনো আর না রয় উঁচা
সবাই হবে সমান বোঁচা।’

সৈন্যরা সব করলে যে তাই,
কান্ড দেখে অবাক সবাই -
নাক দেখে আর কেউ হাসেনা,
ভয়ের চোটে কেউ কাশে না।

নাক খাঁদা আর বেজায় হাঁদা
রইলো বেঁচে বাদশাজাদা।
সেইতো দেশের বাদশা হবে
ঠিক জানিনে কখন কবে!

দুর্ঘটনা

কিশোর কবিতা সংকলন

১। দুর্ঘটনা

গোলগাল চেহারা 
এলো উড়ে বেহারা
	চার চার আটটা;
কাঁধে নিয়ে পালকি 
চলে, তার চাল কী!
	পার হলো মাঠটা।
এর পর নদীতে 
যেই গেল পা দিতে 
	অমনি রে হুড়মুড়
পড়ে গেল গর্তে
ধরতে না ধরতে 
	পালকিটা চুরচুর।
আরোহীর ভুঁড়িটা
যেন দশ কুড়িটা
	গোলাকার মুটকি, 
ফেটে গেলো দুদ্দাড়
বের হলো এন্তার 
	পরোটার শুঁটকি।
চিৎপাত বেচারা 
আট উড়ে বেহারা
	টেনে তারে তুললো,
হাত পায়ে বেঁধে বাঁশ
নিয়ে যেন মরা লাশ 
	ধুঁকে ধুঁকে চললো।

২। শিক্ষা

তিল তিল করে যদি হয় তাল,
চিল চিল করে তবে হলে চাল।
এই ভেবে ও পাড়ার উদ্দিন
চিল চিল করে শুধু রাদ্দিন।

দেখে তার পাগলামি কান্ড
দানা মিয়া এনে দিলো ভান্ড;
বলে তারে,‘এটা তোর হাতে রাখ,
দ্বারে দ্বারে দাও বলে দিবি হাঁক!’

উদ্দিন বলে,‘এযে ভিক্ষা!’
দানা বলে,‘এই হলো শিক্ষা।’

৩। নেড়ি

সায়েব পাড়ার কুকুর
খাচ্ছে চুকুর চুকুর
দুধের ছানা ক্ষীরের পায়েস
সকাল বিকাল দুপুর।

তাইনা দেখে সেদিন
বললে সে এক বেদীন,
‘কুকুর কেন হলাম না হায়, 
পয়দা হলাম যেদিন!’

হাসলে শুনে কুকুর,
বললে তুলে ঢেঁকুর,
‘তুইও নেড়ি আমার মতো,
নেইরে শুধু লেজুড় !’

শুনতে পেয়ে তাহা
বললে সায়েব,‘বাহা,
কুত্তা মেরা বহুত লায়েক 
বাততো ঠিকই কাহা !’

৪। পালোয়ান

লিকলিকে পালোয়ান
	নাম তার সটকা,
রোজ ভোরে চাই তার 
	ছোলা এক মটকা।
ঝোলাগুড় আধমন
	তাতে কবি মন্থণ,
মেরে দেয়, তবু তার
	দেহ রোগা পটকা;
রাতদিন হাঁই তোলে
	চোখে থাকে চটকা।

৫। রোশনাই

টক করে টিপ মেরে 
	হয়ে গেলো রোশনাই,
দেখে শুনে হাবুলের 
	একেবারে হুঁশ নাই।
মামী এসে কেঁদে কন
	‘আহা মোর বাছাধন,’
তনু হেসে বলে,‘উহুঁ,
	কাবুলের দোষ নাই।’

৬। বায়না

খুকুমনি বায়না ধরেছে, 
আয়না ধরে দেখবে কেমন গয়না পরেছে।
কোথায় পাব আয়না?
খুকুমনির বায়না!

নোলক নাকে ঝুমকো কানে
মাথায় সিঁথিপাট, 
হাতে কাঁকন গলাতে হার 
পায়ে মলের ঠাট;
মায়ের কাপড় পড়ে আবার
একটুখানি ঘোমটা করেছে।

তাইতো খুকু বায়না ধরেছে,
আয়না ধরে দেখবে কেমন ঘোমটা করেছে।
কোথায় পাব আয়না?
খুকুমনির বায়না!

