ক্রমান্বয়ে সংযুক্ত করা হবে…
Author: admin
আতাউল করিম
ক্রমান্বয়ে সংযুক্ত করা হবে…
ফরিদ আহমদ দুলাল
ক্রমান্বয়ে সংযুক্ত করা হবে…
যতীন সরকার
(এক)
গোলাম সামদানী কোরায়শী আমার বন্ধু ছিলেন। পরিচয়ের প্রথম দিন থেকেই তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের সূচনা হয়েছিল। সে সূচনাই দিনে দিনে ক্রমপ্রসারমান হয়ে উঠেছিল। ডালপালা বিস্তার করে মহীরুহের রূপধারণ করেছিল। সে ছত্রছায়ায় অবস্থান করে আমি ধণ্য হয়েছিলাম।
তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব গভীর ছিল বটে কিন্তু একমাত্রিক ছিল না। আমাদের দু’জনের মতের ঐক্য যেমন ছিল, তেমনি ছিল মতভিন্নতাও। কখনও কখনও তীব্র মতদ্বন্দ্বেও পরিণত হত। তবে সে দ্বন্দ্ব আমাদের সম্পর্কেও মধুরতাকে সামান্য পরিমাণেও আবিল করতে পারত না। আমাদের মতান্তর কখনও মনান্তরের জন্ম দেয়নি।
১৯৬৮ সালের মাঝামাঝিতে সামদানী যখন নাসিরাবাদ কলেজে আমার সহকর্মী হয়ে এলেন, তখন তাকে একজন ‘অজ্ঞেয়বাদী’ বলে মনে হয়েছিল। আলীয়া মাদ্রাসা থেকে মমতাজুল মোহাদ্দেসীন হওয়ার পর আধুনিক ধারার কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা নিয়ে বাঙলা সাহিত্যে এম.এ. পাস করে ষাটের দশকের গোড়ায় বাঙলা একাডেমিতে চাকরি নিয়েছিলেন, আঞ্চলিক ভাষার অভিধান প্রণয়নে জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সহযোগী হয়েছিলেন। সে সময়ে কিংবা তার কিছু আগে থেকেই নাকি সামদানী সাহেব সকল প্রকার ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পরিত্যাগ করেছিলেন, ধর্ম বিষয়ে ক্রিটিক্যাল হয়ে উঠেছিলেন। পরিচয়ের প্রথম পর্বেই আমি তার এই সমালোচনামুখর রূপটি প্রত্যক্ষ করেছিলাম। ধর্ম থেকে শুরু কওে দর্শন পর্যন্ত নানা বিষয়েই তিনি নানা প্রশ্ন উত্থাপন করতেন। কিন্তু কোনো প্রশ্নেরই নিঃসংশয় উত্তরে পৌছতেন না। ভাববাদ ও বস্তুবাদ উভয়ের প্রতি সে সময়ে তাকে আমি সংশয়তুর দেখেছি। আমি যে দ্বান্দিক বস্তু বাদে বিশ্বাস করি সেটা তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। আমার এই বিশ্বাস কে তিনি এক ধরনের মতান্ধতা বলেই মনে করতেন এবং এর জন্য আমাকে বিদ্রুপরাণে বিদ্ধ করতেও পিছপা হতেন না। নিজেকে তিনি মুক্তবুদ্ধির সাধক বলে পরিচয় দিতেই গৌরববোধ করতেন। যে কোনোও রূপ দার্শনিক বিশ্বাসের অনুগামীতাকেই মুক্তবুদ্ধির বিরোধী বলে মনে করতেন। অথচ কি আশ্চর্য, কয়েক বছরের ব্যাবধানেই তার চিন্তাচেতনার এমন সম্প্রসারণ ঘটে গেল যে দ্বান্দিক বস্তুবাদের মধ্যেই মুক্তবুদ্ধি চর্চার প্রশস্ত পথকে তিনি খুঁজে পেলেন। সমাজতন্ত্র সম্পর্কে এমন প্রত্যয়ী হয়ে উঠলেন যে তার মৃত্যুর কয়েক মাস আগে সমাজতন্ত্রী শিবিরে যখন প্রচন্ড ধ্বস নামছিল, তখন এখানে ওখানে উচ্চ কন্ঠে তিনি বলতে লাগলেন, পৃথিবীর সব মানুষ যদি সমাজতন্ত্রকে মিথ্যা বলে, তবুও আমি একাই সমাজতন্ত্রের পক্ষে কথা বলে যাব।
(দুই)
দ্বান্দিক বস্তুবাদ ও সমাজতন্ত্রে প্রত্যয়ী হয়ে উঠলেও, লক্ষ্য করেছি যে, সামদানী সাহেবের সে প্রত্যয় ছিল একান্তই ব্যাক্তি বৈশিষ্টমন্ডিত। পরের মুখে ঝাল খাওয়া তিনি কখনই পছন্দ করতেন না, সবকিছুতেই যাচাই বাছাই করে নিজের মতটি গঠন করতেন। আনুষ্ঠানিক ধর্ম বিশ্বাস থেকে অজ্ঞেয়বাদে এবং অজ্ঞেয়বাদ থেকে দ্বান্দিক বস্তুবাদে উত্তরণের ক্ষেত্রেও তিনি তার ব্যাক্তি বৈশিষ্টটিকে সমুজ্জ্বল রেখেছিলেন। জীবনের শেষ পর্বে দ্বান্দিক বস্তুবাদ কে জীবন দর্শন হিসেবে গ্রহণ করবার পর নানা ঘরোয়া আলোচনায় ও সভা-সমাবেশে প্রায়ই তিনি বলতেন ‘আমার গুরু সাতজন। প্রথম গুরু সক্রেটিস, দিত্বীয় গুরু বুদ্ধ, তৃতীয় গুরু শ্রীকৃষ্ণ, চতুর্থ গুরু যীশুখ্রিস্ট, পঞ্চম গুরু হযরত মুহম্মদ (সাঃ), ষষ্ঠ গুরু কার্ল মার্কস এবং আমার সপ্তম গুরু হচ্ছেন একান্তই আমার নিজের, যিনি আর কারও গুরু নন, তিনি আমার জন্মদাতা পিতা।’
নানা প্রসঙ্গে তিনি তার এই গুরুদের শিক্ষার ব্যাখ্যাও দিতেন। সক্রেটিসকে প্রথম গুরু বলতেন এ কারণে যে, তিনিই তো মানুষ কে প্রথম আত্মসমীক্ষা করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ‘অপরীক্ষিত জীবন কোনও মতেই যাপনের উপযুক্ত নয়’ (A life unexamined is not worth living) এমন কথা বলেই তো সক্রেটিসই প্রতিটি মানুষকে আত্মপরীক্ষায় প্রবৃত্ত হতে আহ্বান জানিয়েছেন। আমরাতো কোনও না কোনও ধর্ম মত অনুসারী হয়ে থাকি জন্মসূত্রেই। বয়সঃপ্রাপ্ত হয়ে নিজে পছন্দ অনুযায়ী ধর্ম মত বাছাই করে নেয়ার অধিকার সমাজ আমাদের দেয় না। গড্ডল প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়েই ধর্মমত ছাড়া রাজনৈতিক বা দার্শনিক অন্য অন্য মতেরও অনুসারী হই আমরা। আত্মসমীক্ষা বা আত্মপরীক্ষায় প্রবৃদ্ধ হয়ে নিজের জীবন কে কেউই আমরা গড়ে তুলি না। এ কারণে সামদানী সাহেব বলতেন, ‘যাপিত জীবন কে অর্থবহ করে তুলতে হলে সক্রেটিসকেই প্রথম গুরু রূপে বরণ করে নেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই’। এরকমভাবেই পরপর বুদ্ধ, শ্রীকৃষ্ণ ও যীশুর শিক্ষার গুরুত্বেও কথা তিনি তুলে ধরতেন। তার পঞ্চম গুরু হযরত মুহম্মদের শিক্ষা ও আদর্শ সম্পর্কে তো তার ছিল গভীর অনুধাবন। মাদ্রাসার মেধাবী ও কৃতী ছাত্ররূপে মুহম্মদ (সাঃ) ও ইসলাম সম্পর্কে তিনি অসাধারণ জ্ঞান লাভ করেছিলেন। ঘরোয়া আলাপে কিংবা নানা আলোচনা সভায় তার সেই জ্ঞানের পরিচয় পেয়ে আমরা মুগ্ধ হয়ে যেতাম। তার কি গভীর শ্রদ্ধাই না ছিল মহানবী মুহম্মদের প্রতি। সে শ্রদ্ধায় কোন সংস্কারান্ধতা ছিলনা, গতানুগতিকতা ছিলনা, বিচারহীনতা ছিলনা। বিচারশীল ঐতিহাসিক দৃষ্টি দিয়েই তিনি সব কিছু গ্রহণ করতেন। কার্ল মার্কসের প্রতিও এরকম সবিচার দৃষ্টি দিয়েই তিনি তাকিয়েছিলেন। নিজস্ব বিচারশীলতা ক্ষুন্ন হবে মনে করেই, মার্কসের অনুরাগী হয়েও, কমিউনিস্ট পার্টির শৃংখলা সূত্রে নিজেকে তিনি আবদ্ধ করতে চাননি। তবে কমিউনিস্টদের সঙ্গে সবসময় তিনি অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রক্ষা করে চলতেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই এবং আগেও কিছু পরিমানে নানা সামাজিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন কমিউনিস্টদের বিশ্বস্ত সহযাত্রী।
