ক্রমান্বয়ে সংযুক্ত করা হবে…
Author: admin
চিরন্তনী
তোমার আকাশে আজ, হে শ্রাবণ, পূর্নিমার চাঁদ; মেঘের কুয়াসা শুভ্র আবরণ ভেদি তার আলো আমার মুখের পওে নেমে এলো, যেন সুলোচনা ষোড়শীর শান্তদৃষ্টি। আপরূপ বেদনা বিলাস হৃদয় গহনে জাগে, উদাসী দুচোখে স্বপ্ন সাধ সোনালী দিনের আর রূপালী রাতের অন্যমনা আধোআলো আধোছায়া ঘেরা এ জীবন লাগে ভালো শিহরিত গানে গানে চিরন্তন অতনু উল্লাস। এই শুভক্ষণে আজ প্রাণ পেলো অর্থ খুঁজে তার শান্ত সে দৃষ্টির মাঝে; জীবনের নিত্য নব ঘাটে ‘এক হাটে লয়ে বোঝা শূন্য কবি দেয়া অন্য হাটে’ কোন আকর্ষণে আর কেবা সেই নিয়তি দুর্বার। নিত্য নব পরিচয় জীবনের সাথে হলো জানা। প্রদীপ্ত বাসনা তাই মৃত্যু দুর্গে নিত্য দেয় হানা।
গল্পিকা
উটকোর জিভ [গোড়া] কোত্থেকে এলো এক উটকো; হাত পাও প্যাকাটি, পেট যেন চাপাটি, গাল দুটো একদম শুঁটকো। কদ্দিন খায়নি সে অন্ন, ছেঁড়া তার বেশবাস, উসখুসে কেশপাশ দেখে মনে হয় মতিচ্ছন্ন। দেখে তার করুণার মূর্তি ও পাড়ার খয়রাত খেতে দিলো ডালভাত, এনে দিলো নয়া এক কুর্তি। খেয়ে দেয়ে গায়ে হলো শক্তি, নাচে গায় ধেই ধেই পড়ে থাকে সেখানেই খয়রারে করে খুব ভক্তি। খয়রার বউ করে রান্না উটকো সেগন্ধে মনের আনন্দে হাউ মাউ জুড়ে দেয় কান্না। বউ বলে, ‘খাক্ দুটি পান্তা,’ খেতে খেতে গরমও নেই কোনো শরমও বকে যেন সেই সবজান্তা। এই করে কিছুদিন চললো, একদিন আপোষে ‘বলো কারে কে পুষে !’ খয়রাত উটকোরে বললো। উটকো তা শুনে হলো ধন্ধ, চোখ করে চকচক জিভ করে লকলক - খাওয়া তার কেন হবে বন্ধ? ‘কে বলেরে নেই মোর ধান্দা বেঁচে আছি এই ঢের করবো কি বলো ফের, আমিওতো আল্লার বান্দা!’ এই বলে মারে জোরে লম্ফ, যেনো এক দন্তু বিদঘুটে জন্তু দেখে তারে গায়ে লাগে কম্প। ওপাড়াতে ছিলো যুবসঙ্ঘ, দেখে সেই দলবল চোখ করি ছলছল শেষটায় রণে দিল ভঙ্গ। খয়রাত হাফ ছেড়ে বাঁচলো লোকটাকি সাক্ষাত হারে হারে বজ্জাত এ কদিন কাঁধে চড়ে নাচলো! [মাঝা] উটকোরে তাড়িয়ে দিলে গাঁও ছাড়িয়ে খয়রাত ভাবে হলো মুক্ত; বৌ তার খুশিতে তার মন তুষিতে রেঁধে ফেলে ডালনা ও শুক্ত। দিন গিয়ে হয় রাত খেতে বসে খয়রাত সারাদিন ছিল সে অভুক্ত। চারদিক চুপচাপ, অমনিরে ধুপধাপ কোত্থেকে হয় ঢিলা বিষ্টি; খাওয়া হলো আধখান দিলে চোচা পিঠটান - বউ বলে, একি অনাশিষ্টি! ঝোপটার ওপাশে খুকখুক কে হাসে , এইটুকু দেখো না গো তিষ্টি।’ খয়রাত বলে,‘ভূত দেখ্ যদি পাও জুত চট করে দেবে ঘাড় মটকে; বৌ বলে,‘আ মলো, মিনসের কি হলো ঘর ছেড়ে যায় কোথা সটকে! ভূত নয় নির্ঘাৎ এটা কোন বজ্জাত হবে বলে মনে হয় খটকে।’ নিয়ে আসে লোকজন খুজে দেখে ঝোপবন কই কোথা নেই কিছু লুকিয়ে। বৌ বলে,‘খেতে যাও হাত মুখ ধুয়ে নাও ভাত দুটি গেল বুঝি শুকিয়ে।’ ওমা! দেখে ভাত নেই ভূত আর হোক যেই দিয়ে গেছে সেই পাট চুকিয়ে। পর পর কয় রাত হলো এই উৎপাত লোকজন হয়ে গেল ত্যক্ত, শুধু ঢেলা দেখিয়ে রাখে কতো ঠেকিয়ে নিজেরাও যদি কিছু দেখতো। শেষে হয়ে নিরুপায় ব্যাপারটা ভিন গাঁয় গুনীদের কাছে করে ব্যক্ত। শুনে কথা দেখে চিন গুণী বলে,‘ওটা জিন, তাড়ানোটা হবে কিছু শক্ত; পাঁচসের আলো চাল কাঁচা মুগ তিন থাল দুটি কালো মুরগের রক্ত, রেখে এক পাত্রে শনিবার রাত্রে ভোগ দিলে জিন হয় ভক্ত।’ করে সব উদ্যোগ খয়রাত দিলে ভোগ তবু জিন হয়নাকো শান্ত; কোত্থেকে মারে ঢিল হাসে শুধু খিলখিল হররাত, তবু নয় ক্লান্ত। বৌ বলে,‘জিন নয়, করে দেখে নির্ণয়, জীন হলে গুনীনকে মানতো।’ খররাত শেষটা করে বহু চেষ্টা সঙ্ঘের ছেলেদের ধরলে, বলে,‘দাও বাবারা করে এর কিনারা করবে কে তোমরা না করলে। জিন হোক ভূত হোক তোমরা কি পাবে সুখ আমি বুড়া ঢিল খেয়ে মরলে! শুনে তার কান্না ডানপিটে মান্না দলবল নিয়ে গেল রাত্রে, বেড় দিয়ে ঝোপবন বসে গেল দশজন কালিঝুলি মেখে মুখে গাত্রে। হয়ে সব চুপচাপ একসাথে দিলে ঝাঁপ কালোমতো কি, তা দেখা মাত্রে। ‘ওরে বাবা মেরো না কাপড়টা ছেঁড়োনা,’ বলে কালো জিন উঠে চেঁচিয়ে। আরে এযে উটকো মুখপোড়া শুঁটকো, সব মিলে বাঁধে তারে পেচিয়ে। কুঁদে বলে মান্না, ‘রাখ নাকি কান্না ছেড়ে দেবো তোর খাল খেঁচিয়ে।’ মেরে কয় মুষ্ঠা থেমে গেল রোষটা, দেখে ওর নেই সাড়া শব্দ। সবে বলে হায়ওে মারা যদি যায়রে সকলের হতে হবে জব্দ। তাই করে ঘাড়েতে দূরে নদী পাড়েতে রেখে এলো পাড়া হলে স্তব্ধ। শেষ হলো উৎপাত মনে ভাবে খয়রাত এইবার হবে বুঝি শান্তি। নাহি যেতে সাতদিন বুড়া সলিমুদ্দিন ঢিল খেয়ে ঘোচালো ঘুচালো সে ভ্রান্তি। তারপর দুর্যোগ শুরু হলো ঢিলভোগ সকলের শিরে সংক্রান্তি! রাতে তাই পাড়াতে পথে পাও বাড়াতে ভয় হয়, মাথা বুঝি ফাটলো; ছেলেদের দলটা পেলো খুব ফলটা খুজে খুজে বহুরাত কাটলো। হলো নাকো ব্যক্ত শেষে হয়ে ত্যক্ত যার যার পথে সবে হাঁটলো। [আগা] ও পাড়াতে ছিলো সেই বুড়ো সলিমুদ্দি ঢিল খেয়ে মগজেতে হলো তার বুদ্ধি। একদিন সবাইকে ডেকে তাই বল্লে, ‘কোনো কাজ হবে না গো হৈচৈ কল্লে। আমার তো মনে হয়, উটকোর কাজ এ ভালো করে খুঁজে দেখো কোন খানে থাকে সে। তারে নিয়ে এলে তবে পাবে সবে মুক্তাঁরে এই বলে কানে কানে বলে দিলো যুক্তি। একরাত কেটে গেলো তার কথা বুঝতে, তার পরে সবে মিলে লেগে গেল খুঁজতে। পেলো তারে ভিনগাঁয় এক পড়ো বাড়ীতে চেনা দায় নাক মুখ ঢাকা চুল দাড়িতে। কোত্থেকে বাগিয়ছে এক ছেঁড়া কম্বল, গায়ে এক ছেঁড়া জামা - এই তার সম্বল। ঝিম মেওে পড়ে আছে, দেখে তার এই বেশ দূর থেকে মনে হবে পাকা এক দরবেশ। গলিমুদ্দিন গিয়ে তাই বলে ডাকলো, পয়লাই পাওধূলো গায়ে মুখে মাখলো। বলে, ‘বাবা! দয়া কওে পারো তুমি বাঁচাবার সারা গাঁও জিন ভূতে কওে দিলো ছারখার। হররাত ঢিল পড়ে নিঁদ নাই চক্ষে, তুমি যদি যাও সেথা পাবে সবে রক্ষে।’ একে একে দুয়ে দুয়ে হয়ে গেল মেলা ভীড় সবে কেঁদে কেঁদে বলে, ‘দয়া হোক বাবাজীর!’ কথা শুনে উটকোর লেগে গেল ধান্দা, যাই কেনো হোক সেতো আল্লার বান্দা। সবে মিলে ধরে তারে তুলে গরু গাড়ীতে নিয়ে এলো সেই বুড়ো সলিমের বাড়ীতে। সারা গাঁও ছুটে এলো দেখে তার মূর্তি জিন ভূত দূর হলো বলে করে স্ফূর্তি। ডানপিটে ছেলেদের নেতা সেই মান্না এক বড়ো খাসি এনে জুড়ে দিলো রান্না। হৈচৈ হাঁক ডাকে উটকোর সন্দে ঘুচে গেল, চোখ দুটি নাচে মহানন্দে। বহুদিন পেটে তার পড়ে নাকো অন্ন, রান্নার বাসে তাই হলো মতিচ্ছন্ন। একটানে পাঁচ থালা মেরে দিয়ে শেষটা দেখে আর নামে না যে, পেলো পানি তেষ্টা; ঢকঢক করে দিলো এক ঘটি সাবড়ে, তারপর কেনো জানি গেলো খুব ঘাবড়ে। এনে হলো পেটে তার লেগে গেছে যুদ্ধ, ঝিম ঝিম করে তার সারা দেহ শুদ্ধ। চারদিক তবু বলে,‘বাবা আর চারটা খেয়ে নাও জোর করে!’ কেবা শুনে কারটা, উটকোর ততোখনে হয়ে গেছে কর্ম গারা বপু দিয়ে তার ছুটে কাল ঘর্ম। তারপর ঝপ করে হাত পাও ছড়ায়ে চৌকির একপাশে পড়ে গেল গড়ায়ে। সলিমুদ্দিন বলে,‘ওরে তোরা ধরে তোল, এইখানে কিছু হলে হয়তো বা হবে গোল; কিবা দায় রেখে আয় নদীটার পাড়েতে।’ জনকয় রেখে এলো তারে করে ঘাড়েতে। শেষ রাতে পেট তার ফুলে জগঝম্প, শুরু হলো ভেদ বমি জ্বর স্বেদ কম্প। চোখ মেলে যতো চায় ততো পায় তেষ্টা পানি দেখে আঁকুপাকুঁ করে খুব চেষ্টা। উঠবার জোর নেই, শেষে হয়ে মরিয়ে কিছু গেলো বুকে হেঁটে কিছু গেলা গড়িয়ে। তবু পানি পেলো না সে, তেষ্টার জ্বালাতে জিভ তার মুখ ছেড়ে চায় যেনো পালাতে। বের হয়ে আধ হাত গেলো সেটা লটকে, খাঁচা ছেড়ে প্রাণপাখী গেলো তার সটকে। বাদশাজাদা নাক খাঁদা আর বেজায় হাঁদা এক যে ছিলো বাদশা জাদা তার কাহিনী বলবো এবার গোল করোনা কোন চুপটি করে শোনো। এই দেশেতে কোথাও হবে, ঠিক মনে নেই কখন কবে বাদশা ছিল বেজায় রাগী সব লোকেরে ভাবতো দাগী। বলতো, ‘সবাই করছে চুরি দেশটা হলো পাপের পুরী; তাইতো আমারে হয়না ছেলে হয়না রহম খোদার দেলে।’ শুনতে পেয়ে বেগম তাহা, বললে,‘এযে মিথ্যে ডাহা। পাপীর ছেলে হচ্ছে কতো আঁটকুড়ে নয় মোদের মতো।’ রাগলে শুনে বাদশা সাধু বললে,‘ওরা করছে যাদু, লুটছে সবাই আমার টাকা মরলে বেবাক করবে ফাঁকা। কিন্তু আমি মরার আগে করবো যা হয় আমার ভাগে, দেখবো খোদা কোথায় থাকে কাটবো পরে লোক গুলাকে।’ বাদশা সাধু এই না বলে নামলো গিয়ে নদীর জলে, ডুব দিয়ে সে দেখলো ভেসে পৌছে গেছে নতুন দেশে। নেইকো সেথা মানুষ-গরু রাস্তা গুলি বেজায় সরু। তার দু’ধারে অনেক ছাতা সবার নীচে আসন পাতা; আর সেগুলি এমনি কষা বসতে গেলে যায়না বসা; হাঁটতে গেলে মাথায় ঠেকে- বাদশা অবাক এসব দেখে। এমন সময় গরু-গ্-গরু হঠাৎ হলো বৃষ্টি শুরু। অমনি দেখে হাজার হাজার জমলো সেথা ব্যাঙের বাজার, বসলো সবাই ছাতার নীচে বাদশা শুধু রইলো পিছে, ভিজছে কাপড় কাঁপছে দেহ ছাতায় জায়গা দেয় না কেহ। বাদশা রেগে মারলে লাথি ভাঙলো তাতে তিনটে ছাতি। ব্যাঙরা তখন ধরলো তারে লাফ দিয়ে সব উঠলো ঘাড়ে; বললে ডেকে কানের কাছে, ‘করলে এমন বুঝবে পাছে আমরা নাকে কামড়ে দেবো তিনটে ছাতার শোধটা নেবো।’ বাদশা শুনে ছুড়লে পা হাত ব্যাঙরা তবু হয়না তফাত; উলটো ওরা সবাই মিলে নাকের ডগায় কামরে দিলে, পড়লো কাটা নাকটা বেবাক রক্ত দেখে বাদশা অবাক। অমনি গেলো ঝলসে আঁখি কোত্থেকে এক হুতুম পাখি আসলো উড়ে, বলরো, ‘কে রে, এমন করে ফেললো মেরে? লোকটা কেবা, কোথায় থাকে যাচ্ছে কোথা, চাইছে কাকে - নেই জানা তার মুন্ডু মাথা।’ ব্যাঙরা বলে, ‘ভাঙলো ছাতা, এর লাগিতো কামড়ে দিয়ে দিলেম ছেড়ে শোধটা নিয়ে।’ বললে হুতুম ধমকে উঠে, ‘বুদ্ধি তোদের নেই কি মোটে? তোদের খোদা হলাম আমি পালছি সবায় দিবস যামি।’ বাদশা শুনে উঠলো কেঁপে হাত দিয়ে তার নাকটা চেপে বললে,‘খোদা তোমার তরে এলাম হেথা কষ্ট করে। কিন্তু তোমার ফেরেশতারা করলে আমায় কামড়ে সারা।’ বললে হুতুম, ‘বিশ্রী ব্যাপার, বলতে পারো কী চাই তোমার, কিসের লাগি আসলে হেথা ঘুচবে কিসে তোমার ব্যাথা।’ বাদশা সাধু বললে শুনে, ‘তোমার দেখা কপাল গুনে পেলাম যদি, আমায় বলো রাজ্যি কেনো এমন হলো? সবাই মিলে লুটছে টাকা আমার মহল নিসটে ফাঁকা,. একটা ছেলে না হয় যদি লুটবে ওরা আমার গদি।’ এই না শুনে হুতুম বলে, ‘তোমার আশা উঠছে ফলে, যাও নিয়ে এই তিনটে ছাতি একটা ছেলে একটা নাতি একটা তোমার নাতির ছেলে - লাথির চোটে ভাঙা পেলে, নাকটা হবে হয়তো খাঁদা হোক না, তবু বাদশাজাদা।’ বাদশা শুনে উঠলো কেঁদে। বললে বেগম,‘শুনছো, হেঁদে, ঘুমের মাঝে এমন করে উঠলে কেঁদে কিসের তরে?’ বাদশা বলে,‘নাকটা আমার কামড়ে দিয়ে করলে সাবাড়-’ বেগম বলে,‘বকছো বাজে, কামড়ে দেবো কিসের কাকে!’ বাদশা তখন উঠলো রেগে ঘুমের থেকে উঠলো জেগে। বললে সবি বেগমকে সে বেগম শুনে উঠলো হেসে। বাদশা বলে,‘হাসলে কেনো স্বপ্ন শুধুই নয় এ যেনো, খোঁজ পেয়েছি ঠিক অশুধের আঁটকুড়ে নাম ঘুচবে মোদের।’ এই না বলে বদলে কাপড় আনলে ডেকে দশটা চাকর, বললে,‘তোরা আনবি বুঝে ব্যাঙের ছাতা তিনটে খুঁজে।’ দৌড়ে গেল চাকর গুলি ব্যাঙের ছাতা আনলো তুলি, খুব করে তা পিষলো শিলে বেগম পরে ফেললো গিলে। এর পরেতে কাটলো ক মাস, বেগম বলে,‘পাচ্ছি আভাস এবার ছেলে হতেও পারে মেয়ে হলেও পালবো তারে।’ বাদশা বলে,‘হোক্ তো আগে তাই হবে যা মোদের ভাগে।’ কাটলো ক্রমে তিনশ রাতি আঁধার ঘরে জ্বললো বাতি। বেগম কোলে ধরলে ছেলে অন্য সবাই মিষ্টি খেলে। কিন্তু ছেলের নাকটা বোঁচা হাজার টিপেও হয়না উঁচা। মনের দুখে বাদশা বলে, ‘এমন করেও স্বপ্ন ফলে! এর চেয়েতো আঁটকুড়ে নাম তাতেই ছিলো অনেক সুনাম।’ বেগম বলে, ‘নাকটা খাঁদা, হোকনা, তবুও বাদশাজাদা। সবাই তারে করবে খাতির খোদার শোকর, বংশে বাতির যাহোক তবুও হিল্লে হবে নামটা বেঁচে থাকবে ভবে।’ নাক খাঁদা আর হোকনা হাঁদা বাড়লো তবু বাদশাজাদা। হাসতো সবাই, বলতো দেখে ‘বাদশা কি কেউ মানবে একে!’ বাদশা শুনে রাগলে ভারী করলে দেশে হুকুম জারী, ‘নাক উঁচা যার তাকেই ধরে পুরবি এনে কয়েদ ঘরে, তারপরে সব মারবি রাঁদা নাক যেনো হয় সবার খাঁদা।’ হুকুম শুনে সৈন্যরা সব বললে, ‘একী, খোদার গজব! মারবে রাঁদা সবার নাকে এই করে কি রাজ্যি থাকে!’ সবাই মিলে উঠলো কেঁপে বাদশা কে তাই ধরলে চেপে, বললে গিয়ে, ‘আলমপনা, দেশটা হবে কয়েদ খানা; সব লোকেরে করতে খাঁদা লাগবে কয়েক হাজার রাঁদা, ঘষতে যাবে কয়েক বছর - এর চেয়ে কি হয়না জবর পালের গোদা সব কটাকে আনলে ধরে একটা পাকে।’ বাদশা বলে, ‘যা হয় করো সব কটাকে সাপটে ধরো। নাক যেনো আর না রয় উঁচা সবাই হবে সমান বোঁচা।’ সৈন্যরা সব করলে যে তাই, কান্ড দেখে অবাক সবাই - নাক দেখে আর কেউ হাসেনা, ভয়ের চোটে কেউ কাশে না। নাক খাঁদা আর বেজায় হাঁদা রইলো বেঁচে বাদশাজাদা। সেইতো দেশের বাদশা হবে ঠিক জানিনে কখন কবে!
দুর্ঘটনা
কিশোর কবিতা সংকলন
১। দুর্ঘটনা
গোলগাল চেহারা
এলো উড়ে বেহারা
চার চার আটটা;
কাঁধে নিয়ে পালকি
চলে, তার চাল কী!
পার হলো মাঠটা।
এর পর নদীতে
যেই গেল পা দিতে
অমনি রে হুড়মুড়
পড়ে গেল গর্তে
ধরতে না ধরতে
পালকিটা চুরচুর।
আরোহীর ভুঁড়িটা
যেন দশ কুড়িটা
গোলাকার মুটকি,
ফেটে গেলো দুদ্দাড়
বের হলো এন্তার
পরোটার শুঁটকি।
চিৎপাত বেচারা
আট উড়ে বেহারা
টেনে তারে তুললো,
হাত পায়ে বেঁধে বাঁশ
নিয়ে যেন মরা লাশ
ধুঁকে ধুঁকে চললো।
২। শিক্ষা
তিল তিল করে যদি হয় তাল,
চিল চিল করে তবে হলে চাল।
এই ভেবে ও পাড়ার উদ্দিন
চিল চিল করে শুধু রাদ্দিন।
দেখে তার পাগলামি কান্ড
দানা মিয়া এনে দিলো ভান্ড;
বলে তারে,‘এটা তোর হাতে রাখ,
দ্বারে দ্বারে দাও বলে দিবি হাঁক!’
উদ্দিন বলে,‘এযে ভিক্ষা!’
দানা বলে,‘এই হলো শিক্ষা।’
৩। নেড়ি
সায়েব পাড়ার কুকুর
খাচ্ছে চুকুর চুকুর
দুধের ছানা ক্ষীরের পায়েস
সকাল বিকাল দুপুর।
তাইনা দেখে সেদিন
বললে সে এক বেদীন,
‘কুকুর কেন হলাম না হায়,
পয়দা হলাম যেদিন!’
হাসলে শুনে কুকুর,
বললে তুলে ঢেঁকুর,
‘তুইও নেড়ি আমার মতো,
নেইরে শুধু লেজুড় !’
শুনতে পেয়ে তাহা
বললে সায়েব,‘বাহা,
কুত্তা মেরা বহুত লায়েক
বাততো ঠিকই কাহা !’
৪। পালোয়ান
লিকলিকে পালোয়ান
নাম তার সটকা,
রোজ ভোরে চাই তার
ছোলা এক মটকা।
ঝোলাগুড় আধমন
তাতে কবি মন্থণ,
মেরে দেয়, তবু তার
দেহ রোগা পটকা;
রাতদিন হাঁই তোলে
চোখে থাকে চটকা।
৫। রোশনাই
টক করে টিপ মেরে
হয়ে গেলো রোশনাই,
দেখে শুনে হাবুলের
একেবারে হুঁশ নাই।
মামী এসে কেঁদে কন
‘আহা মোর বাছাধন,’
তনু হেসে বলে,‘উহুঁ,
কাবুলের দোষ নাই।’
৬। বায়না
খুকুমনি বায়না ধরেছে,
আয়না ধরে দেখবে কেমন গয়না পরেছে।
কোথায় পাব আয়না?
খুকুমনির বায়না!
নোলক নাকে ঝুমকো কানে
মাথায় সিঁথিপাট,
হাতে কাঁকন গলাতে হার
পায়ে মলের ঠাট;
মায়ের কাপড় পড়ে আবার
একটুখানি ঘোমটা করেছে।
তাইতো খুকু বায়না ধরেছে,
আয়না ধরে দেখবে কেমন ঘোমটা করেছে।
কোথায় পাব আয়না?
খুকুমনির বায়না!
৭। খাঁচা
তোতা পাখী খাঁচাতে
ছিলো লেজ নাচাতে
খোকা এসে হেসে তারে বললে,
‘ইত্কুলে দাবে কি?
বলো হলে খাবে কি?
এখন না লেখাপড়া কললে?’
তোতা শুনে হাসলো,
খুকখুক কাশলো ,
বলে,‘খোকা ঠিক কথা শিখছো;
শুধু বড়ো খাঁচাটা
তার মাঝে বাঁচাটা
জেনে নেবে যতোদিন টিকছো।’
৮। তুড়ি
তুড়ি তুড়ি তুড়ি,
তুড়ি মেরে দিলেম ফেঁড়ে
দলু মিয়ার ভুড়ি।
বোঁচা বলে,‘একী!’
আরে তাইতো দেখি,
ভুড়ির থেকে বেরিয়ে এলো
ইয়া বড়ো এক ঘুড়ি!
নেইকো তাতে সুতো
আকাশে খায় গুঁতো,
তাইতো দেখে পালিয়ে গেলো
দখিন পাড়ার বুড়ি।
ছেলেরা তার এসে
মরেই গেল হেসে
ওদের মাথায় পড়লো ঝরে
পরোটা এক কুড়ি।
৯। খোকার বাড়ী
এলাম গেলাম খেলাম না
খোকার দেখা পেলাম না।
খোকার বাড়ী অনেক দূর
মাঝখানে এক সমুদ্দুর।
সমুদ্দুরে নেই যে না
আসতে যেতে ভিজলো গা,
ভিজলো কাপড় মাথার চুল-
ঝাড়তে গিয়ে পেলাম ফুল।
ফুল ফুটেছে কোন দেশে?
খোকার বাড়ী যেই দেশে।
১০। লাল রং
দীঘির জলে শাপলা ফুল
দুলছে ঢেউয়ে দোদুল দোল।
বললে তারে একটা হাঁস,
‘লাল রং তুই কোথায় পাস?
ঘাঁটছি নিতুই দীঘির ধার
ডুবছি জলে হাজার বার
দেখছি খুঁজে কাদার তাল
ঠোঁট তবুতো হয়না লাল!’
বললে শুনে শাপলা ফুল,
‘করলি এমনি ভুল,
ঠোঁট দিয়ে কি খুঁজলে পাঁক
অমনি জানা যায় বেবাক?
ভাসছি জলে রাত্তিদিন
শিকড় দিয়ে তল গহীন
খুঁজছি, তবু পাইনি খোঁজ
তোর সমানই মুঁই অবুঝ।
১১। ময়না
ময়না পাখী রয়না খাঁচায়,
করবো বলো কি?