৭। খাঁচা

তোতা পাখী খাঁচাতে 
ছিলো লেজ নাচাতে 
খোকা এসে হেসে তারে বললে,
‘ইত্কুলে দাবে কি?
বলো হলে খাবে কি?
এখন না লেখাপড়া কললে?’

তোতা শুনে হাসলো,
খুকখুক কাশলো ,
বলে,‘খোকা ঠিক কথা শিখছো;
শুধু বড়ো খাঁচাটা
তার মাঝে বাঁচাটা
জেনে নেবে যতোদিন টিকছো।’

৮। তুড়ি

তুড়ি তুড়ি তুড়ি,
তুড়ি মেরে দিলেম ফেঁড়ে
দলু মিয়ার ভুড়ি।
বোঁচা বলে,‘একী!’
আরে তাইতো দেখি,
ভুড়ির থেকে বেরিয়ে এলো
ইয়া বড়ো এক ঘুড়ি!
নেইকো তাতে সুতো
আকাশে খায় গুঁতো,
তাইতো দেখে পালিয়ে গেলো
দখিন পাড়ার বুড়ি।
ছেলেরা তার এসে
মরেই গেল হেসে 
ওদের মাথায় পড়লো ঝরে
পরোটা এক কুড়ি।

৯। খোকার বাড়ী

এলাম গেলাম খেলাম না
খোকার দেখা পেলাম না।

খোকার বাড়ী অনেক দূর
মাঝখানে এক সমুদ্দুর।

সমুদ্দুরে নেই যে না
আসতে যেতে ভিজলো গা,
ভিজলো কাপড় মাথার চুল-
ঝাড়তে গিয়ে পেলাম ফুল।

ফুল ফুটেছে কোন দেশে?
খোকার বাড়ী যেই দেশে।

১০। লাল রং

দীঘির জলে শাপলা ফুল
দুলছে ঢেউয়ে দোদুল দোল।
বললে তারে একটা হাঁস,
‘লাল রং তুই কোথায় পাস?
ঘাঁটছি নিতুই দীঘির ধার
ডুবছি জলে হাজার বার
দেখছি খুঁজে কাদার তাল
ঠোঁট তবুতো হয়না লাল!’

বললে শুনে শাপলা ফুল,
‘করলি এমনি ভুল, 
ঠোঁট দিয়ে কি খুঁজলে পাঁক
অমনি জানা যায় বেবাক?
ভাসছি জলে রাত্তিদিন
শিকড় দিয়ে তল গহীন
খুঁজছি, তবু পাইনি খোঁজ 
তোর সমানই মুঁই অবুঝ।

১১। ময়না

ময়না পাখী রয়না খাঁচায়,
	করবো বলো কি?

গয়না দিলে সয় না, চেঁচায়,
	করবো বলো কি?

ভয় না পেলে কয় না কথাই, 
	করবো বলো কি?

ময়না পোষা হয় না যে তাই,
	করবো বলো কি?

১২। টিয়ে

আয়রে টিয়ে আয়
গয়না দেবো গায়,
থাকতে দেবো বাড়ী
পরতে দেব শাড়ী,
খাবার দেবো ছোলা
বসার দেবো দোলা।
দুলবি মনের সুখে
দেখবে চেয়ে লোকে,
বলবে,‘বারে টিয়ে, 
হলো কি তোর বিয়ে?
গয়না দেখি গায়, 
শিকলি কেন পায়?’