ষাটের দশকে আমরা ময়মনসিংহে এমন একটি সাহিত্যচক্র গড়ে তুলেছিলাম, যেটির কোনও সাংগঠনিক রূপ ছিলনা, সভাপতি-সম্পাদক কিছুই ছিলনা, এমনকি এর কোনও নামও ছিলনা। তখনকার গোপন ও নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টিও অদৃশ্য পৃষ্ঠপোষকতা ছিল অনামি এই সাহিত্যচক্রটির প্রতি। ৬৮তে ময়মনসিংহে এসেই সামদানী সাহেব এই সাহিত্যচক্রটির মধ্যমণি হয়ে উঠেছিলেন। তখন আর সেটি অনামী রইলনা। সামদানী সাহেবই এর নামকরণ করলেন, ‘ঘরোয়া সাহিত্যচক্র’। মূলত এই সাহিত্যচক্রের সদস্যদের উদ্যোগেই ১৯৭১ – এর মার্চে ময়মনসিংহে ‘বুদ্ধিজীবী সংগ্রাম শিবির’ গড়ে উঠেছিল। এই শিবিরেরও প্রাণস্বরূপ হয়ে উঠলেন গোলাম সামদানী কোরায়শী। ময়মনসিংহে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তোলার ব্যাপারে ‘বুদ্ধিজীবী সংগ্রাম শিবির’ – এর অবদান মোটেই হেলাফেলা করবার মত নয়। স্বাধীনতার পরও এই সংগঠনটি ময়মনসিংহের সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অনেক দিন ধরে সক্রিয় ছিল। এরপর ৭৫ – এর ১৫ আগষ্টের অমানবিক হত্যাকান্ডের মধ্যদিয়ে সারা দেশে যখন এক ‘অদ্ভুত আঁধার’ নেমে এসেছিল, তখনও মুক্তচেতন সংস্কৃতির আলো জ্বালিয়ে রাখতে সামদানী সাহেব কে আমরা উদ্যোগী হতে দেখেছি। ৭৬ – এ ২১ ফেব্রুয়ারী ও বাংলা নববর্ষ উদযাপনে গোলাম সামদানী কোরায়শীই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এরপর ময়মনসিংহে ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’ এর শাখা গঠিত হলে সামদানী সাহেবই তার কর্ণধার হন। ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট’ কিংবা ‘ঘাতক-দালাল নির্মূল সমন্বয় কমিটি’তেও সামদানী সাহেবের অবস্থান ছিল প্রথম সারিতে। ‘বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি’র কেন্দ্রিয় কমিটির তিনি ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। ময়মনসিংহের মতো মফস্বলের বাসিন্দা হয়েও সারাদেশের প্রগতিশীল শিক্ষা আন্দোলনে তার ছিল উজ্জ্বল উপস্থিতি। ময়মনসিংহ শহরে তো সামদানী সাহেব কে বাদ দিয়ে কোনওরূপ প্রগতিশীল কর্মকান্ডের কথা ভাবাই যেতো না।
আশির দশকে সৈরাচারী এরশাদের ‘রাষ্ট্রধর্ম’ সম্পর্কীয় ঘোষণা যখন বাঙালী মুক্তিযুদ্ধকে ও লাখ শহীদের আত্মদানকে একান্তই বিদ্রুপবিদ্ধ করে তুললো, তখন স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি বলে আত্মবিজ্ঞাপিত রাজনৈতিক দল গুলোও তেমন জোরে সোরে কোনও প্রতিবাদ করেনি। ময়মনসিংহ শহরে গোলাম সামদানী কোরায়শী কিন্তু ‘রাষ্ট্রধর্ম’ ঘোষণার প্রতিবাদ মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েই ক্ষান্ত হলেন না, জ্বালাময়ী বক্তৃতায় প্রচন্ড ক্ষোভেরও প্রকাশ ঘটালেন, হিসেবী রাজনীতিকদের মতন ‘ধরি মাছ না ছুই পানি’ করে দায় সারলেন না। জীবনের প্রতি ক্ষেত্রেই গোলাম সামদানী কোরায়শী ছিলেন এমন অকপট ও দৃঢ়।
(তিন)
যদিও গোলাম সামদানী কোরায়শীর পৈত্রিক ভিটা ও জন্মস্থান ছিল গৌরীপুর থানার বীরআহমদপুরে, তবু সংগ্রামী জীবনের নানা ঘাটে জল খেয়ে খেয়ে তিনি ডেরা বেধেছিলেন ময়মনসিংহ শহরের উপকন্ঠে আকুয়া গ্রামে। জীবনের শেষ ২০/২২ বছর তিনি এখানেই কাটিয়েছিলেন। তার প্রতিবেশীদের গরিষ্ঠ সংখকই ছিলেন খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষজন। এদের সকলের সুখদুঃখের সঙ্গে তিনি একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন। আপদে-বিপদে এরা গোলাম সামদানী কোরায়শীরই পরামর্শ ও সহযেগীতা গ্রহণ করতেন। সামদানীকে ছাড়া এদেও পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের কোন কাজই সম্পন্ন হত না। প্রতিবেশীসহ যে কোনও পরিচিত জনের বিপদকে নিজের বিপদ বলেই মনে করতেন তিনি। নিজের বিপদকে বরং অনেক সময় উপেক্ষাই করতেন। কিন্তু পরের বিপদে কখনও নির্লীপ্ত থাকতে পারতেন না। হিউম্যানিজম এবং হিউম্যানিটারিয়ানিজমের অপূর্ব সম্মিলন ঘটেছিল তার স্বভাবে।
ব্যাক্তিগত ভাবে আনুষ্ঠানিক ধর্মাচরণের সঙ্গে সামদানীর কোনও সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও প্রবিবেশীদের ধর্মীয় জীবনের তিনিই ছিলেন সহযোগী। গাঁয়ের মসজিদের কোষাধ্যক্ষও হতে হত তাকেই। কারণ প্রতিবেশীরা জানত সামদানী সাহেব মসজিদে না গেলেও মসজিদের তহবিলের তিনিই হতে পারেন বিশ্বস্ত সংরক্ষক। ঈদুল আজহার দিনে আকুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সামনে তারই তত্বাবধানে গাঁয়ের সমস্ত লোকের পশু কোরবাণী হত। সকলকে মাংসের যথাযথ ভাগ বন্টন করে দিয়ে তিনি ঘরে ফিরতেন।
একজন আলেম হয়েও তিনি কেন ধর্মাচরণের আনুষ্ঠানিকতায় সামিল থাকেন না, এ নিয়ে অনেকেরই তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছিল। আড়ালে সামদানীর ধর্মহীনতা নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বললেও সামনাসামনি কেউ তাকে অভিযুক্ত করতে সাহস পেত না, তার ব্যাক্তিত্বকে না করার ক্ষমতা কারুরই ছিল না। তিনিও অবশ্যই জনসমক্ষে ধর্ম সম্পর্কে কোনও কালাপাহাড়ী কথাবার্তা বলতেন না, নিজের চৈতন্য ও আচরণে দৃঢ় থেকেই তথাকথিত বিদ্রোহীর ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য কখনও কোনও রূপ অতিরেকের প্রশ্রয় নিতেন না। আপন আদর্শ থেকে বিচ্যুত না হয়েও বাস্তববুদ্ধিকে তিনি বিসর্জন দেন নি।
অসাধারণ কান্ডজ্ঞান ও বাস্তববুদ্ধির সঙ্গে মুক্তচিন্তার যে সংমিশ্রন ঘটেছিল তার চরিত্রে, এ জন্য তিনি বারবার তার পিতার ঋণ স্বীকার করতেন। তার পিতা মৌলবি আব্দুল করিম কোরায়শী উত্তর ভারত থেকে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। সেখান থেকেই পাঠ নিয়েছিলেন ইউনানি চিকিৎসা শাস্ত্রেরও। চিকিৎসা ব্যাবসায়ী পিতার মুক্তচিন্তার প্রভাব পুত্রের উপর গভীরভাবেই পড়েছিল। এ কারণেই জীবন সায়াহ্নে তার সপ্ত গুরুও এক গুরু রূপে পিতার কথা বারবার স্মরণ করতেন।
তবে পিতাকে যে তিনি অনেক দূর ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন এ কথা বোধ হয় নির্দিধায় বলা যেতে পারে। তিনি শুধু জ্ঞানসাধক ছিলেন না, ছিলেন সৃজনশীল সাহিত্যিকও। ছড়া-কবিতায় তার হাত ছিল চমৎকার, যদিও কোন মৌলিক কবিতার বই তিনি প্রকাশ করেননি। তবে ইকবালের হেজাজের সওগাত – এর কাব্যানুবাদে গোলাম সামদানীর কবি-কুশলতার পরিচয় আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। অত্যন্ত সৃষ্টিশীল একটি মন ছিল তার। সেই মনেরই প্রকাশ দেখি সেমেটিক পুরাণের কাহিনী অবলম্বনে লিখিত তার কয়েকটি উপন্যাসে। এগুলোর মধ্যে ‘স্বর্গীয় অশ্রু’ ও ‘মহাপ্লাবণ’ তার জীবৎকালেই প্রকাশিত হয়েছিল। পান্ডুলিপি রেখে গেছেন এই ধারারই আরও দুটি উপন্যাসের ‘পুত্রোৎস্বর্গ’ ও ‘চন্দ্রাতপ’। মৌলিক গল্পের পান্ডুলিপি আছে দুটি ‘দেবাঃন জানান্তি’ ও ‘সংলাপ’।
অবশ্যই স্বীকার করতেই হবে যে গোলাম সামদানীর মননশীল রচনায় যে উৎকর্ষের পরিচয় আমরা পাই, তেমনটি পাই না তার গল্প উপন্যাস বা কবিতায়। বহুভাষাবিদ গোলাম সামদানী কোরায়শীর বিদ্যাবত্তা ও মননশীলতার পরিচয় বিধৃত হয়ে আছে তার অনুবাদ কর্মগুলোতে। মূল ফার্সি থেকে ‘কালিলা ও দিমনা’ তিনি অনুবাদ করেছিলেন। ফার্সি থেকেই অনুবাদ করেন ক্লাসিক্যাল ইতিহাস গ্রন্থ ‘তারিখ-ই-ফিরোজশাহী’র। মূল আরবী থেকে অনুদিত ‘আল-মুকাদ্দিমা’ তার অনন্য সাধারণ কীর্তির স্মারক হয়ে থাকবে। ইবনে খালদুনের এ মহাগ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ বাংলা ভাষায় এর আগে কেউ করেন নি। ইবনে খালদুনকে তো আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের জনক আখ্যা দেয়া হয়ে থাকে। বাংলা ভাষায় যারা সমাজবিজ্ঞানের চর্চা করবেন তাদের অবশ্যই গোলাম সামদানী কোরায়শীর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। তার ‘আরবী সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’ও একটি মূল্যবান পুস্তক।
