বুদ্বিজীবী নিধনের চালচিত্র

বুদ্ধিজীবী নিধনের ব্যাপারটি আদৌ অস্বাভাবিক কিছু নয় এটি সারা বিশ্ব জুড়ে সর্বদাই ঘটে আসছে এবং এখনো এর বিরাম নেই আমাদের এ দেশের যে একাত্তুরের চৌদ্দই ডিসেম্বর এক বার মাত্র এ কান্ডটি ঘটেছিলো, তা নয়; বরং এর আগেও ঘটেছে এবং এখনো এর ধারা পুরোমাত্রায় বজায় রয়েছে। অবশ্যি এ কথা ঠিক যে, একাত্তুরের পরে এমন মর্মবিদারক কোন ঘটনার সংবাদ আমরা জানতে পারিনি। কিন্ত নিধন বলতে তো শুধু হাতে মারাই বুঝায় না, ভাতে মারা এরি মধ্যে পড়ে। এর সাথে আমরা জাতে মারার ব্যপারটিও অনায়াসে যোগ করে নিতে পারি। তার মানে দৈহিক ভাবে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন না করে দারূন অভাব অনটনের মধ্যে ফেলে কিংম্বা প্রলোভনের ফাঁদে জড়িয়েও যথা নিয়মে তাদেরকে পঙ্গু করে দেওয়া যায়। এতেও ফল দাড়াবে সেই একই অর্থাৎ তারা বেচে থাকবে বটে, কিন্তু তাদের অবস্থাটা হবে এই যে, এর চাইতে তাদের একেবারে মরে যাওয়াই ছিল ভালো। কারন মরার চাইতে টসকে মরার ভোগান্তিটাই বেশি। বর্তমানে যদ্দুর মনে হয়, এমন এক দূরবস্থা বুদ্বিজীবীদের উপর বেশ জোরে শোরেই চেপে বসেছে।

সে যাই হোক, যে কথাটা দিয়ে আমরা বক্তব্য আরম্ভ করেছিলাম, তাছিল এই যে. এ ব্যাপারটি আদৌ অস্বাভাবিক কিছু নয়। এর কারন জীবনের অপর নামই সংগ্রাম। আর এইসংগ্রাম তথা হানাহানি মারামারি মধ্য দিয়েই মানুষের সভ্যতা সংস্কৃতির ইতিহাস গড়ে ঊঠেছে। মানুষ যে শুধু প্রকৃতির বিরূদ্বে লড়াই করেছে, তা নয়; বরং তার চাইতেও বেশি করে মানুষের বিরূদ্বে তাকে অনবরত লড়তে হচ্ছে। এর ফলে যারা শক্তিশামান ও কুশলি, তারাই টিকে রয়েছে পৃথিবীর বুকে। আর যারা দুর্বল ও ভিরূ, তারা অপরের হাতে মার খেয়ে খেয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। যোগ্যতমের উদ্বর্তন. বলে যে কথাটা আমাদের সামাজিক ইতিহাসে চালু হয়ে গেছে, তার ও অর্থ বোধ হয় এই যে, শক্তিমানেরই জয়জয়াকার সর্বত্র। সুতারাং যারা দুর্বল, তারা প্রাকৃতিক নিয়মেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে বাধ্য। এদিক থেকে দেখতে গেলে অবশ্যই বলতে হয় যে, বুদ্বিজীবীরা নিশ্চয়ই দুর্বল প্রাণী. কাজেই তাদের নিহত হওয়া বা পঙ্গু হয়ে যাওয়াটা আদৌ অস্বাভাবিক কিছু নয়।