বলিস তখন তুই,
‘কনে হলাম মুঁই 
গয়না শাড়ী পরে 
এলাম পরের ঘরে
শিকলি ওটা মিছে
আছে পায়ের নীচে
লাগলে ভালো বর
করবো তবে ঘর;
নইলে শিকল কেটে
মুখে কুলুপ এঁটে
উড়াল দিয়ে যাবো
বনের ফলই খাবো।

১৩। যা-পাস-গিল

ভুঁড়ির নাম যা-পাস-গিল
গিলছে তাল গিলছে তিল,
বাড়ছে তাই হাত ছাফাই
ডোবার খাই হচ্ছে বিল।

সাতটা দেশ এক গরাস
চাঁদ সুরুজ খায় তরাস,
চায় কতো পায় যতো 
চোখ ততো ফসফরাস।

ঘুরছে দুই চাকতি গোল
জিভটা তাই হচ্ছে লোল,
ভাবটা এই পায় যাকেই
খায় তাকেই কোপ্তা ঝোল।

সবদেশের সবটি গাঁয়
যায় ভুঁড়ি আলতো পায়
দেয়না হাঁক দেয়না পাক
খায় বেবাক একটা হাঁয়।

১৪। কানাকানি

সকাল বেলা সূয্যি কেন উঠে?
ফুলের গাছে ফুল যে কেনো ফুটে?
গানের পাখি কেনোই এসে জুটে?
ঝিরঝিরিয়ে বাতাস কেনো ছুটে?
কেউ কি জান তা?
সূয্যি উঠে ছড়ায় আলোর রাশি,
ফুলের শোভা ফোটায় মুখে হাসি,
পাখীর গানে বাজায় মনে বাঁশী
ঝিরঝিরে যায় যে ভালো বাসি, 
কেউ কি মানো তা?

আমরা সবাই জানি 
আমরা সবাই মানি,
সূয্যি, বাতাস, ফুল আর পাখি
করলো কানাকানি।

১৫। খোকা

খোকা, আমার খোকা,
খোকা তো নয় ফোটা ফুলের থোকা।
গোলাপ বেলি যুঁই চামেলী
সব মিলিয়ে হয়না এমন শোভা,
এমন মনোলোভা!

ভোরের আলো হয়না এমন মিঠি,
এমন করে জুড়ায় নাতো দিঠি।
পুন্নিমা চাঁদ হোক না যতই ভালো,
এমন করে ছড়ায় নাতো আলো।
দখিন হাওয়া দেয়না এমন দোলা, 
এমন আপনভোলা।

খোকা, আমার খোকা,
খোকার তরে হলাম যে তাই বোকা।

১৬। বেদীন

এই দেশেরই শহর কিবা গাঁয়ে
	কোথাও আছে বিদ্কুটে এক পাগল।
বলতে কিছু চায়না ডানে বাঁয়ে;
	সবাই বলে,‘ওর মুখে নেই আগল।’
সামনে যা পায় তা তুলে দেয় হাঁয়ে ;
	সবাই বলে,‘আস্ত একটা ছাগল।’

সেই পাগলে গোল বাধালে সেদিন
	যেই তারে কেউ বললো যে, সে বেদীন।

১৭। চাঁদের বুড়ী

খুকিঃ	চাঁদের বুড়ী, চাঁদের বুড়ী!
	বয়েস তোমার কয়শ’ কুড়ি?
	কয়টি ছেলে, কয়টি মেয়ে
	কয়টি নাতি-নাতনি পেয়ে
	কাটছো সুতো মনের সুখে?
বুড়িঃ	সুখেতো নয় মনের দুখে
	চরকা চালাই সারাটা রাত
	তাইতো জুটে দুবেলা ভাত।
খুকিঃ	ছেলেরা সব মরেছে বুঝি?
বুড়ীঃ	মরেনিতো, পায়নি খুঁজি!

১৮। দত্যি

একটুকু মিছে নয়, বিলকুল সত্যি
আকাশের মাঝখানে আছে এক দত্যি।
বড়ো বড়ো হাত পাও খুব বড়ো মাথাটা, 
আকাশটা আসলে তার বড়ো ছাতাটা।
সুরুজটা যায় যবে সেই ছাতা পেরিয়ে, 
দত্যিটা চোখ বুজে থাকে মুখ ফিরিয়ে।
কখনো সে রাগ করে ডেকে উঠে ঘরঘর, 
গাছপালা নদীনালা কেঁপে উঠে থরথর।
চোখ দুটি তার সাতে উঠে ঝিলমিলিয়ে,
বিজলীর রেখা তাই উঠে কিলবিলিয়ে।
শরীরের ঘাম তার ঝড়ে পড়ে ঝরঝর, 
খালবিল নদীনালা জলে হয় ভরভর।
আমরাতো জানিনেতা তাই বলি বৃষ্টি, 
বলতো কি আজগুবী, অদ্ভুত সৃষ্টি!   