সাহিত্য সম্পর্কে গোলাম সমাদানী কোরায়শীর ভাবনা-চিন্তার পরিচয়বাহী গ্রন্থ তার ‘সাহিত্য ও ঐতিহ্য’ শীর্ষক সংকলনটি। তিনি আলাউল বিরচিত ‘তোহফা’ গ্রন্থটির সম্পাদনা করেছিলেন। মধ্যযুগের বাংলাভাষা ও সাহিত্যে যে দখল ছিল তারই প্রমাণ রেখেছেন ঐ সম্পাদিত পুস্তকটিতে। সমকালীন আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে যে তিনি গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতেন তারই প্রকাশ ঘটেছে ‘বিশ্লেষক ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রগতিশীল চিন্তাবিদ’ এ পুস্তকটিতে। প্রকাশিত এই পুস্তিকাটিতে এবং অপ্রকাশিত নিবন্ধগ্রন্থ ‘আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ইসলাম’ এ তিনি মৌলবাদী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গভীর ঘৃণারও প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
অন্তর্জগতের কোনও ছাপ নেই তার কোনও প্রকাশিত গ্রন্থেই। পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে থাকা কিছু কিছু ব্যাক্তিগত নিবন্ধে তার মানসলোকের কিছু কিছু ছাপ পড়েছে বটে, কিন্তু সেগুলো অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ নয়। তার আত্মজীবনীর প্রথম পর্ব রূপে লেখা ‘সিন্ধুর এ বিন্দু’ পাঠ কওে বাঙালী পাঠক তার মানস বিবর্তণের প্রক্রিয়াটির সঙ্গে পরিচিত হতে পারবেন। এই বইটিতে তিনি যে শুধু তার মানস জগতকেই অনাবৃত করে দেখিয়েছেন তা নয়। কি চরম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছেন ও কি কঠিন সংগ্রাম করে আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন, এ বইয়ে তারই শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনী পাঠ করে পাঠক চমৎকৃত হয়ে যাবেন।
বলার পরও কিন্তু বলতে হবে যে, তার জীবন ভাবনা তথা জীবন দর্শন ও ব্যাক্তি স্বরূপকে কোনও বইয়ে বা লেখায় পুরোপুরি খুঁজে পাওয়া যাবে না। এজন্য প্রয়োজন ছিল একজন বসওয়েলের। গোলাম সামদানীর জীবৎকালে আমরা কেউই তার বসওয়েলের দায়িত্ব গ্রহণ করিনি। যদি করতাম তাহলে বাঙালী পাঠক একজন এদেশীয় জনসনকে পেয়ে যেত। নানা আড্ডায় ও বৈঠকে তিনি যে সব সিরিয়াস কথা বলেছেন কিংবা হালকা চুটকি ঝেড়েছেন অথবা নানা ঘটনায় নানান ধরনের প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ ঘটিয়েছেন, সেসবের বিবরণ রেকর্ড করা থাকলে বর্তমান প্রজন্মের মানুষ একজন অনুসরণীয় ব্যাক্তিত্বের মডেল পেতে পারত।
কিন্তু আমরা তার সহকর্মী ও সহযোদ্ধা বন্ধুরা যথাসময়ে দায়িত্ব পালন করিনি বলে আমাদের পক্ষে এখন আপসোস করা ছাড়া আর করার কিছুই নেই।
আলোকময় নাহা
গোলাম সামদানী কোরায়শী তেইশ বছর আগে ময়মনসিংহে আসেন নাসিরাবাদ কলেজে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে। ময়মনসিংহে এলেন এবং জয় করলেন। সে সময় থেকে আমৃত্যু তিনি ময়মনসিংহের সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতিতে নিজেকে একাত্ম করে রেখেছেন। এ সময়টা তাঁকে ছাড়া এলাকায় কোন সাহিত্য বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কথা চিন্তা করতে পারি না আমরা। ১৯৩০ সালে জন্মেছেন, মৃত্যু গত ১১ই অক্টোবর। বাল্যে পিতৃহারা হয়ে কঠোর সংগ্রাম করতে হয়েছে তাঁকে। অসাধারণ মেধাবী ছাত্র ছিলেন বলেই সেই দুঃসহ দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম তিনি টিকতে পেরেছেন – এগুতে পেরেছেন।
আরবী ফারসী উর্দূতে তাঁর পান্ডিত্য ছিল অগাধ। মমতাজুল মোহাদ্দেসীন পরীক্ষায় ঢাকা আলীয়া মাদ্রাসা থেকে তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। এর পরে তিনি আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তিনি অনার্স ও এম.এ ডিগ্রী প্রাপ্ত হন। বাংলা একাডেমীতে তিনি সুদীর্ঘ ৮ বছর ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র অধীনে আঞ্চলিক ভাষা অভিধান প্রকল্পে চাকুরী করেন। তাঁর আরবী ও ফার্সী থেকে অনুদিত লেখা কিছু বইয়ের মাঝে ইবনে খালদুন রচিত আরবী গ্রন্থ ‘আল মুকাদ্দিমা’, ‘কালিলা ও দিমনা’, ‘হেজাজের সওগাত’, ‘তারিখ-ই-ফিরোজশাহী’, ‘তোহ্ফা’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্যে। আরবী সাহিত্যের ইতিহাস, সাহিত্য ও ঐতিহ্য, ইসলাম ও আমেরিকা ও স্বরচিত অন্যান্য গ্রন্থে গোলাম সামদানীর জ্ঞানের গভীরতা, যুক্তিবাদী চিন্তাচেতনা, দৃষ্টিভঙ্গীর উদারতা, বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও মানবতাবোধ, মুক্তবুদ্ধি-দীপ্ত সাধারণ পাঠকের মনকে ও আলোড়িত করতে সক্ষম হয়।
১৯৬৮ সনে ময়মনসিংহে চাকুরী সূত্রে আসার পর ময়মনসিংহ শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সারাদেশ ব্যাপী রাজনৈতিক আবহাওয়া তখন উত্তপ্ত – শুরু হলো স্বাধিকার আন্দোলনের সংগ্রামী দিনগুলি। ময়মনসিংহে বুদ্ধিজীবিরা বুদ্ধিজীবী সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ শহর, শহরতলী এবং আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে সভাসমিতি করে জনগণকে আন্দোলনের পক্ষে উদ্বুদ্ধ করেন। এ আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে গোলাম সামদানীর ভূমিকা সবাইকে উদ্বুদ্ধ করেছিলো। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষিকে প্রাধান্য দিয়ে একটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় করার জন্য সে সময় দেশজুড়ে যে শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে উঠেছিলো তার অন্যতম রূপকার ছিলেন জনাব সামদানী। এ ব্যাপারে আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে যে গুরুতর ফৌজদারী অভিযোগ এনে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারী হয়েছিলো তাতেও তাঁর নাম যুক্ত হয়েছিলো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বক্ষণে বুদ্ধিজীবী হত্যার যে তালিকা তৈরী হয়েছিলো ময়মনসিংহের সে তালিকায় তাঁর নাম ছিল প্রথমে – ময়মনসিংহ মুক্ত হতে একদিন দেরী হলে হয়তো সামদানীসহ অনেক বন্ধুকেই আমরা সে সময় হারাতাম।
বিগত ৭/৮ বৎসর প্রয়াত সামদানী উচ্চ মাধ্যমিক বা ডিগ্রী পরীক্ষার কোন খাতা দেখেননি। পরীক্ষায় নকলের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন তিনি। প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন ও নকল করার প্রবণতা রোধ করতে তিনি নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। প্রচলিত পদ্ধতিতে পরীক্ষায় আসল ভাল ছাত্রের ও নকলবাজ ছাত্রের খাতা দেখে প্রভেদ নিরুপণ করা সম্ভব নয় বুঝে তিনি নীতিগতভাবে খাতা দেখা ছেড়েছেন। এ ব্যাপারে পত্রপত্রিকায় বহু লেখালেখি করেছেন । অর্থের কাছে তিনি ন্যায়নীতি বিসর্জন দেননি।
আমাদের সমাজে সর্বক্ষেত্রে অবক্ষয় যেখানে চরম আকার ধারণ করেছে, দুর্নীতি এবং দুর্বলকে সবলের শোষণ যেখানে স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে গোলাম সামদানী মেরুদণ্ড সোজা করে এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। সাথে এখন কাউকে না পেলে ‘একলা চলো’ নীতিতে আস্থা রেখেছেন। ধর্মীয় গোড়ামী, সাম্প্রদায়িকতা, সকল প্রকার কুসংস্কার থেকে মুক্ত থেকে তিনি মুক্তবুদ্ধির প্রচারে ও চর্চার যত্নবান থেকেছেন আমরণ। নীতিগতভাবে যার তাঁর এই নীতিরঘোর বিরোধী তাঁরাও কিন্তু সামদানীর চরিত্রের দৃঢ়তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।
বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক, ময়মনসিংহে বঙ্গবন্ধু পরিষদ, আপসো, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, প্রেস ক্লাব, ইত্যাদি বিভিন্ন সংগঠনে তিনি সংযুক্ত থেকে এ এলাকায় শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারে যত্নবান থেকেছেন। তিনি যে মাপের ব্যাক্তিত্ব ছিলেন, মফস্বল শহরে থাকার দরুণ সেটার দেশব্যাপী প্রতিফলন আজ অনুপস্থিত – এ ছাড়া ব্যক্তিগত ভাবে নিজেও ছিলেন প্রচার বিমুখ। জেলা পরিষদের মুদ্রণ বিভাগে তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করে তাঁর রচনাবলী প্রকাশে জেলা পরিষদ উদ্যোগ নেবে এটা কামনা করি।
মুক্তবাতায়ন পাঠচক্র নামের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ১৯৮৯ সনের ১৬ই আগস্ট স্থানীয় প্রেসক্লাবে অধ্যাপক সামদানী কোরায়শীর ষাট বৎসরে পদার্পণ উপলক্ষে এক মনোজ্ঞ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। গত ৬ই সেপ্টেম্বর উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, ময়মনসিংহ শাখা তাঁকে গুণীজন হিসেবে সম্মানীত করে। এ অনুষ্ঠানে তিনি তাঁর ভাষণে বলেছিলেন যে বোধ হয় সমাজকে তাঁর যেটুকু দেয়ার ছিল তা শেষ হয়েছে তাই গুণীজন হিসেবে তাকে সম্মান দেয়া হয়েছে। মাত্র একমাসের মধ্যে যে তিনি আমাদের ছেড়ে যাচ্ছেন সেটা অন্যে না বুঝলেও হয়তো তাঁর উপলব্ধিতে সেটা ছিল।
পরম শ্রদ্ধাভাজন সামদানী’র বিদেহী আত্মা
শান্তি পাক এটাই কামনা করি।
অগ্নিকুন্ডু
পাঁচ পাঁচ দশটা মুন্ডু রাবণের - শ্রাবণের - এই রাত - যেনো এক অগ্নিকুন্ডু। ঘরে নেই চাল নেই ডাল নেই মাছ - হায়রে ভেন্না গাছ; ভ্যানর ভ্যানর করে, বন বন ঘুরে শুধু মাথাটা টাপুশ টুপুশ করে রাতদিন ভিজে ছেঁড়া কাঁথাটা; রক্তের মাঝে তবু তোলপার করে শুধু গাঁজা, ভাঙ্, চরস্ আর চন্ডু। পাঁচ পাঁচ দশটা মুন্ডু --- কুটকুট কামড়ায় মশা কি; ওদের কাটেনা রাত, আমাদের মত এক দশা কি; যাকগে্, নিকগে্ - ভেজালের পানসে রক্ত তবুও মরে না ভাই শকুনির মতো ওরা শক্ত। হায়রে রক্ত চোষার দল! কতো কাল আর কতো কাল এমনি রক্ত চুষবে, পরের মটকে ঘাড় পরের চিবিয়ে হাড় তোমাদের মাগ্ পোলা পুষবে! ঐ ঝড় আসেরে - কড় কড় বাজেরে, ঝড় আসে - তোদের তাসের ঘর করবে লন্ডু ভন্ডু। পাঁচ পাঁচ দশটা মুন্ডু -----
গান
(১) এতো রূপ আছে ভুবনে, আগেতো পড়েনি নয়নে, এতা সুখ এতো গান, বুক ভরা অফুরান; ভয় বাধা নেই কিছু নেই। তুমি মোর পাশে এলে যেই। কি মধুর এই ভোর ফুলের হাসি, আগেতো বুঝিনি এতো ভাল যে বাসি; পাখিদের কলগান, আবেশে জুরায় প্রাণ, হৃদয় হারায় বুঝি খেই। এই বন উপবন সবুজ মায়া, ঐ দূর আকাশের সুনীল কায়া; রোদের সোনালী রূপ, দেখি আজ অপরূপ আশা যে মেটে না কিছুতেই। (২) আমার পৃথিবী আধারে গিয়েছে ছেয়ে; কেগো তুমি দূরে তারকার মত আমা পানে আছো চেয়ে। হেথা নাই কোনো আশার আলোক জীবনের পরিচয়, গহণ আঁধারে সকলই পেয়েছে লয়; আমার হৃদয়ে যতো ব্যথা জাগে একা একা আমি ফিরি তারই গান গেয়ে। কেগো তুমি দূরে শুধু চেয়ে রও কেনো কিছু নাহি বলি, তোমার চাহনি যায় যে হৃদয় দলি; যদি জেনে থাকো গোপন এ ব্যথা এসো তব হেথা আলোর তরনী বেয়ে। (৩) গলে যদি নাই পরাবে গাঁথলে কেন ফুলের মালা। নয়ন জলে করলে কেন দিগুন আমার হৃদয় জ্বালা। ধরা যদি নাই দিবে গো হাসলে কেন মধুর হাসি করলে কেন অমন ধারা চাওনি চোখের সর্বনাশী, বৃথাই গেল কোয়েলগীতি ফুল ফাগুনের বরণ ডালা। তোমায় আমি চেয়েছিলাম সেতো তোমায় পাবো বলে, তাইতো এতো ভুলেছিলাম তোমার যতো কপট ছলে, দেখেছিলাম রূপের ছটা জানিনি তো মনের কালা। (৪) এখনো রাত্রি হয়নি প্রভাত এখনো ডাকেনি পাখী, এখনো আসেনি বিদায় লগন ঝুরে কেনো তব আঁখি। চলে যাবো জানি তোমারে ছাড়িয়া বহুদূরে বহুদূরে, দেহ যাবে শুধু প্রাণ মোর হেথা আসিবে যে ঘুরে ঘুরে, নয়নের জলে যে কথা জানালে মনে হবে থাকি থাকি। মিলনের পরে বিরহের পালা আসে ফিরে ফিরে আসে, আবার মিলনে আঁখি জল মুছে হাসে আঁখি শুধু হাসে, এতো ভাবনার আছে কি যে আর জীবন এখনো বাকী। (৫) আমি বনের কুসুম ফুটি অন্তরালে ঝরি অন্তরালে। পথ পানে চেয়ে থাকি অধীর নয়ন কেউতো আসেনা মোরে করে না চয়ন, কোন ভ্রমর অলি কথা যায় না বলি দখিনা দেয় না দোলা আমার ডালে। বৃথাই যায়গো কেটে জীবন বেলা বাতাস সুরভি নিয়ে করেনা খেলা, শুধু শিশির কণা ঝরে অন্যমনা ব্যথিত অশ্রু কার আমার ভালে।
ছড়ার পড়া
অঃ অজগর, অজগর! কোথা যাও ভাই? এখানে খাবার মতো কিছুই যে নাই। আঃ আম গাছে আম আছে, তা কি তুমি খাবে? কাঁঠালের ভুতি ছাড়া আর কিবা পাবে! ইঃ ইলিশ মাছের তেল, সেতো ভাল নয়; রোজ খেলে হয়ে যাবে মোটা অতিশয়। ঈঃ ঈগলের সাথে যদি কর মিতালী, তাহলে পেতেও পারো খড় বিচালী। ঋঃ ঋণের বোঝায় ভারী চাষী ও মজুর, তাদের খেলেও ক্ষিধে হবেনা কো দূর। এঃ এক্কায় চড়ে তুমি যেয়ো শহরে, দেখবে অনেক লীলা আট পহরে। ঐঃ ঐরাবতের পিঠে চেপেছে বানর, ঘাতে তার লাল ছাতি, গলায় চাদর। ওঃ ওল গুলি গোল হয়ে সাঁঝের বেলা, নদীর পাড়েতে গিয়ে জমায় মেলা। ঔঃ ঔষধ খেয়ে গরু কওে ছটফট, দাড়ি আর পৈতায় চেহারা বিকট! কঃ কাকগুলি কাকা রবে জুড়েছে খেয়াল, তাই শুনে হেসে মরে পাঁচটা শেয়াল। খঃ খলসে মাছের দল ডাকাতি করে, ফেঁদেছে বিরাট বাড়ী ভাটির চরে। গঃ গাধার খসেছে লেজ, হাতে নিয়ে বই, কতো বুলি কপচায়, মুখে ফুটে খই। ঘঃ ঘড়া গুলি সার বেঁধে জমায় মিছিল, আড় চোখে চেয়ে দেখে পড়ে কিনা চিল। ঙঃ ঙ-এর নৌকা চড়ে চলে খরগোশ, পানির দাপটে তার কাঁপে ফুসফুস। চঃ চাল নেই চুলো নেই নাম তার রাজা, সকাল বিকাল কষে খায় শুধু গাঁজা। ছঃ ছাগলের দাড়ি দেখে হাসে টিকটিকি, চোখে তার রোদ লেগে করে ঝিকিমিকি। জঃ জাল ফেলে রাস্তায় জেলে মাছ ধরে, পেলে কিছু ছেলে তার বস্তায় ভরে। ঝঃ ঝাল খেয়ে বুড়ো খোকা করে আহা উহু, মাথায় কোকিল বসে কওে কুহুকুহু। ঞঃ ঞ-র বোচকা পিঠে ভিখ মেগে খায়, এক হাতে লাঠি আর তসবি গলায়। টঃ টাট্টুর পিঠে চেপে যায় হাড়গিলা, মোটা ভুড়ি উসখুস গায় জামা ঢিলা। ঠঃ ঠেলা গাড়ী ঠেলে নেয় এক মোটা হাতি, মাথার উপরে তার ইয়া বড়ো ছাতি। ডঃ ডুগডুগি বেজে উঠে নাচে উট পাখী, কোলা-ব্যাঙ গলা ছেড়ে কওে হাঁকাহাঁকি। ঢঃ ঢাকের বাদ্যি বাজে লাউয়ের আসর, কুমড়া চশমা এঁটে বাজায় কাঁসর। ণঃ মূর্ধণ্য ণ তার মাথার কুসুম, নীচেতে হুতুম পেঁচা ডাকে হুমহুম। তঃ তোতাপাখী জুতা পায়ে যায় ইস্কুলে, ইলিবিলি কতো কী যে পড়ে বই খুলে। থঃ থলি হাতে আরশোলা যায় বাজাওে, একটা চিংড়ি কিনে তিন হাজারে। দঃ দোয়েল শালিক ঘরে বসে খেলে তাস, দোয়ারে দাঁড়ায়ে আছে এক পাঁতিহাস। ধঃ ধুমধাম হৈচৈ গাধা করে বিয়ে, নাকেতে নোলক দিয়ে কনে সাজে টিয়ে। নঃ নাম তার পান্তোয় খায় গুড়গুড়ি, গায়ে তার আরশোলা দেয় সুড়সুড়ি। পঃ পিউ পিউ ডাকে ডালে বিড়ালের ছাও, নীচেতে পাপিয়া ডাকে মিয়াও মিয়াও। ফঃ ফুটবল কেঁদে বলে বাঁচিনাতো আর, পাগুলি মারছে লাথি তবু বারবার। বঃ বকেরা চশমা এঁটে ইতিউতি চায়, পুঁটিমাছ হাসে তার বুকের তলায়। ভঃ ভালুকের হাতে ছাতি চলে থপ্থপ, মৌচাকে মৌমাছি করে নাম জপ। মঃ ময়ুর পেখম ধওে কাকা বলে ডাকে, কাক গুলি কেকা রবে খোঁটা দেয় তাকে। যঃ যাঁতি বসে কালাপাতি দিয়ে খায় পান, সুপারী ব্যাপারী সেজে জুড়ে দিলো গান। রঃ রতন মানিক নিয়ে খেলে কালসাপ, ব্যাং গুলি ঠ্যাং তুলে দেয় অভিশাপ। [এ পর্যন্তই লিখে গেছেন]
