কবিতা সংকলন
একাই যেতে হবে তোমাদের কাউকে ডাকবোনা আমি একাই চলে যাব। হ্যাঁ একাই যেতে হবে আমাকে, কারণ তোমাদের এখনো সময় হয়নি, কারণ এখনো তোমরা ন্যুজ্জ পৃষ্ঠে বোঝার কুন্ডলী তুলে বলছো, আরো চাই। তোমাদের বোঝাই তোমাদের জন্য ভারী হয়ে উঠেছে; অপরের ভার তোমাদের সইবে না। তাই, অপরের বোঝা আমিও বাঁধতে চাইনা; আমি শুধু বোঝা গুলো পিঠ থেকে ফেলে দিতে চাই তা আমার হোক বা পরের হোক, তাতে কিছু যায় আসে না শুধু ভারবাহী পশুত্বের অপবাদ থেকে আমি এই জীবনের পথচারীদেরকে মুক্ত করতে চাই। আমি চাই তারা মানুষের মতো সোজা হয়ে দাঁড়াক মাথা উঁচু করে পথ চলুক। আমি জানি তোমরা আমার কথা শুনবে না। কারণ তোমাদের বোঝা তো তোমাদের পিঠে নয়, তোমাদের বুদ্ধিতে, তোমাদের চেতনায়। ঐতিহ্যের নামে, জ্ঞানের নামে, ধর্মের নামে অসংখ্য বোঝা তোমরা নিজেদের মধ্যে বহন করছো। এসবের লোভ তোমরা সহজে ছাড়তে পারবেনা। সুতরাং তোমাদেরকে ডেকে লাভ নেই; বোঝাই যাদের জীবন, তারা কেন আমার কথা শুনবে। তাই একাই যাব, আমাকে একাই যেতে হবে। প্রতিবাদ অবশ্যি প্রতিবাদ করবো, একশোবার প্রতিবাদ করবো; আমার জন্ম হয়েছে প্রতিবাদ করবাব জন্য। জন্মের পর মুহুর্তেই কি আমি চিৎকার করে প্রতিবাদ করিনি; বিকৃতমুখ ভঙ্গির সঙ্গে আমার হাত কি মুষ্ঠিবদ্ধ হয়নি? তখনতো ভাষাও ছিলোনা, ভুষাও ছিলোনা, ছিলো শুধু উলঙ্গ ক্রন্দন ধ্বনি। আর তোমরা সেই ক্রন্দন শুনে দৌড়ে এসেছিলে, থামাতে চেয়েছিলে আমাকে; কিন্তু আমি নিজের প্রাপ্য ছাড়া কখনো থামিনি, কখনো চুপ করিনি। তাহলে আজ কেন কিছু না দিয়ে আমাকে থামতে বলছো! না আমি থামবো না। আজ আমার মুখে ভাষা আছে, দেহে ভুষা আছে আর সেই ভুষার নিচে আছে শক্ত-সমর্থ একটি প্রত্যাশা মগ্ন শরীর। তাই আেমাদের কে বলছি প্রতিবাদ আমি করবোই, অন্যায় দেখলেই আমি গর্জে উঠবো, পীড়ন দেখলেই আমি প্রতিরোধ করবো। হয় তোমরা আমাকে পরাস্ত করবে, নয়তো আমি তোমাদেরকে পরাস্ত করবো। এর আন্যথা কখনো হবেনা। না সংগ্রাম ছাড়া জীবনের মুল্য নেই; সংগ্রামের অপর নামই জীবন। পথের ধুলো পথের ধুলোকে বারবার বলেছি, পায়ের ধুলো হও; তাইতে তোমার মূল্য বাড়বে, তাইতো সনাতন প্রথা। ওরা বললে, এতোদিন তাইতো হয়েছি; কিন্ত মূল্য বাড়েনি। পায়ের মূল্যেই ধুলোর মূল্য; তার পৃথক কোন মূল্য নেই। ঝেড়ে ফেলে দিলেই সে মূল্যহীন। বললাম, প্রথার অন্যথা হবে কী করে; পায়ের মূল্যই তো ধুলোর মূল্য। শুধু ধুলোর মূল্য কে দেবে। ওরা বললে, আসলে তোমাদের দৃষ্টি পায়ের দিকে নিবদ্ধ; ধুলোর দিকে