১৯। তেলচোরা

এই দেশে এক সায়েব আছেন
	নাম হলো তাঁর আরশোলা, 
রাতের বেলা বেরুন তিনি
	খুঁজেন ভাঁড়ার আর গোলা।
যা পান চাটেন বুদ্ধি আঁটেন
	চাটায় তিনি একচেটে,
চেটেচেটেই করেন সাবাড়
	সবকিছু তার যায় পেটে।
পাখনা দুটি চকচকে তাই
	উড়েন, ভাবেন হই পাখি, 
চামচিকা আর বাদুড় যেমন
	তেমনি বাঁধি ভাই-রাখী।
হায়রে ফুরুৎ! একটু খানি
	তার পরেতে যেইকে সেই-
চাটার জোরে যায়কি উড়া!
	এইটুকুতে হারান খেই।
তবু চাটেন কেবল কেবল চাটেন
	ওতেই মজা আনকোরা,
তাইতো তিনি নাম কিনেছেন
	সবাই ডাকে তেলচোরা।

২০। দরজা

দাদুর হয়েছে জিহ্বা দোষ, সকলি বলেন উলটা, 
রেগে মেগে হন আগুনের মত শুধরাতে গেলে ভুলটা।
আম খেতে হলে বলেন, ‘মোয়া দে’, কাঁঠালে বলেন লটকা;
তিনি যদি কন, ‘কাষ্ট এনে দে’, আমরা যোগাই সটকা।
আমরা সবাই বুঝি তার ভাষা, বাড়ীর চাকর ডান্ডা, 
সেও জানে যদি ‘ডানা’ চান তিনি, এনে দিতে হবে আন্ডা।
সময় দাদুর ভালয় কাটছে খেয়ে পান চুন র্জদা;
এরি মাঝে গিয়ে পুরানো চাকর নতুন এসেছে র্গদা।
বেচারা বুঝতে পারে না মোটেও দাদুর ভাষার শব্দ
আমরাই তাকে এটা ওটা বলি, সবটাতে হয় জব্দ।
সেদিন বাড়ীর সবে একসাথে বেড়াতে গেলাম বাড্ডা,
সারাদিন মান ইতি উতি ঘুরে চুটিয়ে দিলাম আড্ডা।
রাত্রে বাড়ীতে ফিরে দেখি দাদু করেছেন মুখ গোমড়া, 
নতুন চাকর র্গদার কান ফুলে হয়ে গেছে কুমড়া।
অনেক বুঝিয়ে র্গদার শিরে ঢেলে পানি কয় ভান্ড,
আমরা সবাই হেসে মরে যাই শুনে সে দারুণ কান্ড।
র্জদা ফুরায়ে গিয়েছে দাদুর র্গদারে কন আনতে,
র্জদা কি করে ‘দরজা’ হলো তা বেচারা পারেনি জানতে।
অনেক কষ্টে পাশের বাড়িতে বিশ টাকা করি র্কজা
দোকান থেকে এনেছে কাঠের ইয়া বড় এক র্দজা।

২১। আকাশ

খোকন শুধায় মাকে,
‘বলোতো মা, আকাশ বলে কাকে?’
মা হেসে কন ‘জানালার ঐ ফাঁকে’
অনেক দুরে যায়গো দেখা যাকে
আকাশ বলে তাকে।’

খোকন বলে ‘মা!
দেখছি তুমি কিচ্ছু জান না’
মা হেসে কন ‘তাইতো আমার খোকন জানে তা।
এর লাগি তো মেঘের মেয়ে কেঁদে ভাষায় গা,
মেঘ বুড়োটা দাপটে করে রা,
মেঘ বুড়ী দেয় আচল দিয়ে বা,
কখন জানি খোকন খুলে হাঁ!’