হাঁ, তাতো বটেই। দুর্বলতা সে যেখানেই থাক, যে ভাবেই থাক, তা যে জীবন ধারনের উপযোগী গুন নয়, সে কথা আমরা সকলেই স্বীকার করতে বাধ্য। কাজেই যে সকল বুদ্বিজীবী অভাবের তাডনায় আত্মবিস্মৃত হয় কিংবা প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদেরকে বিকিয়ে দেয়, তারা যে নেহাতই দুর্বল, সে সম্পর্কে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। কিন্তু মুশকিল হয়েছে এই যে. চৌদ্দই ডিসেম্বরের, ঘটনাটি এর উল্টো সাক্ষ্যই বহন করে। এটি বরং এ কথাই প্রমান করে যে, এ সকল নিহত বুদ্বিজীবী আদৌ দুর্বল ছিলেন না, তারা অভাবের তাড়নায় কিংবা প্রলোভনের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে আত্মবিক্রয় করেননি। করলে তাদেরকে এমন মর্মান্তিক মৃত্যু বরণ করতে হতো না বরং আমাদের সমাজে বিচরণকারী অজস্র বুদ্ধিজীবীর ন্যায় তারাও বেঁচে থাকতে পারতেন। তারা অসতর্কতার শিকার হয়েছেন বটে; কিন্তু তাদের মৃত্যুই প্রমান করেছিলো যে, তাঁরা যর্থাথই জীবনের অধিকারী ছিলেন। এ যেনো সেই কাদম্বিনীর ব্যাপার; সে মরে প্রমাণ করেছিলো যে সে মরেনি। কিন্তু ভাবছি, উপমাটা বোধ হয়, জুত সই হলো না। কারন কাদম্বিনী তার জীবনের প্রমাণ দিতে গিয়ে আত্মহত্যা করেছিল; কিন্তু শহীদ বুদ্ধিজীবীরা তা করেননি! বরং তাঁদেরকে জোর করের ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছিল বর্বর ধর্মাজ্জরা। সে হত্যা কান্ডও কী জঘন্য, কী নিষ্ঠুর! দড়ি দিয়ে হাত বেঁধে, কাপড় দিয়ে চোখ বেধে রাতের অন্ধকারে গুলি করেছে বুক বরাবর। ফায়ারিং স্কোয়াডের অপরাধীদেরকে ও এমন বর্বরতার সাথে হত্যা করা হয় না। তা হলে কি ওরা তাঁদেরকে তার চাইতে ও বেশী অপরাধী বলে ভেবেছিলো? কী এমন জঘন্য অপরাধ করেছিলেন তাঁরা? তারা কি চুরি ডাকাতি হাইজ্যাক করেছিলেন? বাড়ীঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়ে ছিলেন? কিংবা যুবকদের বুকে যথেচ্ছা গুলি মেরে যুবতীদেরকে ধরে ধরে ধর্ষণ করেছিলেন? কী সেই অপরাধ যার জন্য তারা এমন একটি বর্বর হত্যাকান্ডের শিকার হলেন? আজকে তাদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সর্বাগ্রে তাদের সেই অপরাধটিকেই আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। কারন সেটি না করতে পারলে, একদিকে যেমন তাদের স্মৃতিচারণের মূল্য আমরা বুঝবনা, অন্য দিকে তেমনি ত্রিশ লক্ষ শহীদের তালিকা থেকে তাদের নামগুলি পৃথক করে উচ্চারণ করার যৌক্তিকতা ও আমরা তুলে ধরতে পারবোনা।

তা যাহোক, আসলে সেই অপরাধটা কী? আমাদের মনে হয়, সেটা আমাদের বর্বর বন্ধুরাই ভালো বলতে পারতেন, যারা এই নির্মম হত্যা কান্ড ঘটিয়েছিল। কিন্ত মুশকিল হয়েছে এই যে, তারা এই ব্যাপারে কখনো মুখ খুলেননা। কারন এই ব্যাপারটি তাদের ঘিলু থেকে বেরোয়নি। তাদের ঘিলু এতটা উর্বর হলে এ বর্বরতার পরিনাম ফলটাও তারা অনায়াসে ভাবতে পারতেন জোর গলায় বলতে পারতেন, আমরা যা করেছি দেশের মঙ্গলের জন্যই করেছি। একারনেই আমাদের কেবলই সন্দেহ হয়, আমরা হয়তো শহীদ বুদ্ধিজীবীদের যথার্থ অপরাধটা খুঁজে বের করতে পারবোনা। কারন আমরা যদ্দুর জানি, তারা এ দেশের গণমানুষের স্বাধিকারের জন্যই নিজেদের বিচিত্র শক্তি নিয়োজিত করেছিলেন। সেই ভাষা আন্দোলনের পটভুমি থেকেই এর প্রকাশ্য যাত্রা শুরূ। তারই ধারা ধরে উনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থান এমন এক শক্তির পটভুমি গড়ে তুলে, যার অনিবার্য পরিণতি ছিলো সত্তুরের নির্বাচন ও একাত্তুরের স্বাধীনতা সংগ্রাম। এর জন্যই বর্বর যখন দেখলেন যে, তাদের সকল ষড়যন্ত্র ভেদ করে সেই শক্তির জয়ই অনিবার্য হয়ে উঠেছে, তখন তারা এই শক্তি ব্যুহের স্থপতিদেরকে নির্বিচারে হত্যা করার পরিকল্পনায় মেতে উঠলো।