ছড়ামী
নালিশ পুরের বালিশ মিয়ার পাঁচ’শ টাকার চাকরি, আমড়া কাঠের সখের চেয়ার তিন কুবে হয় লাকড়ি। দিন দুপুরে তিনটে শেয়াল মনের সুখে গাইছে খেয়াল; মালুর বৌয়ের ঘোমটা থেকেও যায় হারিয়ে মাকরি। বাজ পড়ে যে ঘরের চালে দিলেও গলা খাঁকরি। ফটফটিয়ে এলেন সায়েব পায়েতে তাঁর নাগরা। ধানের ক্ষেতে চিল পড়েছে, কে দেয় তাতে বাগড়া! মাছের বৌয়ের সাতটা নাতি তিনটা ঘোড়া চারটা হাতি; চিতল পেটী কাদা খোঁচাও যায় যে হয়ে তাগড়া। চশমা এঁটে চিকন বুড়ী ঘুরায় সাধের ঘাগড়া। চালের দামে এখন নাকি বিকায় তাজা রক্ত। ঘাপলা কোথায় কেউ বুঝেনা, ব্যাপারটা যে শক্ত! তাসের খেলা চলছে ভালো, দিন দুপুরে জ্বলছে আলো; নাকের ডগায় উড়ছে ফড়িং, যায় নামাজের অক্ত। বাজার মাজার সব একাকার হয়ে গাঁজার ভক্ত। ফৌজদারীতে যেতেই হবে সাতটা আছে মামলা, পাকনা চুলের বাছাই হবে, গোর মেরেছে আমলা। শিং গজিয়ে ধোবার গাধা জাবনা খেতে দেয় যে বাধা; মাগনা পেলে পয়সা দিয়ে কে নেয় বলো কামলা, বাবুই পাখির ঘরের মাঝে চড়–ই করে হামলা। চাকায় চাকায় টাকার খেলা কেউ পারেনা জান্তে। বালিশ মিয়ার নালিশ হলো আর পারেনা কান্তে। ঘরের মাঝে হুতুম থাকে, দোষ দেয়া যায় আর বা কাকে! কপাল বেয়ে ঘাম ছুটে যে বাজার করে আন্তে, এসব কথা ফলাও করে গেছেন লিখে দান্তে।
গোবদা সাধুর কোর্তা
কিশোর কবিতা সংকলন গোবদা সাধুর কোর্তা গোবদা সাধুর কোর্তাটি দেখতে বেশ জবরজং খুজঁলে পরে মিলবে তায় রংধনুকের সাতটি রং আসলে কোন রং তো নয় সাত কাপড়ের সাতটি তালি বাড়ছে যতো ভুড়ির বেড়, বাড়ছে ততো তালির ঢং। সাধুর মতো নয় মোটেই দেখতে গেলে তার ভুঁড়ি রোজ দুবেলা ঢালছে সে তায় পরোটা এক কুড়ি। বললে তারে, ‘বুঝলে ভাই পেটটা তোমার নয় সাধু!’ বলবে, ‘দেখো কোর্তাটা, হয় কি কোথাও এর জুড়ি?’ বললে তারে, ‘পাললে পেট, কামাই করে খাও, দাদা!’ বলবে, ‘পেলে পরেরটা কামায় নিজে কোন্ গাধা; তোমরা আমায় কও সাধু, যোগাও সবে অন্ন মোর, তাই দিয়েতো পেট ভরি, উপরি আরো পাই ছাঁদা। এর লাগিয়া দিনকে দিন বাড়ছে নিপট ভুঁড়ির ব্যাস; ভয় কী জানো? ওর মাঝে মেদ শুধু নয় জমছে গ্যাস। ঢেঁকুর তুলে বাই ছেড়ে সবটা কি আর হয় খালি, ভাবনা কখন যায় ফেটে লাগলে নিরেট কিছুর ঠ্যাস। তাইতো আমি কোর্তাটায় তালির পরে দেই তালি, রাখছি ঢেকে ভুঁড়ির বেড়, দেখলে লোকে দেয় গালি।’ বললে তারে, ‘এই বুঝি তোমার সাধু গিরির ভেখ?’ বলবে, ‘লোকে দেয়না তাই আমার মুখে চুন কালি।’
ফালতু সায়েব শ্যাওড়া তলার ফালতু সায়েব, হলেন জমিদারের নায়েব, গোফজোড়া তার ইয়া মোটা মোটা; খাজনা পাতি করেন গায়েব, কেউ যদি তার ধরলো আয়েব অমনি ছুটেন নিয়ে লাঠি সোঁটা। বলেন, ‘বেটা হারামজাদা, না হলে তোর বাপ আর দাদা এমন ছিলো নাতো কোন কালে; নাকের পরে ঘষলে রাঁদা, করতো না রা, এমনি সাদা বলতো ‘হুজুর’ কথার তালে তালে। তুই হয়ে তার ছেলের ছেলে, এমন শিক্ষা কোথায় পেলে, মানীর গায়ে মারিস কাদা ছুড়ে; একাই আমি সবটা খেলে, কখন চলে যেতাম জেলে মানতো কি কেউ আমায় রাজ্যি জুড়ে!’ সবাই শুনে বললে, ‘আহা, আরে না, না, হয় কি তাহা, ফালতু সায়েব এমন ভালো লোক; বউ মরেছে, শুনছি যাহা, আসলে তা নয়, মিথ্যে ডাহা, নইলে কি আর করেন বৌয়ের শোক। সদাই টুপি রাখেন মাথে, হাজার দানা তসবি হাতে, হজ্ব করেছেন খরচ করে টাকা; খোদার ভয়ে কাঁদেন রাতে, বাগড়া কে আর দেবে তাতে ঘর খানা তার রইলো আজো ফাঁকা।’ ছোকড়া গুলা বেজায় পাজি, বললে, ‘হলো তাই তো হাজি, বউ মারা পাপ হজেই হবে মাপ; দখিন পাড়ার গপসা কাজি, বারুই পাড়ার চিমঠে মাঝি সবাই জানে যায়না ঢাকা পাপ। ছেলেটা তার মরলো কিসে, কেউ পেয়েছে কি তার দিশে? বললে মোরা করবে সবাই রোষ; তাই যদি কই পাপের বিষে কিপটে যাঁতায় ফেলেছে পিষে অমনি হবে ছোকড়াগুলার দোষ। বউটা ছিল জবর ভালো, দেখতে কিছু হোকনা কালো দেয়া থোয়ায় হাতটা ছিলো খাসা; ফালতু সেতো কিপটে মালো, দেয়না রাতে ঘরেই আলো, এমন বৌয়ের বুঝবে কী সে চাষা। তাইতো সেবার ছেলের শোগে, ধরলো তারে বিষম রোগে বিছনা ছেড়ে উঠাই হলো দায়; অশুধ তার ছিলোনা ভোগে, করবে ভালো তাবিজ যোগে ফালতু গিয়ে ধরলো ওঝার পায়। শুনতে পেয়ে আমরা সবে, তার কাছেতে গেলাম যবে বললে, ‘তোরা বুঝিস কী বা ছাই; অশুধ খেলেই ভালো হবে, তাইলে কি আর মরতো ভবে, অশুধ কেনার পয়সা কোথায় পাই!’ সবার কথা ফেললে জলে, এর পরে কি বাক্যি চলে, আমরা ফিরে এলাম বিরস মুখে বৌ ছেলে তার মাটির তলে গেলো কিপটেপনার ফলে ফালতু সায়েব তাইতো আছে সুখে। কমলো খরচ বাঁচলো টাকা, তাতে গড়বে দেনার চাকা, মাটির তলে যাবেইযে তা নিয়ে; ঘরখানা তার থাকবে ফাঁকা, যতোই ভুরু করুক বাঁকা দেখবো মোরা দেয় কে তারে বিয়ে!
গবেষণা [সমালোচনা] অতবড়ো জন্তুটা নাম তার এইটুক, শুনে তাই খুকু সোনা হেসে উঠে খুকখুক। বলে, ‘বাবা, বলি হারি বুদ্ধিটা বুড়ো দের, কী দেখে যে নাম রাখে, দিশে নেই মুরোদের। নইলে যে হাত নেই সে কথাতো জানতো, শুঁড় আছে নাম দিয়ে তাই টেনে আনতো। মোটা মোটা পাও আর দাঁত দুটি মুলা যার, বড়ো সড়ো দেহ আর কান দুটি কুলা যার; তার নাম খেলা নয়, বুঝে হবে রাখতে, শব্দের ঠেকা কি অভিধান থাকতে। [প্রস্তাব] শুঁড় দেখে নাম তার রাখা যায় শুন্ডুল;* ছোটো হোক হস্তীর মতো নয় ভন্ডুল। পাও দেখে নাম তার রাখা যায় স্তম্ভ; (বুদ্ধিটা খেলে ভালো, করি নেকো দম্ভ।) কান দেখে শূর্প ও দাঁত দেখে কন্দ, দেহ দেখে পর্বত তবে মিলে ছন্দ। তারপর করে সব এক সাথে সৃষ্ট দরকার হলে করো শিলনোড়া পিষ্ট। মিলে মিশে হবে নাম জন্তুর যুক্ত ‘মদ-শূর-ভন্ডুল-পরব্ত-শুক্ত’। [*পাদটিকা ] শুন্ডের সাথে যোগ করে উল প্রত্যয় শুন্ডল হবে নাকি ব্যাকরণ ব্যত্যয়; এই মতো অভিমত করেছেন ব্যক্ত নিধিরাম পন্ডিত। হয়ে যাই ত্যক্ত, তাই হলে যেতে হয় ব্যাকরণ শিখতে তারপর যেতে হয় গবেষণা লিখতে! এই করে গোল্লায় গেলো পুরো দেশটা, গবেষণা করবার নেই কারো চেষ্টা। কেউ যদি করে তাকে করে দিতে পন্ড এক পায়ে ছুটে সবে উঁচু করি দন্ড।