খোকন শুনে কয়,
‘মেঘ আর আকাশ এক কি করে হয়?
চোখ দিয়ে যা দেখছো তা ঠিক নয়।’
মা হেসে কন, ‘তাইতো করি ভয় 
দিনে দিনে সব কি পাবে লয়, 
চোখের দেখায় থাকবে না আর চোখের পরিচয়?’

খোকন বলে, ‘মা---’
মা হেসে কন, ‘ঘুমা, খোকন ঘুমা,
এইতো আকাশ দিচ্ছে তোরে চুমা।

২২। আসপে তাজী

ছুটছে ঘোড়া, ছুটছে ঘোড়া 
এক দুটি নয় অনেক জোড়া।
চলছে ছুটে ঝড়ের বেগে
ওদের পায়ের ঝাপটা লেগে
চারদিকেতে উড়ছে ধূলি
শোর তুলেছে মানুষ গুলি, 
জোরসে সাবাশ টাট্টু জোরে
পংখীরাজের মতোন উড়ে
ছুটছে সকল ঘোড়ার আগে
আর ওরে কেউ পায়কি বাগে, 
চলছে ছুটে জিতবে বাজি
নাম হলো ওর আসপে তাজী। 

আসপে তাজী ছুটছে কদম
সইস লাথি মারছে বেদম,
পিঠের পরে ঝাপটে বসে
আলতো হাতে লাগাম কষে- 
দেখছে আবার পিছন ফিরে
আর ঘোড়া কি আসলো ঘিরে, 
উঠছে হেঁকে ‘হেইও সাবাশ!’
টাট্টু জোরে ফেলছে নিশাস,
ঘামছে, মুখে উঠছে ফেনা
ধূলোয় ধূলোয় যায়না চেনা, 
বাড়ছে আগে জিতবে বাজি
সাবাশ ঘোড়া আসপে তাজী! 

২৩। দামা খাঁ

        ওপাড়ার দামা খাঁ
        হাটে ঘাটে খামাখা
যারে পায় তাকে দেয় গুঁতিয়ে।
	তাই দেখে ছেলেরা
	ভাবে এই-কেলেরা
একদিন দেবে তারে জুতিয়ে।
	হয়ে পাঁচ খানেতে
	গেলো তার কানেতে
ছেলেদের কথা এই জুতানি।
	শুনে চোখ পাকায়ে 
	দামা ওঠে লাফায়ে
বেড়ে যায় আরো তার গুঁতানি।
	তোলপাড় পাড়াটা
	বাড়ে শিং নাড়াটা
জুতা যদি দেখে কারো পায়েতে।
	জুতানির ভাবনা
	ছেড়ে দেয় জাবনা
নুন যেন পড়ে কাঁচা ঘায়েতে।
	সেইদিন গোয়ালে
	ডেকে তাই শুধালে,
‘কিহে দামা, ঘাস কেন খাওনা?
	দামা বলে,‘হায়রে,
	জাত বুঝি যায়রে-
মোর ভাগে ছিলো এই পাওনা!
	মুঁই জাতে দামড়া
	দিয়ে মোর চামড়া
কতো জুতা বানিয়েছে চামারে;
	রাখি কোথা লাজকে,
	তাই দিয়ে আজকে
পিটাবারে চায় ওরা আমারে।’

মানুষ

কবিতা সংকলন

একাই যেতে হবে

তোমাদের কাউকে ডাকবোনা আমি একাই চলে যাব।
হ্যাঁ একাই যেতে হবে আমাকে, কারণ তোমাদের এখনো
সময় হয়নি, কারণ
এখনো তোমরা ন্যুজ্জ পৃষ্ঠে বোঝার কুন্ডলী
তুলে বলছো, আরো চাই। তোমাদের বোঝাই তোমাদের
জন্য ভারী হয়ে উঠেছে; অপরের ভার তোমাদের সইবে না।
তাই, অপরের বোঝা আমিও বাঁধতে চাইনা; আমি শুধু
বোঝা গুলো পিঠ থেকে ফেলে দিতে চাই তা আমার
হোক বা পরের হোক, তাতে কিছু যায় আসে না শুধু
ভারবাহী পশুত্বের অপবাদ থেকে আমি এই জীবনের
পথচারীদেরকে মুক্ত করতে চাই। আমি চাই তারা মানুষের
মতো সোজা হয়ে দাঁড়াক মাথা উঁচু করে পথ চলুক।