গয়না দিলে সয় না, চেঁচায়,
করবো বলো কি?
ভয় না পেলে কয় না কথাই,
করবো বলো কি?
ময়না পোষা হয় না যে তাই,
করবো বলো কি?
১২। টিয়ে
আয়রে টিয়ে আয়
গয়না দেবো গায়,
থাকতে দেবো বাড়ী
পরতে দেব শাড়ী,
খাবার দেবো ছোলা
বসার দেবো দোলা।
দুলবি মনের সুখে
দেখবে চেয়ে লোকে,
বলবে,‘বারে টিয়ে,
হলো কি তোর বিয়ে?
গয়না দেখি গায়,
শিকলি কেন পায়?’
বলিস তখন তুই,
‘কনে হলাম মুঁই
গয়না শাড়ী পরে
এলাম পরের ঘরে
শিকলি ওটা মিছে
আছে পায়ের নীচে
লাগলে ভালো বর
করবো তবে ঘর;
নইলে শিকল কেটে
মুখে কুলুপ এঁটে
উড়াল দিয়ে যাবো
বনের ফলই খাবো।
১৩। যা-পাস-গিল
ভুঁড়ির নাম যা-পাস-গিল
গিলছে তাল গিলছে তিল,
বাড়ছে তাই হাত ছাফাই
ডোবার খাই হচ্ছে বিল।
সাতটা দেশ এক গরাস
চাঁদ সুরুজ খায় তরাস,
চায় কতো পায় যতো
চোখ ততো ফসফরাস।
ঘুরছে দুই চাকতি গোল
জিভটা তাই হচ্ছে লোল,
ভাবটা এই পায় যাকেই
খায় তাকেই কোপ্তা ঝোল।
সবদেশের সবটি গাঁয়
যায় ভুঁড়ি আলতো পায়
দেয়না হাঁক দেয়না পাক
খায় বেবাক একটা হাঁয়।
১৪। কানাকানি
সকাল বেলা সূয্যি কেন উঠে?
ফুলের গাছে ফুল যে কেনো ফুটে?
গানের পাখি কেনোই এসে জুটে?
ঝিরঝিরিয়ে বাতাস কেনো ছুটে?
কেউ কি জান তা?
সূয্যি উঠে ছড়ায় আলোর রাশি,
ফুলের শোভা ফোটায় মুখে হাসি,
পাখীর গানে বাজায় মনে বাঁশী
ঝিরঝিরে যায় যে ভালো বাসি,
কেউ কি মানো তা?
আমরা সবাই জানি
আমরা সবাই মানি,
সূয্যি, বাতাস, ফুল আর পাখি
করলো কানাকানি।
১৫। খোকা
খোকা, আমার খোকা,
খোকা তো নয় ফোটা ফুলের থোকা।
গোলাপ বেলি যুঁই চামেলী
সব মিলিয়ে হয়না এমন শোভা,
এমন মনোলোভা!
ভোরের আলো হয়না এমন মিঠি,
এমন করে জুড়ায় নাতো দিঠি।
পুন্নিমা চাঁদ হোক না যতই ভালো,
এমন করে ছড়ায় নাতো আলো।
দখিন হাওয়া দেয়না এমন দোলা,
এমন আপনভোলা।
খোকা, আমার খোকা,
খোকার তরে হলাম যে তাই বোকা।
১৬। বেদীন
এই দেশেরই শহর কিবা গাঁয়ে
কোথাও আছে বিদ্কুটে এক পাগল।
বলতে কিছু চায়না ডানে বাঁয়ে;
সবাই বলে,‘ওর মুখে নেই আগল।’
সামনে যা পায় তা তুলে দেয় হাঁয়ে ;
সবাই বলে,‘আস্ত একটা ছাগল।’
সেই পাগলে গোল বাধালে সেদিন
যেই তারে কেউ বললো যে, সে বেদীন।
১৭। চাঁদের বুড়ী
খুকিঃ চাঁদের বুড়ী, চাঁদের বুড়ী!
বয়েস তোমার কয়শ’ কুড়ি?
কয়টি ছেলে, কয়টি মেয়ে
কয়টি নাতি-নাতনি পেয়ে
কাটছো সুতো মনের সুখে?
বুড়িঃ সুখেতো নয় মনের দুখে
চরকা চালাই সারাটা রাত
তাইতো জুটে দুবেলা ভাত।
খুকিঃ ছেলেরা সব মরেছে বুঝি?
বুড়ীঃ মরেনিতো, পায়নি খুঁজি!
১৮। দত্যি
একটুকু মিছে নয়, বিলকুল সত্যি
আকাশের মাঝখানে আছে এক দত্যি।
বড়ো বড়ো হাত পাও খুব বড়ো মাথাটা,
আকাশটা আসলে তার বড়ো ছাতাটা।
সুরুজটা যায় যবে সেই ছাতা পেরিয়ে,
দত্যিটা চোখ বুজে থাকে মুখ ফিরিয়ে।
কখনো সে রাগ করে ডেকে উঠে ঘরঘর,
গাছপালা নদীনালা কেঁপে উঠে থরথর।
চোখ দুটি তার সাতে উঠে ঝিলমিলিয়ে,
বিজলীর রেখা তাই উঠে কিলবিলিয়ে।
শরীরের ঘাম তার ঝড়ে পড়ে ঝরঝর,
খালবিল নদীনালা জলে হয় ভরভর।
আমরাতো জানিনেতা তাই বলি বৃষ্টি,
বলতো কি আজগুবী, অদ্ভুত সৃষ্টি!
১৯। তেলচোরা
এই দেশে এক সায়েব আছেন
নাম হলো তাঁর আরশোলা,
রাতের বেলা বেরুন তিনি
খুঁজেন ভাঁড়ার আর গোলা।
যা পান চাটেন বুদ্ধি আঁটেন
চাটায় তিনি একচেটে,
চেটেচেটেই করেন সাবাড়
সবকিছু তার যায় পেটে।
পাখনা দুটি চকচকে তাই
উড়েন, ভাবেন হই পাখি,
চামচিকা আর বাদুড় যেমন
তেমনি বাঁধি ভাই-রাখী।
হায়রে ফুরুৎ! একটু খানি
তার পরেতে যেইকে সেই-
চাটার জোরে যায়কি উড়া!
এইটুকুতে হারান খেই।
তবু চাটেন কেবল কেবল চাটেন
ওতেই মজা আনকোরা,
তাইতো তিনি নাম কিনেছেন
সবাই ডাকে তেলচোরা।
২০। দরজা
দাদুর হয়েছে জিহ্বা দোষ, সকলি বলেন উলটা,
রেগে মেগে হন আগুনের মত শুধরাতে গেলে ভুলটা।
আম খেতে হলে বলেন, ‘মোয়া দে’, কাঁঠালে বলেন লটকা;
তিনি যদি কন, ‘কাষ্ট এনে দে’, আমরা যোগাই সটকা।
আমরা সবাই বুঝি তার ভাষা, বাড়ীর চাকর ডান্ডা,
সেও জানে যদি ‘ডানা’ চান তিনি, এনে দিতে হবে আন্ডা।
সময় দাদুর ভালয় কাটছে খেয়ে পান চুন র্জদা;
এরি মাঝে গিয়ে পুরানো চাকর নতুন এসেছে র্গদা।
বেচারা বুঝতে পারে না মোটেও দাদুর ভাষার শব্দ
আমরাই তাকে এটা ওটা বলি, সবটাতে হয় জব্দ।
সেদিন বাড়ীর সবে একসাথে বেড়াতে গেলাম বাড্ডা,
সারাদিন মান ইতি উতি ঘুরে চুটিয়ে দিলাম আড্ডা।
রাত্রে বাড়ীতে ফিরে দেখি দাদু করেছেন মুখ গোমড়া,
নতুন চাকর র্গদার কান ফুলে হয়ে গেছে কুমড়া।
অনেক বুঝিয়ে র্গদার শিরে ঢেলে পানি কয় ভান্ড,
আমরা সবাই হেসে মরে যাই শুনে সে দারুণ কান্ড।
র্জদা ফুরায়ে গিয়েছে দাদুর র্গদারে কন আনতে,
র্জদা কি করে ‘দরজা’ হলো তা বেচারা পারেনি জানতে।
অনেক কষ্টে পাশের বাড়িতে বিশ টাকা করি র্কজা
দোকান থেকে এনেছে কাঠের ইয়া বড় এক র্দজা।
২১। আকাশ
খোকন শুধায় মাকে,
‘বলোতো মা, আকাশ বলে কাকে?’
মা হেসে কন ‘জানালার ঐ ফাঁকে’
অনেক দুরে যায়গো দেখা যাকে
আকাশ বলে তাকে।’
খোকন বলে ‘মা!
দেখছি তুমি কিচ্ছু জান না’
মা হেসে কন ‘তাইতো আমার খোকন জানে তা।
এর লাগি তো মেঘের মেয়ে কেঁদে ভাষায় গা,
মেঘ বুড়োটা দাপটে করে রা,
মেঘ বুড়ী দেয় আচল দিয়ে বা,
কখন জানি খোকন খুলে হাঁ!’