বিরাট ও ব্যাপক তাদের সে পরিকল্পনা। অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা তাদের এই কুখ্যাত পরিকল্পনাকে বুদ্বিজীবী নিধনের নীল নকশা বলে অভীহিতকরে থাকেন। সমস্ত বাংলাদেশই ছিলো এ পরিকল্পনার আওতাভুক্ত। আর এরই ধারা অনুসরন করে তারা শুধু ঢাকায় নয়, ব্রাহ্মণবাডিয়াতেও এমনি হত্যাকান্ড চালিয়েছিল। শুনেছি এই ময়মনসিংহ শহরেও ডিসম্বেরের তিন তারিখে তারা ছোবল হানার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন। কিন্তু সে দিন নাকি নিয়াজি এসে পড়ায় তাদের সে পরিকল্পনা সফল হয়নি। এমনি ভাবে নানা ধরনের বাধা বিপত্তি এসে তাদের আরদ্ধ কাজ শেষ করার পথে অনন্তরায় হয়ে দাড়ায়। কিন্তু তাই বলে কি তাদের সেই পবিত্র নীল নকশা বাতিল হয়ে গেছে? মনেতো হয়না। হাতে না মারতে পারলেও ভাতে আর জাতে মারার কাজতো পুরো দমেই চলছে। এমন কি কিছু দিন এক বন্ধু বললেন, একটি নতুন নীল নকশাও নাকি ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে।

তা নীল নকশাই বলুন আর লাল নকশাই বলুন, বন্ধুদেরকে বলবো, এ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কি খুব লাভ আছে? কারণ যে জন্মে তাকে মরতে হবে; আল্লা মিয়া তার সাদা নকশাতেই এ কাজ সাবাড় করে রেখেছেন। সুতারাং যে গুলিকরে, সেও মরে যে গুলি খায় সেও মরে, বাকি থাকে শুধু কে কি কাজ করলো, সেটুক। কাজেই ভয় নেই, এ দেশের গণমানুষের স্বাধীকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করাটা যদি অপরাধ হয়, তা হলে সে অপরাধ করেই মরা ভালো। তাতে জীবন না হোক, অন্তত মৃত্যুটাতো সার্থক হবে।

কারণ আমাদের ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে যতটুকু বুঝতে পারি, তাতে মনে হয় এমনি এক অপরাধের জন্যই বুদ্ধিজীবীদেরকে হত্যা করা হয়েছে এবং হচ্ছে। যদি তা না হয়, তা হলে জোড় হাতে বন্ধুদের কাছে এই অনুরোধ জানাবো, তারা যেন দয়া করে এ সকল বুদ্ধিজীবীর যথার্থ অপরাধটি সকলের সম্মুখে খুলে বলেন যদি তারা ন্যায়সঙ্গত যুক্তিপ্রমাণ দিয়ে এই নির্মম হত্যা কান্ডের সরবতা প্রতিপন্ন করতে পারেন, তাহলে কথা দিচ্ছি, আমরা তা নির্দ্বিধায় মেনে নেবো। আর যদি তা না পারেন, তা হলে বলুন, কেন কিসের জন্য আপনারা এমন কিছু প্রাণের বিনাশ সাধন করেছেন, যাঁদের বুদ্বিমত্তা আর মননশীলতা জাতীয় অগ্রগতির জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় ব্যাপার ছিল? কিন্তু প্রশ্ন করে কোন লাভ আছে? কারণ এ কথা ভালো করেই জানি যে, আপনারা এর উত্তর দিতে পারবেন না। আসলে এ এক ধরনের বিভ্রান্তি এক ধরনের অন্ধ উন্মাদনা। মানুষের সভ্যতা সংস্কৃতির ইতিহাসে এর ভুরি ভুরি উদাহরণ বিদ্যামান। এভাবেই এক দল অপযুক্তির পুজারি সমাজ প্রগতির ধারাকে বার বার রূদ্ধ করে দিতে চেয়েছে। কখনো নিজেদের কায়েমি স্বার্থের জন্য, আবার কখনো ভিন্নতর কোন প্রলোভনের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে প্রগতির বার্তা বাহক সমাজ শিল্পীদেরকে নীরব করে দিতে এগিয়ে এসেছে। আপাত দৃষ্টিতে সাময়িক ভাবে তাদের এ প্রচেষ্টা সফল হলেও পরিণামে জয় হয়েছে প্রগতির। আর এমনি ভাবেই রক্তাক্ত ঘর্মাক্ত পিচ্ছিল পথে পা ফেলে ফেলে ক্রমাগত এগিয়ে এসেছে মানুষের সভ্যতা সংস্কৃতির ইতিহাস।

