চঞ্চলা

[রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিরচিত ‘চঞ্চলা’ কবিতার প্যারডি]

        হে বিরাট গদি,
সুদৃশ্য সশব্দে তব লোভ
	অবিচ্ছিন্ন তারি ক্ষোভ
		আছে নিরবধি।
স্পন্দনে শিহরে দেশ তব রুদ্র কায়াময় বেগে,
বস্তুহীন আদর্শের প্রচন্ড আঘাত লেগে
	পুঞ্জ পুঞ্জ শব্দ ফেনা উঠে জেগে,
লালসার তীব্রচ্ছটা বিচ্ছুরিয়া উঠে ঘর্মস্রোতে
ধাবমান অন্ধকার হতে,
	ঘূর্ণাচক্রে ঘুরে ঘুরে মরে
		স্তরে স্তরে
	জনসাধারণ যত
		বুদবুদের মত।

	হে স্বৈরিণী, ওগো বৈরাগিনী,
চলেছে সে কোন্ দেশ, সেই চলা তোমার রাগিনী -
		ক্রন্দনের সুর।
		ছন্দহীন দূর
	তোমারে কি নিরন্তর দেয় সাড়া?
সর্বনাশা প্রেমে তার নিত্য তাই তুমি ঘরছাড়া।
		উন্মত্ত সে অভিসারে
		তব বক্ষোহারে
	ঘন ঘন লাগে দোলা, ছড়ায় অমনি
		মন্ত্রীত্বের মনি।

আস্ফালিয়া ওড়ে শূণ্যে ঝোড়ো এলো চুল;
		দুলে উঠে নির্দেশের দুল;
			পরান আকুল
		ছড়ায় নিশীথ দিনে
	চঞ্চল বান্ধববৃন্দে মুখ চিনে চিনে;
		বারম্বার ঝরে ঝরে পড়ে ভুল -
			দাও চাপা দূর্ভোগের মূল
				পথে পথে
			বিড়াল বেরোয় থলি হতে।

শুধু খাও, শুধু খাও, শুধু রেগে খাও
	কোরমা পোলাও -
		ফিরে নাহি চাও,
জনগণ কী যে চায়, কী যে বলে, বোঝ নাকো তাও।
	শুধায়ে লও না কিছু, করনা সঞ্চয়
		নাই শোক, নাই ভয় -
পদের আনন্দে বেগে অবাধে অর্থেরে কর ক্ষয়।

	যে মুহূর্তে শান্ত তুমি সে মুহূর্তে কিছু তব নাই,
				তুমি তাই
			সঙ্কিত সদাই।
	তোমার নির্দেশ লভি দ্রব্যগুলি
		মূল্যমান যায় ভুলি।
পলকে পলকে -
	মূল্যমান নেমে যায় ঝলকে ঝলকে।
		যদি তুমি অখ্যাতির তরে
			ক্রোধ ভরে
				দাঁড়াও থমকি
					অমনি চমকি
		উল্লাসি উঠিবে দেশ পুঞ্জ পুঞ্জ পুঁজির পর্বতে;
				পঙ্গু মূক কবন্ধ বধির আঁধা
					স্থুলতনু ভয়ঙ্করী বাধা
		সবারে ঠেকায়ে দিয়ে দাঁড়াইবে পথে।
স্বল্পতম পুঁজিবাদ আপনার ভাড়ে
সঞ্চয়ের সচল বিকারে
বিধ্য হবে জনতার মর্মমূলে
	শোশনের বেদনার শূলে।

ওগো গদি, চঞ্চল অপ্সরি,
	লোলুপ সুন্দরী,
	তব আশা মন্দাকিনী নৃত্য ঝরি ঝরি
			তুলিতেছে ক্ষিপ্ত করি
		মৃত্যুন্নানে দেশের জীবন।
সহিংস বিদ্রোহ বিষে বিষাইছে নিখিল গগন।

ওরে কবি, তোরে আজ করেছে উতলা
            শোষন কাতরা এই ভুবন মেঘলা
        দুর্বিনীত চরণের আকরণ অবারণ চলা।
            নাড়ীতে নাড়ীতে তোর অশান্তির শুনি পদধ্বনি,
                বক্ষ তোর উঠে রণরনি।
                নাহি জানে কেউ -
            রক্তে তোর নাচে আজি বিপ্লবের ঢেউ,
            কাঁপে আজি জনতার ব্যাকুলতা;
                মনে আজি পড়ে সেই কথা -
                    যুগে যুগে এনেছি ছলিয়া
                        স্খলিয়া স্খলিয়া
                            চুপে চুপে
                        রূপ হতে রূপে
                            স্থান স্থান হতে স্থানে;
                        নিশীথে প্রভাতে
                    যা - কিছু গিয়েছি সাথে
                    এসেছি করিয়া ক্ষয় মাঠে-ময়দানে
                        স্লোগানে স্লোগানে।

            ওরে দেখ্, জনস্রোত হয়েছে মুখর,
                তরণী কাঁপিছে থরথর।
                নীড়ের সঞ্চয় তোর পড়ে থাক তীরে -
                    তাকাস নে ফিরে।
                        বিপ্লবের বাণী
                    নিক তোরে টানি
                        জনস্রোতে
                পশ্চাতের প্রতিক্রিয়া হতে
                    প্রগতির পথে - উজ্জ্বল আলোতে।