আমি জানি তোমরা আমার কথা শুনবে না। কারণ
তোমাদের বোঝা তো তোমাদের পিঠে নয়, তোমাদের
বুদ্ধিতে, তোমাদের চেতনায়। ঐতিহ্যের নামে, জ্ঞানের
নামে, ধর্মের নামে অসংখ্য বোঝা তোমরা নিজেদের
মধ্যে বহন করছো। এসবের লোভ তোমরা সহজে
ছাড়তে পারবেনা। সুতরাং তোমাদেরকে ডেকে লাভ
নেই; বোঝাই যাদের জীবন, তারা কেন আমার কথা
শুনবে। তাই একাই যাব, আমাকে একাই যেতে হবে।


প্রতিবাদ

অবশ্যি প্রতিবাদ করবো, একশোবার প্রতিবাদ করবো;
আমার জন্ম হয়েছে প্রতিবাদ করবাব জন্য।
জন্মের পর মুহুর্তেই কি আমি চিৎকার করে প্রতিবাদ
করিনি; বিকৃতমুখ ভঙ্গির সঙ্গে আমার হাত কি
মুষ্ঠিবদ্ধ হয়নি? তখনতো ভাষাও ছিলোনা, ভুষাও
ছিলোনা, ছিলো শুধু উলঙ্গ ক্রন্দন ধ্বনি।
আর তোমরা সেই ক্রন্দন শুনে দৌড়ে এসেছিলে,
থামাতে চেয়েছিলে আমাকে; কিন্তু আমি নিজের 
প্রাপ্য ছাড়া কখনো থামিনি, কখনো চুপ করিনি।
তাহলে আজ কেন কিছু না দিয়ে আমাকে থামতে বলছো! না
আমি থামবো না। আজ আমার মুখে ভাষা আছে, দেহে ভুষা আছে আর সেই
ভুষার নিচে আছে শক্ত-সমর্থ একটি প্রত্যাশা মগ্ন শরীর।

তাই আেমাদের কে বলছি প্রতিবাদ আমি করবোই,
অন্যায় দেখলেই আমি গর্জে উঠবো, পীড়ন দেখলেই 
আমি প্রতিরোধ করবো। হয় তোমরা আমাকে
পরাস্ত করবে, নয়তো আমি তোমাদেরকে  পরাস্ত
করবো। এর আন্যথা কখনো হবেনা। না সংগ্রাম 
ছাড়া জীবনের মুল্য নেই; সংগ্রামের অপর নামই জীবন।


পথের ধুলো

পথের ধুলোকে বারবার বলেছি, পায়ের ধুলো হও;
তাইতে তোমার মূল্য বাড়বে, তাইতো সনাতন প্রথা। 
ওরা বললে, এতোদিন তাইতো হয়েছি; কিন্ত মূল্য 
বাড়েনি। পায়ের মূল্যেই ধুলোর মূল্য; তার পৃথক 
কোন মূল্য নেই। ঝেড়ে ফেলে দিলেই সে মূল্যহীন।
বললাম, প্রথার অন্যথা হবে কী করে; পায়ের 
মূল্যই তো ধুলোর মূল্য। শুধু ধুলোর মূল্য কে দেবে।
ওরা বললে, আসলে তোমাদের দৃষ্টি পায়ের দিকে
নিবদ্ধ; ধুলোর দিকে তোমরা কোনদিন তাকাওনি। 
যদি তাকাতে, তাহলে দেখতে পেতে ঐ ধুলোর বুকেই 
পড়ে আছে অসংখ্য পায়ের চিহ্ন। ওরা এসেছে আর 
চলে গেছে; শুধু ধুলো চিহ্ন বুকে নিয়ে পড়ে আছে।
বললাম, সেতো ইতিহাস; সবলের পায়ের নিচেই 
দুর্বলের অবস্থান। চিরকাল তাই হয়ে এসেছে।
ওরা বললে, এবার আমরা উল্টে দেবো সেই প্রথা,
সবল হয়ে উঠবো। পায়ের ধুলো হয়ে নয়, চোখের 
ধুলো হয়ে নয়; আমরা ঘূণীঝড় হয়ে ছড়িয়ে যাবো।
আঁধি হয়ে তোমাদের সমস্ত চিহ্ন মুছে দেব। পথের
ধুলো থেকে জন্ম নেবে এক নতুন ধুলোর পৃথিবী। 