তোমরা কোনদিন তাকাওনি। যদি তাকাতে, তাহলে দেখতে পেতে ঐ ধুলোর বুকেই পড়ে আছে অসংখ্য পায়ের চিহ্ন। ওরা এসেছে আর চলে গেছে; শুধু ধুলো চিহ্ন বুকে নিয়ে পড়ে আছে। বললাম, সেতো ইতিহাস; সবলের পায়ের নিচেই দুর্বলের অবস্থান। চিরকাল তাই হয়ে এসেছে। ওরা বললে, এবার আমরা উল্টে দেবো সেই প্রথা, সবল হয়ে উঠবো। পায়ের ধুলো হয়ে নয়, চোখের ধুলো হয়ে নয়; আমরা ঘূণীঝড় হয়ে ছড়িয়ে যাবো। আঁধি হয়ে তোমাদের সমস্ত চিহ্ন মুছে দেব। পথের ধুলো থেকে জন্ম নেবে এক নতুন ধুলোর পৃথিবী। হতাশা আর কতো দিন থাকতে হবে এই পৃথিবীতে? আর কতোদিন বলতে হবে, আমাকে ভাত দাও, কাপড় দাও, মাথা গোঁজার একটু জায়গা দাও। এজন্যই কি আমি পৃথিবীতে এসেছিলাম? শুধু নিজের গ্রাসাচ্ছাদন সংগ্রহ করে বেঁচে থাকতে; শুধু সজ্জা আর শয্যার শান্তি লাভ করতে? তোমরা কি বলবে, এই মাথার উপরের আকাশ এই পায়ের নীচের মাটি আমাকে কোত্থেকে নিয়ে এলো? তারপর কোথায় আমাকে নিয়ে যাবে? কত দুরে আছে সেই গন্তব্যের সমুজ্জ্বল দিগন্ত রেখা? কী নিষ্ঠুর এই আকাশ শুধু চেয়ে থাকে, কি কোমল এই মাটি শুধুই চুমু খায়; কোন কথা বলেনা, উত্তর দেয় না, উত্তর নেই। কিন্ত আমিতো উত্তর চাই, প্রশ্নের উত্তর চাই। যদি উত্তর না থাকে, তা হলে প্রশ্ন জাগে কেন? কেন বারবার অস্তিত্বের প্রপঞ্চ আমাকে কাঁদায়; কেন জীবনের অর্থ খুঁজতে গিয়ে আমি হতাশ হই। হতাশার অপর নামতো আত্মহনন; তাহলে কি এই আত্মহননের মাঝেই জীবনের পরিসমাপ্তি? মানুষ ষাট বছরে পা রেখেছি যেই অমনি ওরা বললো এসে, ‘মানুষ’ তুমি, গলায় মালা দেবো, তোমাকেই । শুনে ওদের কথা বুকের মাঝে প্রশ্ন হয়ে বাড়লো নীরবতা। তা হলে কি পেরিয়ে অনেক গলি, ঝেরে ঝুরে পুরানো সব কথা মালার থলি, যে মানুষের খোঁজে আমি এখনো পথ চলি, সেই মানুষই আছে আমার মাঝে? ষাটটি বছর বৃথাই গেলো মানুষ খোঁজার কাজে? বললো ওরা, নয় তা বৃথা নয়; মানুষ খোঁজো বলেই তোমার ‘মানুষ’ পরিচয়। এই না বলে পরিয়ে দিলে মালা, মনে মনে বুঝতে পেলাম মানুষ হবার জ্বালা। ‘মানুষ’, সে তো পরশমণি, ভাই, আমি আজো মানুষ খুঁজি তাই। তবে কিসের এ স্বাধীনতা আমি পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াবো, দেয়ালে চরবো, পুকুরে নামবো গাছের মগ ডালে উঠে তিডিং তিডিং লাফাবো; আমার মুখে থাকবে গালি, হাতে থাকবে ঢিল- যদি এই না করতে পারি, তবে কিসের তরে এ স্বাধীনতা । আমি পথে যেতে যেতে গানের কলি গেয়ে উঠবো, যথেচ্ছা মুখের ঝাল ঝারবো, চোখ মারবো, পরীক্ষার হলে বই খুলে নকল