তাহলে অপরাধ। কিসের অপরাধ? কি অপরাধ করেছিলেন সক্রেটিস; যার জন্য তাকে হেমলকের পিয়ালা মুখে তুলে আত্মবিসর্জন দিতে হলো? কি অপরাধ করেছিলেন হযরত ঈসা যার জন্য তাকে ক্রুশে চড়ে প্রায়শ্চিত্ত করতে হলো? কি অপরাধ করেছিলেন হযরত মুহম্মদ; যার জন্য তাকে প্রাণের ভয়ে স্বদেশ ত্যাগ করতে হলো? কি অপরাধ করেছিলেন গ্যালিলিও; যার জন্য তাকে নির্মম অত্যাচারের শিকার হতে হলো? অজস্র উদাহরণ; অজস্র নির্মম নিস্করুন দৃষ্টান্ত। একেবারে আমাদের একাল পর্যন্ত তাকে টেনে আনা যায়। কিন্তু কি লাভ হবে তাতে? আমাদের অন্ধ বন্ধুদের দৃষ্টি কি তাতে বিস্ফারিত হবে? মোটেও না; বরং ইতিমধ্যেই তারা মনে মনে আৎকে উঠেছেন। এ বলে কিরে এ সব, বুদ্বিজীবী হত্যালীলা বুঝাতে গিয়ে কিনা যতো সব পুণ্যাত্মা ধর্মবেত্তা আর জ্ঞানী গুনীদের নাম টেনে এনেছে। এর কারণ বন্ধুদের ধারনা, বুদ্বিজীবী মানেই নাস্তিক, নাস্তিক মানে ধর্মবিরোধী আর ধর্ম বিরোধী মানেই দেশদ্রোহী; সুতারাং এদেরকে নির্বিচারে হত্যা করা শুধু জায়েজ নয়, ফরজ। কাজেই ঝুঝতেই পারছেন, এমন বন্ধুদেরকে বুঝাতে যাওয়া পন্ডশ্রম।

না না, তারা যে নির্বোধ, এ কথা মনে করার কোন কারন নেই; বরং তারা যথেষ্ট বুদ্বিমান; সে দিন তিনি কি সুন্দর করে বললেন, লোকে আমাকে অনেক বিশেষণই দিয়েছেন, কিন্তু কেউ আমাকে গন্ডমুর্খ বলেনি। বাস্তবিক তিনি যে গন্ডর্মূখ নন, ইরানে থাকা কালে তার একটি মন্তব্যে তা ধরা পড়েছে। একবার তিনি সাংবাদিকদের নিকট বলেছিলেন, আমার দেশের জন্য কমিউনিষ্টদের চাইতেও ক্ষতিকর হলো বুদ্বিজীবীরা, বলুন, বুদ্বিমান ছাড়া কি এমন কথা অন্য কেউ বলতে পারে? কারন তিনি দেখতে পেয়েছিলেন যে, দীর্ঘদিন চেষ্টা চালিয়েও তার সেবক বাহিনী এই বুদ্বিজীবীদেরকে নির্মূল করতে পারেনি অবশেষে তারাই খোমেনীকে ডেকে এনেছে। আপনারা, আর শুধু আপনারা কেনো সারা বিশ্ববাসীই এখন খোমেনীর খেলা দেখছেন; কিছু দিনের মধ্যে মাদারীর খেলাও জমে উঠলো বলে। এসবের পিছনে কি ইরানের বুদ্বিজীবীরা নেই? তা হলে কি একথা বলতে হবে যে, তারা সবাই নাস্তিক?