খোকন শুনে কয়,
‘মেঘ আর আকাশ এক কি করে হয়?
চোখ দিয়ে যা দেখছো তা ঠিক নয়।’
মা হেসে কন, ‘তাইতো করি ভয়
দিনে দিনে সব কি পাবে লয়,
চোখের দেখায় থাকবে না আর চোখের পরিচয়?’
খোকন বলে, ‘মা---’
মা হেসে কন, ‘ঘুমা, খোকন ঘুমা,
এইতো আকাশ দিচ্ছে তোরে চুমা।
২২। আসপে তাজী
ছুটছে ঘোড়া, ছুটছে ঘোড়া
এক দুটি নয় অনেক জোড়া।
চলছে ছুটে ঝড়ের বেগে
ওদের পায়ের ঝাপটা লেগে
চারদিকেতে উড়ছে ধূলি
শোর তুলেছে মানুষ গুলি,
জোরসে সাবাশ টাট্টু জোরে
পংখীরাজের মতোন উড়ে
ছুটছে সকল ঘোড়ার আগে
আর ওরে কেউ পায়কি বাগে,
চলছে ছুটে জিতবে বাজি
নাম হলো ওর আসপে তাজী।
আসপে তাজী ছুটছে কদম
সইস লাথি মারছে বেদম,
পিঠের পরে ঝাপটে বসে
আলতো হাতে লাগাম কষে-
দেখছে আবার পিছন ফিরে
আর ঘোড়া কি আসলো ঘিরে,
উঠছে হেঁকে ‘হেইও সাবাশ!’
টাট্টু জোরে ফেলছে নিশাস,
ঘামছে, মুখে উঠছে ফেনা
ধূলোয় ধূলোয় যায়না চেনা,
বাড়ছে আগে জিতবে বাজি
সাবাশ ঘোড়া আসপে তাজী!
২৩। দামা খাঁ
ওপাড়ার দামা খাঁ
হাটে ঘাটে খামাখা
যারে পায় তাকে দেয় গুঁতিয়ে।
তাই দেখে ছেলেরা
ভাবে এই-কেলেরা
একদিন দেবে তারে জুতিয়ে।
হয়ে পাঁচ খানেতে
গেলো তার কানেতে
ছেলেদের কথা এই জুতানি।
শুনে চোখ পাকায়ে
দামা ওঠে লাফায়ে
বেড়ে যায় আরো তার গুঁতানি।
তোলপাড় পাড়াটা
বাড়ে শিং নাড়াটা
জুতা যদি দেখে কারো পায়েতে।
জুতানির ভাবনা
ছেড়ে দেয় জাবনা
নুন যেন পড়ে কাঁচা ঘায়েতে।
সেইদিন গোয়ালে
ডেকে তাই শুধালে,
‘কিহে দামা, ঘাস কেন খাওনা?
দামা বলে,‘হায়রে,
জাত বুঝি যায়রে-
মোর ভাগে ছিলো এই পাওনা!
মুঁই জাতে দামড়া
দিয়ে মোর চামড়া
কতো জুতা বানিয়েছে চামারে;
রাখি কোথা লাজকে,
তাই দিয়ে আজকে
পিটাবারে চায় ওরা আমারে।’
মানুষ
কবিতা সংকলন
একাই যেতে হবে তোমাদের কাউকে ডাকবোনা আমি একাই চলে যাব। হ্যাঁ একাই যেতে হবে আমাকে, কারণ তোমাদের এখনো সময় হয়নি, কারণ এখনো তোমরা ন্যুজ্জ পৃষ্ঠে বোঝার কুন্ডলী তুলে বলছো, আরো চাই। তোমাদের বোঝাই তোমাদের জন্য ভারী হয়ে উঠেছে; অপরের ভার তোমাদের সইবে না। তাই, অপরের বোঝা আমিও বাঁধতে চাইনা; আমি শুধু বোঝা গুলো পিঠ থেকে ফেলে দিতে চাই তা আমার হোক বা পরের হোক, তাতে কিছু যায় আসে না শুধু ভারবাহী পশুত্বের অপবাদ থেকে আমি এই জীবনের পথচারীদেরকে মুক্ত করতে চাই। আমি চাই তারা মানুষের মতো সোজা হয়ে দাঁড়াক মাথা উঁচু করে পথ চলুক। আমি জানি তোমরা আমার কথা শুনবে না। কারণ তোমাদের বোঝা তো তোমাদের পিঠে নয়, তোমাদের বুদ্ধিতে, তোমাদের চেতনায়। ঐতিহ্যের নামে, জ্ঞানের নামে, ধর্মের নামে অসংখ্য বোঝা তোমরা নিজেদের মধ্যে বহন করছো। এসবের লোভ তোমরা সহজে ছাড়তে পারবেনা। সুতরাং তোমাদেরকে ডেকে লাভ নেই; বোঝাই যাদের জীবন, তারা কেন আমার কথা শুনবে। তাই একাই যাব, আমাকে একাই যেতে হবে। প্রতিবাদ অবশ্যি প্রতিবাদ করবো, একশোবার প্রতিবাদ করবো; আমার জন্ম হয়েছে প্রতিবাদ করবাব জন্য। জন্মের পর মুহুর্তেই কি আমি চিৎকার করে প্রতিবাদ করিনি; বিকৃতমুখ ভঙ্গির সঙ্গে আমার হাত কি মুষ্ঠিবদ্ধ হয়নি? তখনতো ভাষাও ছিলোনা, ভুষাও ছিলোনা, ছিলো শুধু উলঙ্গ ক্রন্দন ধ্বনি। আর তোমরা সেই ক্রন্দন শুনে দৌড়ে এসেছিলে, থামাতে চেয়েছিলে আমাকে; কিন্তু আমি নিজের প্রাপ্য ছাড়া কখনো থামিনি, কখনো চুপ করিনি। তাহলে আজ কেন কিছু না দিয়ে আমাকে থামতে বলছো! না আমি থামবো না। আজ আমার মুখে ভাষা আছে, দেহে ভুষা আছে আর সেই ভুষার নিচে আছে শক্ত-সমর্থ একটি প্রত্যাশা মগ্ন শরীর। তাই আেমাদের কে বলছি প্রতিবাদ আমি করবোই, অন্যায় দেখলেই আমি গর্জে উঠবো, পীড়ন দেখলেই আমি প্রতিরোধ করবো। হয় তোমরা আমাকে পরাস্ত করবে, নয়তো আমি তোমাদেরকে পরাস্ত করবো। এর আন্যথা কখনো হবেনা। না সংগ্রাম ছাড়া জীবনের মুল্য নেই; সংগ্রামের অপর নামই জীবন। পথের ধুলো পথের ধুলোকে বারবার বলেছি, পায়ের ধুলো হও; তাইতে তোমার মূল্য বাড়বে, তাইতো সনাতন প্রথা। ওরা বললে, এতোদিন তাইতো হয়েছি; কিন্ত মূল্য বাড়েনি। পায়ের মূল্যেই ধুলোর মূল্য; তার পৃথক কোন মূল্য নেই। ঝেড়ে ফেলে দিলেই সে মূল্যহীন। বললাম, প্রথার অন্যথা হবে কী করে; পায়ের মূল্যই তো ধুলোর মূল্য। শুধু ধুলোর মূল্য কে দেবে। ওরা বললে, আসলে তোমাদের দৃষ্টি পায়ের দিকে নিবদ্ধ; ধুলোর দিকে তোমরা কোনদিন তাকাওনি। যদি তাকাতে, তাহলে দেখতে পেতে ঐ ধুলোর বুকেই পড়ে আছে অসংখ্য পায়ের চিহ্ন। ওরা এসেছে আর চলে গেছে; শুধু ধুলো চিহ্ন বুকে নিয়ে পড়ে আছে। বললাম, সেতো ইতিহাস; সবলের পায়ের নিচেই দুর্বলের অবস্থান। চিরকাল তাই হয়ে এসেছে। ওরা বললে, এবার আমরা উল্টে দেবো সেই প্রথা, সবল হয়ে উঠবো। পায়ের ধুলো হয়ে নয়, চোখের ধুলো হয়ে নয়; আমরা ঘূণীঝড় হয়ে ছড়িয়ে যাবো। আঁধি হয়ে তোমাদের সমস্ত চিহ্ন মুছে দেব। পথের ধুলো থেকে জন্ম নেবে এক নতুন ধুলোর পৃথিবী। হতাশা আর কতো দিন থাকতে হবে এই পৃথিবীতে? আর কতোদিন বলতে হবে, আমাকে ভাত দাও, কাপড় দাও, মাথা গোঁজার একটু জায়গা দাও। এজন্যই কি আমি পৃথিবীতে এসেছিলাম? শুধু নিজের গ্রাসাচ্ছাদন সংগ্রহ করে বেঁচে থাকতে; শুধু সজ্জা আর শয্যার শান্তি লাভ করতে? তোমরা কি বলবে, এই মাথার উপরের আকাশ এই পায়ের নীচের মাটি আমাকে কোত্থেকে নিয়ে এলো? তারপর কোথায় আমাকে নিয়ে যাবে? কত দুরে আছে সেই গন্তব্যের সমুজ্জ্বল দিগন্ত রেখা? কী নিষ্ঠুর এই আকাশ শুধু চেয়ে থাকে, কি কোমল এই মাটি শুধুই চুমু খায়; কোন কথা বলেনা, উত্তর দেয় না, উত্তর নেই। কিন্ত আমিতো উত্তর চাই, প্রশ্নের উত্তর চাই। যদি উত্তর না থাকে, তা হলে প্রশ্ন