করবো; আমার গায়ের পোশাক, আমার মাখার চুল, ইচ্ছে মতো উঠবে নামবে, বাড়বে আর কমবে যদি এই না করতে পারি, তবে কিসের তরে এ স্বাধীনতা । আমি মিছিলে চিৎকার করে গলা ফাটাবো, জোর করে পারমিট লাইসেন্স বাগাবো, হাইজ্যাক করে হলেও প্রচুর টাকা করবো; যৌবনকে ভোগ করবো, পাড়ায় যাবো মদ খাবো, ন্যায় নীতিকে যথেচ্ছা বুড়ো আঙ্গুল দেখাবো, জীবনকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলবো- যদি এই না করতে পারি, তবে কিসের তরে এ স্বাধীনতা । আমি চাকরিকে নিজের জমিদারী বলে ভাববো, যখন ইচ্ছা অফিসে যাবো, চলে আসবো, অবসর সময়ে তাস ফাস, না হয় দাবা খেলবো, রাজনীতি ও সাহিত্য নিয়ে যা ইচ্ছা হয় বলবো, যতো পারি ঘুষ খাবো, অশ্লীল বই পড়বো, সুযোগ পেলে মদ মাংসের তৃষ্ণাও মিটিয়ে নেব; জীবনটাকে ইচ্ছা মতো ছড়িয়ে দেবো, গড়িয়ে দেবো- যদি এই না করতে পারি, তবে কিসের তরে এ স্বাধীনতা । আমি এক টাকার জিনিস দশ টাকায় বিক্রি করবো, দশ টাকার জন্য লাখ টাকার বস্তা পুড়িয়ে ফেলবো, খাদ্যে ভেজাল মিশাবো, নকল ছড়াবো, সুযোগ পেলে বিদেশে পাচার করবো; বাড়ী গাড়ী শাড়ী কিনবো, টুপি মাথায় দেবো, বই ছবি কার্পেট দিয়ে বৈঠক খানা সাজাবো, ছেলেকে বিলেত পাঠাবো, মেয়েকে নাচ শেখাবো, পার্টিতে চাঁদা দেবো, দুর্যোগে দান করবো যদি এই না করতে পারি, তবে কিসের তরে এ স্বাধীনতা। আমি রাজনীতিকে ব্যবসা বলেই ভাববো, মুখে বড়ো বড়ো বুলি আর কাঁধে ভিক্ষার ঝুলি রাখবো, গদিতে যাবার আগে গদ গদ ভাষা বলবো, গদিতে চড়েই গদা নিয়ে রূখে দাড়াবো, কখনো ধর্ম যায়, কখনো স্বাধীনতা যায় বলে চীৎকার করবো, সাঙ্গো-পাঙ্গোদেরকে যে করেই হোক উপরে তুলবো, আর যাদের জন্য গদিতে বসেছিলাম, তাদের কথা ভুলে যাবো, গাড়ী বাড়ী আর রকমারি ব্যাংক ব্যালেন্স করবো, গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল হয়ে বসে থাকবো যদি এই না করতে পারি, তবে কিসের তরে এ স্বাধীনতা। আমি দেশের জন্য নয় নিজের জন্য সাহিত্য করবো, যা ইচ্ছা হয় শিখবো, যা ইচ্ছা হয় লিখবো, দেশ-ঐতিহ্য-নীতি সব কিছুকে ডুবিয়ে মারবো শুধু একা আমি মাথাটাকে উঁচিয়ে রাখবো, যা ভালো লাগেনা, তাকেই গালাগাল করবো, ভালো বই না চললে অশ্লীল বই লিখবো, বক্তৃতা দিতে গিয়ে সবাইকে শিশু বলে ভাববো, গণ দুঃখের কাঁদুলি লিখে পয়সা কামাবো, কিন্ত জনতার ছোঁয়া থেকে নিজেকে সর্বদাই দূরে রাখবো আর অন্যের মতোই বাড়ী গাড়ীর জন্য জিহ্বা ও কলম চালাবো, যদি এই না করতে পারি, তবে কিসের তরে এ স্বাধীনতা ।