করুণা বেচারাম দেউড়ি, ভোরে হয়ে খেউড়ি একটিন মুড়ি দেন ছড়ায়ে; শালিক আর কাকরা পায় তাতে বখরা। নিজে এক ঘটি জল গড়ায়ে পাখিদের তুষ্টি হলে দুই মুষ্টি মুড়ি খান খুব করে চিবিয়ে; তারপর ঢকঢক ঘটি করে ভকভক জল ঢেলে দেন ক্ষুধা নিবিয়ে। চান করে নদীতে চলে যান গদীতে পথে তার দেরী হয় কিছুটা, মাছ কিনে ছাড়াতে পিপড়ে না মাড়াতে বারবার দেখে পার নীচুটা। মানুষ কী নষ্ট দেয় জীবে কষ্ট ভেবে তার মনে হয় দুঃখ; তাই দেখে নিকারী ঘুঘু বক শিকারী মেজাজটা হয়ে যায় রুক্ষ। ঠেস দিয়ে তাকিয়ে বসে যান জাঁকিয়ে নিয়ে রোকড়ের খাতাপত্র; মনে তার আছে ভাব এই বার হলে লাভ খুলবেন এক দান সত্র। দেশে অনাবৃষ্টি জ্বলে গেলো সৃষ্টি, খাদ্যের দাম তাই বাড়ছে; দিনকাল মন্দা রোজ ভোর সন্ধ্যা ভিক্ষুক দ্বারে হাঁক ছাড়ছে। বেচারাম গুদামে রেখেছেন সু দামে ধান চাল কিনে লাখ বস্তা; দেখা যায় শুভচিন যাক আরো কিছুদিন দরদাম এখনো তো সস্তা। এরপর বন্যা কেঁদে মেঘ কন্যা দেশটারে করে দিলো গর্ত; চারদিকে হাহাকার ভেসে গেলো ঘর দ্বার এক হলো আকাশ আর মর্ত্য। এক মুঠি খাদ্য পায় কার সাধ্য নাহি দিলে এক মুঠি তংকা; সব ঘরে তাও নাই আছে শুধু খাই খাই রাত দিন মরণের শংকা। পায় যদি অন্ন হয়ে মতিছন্ন গাঁও ছেড়ে লোক যায় শহরে; ‘দাও দুষ্টি ফেনভাত’ কাতরায় দিনরাত মেটে নাকো ক্ষুধা আট পহরে। লঙ্গড় খানাতে দুটি ক্ষুদ দানাতে কয়জন পাবে আর রক্ষা; কিছুপানি চাল ডাল তার চেয়ে লাথি গাল বেশী খায়, শেষে পায় অক্কা। দেশ যবে মর মর বেচারাম পেয়ে দর রাতে রাতে করে দেন বিক্রি; ধান চাল কোথা যায় তাতে তার নাহি দায় যথা লাভ তথা তার ডিক্রি। নেই কোনো শংকা লাভে মূলে তংকা কতো হলো, গোনা তার কর্ম; জীবে দয়া করলে গতি হবে হবে মরলে জীবে দয়া তাই তার ধর্ম। এই ঘোরে আকালে আজো তাই সকালে চাল মুড়ি দেন তিনি ছড়ায়ে; ঘুরে দেখে পাড়াটা মাছ কিনে ছাড়াটা হয় নাকো, বেলা যায় গড়ায়ে বসে থেকে বাড়ীতে; কভু যান গাড়ীতে পথে ঘাটে চোখ করি অন্ধ। চার দিকে হাহাকার নেই কাজ কারবার রেখেছেন গদী তাই বন্ধ।
অতুলন ঘরের দাওয়ায় একটা পোষা বাজ পাখী থাকতো বসে, আপন মনে খুঁটতো গা; মোরগ বুড়া দেখতো তারে দূর থাকি, বললো সে দিন, ‘শুনছো ওগো বাজের ছা, তোমার মতো নবাব কোথাও নেই নাকি, মান যাবে কি আমার সাথে করলে রা?’ তাইনা শুনে উঠলো রেগে বাজের পো, বললে, ‘ওরে নিমক হারাম, বলিস কি? তোর সাথে মুই বলবো কথা, ওয়াক থু, মুখের দিকে যায়না চাওয়া বালাই ছি!’ বললে মোরগ, ‘মেজাজ কারে দেখাস তু, মোরগ কারো ধার ধারে না শুনিস নি? মুচকি হেসে বাজ তারে কয়, ‘হায় কপাল, পরের ঘরে থাকিস তবু বলিস এই!’ মোরগ বলে, ‘মিছাই ঝারিস মুখের ঝাল তুইও থাকিস পারের ঘরে, সন্দে নেই।’ বাজ বলে, ‘দুর, বলছি ভালো বুঝলি গাল।’ মোরগ বলে, ‘বৃথাই হারাস কথার খেই।’ এই না শুনে বললে রেগে বাজের পুত, ‘বলছি যা মুই একটি কথাও মিথ্যে নয়; মালিক এতো খাওয়ায় তবু পায়না জুত, ধরতে গেলেই দৌড়ে পালাস, কিসের ভয়? পরের খেয়ে হামবড়া তোর জাতের খুঁত, বলবি তবু মিছাই বাজে নিন্দে কয়।’ ‘দেখতো আমায় ছিলাম কোথায় জঙ্গলে মালিক এনে আদর করে পাললে, তাই ডাকলে পরে উড়াল দিয়ে যাই চলে, হাতের কাছে দিই ধরা, তায় নেই কামাই।’ মোরগ বলে, ‘হয়তো তা ঠিক, তাই বলে জানিস কী তুই, কিসের তরে মুই পালাই?’ ‘জীবন ভরে দেখলি নেতো কোথাও বাজ, তোদের কারো গোশ্ত দিয়ে রাঁধতে ঝোল; দেখলে পারে ধরতিরে তুই মোদের সাজ, ডাকলে তোরেও পালাতি, তায় নেই যে ভুল। তুই আর মালিক শিকার করা তোদের কাজ, শিকার যে হয়, তার সাথে নেই তোদের তুল।’
হুক্কাহুয়া দুপুর বেলা সবার চোখে লাগছে যখন ঘুমের ছোঁয়া, ঠিক তখনি শিয়াল বুড়ো উঠল ডেকে হুক্কা হুয়া। বললে সবাই, ‘ব্যাপার কিহে, ডাকছো ডেকে এই অবেলা? ঘরের বুড়ী মারলো কি ভাই কনুই দিয়ে বিষম ঠেলা?’ বললে শিয়াল, ‘ঠাট্টা রাখো, ডাকছি কি আর অমনি সাধে, দুদিন ধরে পাইনি কিছু বাচ্চা বুড়ী ক্ষিধেয় কাঁদে। মোড়ল বাড়ীর কুকুর গুলা এমনি পাজি, বলবো কি আর, ওদের হাঁকে ওই পাড়াতে যাওয়াই হলো ভীষন ব্যাপার। মোড়গ গুলাও সুযোগ বুঝে ঠ্যাং দেখিয়ে করছে খাতির, শিয়াল খেলে জাত যাবে, তাই লোকমা হবে মানুষ জাতির। ছোকড়াগুলাও দেদার চেঁচায়, ‘ওইযে শেয়াল, ওইযে শোয়াল!’ তোরাতো খাস রাজ্যি গিলে শিয়াল কি তা করছে খেয়াল? একটি মোরগ, ছাগল ছানা এইতো মোরা করছি দাবী, নাই দিলি তা, চেঁচাস কেনো, না হয় তোরা নিজেই খাবি! খোদার দেয়া এই দুনিয়া খুব চুটিয়ে করলি রে ভোগ তোদের সাথে জাত গোলাম ঐ কুকুর গুলাও দিচ্ছে যে যোগ; তাই দেখে তো কলেজ ফাটে, এমনি হলো পশুর পতন! সব খেকো ঐ মানুষ গুলার এমন করে করছে যতন। এইনা শুনে বললে কেহ, ‘নাই বা গেলে ওই পাড়াতে, বিদ্ঘুটে ঐ মানুষ পালা মোরগ গুলার দাও মারাতে। বিলের ধারে মাছ আছে আর কাঁকড়া শামুক দেদার মিলে, তাই দিয়ে পেট না হয় তুমি এই কটা দিন ভরেই নিলে। তারপারে তো মড়ক আছে মরবে মোরগ, মরবে গরু; কুকুর শকুন খেলেও তাতে পালতে পাবে বাচ্চা জরু।’ বললে শুনে শিয়াল বুড়ো, তুইতো দেখি আস্ত হাঁদা! বুঝবি কিসে ভোজের বাড়ীর পাত চাটা তোর নিত্যি সাধা। বিলের ধারে মানুষ গুলা বাঁধ দিয়েছে মাছের লাগি, আলোও জ্বেলে বাঁধের পারে সমস্ত রাত থাকছে জাগি। তাই তো সেদিন চুপটি করে ছিলেম বসে বাধেঁর পাশে, মিলতে পারে একটি মাছও নিদেন কাঁকড়া, তারই আশে। হায়রে কোথা মাছ পাবো আর কাঁকড়া খাবো, তার বদলে একসেরী এক ঢেলার চোটে ঝাঁপ দিলেম ঐ বিলের জলে। অনেক করে সাঁতরে শেষে জানটা নিয়ে এলাম ফিওে; আর কিওে যাই বাঁধের কাছে বৌ দিয়েছে মাথার কিরে। মরবে কবে মোরগ গরু, সেই আশতে বাঁধবো পাথর, এই করে কি দিন চলে আর দুদিন ধরে ক্ষিধেয় কাতর! বাচ্চা বুড়ী মরবে, শেষে মরবো নিজেও পেটের জ্বালায়, এর লাগিতো শুনছি এখন বাচ্চা রেখে শিয়াল পালায়। বাপ দাদারা ভালোই গেছে, মিলতো তখন অল্প বেশী, দুদিন ধরে অমন করে খিঁচতো নাতো পেটের পেশী। তখন এমন হন্যে হয়ে সব খেতো না মানুষ গুলো, খুব সহজেই দেওয়া যেতো কুকুর গুলোর চক্ষে ধূলো। ক্রমেই যতো যাচ্ছে রে দিন বাড়ছে ক্ষিধে, ছল-চাতুরি, লুটছে সবাই ইচ্ছামতো চুরির পরে করছে চুরি। তাই হলো আজ শিয়াল বোকা দেখছে চোখে সকল ভুয়া, দিন দুপুরে ডাকছে রে তাই হুক্কা হুয়া, হুক্কা হুয়া।
গাধা ঘোড়ার নাতি একটা হাতি বললে যখন এক গাধাকে ‘তোমার দেহ দেখলে কেহ করবে স্মরণ মোর দাদা কে। বললে গাধা, ‘তোমার দাদা এমন করে বলতো যদি, তাইলে কি আর থাকতো গো তার পিঠের পারে জিনের গদি। তোমরা ছেলে নতুন কেলে মানছো না তাই দাদার প্রথা; আমার কানে কিসের টানে বলছো রে ভাই এমন কথা? এ মুখ পোড়া বিশ্ব জোড়া নাম কিনেছে তার লোভে কি? তাইলে মোরে দাদার জোরে যেই চিনেছে, তার শোভে কি?’ বললে হাতি ঘোড়ার নাতি, আর কিছু নয়, কান দুটি তার তোমার মতো ভাবছি যতো মোর মনে হয় এমনি আকার। হাসলে গাধা, বললে,‘হাঁদা, কান দিয়ে কি বিচার চলে! বিরাট কায়া করলে ভায়া তাই গিয়ে কি হাতির দলে?’
মাছরাঙা নদীটার পাড় যেথা ভাঙা পুকুরে ধারে যেথা ডাঙা, সেই খানে ঝোপে ঝাড়ে বসে থাকে চুপি সারে তোমরা দেখেছো তারে নাম? তাও জানো ঃ মাছরাঙা। দেখে তারে মনে মনে ভাবলে, জ্যান্ত কি মরা, নেই সাড়া তো? একটু দাঁড়াও দুরে আগলে, চুপ কওে, নেই কোন তাড়াতো? দেখছো কি? বসে আছে চুপচাপ মাখছেনা গায়ে কোন রোদ তাপ; চোখ দুটি একঠাঁয় পানি যেথা বয়ে যায়, কি জানি কিসের দায় আচমকা টুপ করে দিলো ঝাঁপ। ঝুপ করে হলো একশব্দ দেখতে না দেখতেই এলো ফের, ঠোটে তার মাছ; তুমি স্তব্ধ দেখে তার খেলা এক পলকের। খেলা নয়, দেখলে যা আজ তার ঝোপ বুঝে কোপ মারা কাজ তার; খেয়ে দেয়ে আছে সুখে গায় পাখা ঠোঁট মুখে মাছের স্বপন চোখে আহা মরি শিকারীর সাজ তার! মাছ খেয়ে বেড়ে গেছে চেকনাই পাখা আর ঠোঁট হলো রাঙা, সবে মিলে নাম বুঝি দিলো তাই মাছ খেকো নয়, মাছরাঙা!