জাগে কেন? কেন বারবার অস্তিত্বের প্রপঞ্চ আমাকে কাঁদায়; কেন জীবনের অর্থ খুঁজতে গিয়ে আমি হতাশ হই। হতাশার অপর নামতো আত্মহনন; তাহলে কি এই আত্মহননের মাঝেই জীবনের পরিসমাপ্তি? মানুষ ষাট বছরে পা রেখেছি যেই অমনি ওরা বললো এসে, ‘মানুষ’ তুমি, গলায় মালা দেবো, তোমাকেই । শুনে ওদের কথা বুকের মাঝে প্রশ্ন হয়ে বাড়লো নীরবতা। তা হলে কি পেরিয়ে অনেক গলি, ঝেরে ঝুরে পুরানো সব কথা মালার থলি, যে মানুষের খোঁজে আমি এখনো পথ চলি, সেই মানুষই আছে আমার মাঝে? ষাটটি বছর বৃথাই গেলো মানুষ খোঁজার কাজে? বললো ওরা, নয় তা বৃথা নয়; মানুষ খোঁজো বলেই তোমার ‘মানুষ’ পরিচয়। এই না বলে পরিয়ে দিলে মালা, মনে মনে বুঝতে পেলাম মানুষ হবার জ্বালা। ‘মানুষ’, সে তো পরশমণি, ভাই, আমি আজো মানুষ খুঁজি তাই। তবে কিসের এ স্বাধীনতা আমি পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াবো, দেয়ালে চরবো, পুকুরে নামবো গাছের মগ ডালে উঠে তিডিং তিডিং লাফাবো; আমার মুখে থাকবে গালি, হাতে থাকবে ঢিল- যদি এই না করতে পারি, তবে কিসের তরে এ স্বাধীনতা । আমি পথে যেতে যেতে গানের কলি গেয়ে উঠবো, যথেচ্ছা মুখের ঝাল ঝারবো, চোখ মারবো, পরীক্ষার হলে বই খুলে নকল করবো; আমার গায়ের পোশাক, আমার মাখার চুল, ইচ্ছে মতো উঠবে নামবে, বাড়বে আর কমবে যদি এই না করতে পারি, তবে কিসের তরে এ স্বাধীনতা । আমি মিছিলে চিৎকার করে গলা ফাটাবো, জোর করে পারমিট লাইসেন্স বাগাবো, হাইজ্যাক করে হলেও প্রচুর টাকা করবো; যৌবনকে ভোগ করবো, পাড়ায় যাবো মদ খাবো, ন্যায় নীতিকে যথেচ্ছা বুড়ো আঙ্গুল দেখাবো, জীবনকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলবো- যদি এই না করতে পারি, তবে কিসের তরে এ স্বাধীনতা । আমি চাকরিকে নিজের জমিদারী বলে ভাববো, যখন ইচ্ছা অফিসে যাবো, চলে আসবো, অবসর সময়ে তাস ফাস, না হয় দাবা খেলবো, রাজনীতি ও সাহিত্য নিয়ে যা ইচ্ছা হয় বলবো, যতো পারি ঘুষ খাবো, অশ্লীল বই পড়বো, সুযোগ পেলে মদ মাংসের তৃষ্ণাও মিটিয়ে নেব; জীবনটাকে ইচ্ছা মতো ছড়িয়ে দেবো, গড়িয়ে দেবো- যদি এই না করতে পারি, তবে কিসের তরে এ স্বাধীনতা । আমি এক টাকার জিনিস দশ টাকায় বিক্রি করবো, দশ টাকার জন্য লাখ টাকার বস্তা পুড়িয়ে ফেলবো, খাদ্যে ভেজাল মিশাবো, নকল ছড়াবো, সুযোগ পেলে বিদেশে পাচার করবো; বাড়ী গাড়ী শাড়ী কিনবো, টুপি মাথায় দেবো, বই ছবি কার্পেট দিয়ে বৈঠক খানা সাজাবো, ছেলেকে বিলেত পাঠাবো, মেয়েকে নাচ শেখাবো, পার্টিতে চাঁদা দেবো, দুর্যোগে দান করবো যদি এই না করতে পারি, তবে কিসের তরে এ স্বাধীনতা। আমি রাজনীতিকে ব্যবসা বলেই ভাববো, মুখে বড়ো বড়ো বুলি আর কাঁধে ভিক্ষার ঝুলি রাখবো, গদিতে যাবার আগে গদ গদ ভাষা বলবো, গদিতে চড়েই গদা নিয়ে রূখে দাড়াবো, কখনো ধর্ম যায়, কখনো স্বাধীনতা যায় বলে চীৎকার করবো, সাঙ্গো-পাঙ্গোদেরকে যে করেই হোক উপরে তুলবো, আর যাদের জন্য গদিতে বসেছিলাম, তাদের কথা ভুলে যাবো, গাড়ী বাড়ী আর রকমারি ব্যাংক ব্যালেন্স করবো, গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল হয়ে বসে থাকবো যদি এই না করতে পারি, তবে কিসের তরে এ স্বাধীনতা। আমি দেশের জন্য নয় নিজের জন্য সাহিত্য করবো, যা ইচ্ছা হয় শিখবো, যা ইচ্ছা হয় লিখবো, দেশ-ঐতিহ্য-নীতি সব কিছুকে ডুবিয়ে মারবো শুধু একা আমি মাথাটাকে উঁচিয়ে রাখবো, যা ভালো লাগেনা, তাকেই গালাগাল করবো, ভালো বই না চললে অশ্লীল বই লিখবো, বক্তৃতা দিতে গিয়ে সবাইকে শিশু বলে ভাববো, গণ দুঃখের কাঁদুলি লিখে পয়সা কামাবো, কিন্ত জনতার ছোঁয়া থেকে নিজেকে সর্বদাই দূরে রাখবো আর অন্যের মতোই বাড়ী গাড়ীর জন্য জিহ্বা ও কলম চালাবো, যদি এই না করতে পারি, তবে কিসের তরে এ স্বাধীনতা ।
আমাদের দেশ
ক্রমান্বয়ে সংযুক্ত করা হবে…
টুপিচোর
প্রথম দৃশ্যঃ
(একটি শহুরে গলি। পাশাপাশি তিনটি দোকানের সাইন বোর্ড দেখা যাচ্ছে। একটি তাবিজের, একটি গাঁজার ও একটি হাত গোনার। দোকান গুলির সামনে তিনজন খরিদ্দার এদিক সেদিক আনাগোনা করছে এবং অস্পষ্ট স্বরে কথা বলছে। এমন সময় একজন টুপিঅলা এসে সেখানে প্রবেশ করলো। সে গাঁজার দোকানের সামনে এসে দাড়াতেই খরিদ্দারদের মধ্য থেকে লুঙ্গি শার্ট পড়া ও মাথায় পট্টি বাঁধা ষন্ডা মার্কা একজন তার মাথার টুপি ধরে টান দিলো। অমনি লুঙ্গি-পাঞ্জাবী পড়া টুপিঅলা ঝাপটে ধরলো তাকে। খরিদ্দারদের মদ্য থেকে প্যান্ট শার্ট ও সাহেবী টুপি পড়া অন্য একজন এসে ঝাপিয়ে পড়লো তাদের মাঝখানে, বললো – “আরে করেন কি, করেন কি”। এই কথা বলতে বলতে সে আলগোছে টুপিঅলার বুক পকেটের মানি ব্যাগটি তুলে নিয়ে পাশে দাড়ানো পায়জামা পাঞ্জাবী ও টুপি পড়া অন্যজনের কাছে পাঁচার করে দিলো এবং সে মানি ব্যাগটি নিয়ে চুপিসারে সরে পড়লো। ইতি মধ্যে “করেন কি, করেন কি”-র জবাবে সামান্য সরে দাড়িয়ে টুপিঅলা)
টুপিঅলা – দেখছেন না এ বেটা আমার টুপি নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে!
পকেটমার – তাই নাকি, বেটার আস্পদ্দাতো কম নয় – (এই বলে টুপিচোরের ঘাড় ধরলো এবং টুপিচোর মুখ কাঁচুমাচু করে ওর দিকে তাকালো) – বল বেটা, কোথায় রেখেছিস টুপি?
(ডানহাতের মুঠো আলগা করে উপরে তুলে ধরলো। সেখানে আধময়লা একটা পুরোনো টুপি।)
পকেটমার – অ্যাঁ, তাহলে ঠিকই টুপি চুরি করেছিস তুই! (এই বলে চোরের মাথায় একটা গাদা মেরে) – বল, কেন চুরি করেছিস?
টুপিচোর – পয়সা নেই, তাই।
টুপিঅলা – (টুপিঅলা ইতিমধ্যে নিজের পকেট সম্পর্কে সচেতন হয়েছে। সেখানে হাত দিয়েই সে বলে উঠলো) – কিন্তু আমার মানি ব্যাগ?