হতাশা 

আর কতো দিন থাকতে হবে এই পৃথিবীতে?
আর কতোদিন বলতে হবে, আমাকে ভাত দাও,
কাপড় দাও, মাথা গোঁজার একটু জায়গা দাও।
এজন্যই কি আমি পৃথিবীতে এসেছিলাম?
শুধু নিজের গ্রাসাচ্ছাদন সংগ্রহ করে বেঁচে থাকতে;
শুধু সজ্জা আর শয্যার শান্তি লাভ করতে?
তোমরা কি বলবে, এই মাথার উপরের আকাশ
এই পায়ের নীচের মাটি আমাকে কোত্থেকে নিয়ে এলো?
তারপর কোথায় আমাকে নিয়ে যাবে? 
কত দুরে আছে সেই গন্তব্যের সমুজ্জ্বল দিগন্ত রেখা?
কী নিষ্ঠুর এই আকাশ শুধু চেয়ে থাকে,
কি কোমল এই মাটি শুধুই চুমু খায়;
কোন কথা বলেনা, উত্তর দেয় না, উত্তর নেই।
কিন্ত আমিতো উত্তর চাই, প্রশ্নের  উত্তর  চাই।
যদি উত্তর না থাকে, তা হলে প্রশ্ন জাগে কেন?
কেন বারবার অস্তিত্বের প্রপঞ্চ আমাকে কাঁদায়;
কেন জীবনের অর্থ খুঁজতে গিয়ে আমি হতাশ হই।
হতাশার অপর নামতো আত্মহনন; তাহলে কি
এই আত্মহননের মাঝেই জীবনের পরিসমাপ্তি?


মানুষ

ষাট বছরে পা রেখেছি যেই 
অমনি ওরা বললো এসে, ‘মানুষ’ তুমি,
গলায় মালা দেবো, তোমাকেই ।
শুনে ওদের কথা 
বুকের মাঝে প্রশ্ন হয়ে বাড়লো নীরবতা।
তা হলে কি পেরিয়ে অনেক গলি,
ঝেরে ঝুরে পুরানো সব কথা মালার থলি,
যে মানুষের খোঁজে আমি এখনো পথ চলি,
সেই মানুষই আছে আমার মাঝে?
ষাটটি বছর বৃথাই গেলো মানুষ খোঁজার কাজে?

বললো ওরা, নয় তা বৃথা নয়;
মানুষ খোঁজো বলেই তোমার ‘মানুষ’ পরিচয়।
এই না বলে পরিয়ে দিলে মালা,
মনে মনে বুঝতে পেলাম মানুষ হবার জ্বালা।
‘মানুষ’, সে তো পরশমণি, ভাই,
আমি আজো মানুষ খুঁজি তাই।


তবে কিসের এ স্বাধীনতা

আমি পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াবো,
দেয়ালে চরবো, পুকুরে নামবো 
গাছের মগ ডালে উঠে তিডিং তিডিং লাফাবো;
আমার মুখে থাকবে গালি, হাতে থাকবে ঢিল-
যদি এই না করতে পারি, তবে কিসের তরে এ
স্বাধীনতা ।

আমি পথে যেতে যেতে গানের কলি গেয়ে উঠবো,
যথেচ্ছা মুখের ঝাল ঝারবো, চোখ মারবো,
পরীক্ষার হলে বই খুলে নকল করবো;
আমার গায়ের পোশাক, আমার মাখার চুল,
ইচ্ছে মতো উঠবে নামবে, বাড়বে আর কমবে
যদি এই না করতে পারি, তবে কিসের তরে এ
স্বাধীনতা ।