অযাচিত অনেক দূরে এক দেশে এক জঙ্গলে সেবার এলো শীত, পড়লো ঝরে গাছের পাতা গাছ তলে থামলো পাখীর গীত। সেথায় ছিলো বাঁদর ছিলো না তার চাদর, কোথায় পাবে ঘরের কোনে লেপের তলার আদর! এমনি খালি হাতে ঘুরছিলো সে রাতে। বইছে তখন হিমেল হাওয়া কনকনে কাঁপছে চারিধার ভাবছে বনের পশু পাখী নিজমনে উপায় নাহি আর। শীতের চোটে কাতর ঠক্ঠকে সেই বাঁদর দেখতে পেলো পথের ধারে চকচকে এক পাথর। আগুন ভেবে তাতে করলো জড়ো হাতে গাছের ঝরা শুকনো পাতা কয় মুঠো, লাগালো তায় ফুঁক, ফুঁয়ের চোটে হয় বুঝি তার পেট ফুটো যায় বা ফেটে মুখ। মোরগ ছিলো দূরে ঝোপের অন্তঃপুরে বাঁদর ভায়ার ব্যাপার দেখে মুন্ডু গেলো ঘুরে। ভাবলে বোকা, হায় চকচকে যা পায় তারেই ভাবে আগুন, আহা এর তরে করতে কিছু হয় - এইনা ভেবে বললে, ‘মিছাই, শোন ওরে করিস দেহ ক্ষয়। পাথর পাতায় জুড়ে দিলেই কি আর পুড়ে? হবার যা নয় তার লাগি তুই মরিস মাথা খুঁড়ে!’ বাঁদর শুনেও তায় মাখলে নাকো গায়। ভাবলে মোরগ শুনতে পেলে করতো রা, পায়নি বুঝি তাই পুণ্য কাজে কষ্ট কী আর তুলতে গা আমি নিজেই যাই। মোরগ ভেবে এই কাছে গেলো যেই, বললে বাঁদর, ‘কিসের তরে নাচিস রে ধেই ধেই?’ মোরগ বলে, ‘হায় বোঝান তরে দায়! বাঁদর বলে, ‘আহারে মোর বুদ্ধিমান বোঝানো তোর রাখ।’ এই না বলে জাপটে ধরে মুন্ডু খান করেই দিলো ফাঁক।
কাঁথা অনেক বছর আগে পৌষে কিবা মাঘে ঠিক মনে নেই- শীতের চোটে করলে চুরি কাঁথা একটা বুড়ো বাঘে। গায় দিয়ে সে কাঁথা করলে দেহ তাতা, তারপরে সে আরাম করে ফিরলে গুহার দিকে দোলদুলিয়ে মাথা। বাঘের বুড়ী দেখে ভাবছে ওমা, একে? দেখতে যেন বাঘের মতো গায়ে আবার কীযে রং এসেছে মেখে। দুলছে মাথা কোনো ভালুই হবে যেনো; পালাই তবে দেখলে পারে করবে বিষম তাড়া নাইতো মাতাল হেনো। বাঘ দেখে তার বুড়ী পালায় গুড়িগুড়ি; বললে ডেকে, ‘ও বুড়ী তুই যাস পালিয়ে কোথা আঁধার করে পুরী?’ শুনলে বুড়ী তাহা, বললে ফিরে, ‘আহা, ঢং দেখে আর বাঁচিনে গো, শেষ কালে তুই বুড়ো ভয় দেখালি ডাহা! গায় দিলি কী ওটা, দেখতে তো বেশ মোটা! বাষ বলে, তা বলছি পরে আগুন ধরাবি তো শুকনো পাতা জোটা। বসলে আলাও কওে হুঁকায় তামুক ভরে, বললে, ‘বুড়ী! শীতের দিনে এই গায়ে না দিলে মানুষ যেতো মরে। বললে বুড়ী হেসে খুকখুকিয়ে কেশে, ‘বাঘও বুঝি মরতো এবার যদিই না সে চুরি করতো তাহা শেষে!’ এই না শুনে বাঘে উঠলো কেঁপে রাগে, বললে, ‘বলিস এমন কথা দিলেম তবে ফেঁকে দেখি কী শীত লাগে! এই না বলে কাঁথা ফেললো করে যাতা, আগুন রেগে পুড়লো, তাতে বাঘবুড়া ও বুড়ীর গা হলো খুব তাতা।
দুষ্টুমি মায়ের কাছে এক যে আছে দুষ্টু খোকা নয় সে বোকা, দুষ্টুমিটা এমনি মিঠা বলবো কী আর! গল্পটি তার শুনলে তুমি মুখটি চুমি বলবে খেঁচে থাকসে বেঁচে দুষ্টুমিতে সবার চিতে। রাতের শেষে ঘুমের দেশে সূয্যি যখন দেখছে স্বপন তখন খোকা সে এক রোখা উঠবে জেগে বলবে রেগে, খুলবে না দোর, হয়নি কি ভোর? তখন তারে সবাই হারে বললে কিছু ডাকলে পিছু শুনবে সে, বসবে পাশে বলবে, মাগো তোমরা জাগো, সবাই কেনো আলসে হেনো! এই দেখোনা যাচ্ছে শোনা কাকের কাকা লাগছে ফাঁকা আঁধারটা যে, কয়টা বাজে? দেখবে ঘড়ি আনবে ছড়ি খুলতে যাবে এমনি ভাবে দরজাটাকে - বলবো কাকে, দেখতে খাসা যায়না হাসা; হাসলে কেঁদে মাথায় বেঁধে তুলবে টেনে, সেটুক জেনে থাকছি শুয়ে। সে একগুঁয়ে করছে তখন অনেক যতন ছড়ির আগায় খুলতে সে চায় ছিটকিনি টা, এমনি চিটা যায় না খোলা খাচ্ছে দোলা হাত দুটি তার মজার ব্যাপার! দেখছি, শেষে ফেলছি হেসে এমনি খোকা সে এক রোখা উঠলো রেগে ছুটলো বেগে আনলো ধরে আনেক করে চেয়ার টাকে দ্বারের ফাঁকে। তারপরে সে মুচকি হেসে দরজা বেয়ে উঠলো যেয়ে চেয়ার টাতে ধরলো হাতে ছিটকিনিটা, দুষ্টুমিটা বলবো কী তার, খুললো সে দ্বার। তাইতো খোকা ফুলের থোকা উঠলো হেসে, এক নিমেষে তার সে হাসি আলোর রাশি পুব আকাশে, ছড়ায় ঘাসে। ঘরের মাঝে আর কি সাজে আমায় শোয়া, লাগছে ছোঁয়া দুই চোখে মোর - রাত হলো ভোর।
ব্যাঙের সর্দি আষাঢ়ে মেঘের নতুন পানিতে কসরত করে ঠ্যাঙের সর্দি লেগেছে ব্যাঙের। চুপ করে বসে কাটায়েছে পুরা শীতকাল বাইরে যায়নি, বুঝেনি দেশের হালচাল। ফাগুন চৈতে আগুনে হাওয়ার হলকা, বৈশাখে জেঠে মাটিরে করেছে বলকা। কখনো ছুটেছে মাতাল ধুলির ঝরনা, এলো মেলো করে দিয়ে গেছে ঘর-করনা। তবুতো টলেনি নিঁদালু ব্যাঙের ঘাপটি, দুটি চোখ বুজে রয়েছে সে মাটি সাপটি। তার পরে যেই আষাঢ়ে মেঘের গুরগুর আকাশ বাতাশ কাঁপায়ে তুলেছে ভীমসুর। হাটে ঘাটে মাঠে নুপূর বেজেছে রিমঝিম, তরল পরশে ধরনী হয়েছে হিমহিম। অমনি টুটেছে ব্যাঙের দুচোখে চটকা, খুশিতে দু’গাল ফুলায়ে হয়েছে মটকা। নতুন পানির আসরে জমেছে গাওনা, এমন সময় সর্দি কি ছিলো পাওনা! সর্দি লেগেছে ব্যাঙের বারবার তাই তাল কেটে যায় রাগিনী গ্যাঙর গ্যাঙের। তবলার বোল তাধিন তাধিন ধিনতা, ব্যাঙোনীর গালে ফুটেনা, হয়েছে চিন্তা। কেমনে সর্দি দূর করা যায় তাইতো, ডাক্তার ছাড়া আর কোনো পথ নাইতো। শেষে লেজ নেড়ে এলো এক চ্যাঙ ডাক্তার, বললে, ‘পয়লা উঁচু করে দাও নাক তার। চ্যাপ্টা নাকের সর্দিতো বের হয় না গলায় চেপেছে, সুর তাই কথা কয়না।’ কচুর ডাঁটায় লাগিয়ে বিষম ঠেকনা, উঁচু হলো নাক। ঔষধ, তাও এক না। মাথায় দিয়েছে সবুজ শ্যাওলা পট্টি, গলায় দড়িতে পড়া গেরো একষট্টি। বুকেতে মালিশ ফেনা আর খাবে নোনতা, তা হলে বুঝবে অশুধের কীযে গুণ, তা। এর পওে যদি উবু হয়ে থাকো দেড় দিন, তাইলে রবেনা দেহে সর্দির কোনো চিন। উঁচু করে নাক উবু হয়ে থেকে ঔষধ খেয়ে চ্যাঙের সর্দি সেরেছে ব্যাঙের।
জোনাকী রাতের বেলা আকাশটাতে অনেক গুলি তারা কী যেনো কী খুঁজে বেড়ায় হয়ে পাগল পারা। মিটমিটিয়ে পিটপিটিয়ে রগড়ে নিয়ে চোখ, যতোই খুঁজে ততোই বাড়ে খোঁজে দেখার রোখ। এটুক লিখে ভাবছি যখন, হঠাৎ খোকন এসে, আমার ক’লাইন পদ্য পড়ে উঠলো বেজায় হেসে। বললো, বাবা, এই লিখেছো, তাও জানো নাকি? আসলে ওরা তারাতো নয়,ওরাও জোনাকী। অনেক দূরে আকাশ টাতে বিরাট গহীন বন, গাছের পরে গাছ সেখানে নেইকো মানুষ জন। পশুও নেই পাখীও নেই, দেও পরীদের বাস, বড়োই সুখে সেথায় তারা কাটায় বারোমাস। কইনু হেসে, গল্প তোমার কোথাও শোনা কি? নইলে কোথায় দেও পরী আর কোথায় জোনাকী! বললে রেগে, ‘শোনেই না ছাই, বলবে আবার কে, তোমাদের ঐ গল্পতো সব ‘গাঙ শালিকের বে’।’ তারপরে সেই গহীন বনে নেই কো দিবস রাত, চাঁদ সুরুজও করে নাকো সেথায় আলোক পাত। ঘুটঘুটে সেই আঁধার মাঝে জোনাকীদের মেলা, তার আলোতে দেও পরীরা খেলে মজার খেলা। খাওয়া পরার ভাবনা তো নেই, নেই কো ঘুমের টান, সবাই সেথায় নেচে বেড়ায় সবাই গাহে গান। চাঁদের চেয়ে আগে সেথায় তাইতো যাওয়া চাই, সেথায় যাবার গড়বো রকেট পয়সা যদি পাই।