পকেটমার – কি বললেন, মানি ব্যাগও হাওয়া হয়ে গেছে?
টুপিঅলা – (পকেট হাতড়াতে হাতড়াতে কাঁদো কাঁদো স্বরে) – তাইতো দেখছি!
পকেটমার – তাহলে এ বেটাই নিয়েছে (এই্ বলে সে টুপি চোরের পকেট-গাঁট হাতড়াতে আরম্ভ করলো। একটি গাঁজার কলকে ছাড়া কোথাও কিছু পাওয়া গেল না। এবার সে টুপিঅলার দিকে তাকিয়ে বলল) – না. এর কাছে তো নেই।
(টুপি অলা কিছু না বলে একদৃষ্টে পকেটমারের দিকে চেয়ে রইলো)
পকেটমার – কী, আমাকে সন্দে করছেন? তাহলে খুঁজে দেখুন (এই বলে টুপিচোরকে ছেড়ে নিজেকে টুপিঅলার কাছে এগিয়ে দিলো। আর এই ফাঁকে টুপিচোর পালিয়ে যাবার জন্য পা বাড়ালো। ইতিমধ্যে পকেটমারের সঙ্গীও ফিরে এসেছে। সে এসে টুপিচোরকে একটা থাপ্পরই মেরে বসলো)
সঙ্গী – এভাবে হবেনা, চলুন, মহল্লার সর্দারের কাছে নিয়ে যাই।
পকেটমার – তাই চলুন, তাহলে মানি ব্যাগটারও খোঁজ পাওয়া যাবে।
(টুপিচোরকে ধরে নিয়ে তারা সবাই বেরিয়ে গেলো)
দিত্বীয় দৃশ্যঃ
(মহল্লার সর্দারের দরবার। একটি ফরাসের উপর সর্দার তার দু’জন চেলা নিয়ে বসে আছে। টুপিচোরসহ পকেটমার ও তার সঙ্গীরা প্রবেশ করতেই চেলা দু’জন এগিয়ে এসে বলল)
১ম চেলা – কী ব্যাপার?
টুপিঅলা – এই বেটা আমার টুপি ও মানি ব্যাগ দুটোই চুরি করেছে।
(এই কথা শুনতে শুনতেই সর্দার একটি টুপি মাথায় দিয়ে একটি তসবি ছড়া হাতে নিয়ে নিলো)
সর্দার – হুম, আপনার কোনো সাক্ষী আছে?
টুপিঅলা – (পকেটমার ও তার সঙ্গীকে দেখিয়ে) এরা দু’জন আমার সাক্ষী। তাছাড়া চোর নিজেও স্বীকার করেছে।
সর্দার – কিরে বেটা, মামলা কি সত্যি?
টুপিচোর – হ্যাঁ, টুপি আমি চুরি করেছি; কিন্তু মানি ব্যাগের কথা বলতে পারবো না।
সর্দার – কোথায় টুপি?
টুপিচোর – এইতো (ডান হাতের মুঠো মেলে ধরলো)।
সর্দার – তা টুপিই বা তুই চুরি করতে গেলি কেন?
টুপিচোর – পয়সা ছিল না তাই।
সর্দার – কিসের পয়সা?
টুপিচোর – গাঁজার পয়সা। আজ দু’দিন ধরে একছিলিমও জুটেনি।
১ম চেলা – আহ্ চুঁ চুঁ চুঁ, বেচারা একেবারে বেচাল হয়ে টুপিতেই হাত দিয়ে বসেছে। কিন্তু এই পুরোনো টুপি বেঁচে আর কয় পয়সা হতো।
২য় চেলা – এবার বল, মানি ব্যাগটা কোথায় রেখেছিস?
পকেটমার – আমিতো সাথে সাথেই খোঁজ নিয়ে ছিলাম। কিন্তু মানি ব্যাগ ও বেটার কাছে নেই।
সর্দার – (টুপিঅলার দিকে চেয়ে) ব্যাপার কি ঠিক?
টুপিঅলা – হাঁ, তাইতো মনে হলো।
সর্দার – তাহলে আর কি করা যাবে। তাছাড়া আপনার মানি ব্যাগে কত টাকা ছিল?
টুপিঅলা – ১৯৭১ টাকা ১০ পয়সা।
সর্দার – সেরেছে, আমিতো পাঁচশোর উপরে হলেই আর বিচার করার ক্ষমতা রাখিনা। টাকার ব্যাপারে তাই কোনো সাহায্য করতে পারবো না। তবে টুপির ব্যাপারে অবশ্যই সাহয্য করবো। এখন বলুন, আপনার টুপি ফেরত পেলে কি আপনি খুশি হবেন?
টুপিঅলা – টুপি না পেলেও চলবে। কিন্তু মানি ব্যাগ না পেলে গোষ্ঠি শুদ্ধ উপোস দিয়ে মরতে হবে।
সর্দার – তাতো ঠিক, তাতো ঠিক। তাহলে তো আপনাকে পুলিশ ফাঁড়িতে যেতে হবে, নালিশ করতে হবে।
(টুপিঅলা যাবার জন্য পা বাড়াতেই দু’জন চেলা তার সামনে হাত বাড়িয়ে বলল)
চেলা – আমাদের পাওনা?
টুপিঅলা – আমার কাছে তো ভাই কিছুই নেই।
পকেটমার – (টুপিচোরকে টুপিঅলার হাতে দিয়ে) এই নাও ভাই, মাফ করো।
(এই বলে দু’টি টাকা দু’জনের হাতে দিয়ে দিলো)
টুপিঅলা – এ কী করছেন?
পকেটমার – ঋণ দিচ্ছি, পরে দিয়ে দিবেন।
(টুপিচোরের হাত ধরে সবাই বেরিয়ে গেল)
তৃতীয় দৃশ্যঃ
(পুলিশ ফাঁড়িতে টেবিল সামনে নিয়ে চেয়ারে বসে আছেন পুলিশের কর্মকর্তা। বেশভূষা ছাড়া দেখতে অনেকটা সর্দারের মতই। সেই চেলা দু’জন যেন পোশাক বদলে রাইফেল হাতে দু’পাশে দাড়িয়ে আছে। টুপিচোর সহ পকেটমার ও তার সঙ্গীরা প্রবেশ করতেই এক জন পুলিশ এগিয়ে এসে বলল)
১ম পুলিশ – কী ব্যাপার?
পকেটমার – একটি চুরির কেইস, হাতে নাতে ধরা পড়েছে।
কর্মকর্তা – কী চুরি করেছে?
টুপিঅলা – আমার মানিব্যাগ।
পকেটমার – আগে টুপি, তারপর মানিব্যাগ।
কর্মকর্তা – তার মানে?
টুপিঅলা – মানে খুবই সোজা, টুপি চুরির ভয় দেখিয়ে মানি ব্যাগ হাতিয়ে নিয়েছে।
কর্মকর্তা – সাক্ষী আছে?
টুপিঅলা – (পকেটমার ও তার সঙ্গীকে দেখিয়ে) এই যে এরা দু’জন।
কর্মকর্তা – ঠিক আছে, নাম বলুন।
টুপিঅলা – আমার নাম – ফেলু মিয়া,
বাপের নাম – ফালতু মিয়া,
গ্রাম – কেবলার চর।
কর্মকর্তা – (লিখতে লিখতে) কী কাজ করেন?
টুপিঅলা – কেরাণী, আফিসের কেরাণী।
কর্মকর্তা – (টুপিচোরের প্রতি) কিরে বেটা তোর নাম কী?
টুপিচোর – আমার নাম পাঞ্জু বেকার,
বাপের নাম – জানিনা,
গ্রাম – গাছতলা।
কর্মকর্তা – বাপের নাম কী বললি?
টুপিচোর – বললাম তো, জানিনা।
কর্মকর্তা – (পকেটমারের দিকে) আপনার নাম কী?
পকেটমার – টেলকম পাউডার,
পিতার নাম – কলম্বাস,
ঠিকানা – হাইজাক পাড়া।
কর্মকর্তা – আপনি কী চুরি করতে দেখেছেন।
পকেটমার – হ্যাঁ, দেখেছি।
কর্মকর্তা – (পকেটমারের সঙ্গীর প্রতি) আপনার নাম কী?
সঙ্গী – আলহাজ্ব পোশাক মিয়া,
বাপের নাম – ব্যাংক লুট মিয়া,
বাড়ী – জোদ্দার পাড়া।
কর্মকর্তা – আপনি কী চুরি করতে দেখেছেন।
সঙ্গী – না, দেখিনি; মিঃ টেলকমের কাছে শুনেছি।
কর্মকর্তা – (টুপিঅলার প্রতি) ব্যাস, (পুলিশের প্রতি দেখিয়ে) চুরির বিবরণটা এদের কাউকে দিয়ে লিখিয়ে দাখিল করে যাবেন। আসামী কোর্টে চালান হবে। সেখানে আবার দেখা হবে।
(এই বলে কর্মকর্তা উঠে পড়লেন। টুপিঅলা পাশের পুলিশটির দিকে তাকাতেই সে হাত বাড়িয়ে দিল।)
টুপিঅলা – আমার কাছে একটি পয়সাও নাই, ভাই!