আমি মিছিলে চিৎকার করে গলা ফাটাবো,
জোর করে পারমিট লাইসেন্স বাগাবো, 
হাইজ্যাক করে হলেও প্রচুর টাকা করবো;
যৌবনকে ভোগ করবো, পাড়ায় যাবো মদ খাবো,
ন্যায় নীতিকে যথেচ্ছা বুড়ো আঙ্গুল দেখাবো,
জীবনকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলবো-
যদি এই না করতে পারি, তবে কিসের তরে এ 
স্বাধীনতা ।

আমি চাকরিকে নিজের জমিদারী বলে ভাববো,
যখন ইচ্ছা অফিসে যাবো, চলে আসবো,
অবসর সময়ে তাস ফাস, না হয় দাবা খেলবো,
রাজনীতি ও সাহিত্য নিয়ে যা ইচ্ছা হয় বলবো,
যতো পারি ঘুষ খাবো, অশ্লীল বই পড়বো,
সুযোগ পেলে মদ মাংসের তৃষ্ণাও মিটিয়ে নেব;
জীবনটাকে ইচ্ছা মতো ছড়িয়ে দেবো, গড়িয়ে দেবো- 
যদি এই না করতে পারি, তবে কিসের তরে এ 
স্বাধীনতা ।

আমি এক টাকার জিনিস দশ টাকায় বিক্রি করবো,
দশ টাকার জন্য লাখ টাকার বস্তা পুড়িয়ে ফেলবো,
খাদ্যে ভেজাল মিশাবো, নকল ছড়াবো,
সুযোগ পেলে বিদেশে পাচার করবো;
বাড়ী গাড়ী শাড়ী কিনবো, টুপি মাথায় দেবো,
বই ছবি কার্পেট দিয়ে বৈঠক খানা সাজাবো,
ছেলেকে বিলেত পাঠাবো, মেয়েকে নাচ শেখাবো,
পার্টিতে চাঁদা দেবো, দুর্যোগে দান করবো 
যদি এই না করতে পারি, তবে কিসের তরে এ
স্বাধীনতা।

আমি রাজনীতিকে ব্যবসা বলেই ভাববো,
মুখে বড়ো বড়ো বুলি আর কাঁধে ভিক্ষার ঝুলি রাখবো,
গদিতে যাবার আগে গদ গদ ভাষা বলবো,
গদিতে চড়েই গদা নিয়ে রূখে দাড়াবো,
কখনো ধর্ম যায়, কখনো স্বাধীনতা যায় বলে চীৎকার করবো,
সাঙ্গো-পাঙ্গোদেরকে যে করেই হোক উপরে তুলবো,
আর যাদের জন্য গদিতে বসেছিলাম, তাদের কথা ভুলে যাবো,
গাড়ী বাড়ী আর রকমারি ব্যাংক ব্যালেন্স করবো,
গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল হয়ে বসে থাকবো 
যদি এই না করতে পারি, তবে কিসের তরে এ
স্বাধীনতা।

আমি দেশের জন্য নয় নিজের জন্য সাহিত্য করবো,
যা ইচ্ছা হয় শিখবো, যা ইচ্ছা হয় লিখবো,
দেশ-ঐতিহ্য-নীতি সব কিছুকে ডুবিয়ে মারবো 
শুধু একা আমি মাথাটাকে উঁচিয়ে রাখবো,
যা ভালো লাগেনা, তাকেই গালাগাল করবো,
ভালো বই না চললে অশ্লীল বই লিখবো,
বক্তৃতা দিতে গিয়ে সবাইকে শিশু বলে ভাববো,
গণ দুঃখের কাঁদুলি লিখে পয়সা কামাবো,
কিন্ত জনতার ছোঁয়া থেকে নিজেকে সর্বদাই দূরে রাখবো 
আর অন্যের মতোই বাড়ী গাড়ীর জন্য জিহ্বা ও কলম চালাবো,
যদি এই না করতে পারি, তবে কিসের তরে এ 
স্বাধীনতা ।