মোমবাতি বাদশা দিলেন হাজার টাকা খাজারে, কী সব নাকি আনতে যাবে বাজারে। লোকটা ছিলো বেজায় চটা ফেললো ছিঁড়ে শূণ্য ক’টা, বললো রেগে, ‘খেয়েছে কী গাঁজারে! নইরে কি দ্যায় এক টাকা এক হাজারে। এক টাকা তে কিনলো সে মোমবাতি, ভাবলো, এতে চলবে গোটা দিনরাতি। আলোর চেয়ে আর কী ভালো, এইনা হলে সবতো কালো। তাই ভেবে সে খুব ফুলিয়ে নিজে ছাতি, বাজার থেকে র্ফিরলো চড়ে শ্বেত হাতি। বাদশা বলেন, ‘ব্যাপার কি হে সওদা কই? দেখছিনেতো কিছুই হাতির হওদা বই।’ বললে খাজা, ‘এই তো হাতে, আর কী পাবো এক টাকাতে; কিনেছি এই মোমবাতি। মুই আর যা হই, সবার মতো নিসটে বোকা মোটেও নেই। বাদশা বলেন, ‘দিলেন টাকা এক হাজার একটাকাতে করবি কেনো এই বাজার! নয়শ নিরানব্বই বাকী অমনি হবে মিথ্যে ফাঁকি, করলি কী তা, দম দিয়েছিস কোন গাঁজার? এই না বলে সাপটে ধরেন ঘাড় খাজার। চেঁচায় খাজা, ‘দোহাই হুজুর, মিথ্যে নয়; মটকে আবে ঘাড়টা বেজায় করছি ভয়। ডাকুন দেখি মুনশীজিকে আঁকটা দিলো সেই তো লিখে এক ছাড়া আর শূণ্য সবই, তাইতো হয়; শূণ্য গুলির নেই যে মূল্য সবাই কয়। বাদশা বলেন, ‘এহ বুঝি তোর আঁক শেখা, শূণ্য কবে পৃথক করে হয় লেখা? একের পিঠে শূণ্য দিলে তবেই তোরে হিসাব মিলে। শূণ্য কোনো সংখ্যাতো নয়, এক রেখা। মগজ তোর গোবর কতো যাক দেখা।’ এই না বলে বাদশা দিলেন এক ধমক, দূর হলো তায় খাজার যতো জাঁক জমক। মাথায় পোড়া গোবর নিয়ে আন্ধা গোরে ঢুকলো গিয়ে, বাদশা গেলেন শুনতে খেয়াল সুর গমক, অমনি মাথায় একটা কথা দেয় চমক। বলেন ডেকে খাজাঞ্চীকে, ‘ঠিক কি তাই, চায়নি খাজা হাজার টাকা তোমার ঠাঁই? খাজাঞ্চী কয়, ‘হায়রে কপাল, কোথায় পাবো খাজার নাগাল, কর্জ নিলে একটাকা, তায় দেখাই নাই হাজারতো দূর আর তারে দিই একটা পাই। বাদশা বলেন, ‘এই সেরেছে, হায় বোকা দিয়েছিলাম হাজার টাকার এক রোকা দেয়নি সে তা তোমার কাছে তাইলে সে তার সাথেই আছে, তাই তো এক আর শূণ্য নিয়ে এক রোখা গোল পাকালে, আমায় দিলে এই ধোকা।’ বাদশা বসে খাজার গোরের পাশটাতে দিলেন জ্বেলে মোমবাতিটা নিজ হাতে, বলেন, ছিলো লোকটা ভালো তার গোরেতে জ্বলুক আলো।’ দিলেন রেখে হাজার টাকা এই খাতে মোমবাতি তাই জ্বলছে গোরে দিনরাতে।
খোকার আব্দার আমায় রেখোনা, মাগো, বন্ধ করে এ ঘরের মাঝে, আমিতো হয়েছি বড়ো, আমার কি আর থাকা সাজে ঘরের কোনেতে শুধু! তোমার আঁচল ধরে ধরে কেবল খেলানো এই এতোটুকু উঠোনের পরে। আমায় দাওনা যেতে ওই দূরে মাঠের সবুজে, সেখানে বলদ গুলো হাল টানে চোখ বুজে বুজে। বাবাতো পাজন হাতে পিছু থেকে ওদেরে শাসায়, তবুও ছুটেনা ওরা; বলোনা মা, কিসের আশায় ছুটবে! ওদের মুখে বাধাঁ আছে মোটা মোটা দড়ি, ঘাসতো পায় না খেতে পিঠে পড়ে গুতো আর ছড়ি। বাবারে বলোনা মাগো, ওদের জোয়াল খুলে দিক্, সবুজ ধানের ক্ষেতে ওরাও কিছুটা খেয়ে নিক। না হয় খোরাকী কিছু কম হবে, তাতে কীবা দোষ, না হয় দুয়েক দিন আমারও করবো উপোস! বাবাতো আমার কথা শুনে না মা, শুধু ধমকায় তোমাকেও ধরে মারে, বুঝিনাতো বাবা কীযে চায়! ধরোনা, আমায় যদি কেউ নিয়ে জোয়ালেতে জুতে, মুখে দড়ি বেঁধে রাখে, কেবলি শাসায় খেতে শুতে। তাহলেও বাবা বুঝি মুখ বুজে সয়ে যাবে সব; তুমিও কাঁদবে শুধু, বলবে এ খোদার গজব? তা যদি না হয়, মাগো, দাও না আমায় যেতে আজ, হাতে দাও হাতিয়ার, গায়েতে পরাও বীরসাজ। জোয়ালের যতো দড়ি, কেটে দেবো সব গুলি তার, গরুগুলি ছাড়া পাবে খুশি মনে ঘুরে বেড়াবার। বাবা যদি রাগ করে, লাঠি নিয়ে আসে খুব তেড়ে, তুমি মা দিওনা বাধা দূর থেকে হাত নেড়ে নেড়ে। আমিও গরুর সাথে দেবো ছুট সারা মাঠভর, বাবা কি পারবে ছুঁতে নিয়ে তার বাতের কোমর! ছুটে ছুটে শেষটায় বেড়ে যাবে বুকের হাঁপানি, বলবে তোমায় এসে, ‘দাও দিকি এক গ্লাস পানি।’
ভূতের ছা দুপুর বেলা ভুতের ঢেলা পড়লো গায়ে আচমকা, অমনি সটান ঘাবড়ে গিয়ে দৌড়ে পালান আদম খাঁ। বললে সবাই, ‘ও খাঁ সায়েব! পালান কোথা, ব্যাপার কি?’ বলেন, ‘ওরে ভুতের ঢেলা, পালাও রেখে ইয়ারকি!’ সবাই পালায়, ঠিক দুপুরে ভূতের ঢেলা বাপরে বাপ! ভয়ের চোটে হোতকা মোটার উঠলো বেড়ে রক্তচাপ। পটকা পিলের হালকা দেহে বাড়লো জোরে হাঁপির টান। ছুটলো সবাই সেই দিকেতে, যেথায় গেলেন আদম খান। পালায় বুড়া পালায় বুড়ী জোয়ান ছুঁড়ী মায় ছারে, ভূতের ভয়ে কাতর হয়ে রইলোনা কেউ দেশ গাঁয়ে। মা বাপ হারা কয়টি ছেলে ঘাঁটতে ছিলো আস্তাকুঁড়, ওরাই শুধু জানলো না এই ভূতের ভয়ের ঘটার তোড়। আস্তা কুঁড়ের আস্ত পচা খাবার খেয়ে পেট ভরে ফিরছে যখন পথের পাশে চাটায় ঘেরা নিজ ঘরে দেখলো পথে আগের মতো ছুটছে নাতো আর গাড়ী, করছে খাঁ খাঁ দিন দুপুরে দালান কোঠা সব বাড়ী। ঋাবলে ওরা, ভর দুপুরে কোথায় গেলো লোক গুলা, হয়তো কোথাও দাওয়াত আছে, সন্দেহ নেই এক তোলা। এই না ভেবে পাড়ায় পাড়ায় ওরাই শুধু বাড়ায় পা, জানিনে ভাই, মানুষ ওরা কিংবা ওরাই ভূতের ছা।
হাড়গিলা সায়ের সেজে হাড় গিলা গায় লাগিয়ে সুট ঢিলা টাই উড়িয়ে হাওয়াতে জুটলো এসে দাওয়াতে। রাঁধতে বসে শিয়ালনী ফেলছে পুড়ে বিরিয়ানী ছুটছে বিকট গন্ধ তার, চার দিকেতে অন্ধকার। চশমা এঁটে নাক দুটোয় আগুন জ্বেলে কাঠ কুটোয় শিয়াল দেখে সব ফাঁকা, বৃথাই গেলো ত্রিশ টাকা! শুনতে পেয়ে হায়জারি হাড় গিলা কয় ডাক ছাড়ি, ও ভাই শিয়াল চিন্তা কি; একাই যাবো মান রাখি। খেলাম কতো হাড় গিলে বিরিয়ানী তো খুব ঢিলে, সুরুৎ সুরুৎ টান মেরে এই তো দিলাম সব সেরে। সবটা একা সাবড়িয়ে হাড়গিলা যায় ঘাবড়িয়ে, পেট ফুলে তার আস্ত ঢোল বাধলো বিষম গন্ড গোল।
পুতুলের বিয়ে গোলগাল পুতুলের তুলতুলে গাল, কেনো জানি হয়ে গেছে টুকটুকে লাল। ভাবনায় শান্তির চোখে নেই ঘুম, বারবার দেখে আর গালে খায় চুম। শ্যামলের ছেলেটার বিয়ে গেলো কাল, সেখানে পুতুল গিয়ে খেয়েছে কি কাল? সারাদিন হৈ চৈ গেছে ধুম ধাম, মনে কারো পড়ে নাই পুতুলের নাম। কাজলের মেয়েটার মূখে বড়ো ঝাল, সেই কি দিয়েছে তবে পুতুলের গাল? তাই শুনে মাথা বুঝি করে ঝিম ঝিম, হাত পাও হয়ে গেছে এতো হিম হিম! পুতুলের পাশে বসে পুষি খায় চাল, শান্তি যে রাঁধে নাই আজ চাল ডাল। সব শুনে পুষি তাই হাসে ফিক ফিক, বলে এর কোনোটাই নয় বুঝি ঠিক! আসলে যে পুতুলের বিয়ে হবে কাল, লজ্জায় গাল তাই হয়ে গেছে লাল। তাই শুনে শান্তিও কুঁচকিয়ে নাক বলে, ‘আমি বুঝেছিরে, বলিস নে, থাক। শুনে তাই ডালুটাও দেয় তিন ফাল, আহলাদে পড়ে তার জিভ দিয়ে নাল। পুষিটাও জিভ দিয়ে করে চুক চুক, সব কিছু বুঝে ওরা, নয় উজবুক।
দেখলে খুঁজে অনেক কিছু মিলে! সকাল বেল সূয্যি যখন উঠে বইতে থাকে মন্দ মধুর হাওয়া, মুচকি হেসে ফুল কলিরা ফুটে অমনি জুড়ে পাখীরা গান গাওয়া। ঠিক তখনি দেখলে চেয়ে দূরে কী যেনো হয় মনের অন্তঃপুরে! মেঘেরা সব ঘুমিয়ে যখন থাকে দূরের আকাশটাতে হেলান দিয়ে, গাছেরা সব গায়েতে রোদ মাখে, খেলায় বায়ু পাতার আঁচল নিয়ে! ঠিক তকনি আকাশের ঐ নীলে দেখলে খুঁজে অনেক কিছু মিলে! আবার যখন মেঘেরা সব জেগে করতে থাকে বেজায় হুড়ো হুড়ি, ঝিলিক দেয়া গরজে উঠে রেগে পড়তে থাকে বৃষ্টি গুড়ি গুড়ি। ঠিক তখনি মেঘের ফাঁকে ফাঁকে অনেক কিছু লুকিয়ে বুঝি থাকে। সাঁজের বেলা সূয্যি যখন ডুবে টিপের মতো উঠে সন্ধ্যা তারা, কালির মতো কালো ঘনায় পুবে পশ্চিমেতে মিলায় আলোর ধারা। ঠিক তখনি দেখলে আকাশটাতে কিসের ছোঁয়া লাগে নয়ন পাতে। রাতে য়খন ছড়ায় চাঁদের হাসি লতায় পাতায় মধুর মায়া ঝলে, দূরে কোথাও বাজতে থাকে বাঁশি কারা যেনো বেড়ায় হাওয়ার ছলে। ঠিক তখনি দেখলে বসে একা অনেক কিছু যায় বুঝিবা দেখা! আঁধার রাতে যখন তারার আলো ঝিকমিকিয়ে জ্বলতে থাকে দূরে, ঘুমায় ধরা চাদর মুড়ে কালো ঝিল্লি পোকার ঘুম পাড়ানী সুরে। ঠিক তখনি দেখলে দুচোখ মেলে মনের মাঝে অনেক কিছু খেলে ।
কৈফিয়ত কৈফিয়তে বলার কিছু নেই, বলবো শুধু এই - যাদের তরে লিখছি, যদি তারা বুঝতে পারে, তবেই হলো সারা আমার সকল কাজ। নইলে কথার ভাঁজ বাড়বে যতো ততোই হবে ভুল, যার কিছু নেই মূল।