অন্য পুলিশ – (টুপিচোরের প্রতি) মানিব্যাগ কী করলি?
টুপিচোর – মানিব্যাগ আমি নিইনি।
অন্য পুলিশ – তবে কে নিয়েছ? বলবি, না প্যাদানী খাবি!
পকেটমার – থাক ভাই, এই নিন (পাঁচ টাকার দু’টি নোট বের করে দুই পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিলো)।
টুপিঅলা – এ কী করছেন ভাই!
পকেটমার – কিছুনা, সাহায্য করছি, ঋণ দিচ্ছি, পরে দিয়ে দেবেন, এখন চলুন যাওয়া যাক্।
(টুপিচোর ছাড়া অন্যরা বেরিয়ে গেল। পরে পুলিশ দু’জন চোর কে বেঁধে নিয়ে চলে গেলো।)
চতুর্থ দৃশ্যঃ
(কোর্টে হাকিমের এজলাশ। টেবিল সামনে নিয়ে চেয়ারে বসে আছেন হাকিম। বেশ ভূষা ছাড়া চেহারা অনেকটা পুলিশ কর্মকর্তার মতোই। কাঠগড়ায় দাড়িয়ে আছে টুপিচোর। অন্যদিকে পেশকারের কাছে দাড়িয়ে আছে টুপিঅলা ও পকেটমার। সামনে বসে আছে দু’জন উকিল। বেশ ভূষা ছাড়া চেহারায় আগের পুলিশ দু’জনের মতোই।)
পেশকার – বাদী পক্ষের উকিল মামলা শুরু করতে পারেন।
বাদী উকিল – (বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে) ধর্মাবতার, এই আসামী পাঞ্জু বেকার আমার মক্কেল ফেলু মিয়ার টুপি ও মানিব্যাগ চুরি করেছে। মিঃ টেলকম ও আলহাজ্ব পোশাক মিয়া এই চুরির সাক্ষী।
হাকিম – সাক্ষী মিঃ টেলকমকে হাজির করুন।
পেশকার – মিঃ টেলকম হাজির…।
(টেলকম এসে সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়ালো এবং নিজেই – “যাহা বলিব সত্য বলিব” বলে শপথ গ্রহণ করল।)
বাদী উকিল – আচ্ছা, মিঃ টেলকম, আপনিতো আসামীকে চুরি করতে দেখেছেন, তাইনা?
টেলকম – হ্যাঁ, তবে টুপি চুরি করতেই দেখেছি, মানিব্যাগ নয়।
বাদী উকিল – তা হলে মানিব্যাগ কে চুরি করল?
টেলকম – আমি বলতে পারবো না।
হাকিম – বিবাদী পক্ষের উকিল কি সাক্ষী কে জেরা করবেন?
বিবাদী উকিল – না, ধর্মাবতার, সাক্ষী আমার পক্ষেই কথা বলেছে। জেরার দরকার নেই।
হাকিম – দ্বিতীয় সাক্ষী।
পেশকার – সাক্ষী আলহাজ্ব পোশাক মিয়া হাজির…।
(পোশাক মিয়া এসে সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়ালো এবং নিজেই – “আমি মিথ্যা কথা বলিনা” বলে শপথ নিল।)
বাদী উকিল – আচ্ছা পোশাক মিয়া, আপনি তো আসামীকে চুরি করতে নিশ্চয়ই দেখেছেন?
পোশাক মিয়া – না, আমি দেখেনি, তবে মিঃ টেলকমের কাছে শুনেছি।
বাদী উকিল – তার কথা শুনেই আপনি বিশ্বাস করলেন?
পোশাক মিয়া – মিঃ টেলকম বিদেশী মানুষ, তারতো মিথ্যা বলার কারণ নেই।
হাকিম – বিবাদী পক্ষের উকিল কী সাক্ষীকে জেরা করবেন?
বিবাদী উকিল – না, ধর্মাবতার, জেরার কোনো প্রয়োজন নেই। এ মামলা যে মিথ্যা, সাক্ষীরা নিজেরাই তা প্রমান করেছেন। তবে আমি বাদী ফেলু মিয়াকে দুয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই।
হাকিম – ফেলু মিয়াকে হাজির করুন।
পেশকার – ফেলু মিয়া হাজির…।
(ফেলু মিয়া কাঠগড়ায় এসে দাঁড়াবে এবং নিজেই “কোনো কিছু গোপন করিবনা” বলে শপথ নেবে।)
বিবাদী উকিল – আপনি কী গাঁজার ভক্ত?
ফেলু মিয়া – কক্ষনো না, তওবা তওবা!
বিবাদী উকিল – তাহলে টুপি মাথায় দিয়ে গাঁজার দোকানে গিয়েছিলেন কেন? ধর্মাবতার, বাদী গাঁজাখোর; টুপি মাথায় দিলেও গাঁজার নেশা ছাড়তে পারেনি। তাই টুপি খুইয়ে মানিব্যাগ হারিয়ে আমার মক্কেলের নামে এই মিথ্যা মামলা সাজিয়েছে।
ফেলু মিয়া – অসম্ভব, এই টুপি আমার দাদার, আমার বাপও মাথায় দিয়েছে, তাই আমি কী এই টুপির ইজ্জত নষ্ট করতে পারি। আসামী যে টুপি চুরি করেছে, সেতো সাক্ষীরাই বলেছে। কাজেই যে টুপি চুরি করতে পারে, সে মানিব্যাগও চুরি করতে পারে। টুপি চুরির ভাওতা দিয়ে, আমার মানিব্যাগ হাতিয়ে দিয়েছে। আমান সর্বস্ব হারিয়ে আজ মাগপোলা নিয়ে আমি উপোস করছি। ধর্মাবতার, আমি এর বিচার চাই।
হাকিম – কিন্তু সাক্ষ প্রমানেতো আসামীকে দোষী করা যাচ্ছে না। তাছাড়া টুপি চুরির ব্যাপারটাও সন্দেহজনক। কারণ, সাধারণভাবে মাথার টুপি কেউ চুরি করেনা, করা সম্ভব নয়। তাই আসামীকে বেকসুর খালাস দেয়া ছাড়া উপায় নেই। তবে বাদীকে এই উপদেশ দেয়া যেতে পারে যে, ভবিষ্যতে সে যেন টুপির চাইতে মানিব্যাগের দিকে বেশী খেয়াল রাখে। কোর্ট আপাততঃ মুলতবী ঘোষণা করা হলো।
(একে একে সবাই কোর্ট থেকে বেরিয়ে যাবে।)
পঞ্চম দৃশ্যঃ
(আবার সেই গলির দৃশ্য। টুপিঅলা ফেলু মিয়া ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মিঃ টেলকম তার পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে।)
টেলকম – কেঁদে আর কী হবে ভাই, কোর্টের বিচারই এমনই। যা হোক আমরা আপনার একটা হিল্লা অবশ্যি করবো। আপনি বালবাচ্চা নিয়ে না খেয়ে মরবেন, এটা তো হতে পারেনা।
পোশাক মিয়া – অবশ্যি, অবশ্যি। মিঃ টেলকম, আপনি যে মানবতা দেখালেন, তার কোন তুলনা হয় না।
টেলকম – কী করবো বলুন, এর জন্যেই তো এই বিদেশ বিভূঁইয়ে পড়ে আছি। মানুষের দুঃখ মোটেও দেখতে পারিনে।
ফেলু মিয়া – কিন্তু আপনি আর কত দেবেন। মামলার সমস্ত খরচ দিলেন। এমনিইতো অনেক টাকা ঋণী হয়ে গেছি।
টেলকম – তাতে কী হয়েছে, দরকার হলে আরও ঋণ দেবো। তবু আপনাকে না খেয়ে মরতে দেবো না।
পোশাক মিয়া – না, না, তা হতে দেয়া যায় না। মিঃ টেলকম, সত্যি আপনাকে যতোই দেখছি কেবলি আবাক হচ্ছি।
ফেলু মিয়া – তা আর বলতে, মনে হয় আত্মার আত্মীয়…
টেলকম – আহ্, থামুনতো আপনারা। এই নিন (গাঁজার দোকানের পাশ থেকে একটি থলে এনে ফেলু মিয়ার হাতে তুলে দিয়ে) এতে সের দশেক গম আছে। কোন প্রকারে আজকের দিনটা চালিয়ে নিন। পরদিন আবার আসবেন, আবার দেবো।
ফেলু মিয়া – (গমের থলে কাঁধে তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় এবং বলতে থাকে।)
আল্লাহ আপনাকে এর বদলা দেবে, আল্লাহ্ই এর বিচার করবেন।
(এমন পাঞ্জু বেকারও এসে প্রবেশ করে এবং সকলে হাসতে হাসতে একে অপরের সাথে হাত মেলায়।)
শেষ
দাদা
ক্রমান্বয়ে সংযুক্ত করা হবে…
কলা
ক্রমান্বয়ে সংযুক্ত করা হবে…
কালকেতু উপাখ্যান
ক্রমান্বয়ে সংযুক্ত করা হবে…