এজন্যই বলছিলাম, আমাদের বন্ধুরা মোটেও নির্বোধ নন; বরং তারাও বুদ্বিজীবী। তফাৎ শুধু এই যে, তারা একটা গন্ডির মধ্যে আবদ্ব থেকে সব কিছু দেখতে আর শুনতে ভালোবাসেন। এজন্যই তারা যখন প্রগতির কথা বলেন, তা আবলীলায় পশ্চাৎ গতি হয়ে দাঁড়ায়। শুনেছি ভূতের পা নাকি পিছন দিকে কাজেই সে যখন এগিয়ে যায়, তখন পিছন দিকেই অগ্রসর হয় আমাদের বন্ধুদের অবস্থাও হয়েছে তাই এর কারণ তারা বিশ্বের দিকে তাকিয়ে দেখেন না; সবকিছু ইতিহাসের সামগ্রিক পটভূমিতে বিচার করতে অগ্রসর হন না। যদি তা করতে পারতেন, তা হলে তাদের দৃষ্টি অবশ্যই সত্যকে দর্শন করতো তারা ও দেখতে পেতেন যে, এই পৃথিবীর বস্তুপুঞ্জকে বিশ্লেষণ করলে যেমন তার মূলে অনু পাওয়া যায়, তেমনি এর সভ্যতা ও সংস্কৃতির তাবৎ ঐতিহ্যকে বিশ্লেষন করলেও তার মূলে পাওয়া যায় শ্রম। আর অনু যেমন ঋনাত্বক ও ধনাত্বক দুটি বিদ্যুৎ কণার চাঞ্চল্য নিয়ে গঠিত, তেমনি এই শ্রমও শক্তি ও বুদ্ধির ঐশ্বর্যে মহিমান্বিত। অনুর ধনাত্বক বিদ্যুৎ কণার মতো শ্রমের মধ্যকার এই বুদ্ধিও ধনাত্বক। সে প্রয়োজনের তাড়নায় একটি সত্যকে আবিষ্কার করে আর শক্তি সেই সত্যকে বাস্তবে রূপ দিয়ে ঋনাত্বক বিদ্যুৎ কণার ভূমিকা পালন করে। এমনি ভাবে কায়িক ও মানসিক শ্রমের সম্মিলিত সমাহারে সভ্যতা-সংস্কৃতির ইতিহাস গড়ে উঠে।

এক্ষেত্রে, বন্ধুরা, আমরা সকলেই স্বীকার করতে বাধ্য যে, তুলনামূলক বিচারে কায়িক শ্রমের চাইতে মানসিক শ্রমের মূল্য অবশ্যই বেশী। কারন এই মানসিক শ্রম তথা বুদ্ধি-চিন্তা-মননশীলতাই দিক নির্দেশের কাজ করে থাকে। এর ফলেই সমাজ প্রগতি উদ্দেশ্যে অনুসারী হয়ে গন্তব্যে পৌছাতে সক্ষম হয়। উপরে যাদের পুণ্য নাম উল্লেখ করে ছিলাম, তাঁরাও তো এই মানসিক শ্রমের অধিকারী। তাঁরা প্রতিভাবান, তাই তাঁরা যুগান্তর সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করলে চলবে না যে, তাঁদের এ প্রকার আলোড়ন সৃষ্টিকারী আর্বির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন লক্ষ লক্ষ বুদ্ধিজীবী। এমন কি তাদের তিরোভাবের পরও এ সকল বুদ্ধিজীবীই তাদের উপলব্ধীতে সত্যকে ধারণ করেছেন এবং বাস্তবে রূপ দিতে সচেষ্ট হয়েছেন। সুতরাং বুদ্ধিজীবীদের প্রতি প্রদর্শিত নির্মমতার উদাহরণ দিতে গিয়ে এ সকল পুণ্যাত্মা জ্ঞানী গুণীদের নাম উচ্চারন করলে আৎকে উঠার কোনো অবকাশ নেই; বরং এর মধ্যে ইতিহাসের সত্যকে অনুধাবন করাই সমুচিত।

সমুচিততো বটেই। কিন্তু তারা কোথায়, যাদের জন্য এতো গলাবাজি করছি। সেই বুদ্বিজীবীরা? আমাদের এ দেশে তদের অস্তিত্বের কোন লক্ষণতো দেখতে পাচ্ছিনা। তারা কি ভাতে মারা আর জাতে মারার কবলে পড়ে এমনি নির্জীব হয়ে পড়েছেন যে, তাদেরকে আর চেনাই যাচ্ছেনা। ‘হুজ্জুতে বাঙ্গাল’ একটা কথা ছিল, আজ দেখছি সেটা বদলে গিয়ে ‘হুজোগে বাঙ্গাল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের ছেলেরা খরো হয়ে জন্মায় আর ঢ়োড়া হয়ে মরে এ কি শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করতে হবে। চারদিকের অবস্থা দেখে শেষ পর্যন্ত সেই বর্বর বন্ধুদেরকেই ধন্যবাদ জানাতে ইচ্ছা হচ্ছে। সত্যি তারা চৌদ্দই ডিসেম্বরের হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে অন্তত; কিছু সংখ্যক বুদ্বিজীবীকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। তা না হলে অন্য আরো অনেকের মতো তাদেরও আরো করুণ অপমৃত্যু ঘটতো। এজন্য রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতাটির ছন্দ নকল করে বলতে ইচ্ছা হয়:

বুদ্বিজীবী হত্যা করে করেছো একি বন্ধুরা,
অমর করে দিয়েছো তাদের বাঁচিয়ে।